মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রদত্ত এক হৃদয়স্পর্শী জুমার খুতবায় শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া, ইখলাস, সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের তাৎপর্য অনুধাবনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো নিজের রবকে জানা। আর আল্লাহকে জানার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। কেননা একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জানবে, তত বেশি সে তাঁর মহিমা উপলব্ধি করবে, তাঁকে ভালোবাসবে, তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে। কারণ আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনাই প্রকৃত ঈমানের ভিত্তি।
ইয়া হাইয়্যু ও ইয়া কাইয়্যুম: আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দুই নাম
খুতবায় বিশেষভাবে আল্লাহর দুটি মহান নাম—ইয়া হাইয়্যু (চিরঞ্জীব) এবং ইয়া কাইয়্যুম (স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক)—এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘ইয়া হাইয়্যু’ নামটি আল্লাহর পরিপূর্ণ, চিরন্তন ও অনন্ত জীবনের পরিচয় বহন করে। তাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই, শেষও নেই। তিনি কখনো ক্লান্ত হন না, তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তাঁর জীবন পূর্ণাঙ্গ; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাঁর অসীম জ্ঞান, সীমাহীন ক্ষমতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, অসীম দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং পরিপূর্ণতার সব গুণ।
অন্যদিকে ‘ইয়া কাইয়্যুম’ নামটি নির্দেশ করে যে, আল্লাহ নিজে কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল। আকাশ, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন পরিচালিত হয়। তিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান, মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, মর্যাদা হ্রাস করেন, বিপদ দূর করেন, রোগমুক্তি দান করেন, তওবা কবুল করেন এবং অসহায়ের আহ্বানে সাড়া দেন।
আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নামের মর্যাদা
তিনি উল্লেখ করেন, বহু আলেমের মতে ‘ইয়া হাইয়্যু’ ও ‘ইয়া কাইয়্যুম’-ই আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম; যে নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা দান করেন। এই দুটি নামের ফজিলত সম্পর্কে মুসনাদ আহমাদ ও সুনান ইবনে মাজাহ-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা এসেছে। এছাড়া আয়াতুল কুরসি, সুরা আলে ইমরানের শুরু এবং সুরা ত্ব-হা-তেও এই মহান দুই নামের উল্লেখ রয়েছে।
কোরআনের আলোকে আল্লাহর চিরন্তন সত্তা
ইমাম আল-মুয়াইকলি স্মরণ করিয়ে দেন, একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীব; তাঁর ছাড়া সবকিছুই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী তুলে ধরেন, ‘আর তুমি সেই চিরঞ্জীবের ওপর ভরসা করো, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল। কেবল তোমার প্রতিপালকের মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তাই চিরস্থায়ী।’(সুরা : রহমান, আয়াত : ২৬–২৭)
তিনি নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ঈমানের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন। তখন তিনি কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে মুসলিমদের স্থিরতা ফিরিয়ে আনেন, ‘মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন..।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৪)
আয়াতুল কুরসি : আল্লাহর মহিমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা
খুতবায় আয়াতুল কুরসির তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করা হয়। এই আয়াতে আল্লাহর পরিপূর্ণ জীবন, স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সর্বময় কর্তৃত্ব, অসীম জ্ঞান ও অপরিসীম শক্তির ঘোষণা রয়েছে। ‘আল্লাহ! তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁর...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৫)
এই আয়াত ঘোষণা করে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সংরক্ষণ আল্লাহকে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত করে না। কারণ তিনিই সর্বোচ্চ, সর্বমহান এবং সর্বশক্তিমান।
ঈমানের বাস্তব শিক্ষা
ইমাম আল-মুয়াইকলি বলেন, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহই চিরঞ্জীব, তিনিই সবকিছুর মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী—তখন তার অন্তরে তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা), ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়। সে মানুষের ওপর নয়, একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে-বিপদে সে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।
নবী (সা.)-এর শেখানো মহামূল্যবান দোয়া
খুতবার শেষাংশে মুসলিমদের সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়। বিশেষভাবে তিনি এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার আহ্বান জানান,
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
উচ্চারণ : ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আসতাগিছ। আসলিহ লি শানি কুল্লাহু, ওয়া লা তাকিলনি ইলা নাফসি তারফাতা আইন।
অর্থ : ‘হে চিরঞ্জীব! হে সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক! আমি আপনার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সব বিষয় সংশোধন করে দিন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না।’ এছাড়া তিনি বেশি বেশি ইস্তিগফার করারও আহ্বান জানান। বিশেষ করে এই দোয়াটি পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন—
أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহ ইল্লা হুয়াল হায়্যিুল কায়্যিুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ : ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক; আর আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।’
এই জুমার খুতবার মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহকে তাঁর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে জানা এবং সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। যখন একজন মুমিন উপলব্ধি করে যে আল্লাহই আল-হাইয়্যু এবং আল-কাইয়্যুম, তখন তার অন্তর থেকে ভয়, হতাশা ও নির্ভরতাহীনতা দূর হয়ে যায়। সে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করে। আর এভাবেই আল্লাহর নামের জ্ঞান মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথে পরিচালিত করে।




