• ই-পেপার

শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

শায়েখ ড. হুসাইন

দাম্পত্য জীবন নিয়ে মসজিদে নববীর খতিবের হৃদয়স্পর্শী নসিহত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দাম্পত্য জীবন নিয়ে মসজিদে নববীর খতিবের হৃদয়স্পর্শী নসিহত
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। একটি সুস্থ পরিবারই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। তাই ইসলাম যেমন বিবাহকে সহজ করেছে, তেমনি সংসার রক্ষা ও পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বৈবাহিক জীবনে যখন সব ধরনের সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই শুধু তালাককে শেষ ও অনিবার্য সমাধান হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।

গতকাল মদিনায় (১৭ জুলাই ২০২৬) তারিখে মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব, শায়েখ ড. হুসাইন তাঁর জুমার খুতবায় ইসলামে বিবাহ, পারিবারিক জীবন ও তালাকের বিধান সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ইসলামী শরিয়ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, মমতা ও দয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবারকে স্থিতিশীল রাখা এবং প্রত্যেক সদস্যের অধিকার সংরক্ষণ করাই ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই বিবাহিত জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলেও ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ কর, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

কেননা কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টিতে যে বিষয়টি অপছন্দনীয় মনে হয়, আল্লাহ তাতেই বহু কল্যাণ ও বরকত রেখে দেন। তাই সাময়িক রাগ, অভিমান বা মতবিরোধের কারণে সংসার ভেঙে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। মহানবী (সা.)-ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে নিশ্চয়ই তার অন্য কোনো স্বভাব তাকে সন্তুষ্ট করবে।’ (সহিহ মুসলিম)

শায়েখ ড. হুসাইন বলেন, এই হাদিস আমাদের শেখায়—মানুষের দুর্বলতার দিকে নয়, তার ভালো গুণগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। দোষ খুঁজে সম্পর্ক ভাঙার পরিবর্তে গুণাবলিকে মূল্যায়ন করে ধৈর্যের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের পরিচয়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ইসলামে তালাক কোনো আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। বরং যখন সব ধরনের মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং একসঙ্গে বসবাস করা সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে তালাকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কখনোই তাড়াহুড়ো করে বিবাহবিচ্ছেদের অজুহাত হতে পারে না।

তিনি বৈধ তালাকের শরয়ি পদ্ধতিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বামী স্ত্রীকে এমন পবিত্রতার সময়ে একবার তালাক দেবেন, যখন সেই পবিত্রতার সময়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। অথবা স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন, তবে সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া যেতে পারে। এরপর স্ত্রীকে ইদ্দতের সময় দাম্পত্য গৃহেই থাকার সুযোগ দিতে হবে, যাতে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা বজায় থাকে। কারণ আল্লাহ চাইলে এ সময়ের মধ্যেই উভয়ের মন পরিবর্তন হতে পারে এবং পরিবার আবারও একত্রিত হতে পারে।

তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেন শরিয়তবিরোধী তালাকের প্রচলিত কিছু ভুল পদ্ধতি সম্পর্কে। যেমন—এক বৈঠকে তিন তালাক উচ্চারণ করা, ঋতুস্রাব চলাকালে তালাক দেওয়া অথবা এমন পবিত্রতার সময় তালাক দেওয়া, যখন ওই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস হয়েছে। এসব পদ্ধতি শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

খুতবায় তিনি আরেকটি সামাজিক ব্যাধির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অনেকেই কথার জোর বাড়াতে বা কাউকে বাধ্য করতে ‘তালাকের কসম’ ব্যবহার করেন। যেমন—‘তালাকের কসম, তুমি আজ এখানেই খাবে’, ‘তালাকের কসম, তুমি ওখানে যাবে না’ ইত্যাদি। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় অভ্যাস। তালাক আল্লাহর নির্ধারিত একটি গুরুতর বিধান; এটিকে খেলাচ্ছলে, শপথ হিসেবে বা কথার জোর বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা মারাত্মক অবহেলার পরিচয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী উদ্ধৃত করেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। অতএব তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তারাই জালিম।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৯)

খুতবার শেষাংশে তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ার আহ্বান জানান। রাগের মুহূর্তে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার জন্য পরে সারাজীবন অনুশোচনা করতে হয়। তিনি নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শরয়ি নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দেন। কোনো বৈধ কারণ ছাড়া শুধু আবেগ বা সাময়িক অসন্তুষ্টির বশবর্তী হয়ে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া ইসলামে বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী উল্লেখ করেন, ‘যে নারী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণও হারাম হয়ে যায়।’(তিরমিজি)

ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক বৈধ হলেও এটি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। ইসলামের লক্ষ্য সংসার ভাঙা নয়, বরং সংসার টিকিয়ে রাখা। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ একটি স্থিতিশীল পরিবার শুধু দুইজন মানুষের সুখই নিশ্চিত করে না; বরং সন্তান, সমাজ এবং পুরো জাতির কল্যাণের ভিত্তিও রচনা করে। আর যখন বিচ্ছেদ ছাড়া সত্যিই কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না, তখনও ইসলামের নির্ধারিত বিধান ও শিষ্টাচার মেনেই সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

সফল হতে কোরআনের যে তিন সূত্র মানা জরুরি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সফল হতে কোরআনের যে তিন সূত্র মানা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

এখানে এমন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হচ্ছে, যা দ্বিন ও দুনিয়ার সফলতার সূত্র।

১. দোয়া : দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতে হবে, যেন তিনি কাজটি সহজ করে দেন এবং সফলতা দান করেন। কারণ দোয়া হলো ইবাদত, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম এবং সেই মহান রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা, যার হাতেই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অপমানিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৭৯)

একজন বান্দার উচিত দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিটি ছোট-বড় প্রয়োজন আল্লাহর কাছেই চাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার সকল প্রয়োজনই তার রবের কাছে চায়; এমনকি তার জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও সেটিও যেন আল্লাহর কাছেই চায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬০৪)

২. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা : দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে হবে, যেন তিনি কাজকে সহজ করে দেন এবং সফলতা দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : আত-তালাক, আয়াত : ৩)
অর্থাৎ আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট সাহায্যকারী ও অভিভাবক।

তাওয়াক্কুলের অন্যতম সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমিন (রহ.)। তিনি বলেন, ‘তাওয়াক্কুল হলো, উপকার লাভ ও ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য আল্লাহর ওপর আন্তরিকভাবে নির্ভর করা, পাশাপাশি আল্লাহ যে উপায়-উপকরণ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন, তা যথাযথভাবে অবলম্বন করা।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, ১/১০৬)

সুতরাং একজন মুমিন ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে এবং তার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত রাখে। কারণ সে বিশ্বাস করে, সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর ফয়সালায় এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণেই সংঘটিত হয়।

৩. উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা : সফলতা অর্জনের জন্য কল্যাণকর উপায় গ্রহণ করা এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। এটি কখনো তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ তাওয়াক্কুলকারী ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি যেমন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করতেন, তেমনি শরিয়তসম্মত ও বাস্তবসম্মত সব উপায়ও অবলম্বন করতেন। তিনি বিভিন্ন জিকিরের মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতেন। ঘুমানোর আগে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করতেন। যুদ্ধে বর্ম পরিধান করতেন। খন্দকের যুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য খন্দক খনন করেছিলেন। এভাবে তিনি সব বৈধ উপায় গ্রহণ করতেন। তিনি আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। এমনকি দুর্বল উপায় হলেও তা গ্রহণ করা উচিত। উপায় গ্রহণের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি তখন ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, সদ্য সন্তান প্রসবকারী এক নারী। অথচ আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন একটি বিশাল খেজুরগাছের কাণ্ড ঝাঁকাতে, যা শক্তিশালী পুরুষদের পক্ষেও সহজ ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তুমি খেজুরগাছের কাণ্ডটি তোমার দিকে নাড়াও; তাহলে তোমার ওপর ঝরে পড়বে তাজা ও পাকা খেজুর।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৫)

আল্লামা আশ-শানকিতি (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা চাইলে গাছ না ঝাঁকিয়েই মারইয়ামের ওপর খেজুর ঝরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁকে গাছের কাণ্ড নাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে মানুষ শিক্ষা লাভ করে যে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি বৈধ উপায়-উপকরণ গ্রহণ করাও অপরিহার্য।’

অতএব একজন মুসলিমের জন্য দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে এই তিনটি নীতি সর্বদা অনুসরণ করা উচিত—
১. আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
২. পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতাসহ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা।
৩. শরিয়তসম্মত ও বৈধ সব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা।

যখন এই তিনটি বিষয় একত্র হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় কাজ সহজ হয়, অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের পথ সুগম হয়।

নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ

আলেমা হাবিবা আক্তার
নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ
সংগৃহীত ছবি

আদি পিতা আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন করলেন এবং স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন, তখন আল্লাহ অঙ্গীকার করলেন—‘যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৩৮)

আল্লাহ তাআলা এই অঙ্গীকার পূরণের প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক।’ (সুরা : রাআদ, আয়াত : ৭)
আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের বাহক হিসেবে যুগে যুগে যেসব নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের মৌলিক কাজ ছিল চারটি। তা হলো—‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতগুলো; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ২)

ক. কিতাব তিলাওয়াত করা, খ. আত্মশুদ্ধি করা, গ. কিতাব শিক্ষা দেওয়া, ঘ. প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘পশু প্রবৃত্তিকে বিবেকের নিয়ন্ত্রণে রাখা, অবাধ্যতার পরিবর্তে দাসত্বকে বরণ করে নেওয়া, পার্থিব জীবন পরকালীন জীবনে অনুকূলে পরিচালিত করা এবং সর্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই আল্লাহ নবীদের ওপর এই চারটি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ)

প্রধান চার মিশন
আয়াতে বর্ণিত চারটি কাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো—
আয়াত তিলাওয়াত করা
আয়াত তিলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর কিতাব যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়া মানুষকে পাঠ করে শোনানো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল! আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তা প্রচার করলেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটা তো ওহি। যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)

কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব : প্রশ্ন হলো—কোরআন তিলাওয়াতকে আল্লাহ নবী-রাসুলদের অন্যতম প্রধান মিশন বানালেন কেন? উত্তর হলো—আল্লাহ কোরআনকে হেদায়েত, ঈমান ও সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন।

ক. হেদায়েতের উৎস : আল্লাহর কিতাবগুলো মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উৎস। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে বিকৃতি আসায় তার অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন হেদায়েত করে সেই পথের দিকে, যা সুদৃঢ়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)
খ. ঈমানের উৎস : আল্লাহ তাঁর কিতাব তথা কোরআনকে ঈমানের উৎস বানিয়েছেন। তাই মানুষের উচিত তা পাঠ করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তার আয়াত তাদের কাছে তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)

গ. সব জ্ঞানের উৎস : আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিতাবে কোনো কিছুই আমি বাদ দিইনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

আত্মিক পরিশুদ্ধি
নবী-রাসুলদের দ্বিতীয় প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, তাদেরকে পবিত্র করবেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে মন্দ স্বভাব, অন্তরের কলুষতা, মূর্খতাসুলভ কাজ থেকে পবিত্র করবেন। ফলে তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৬৪)

আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক স্তর হলো মানুষের মন্দ স্বভাব ও চরিত্র দূর করে তার ভেতর উত্তম স্বভাব-চরিত্র সৃষ্টি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম আখলাক পূর্ণতা দানের জন্য।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৭৩)

আর সর্বোচ্চ স্তর হলো ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়া। তা হলো দুনিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতি। সহিহ বুখারিতে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহ ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি)

পবিত্র কোরআনে আত্মশুদ্ধিকে সাফল্যের চাবিকাঠি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেই সফল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সেই ব্যর্থ যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করল।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৮-৯)

কিতাব শিক্ষা দেওয়া
মুফাসসিররা বলেন, কিতাব শিক্ষা দেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা দেওয়া। শরিয়ত হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত জীবন বিধান। এর মাধ্যমে বান্দা পার্থিব জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্জি অনুসারে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। আল্লাহ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে চূড়ান্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)

মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মনোনীত দ্বিন ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে বলেন, ‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বিন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)

আর আল্লাহ প্রণীত জীবন বিধান ছাড়া মানুষের ভেতর ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেননা মানব প্রণীত বিধান অপূর্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত হতে পারে না।

প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া
আয়াতে বর্ণিত, হিকমত শব্দের ব্যাখ্যা দুইভাবে করা হয় : ক. হিকমত হলো শরিয়তের উচ্চতর জ্ঞান, খ. হিকমত হলো পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। তাফসিরবিদদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যদিও পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান নববী মিশনের অপরিহার্য অংশ নয়, তবে ইসলাম মানুষকে পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ থাকতে বলে না, বরং পার্থিব জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে যে উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হয়, তা গ্রহণ করতে বলে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কোরো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

মুসলিম ঐতিহাসিকরা লেখেন, নুহ (আ.) ছিলেন প্রথম রাসুল। তিনি প্রথম শরিয়ত লাভ করেন। তাঁর পূর্ববর্তী নবীরা ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানুষকে পার্থিব জীবনের ব্যবস্থাপনাগুলো শিখিয়েছেন।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

আজ শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩, ৩ সফর, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ৮ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৫ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৪টা ০০ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৯ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।