• ই-পেপার

শায়েখ ড. হুসাইন

দাম্পত্য জীবন নিয়ে মসজিদে নববীর খতিবের হৃদয়স্পর্শী নসিহত

শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ
সংগৃহীত ছবি

মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রদত্ত এক হৃদয়স্পর্শী জুমার খুতবায় শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া, ইখলাস, সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের তাৎপর্য অনুধাবনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো নিজের রবকে জানা। আর আল্লাহকে জানার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। কেননা একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জানবে, তত বেশি সে তাঁর মহিমা উপলব্ধি করবে, তাঁকে ভালোবাসবে, তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে। কারণ আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনাই প্রকৃত ঈমানের ভিত্তি।

ইয়া হাইয়্যু ও ইয়া কাইয়্যুম: আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দুই নাম
খুতবায় বিশেষভাবে আল্লাহর দুটি মহান নাম—ইয়া হাইয়্যু (চিরঞ্জীব) এবং ইয়া কাইয়্যুম (স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক)—এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘ইয়া হাইয়্যু’ নামটি আল্লাহর পরিপূর্ণ, চিরন্তন ও অনন্ত জীবনের পরিচয় বহন করে। তাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই, শেষও নেই। তিনি কখনো ক্লান্ত হন না, তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তাঁর জীবন পূর্ণাঙ্গ; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাঁর অসীম জ্ঞান, সীমাহীন ক্ষমতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, অসীম দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং পরিপূর্ণতার সব গুণ।

অন্যদিকে ‘ইয়া কাইয়্যুম’ নামটি নির্দেশ করে যে, আল্লাহ নিজে কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল। আকাশ, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন পরিচালিত হয়। তিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান, মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, মর্যাদা হ্রাস করেন, বিপদ দূর করেন, রোগমুক্তি দান করেন, তওবা কবুল করেন এবং অসহায়ের আহ্বানে সাড়া দেন।

আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নামের মর্যাদা
তিনি উল্লেখ করেন, বহু আলেমের মতে ‘ইয়া হাইয়্যু’ ও ‘ইয়া কাইয়্যুম’-ই আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম; যে নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা দান করেন। এই দুটি নামের ফজিলত সম্পর্কে মুসনাদ আহমাদ ও সুনান ইবনে মাজাহ-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা এসেছে। এছাড়া আয়াতুল কুরসি, সুরা আলে ইমরানের শুরু এবং সুরা ত্ব-হা-তেও এই মহান দুই নামের উল্লেখ রয়েছে।

কোরআনের আলোকে আল্লাহর চিরন্তন সত্তা
ইমাম আল-মুয়াইকলি স্মরণ করিয়ে দেন, একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীব; তাঁর ছাড়া সবকিছুই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী তুলে ধরেন, ‘আর তুমি সেই চিরঞ্জীবের ওপর ভরসা করো, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল। কেবল তোমার প্রতিপালকের মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তাই চিরস্থায়ী।’(সুরা : রহমান, আয়াত : ২৬–২৭)

তিনি নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ঈমানের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন। তখন তিনি কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে মুসলিমদের স্থিরতা ফিরিয়ে আনেন, ‘মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন..।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৪)

আয়াতুল কুরসি : আল্লাহর মহিমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা
খুতবায় আয়াতুল কুরসির তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করা হয়। এই আয়াতে আল্লাহর পরিপূর্ণ জীবন, স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সর্বময় কর্তৃত্ব, অসীম জ্ঞান ও অপরিসীম শক্তির ঘোষণা রয়েছে। ‘আল্লাহ! তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁর...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৫)

এই আয়াত ঘোষণা করে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সংরক্ষণ আল্লাহকে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত করে না। কারণ তিনিই সর্বোচ্চ, সর্বমহান এবং সর্বশক্তিমান।

ঈমানের বাস্তব শিক্ষা
ইমাম আল-মুয়াইকলি বলেন, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহই চিরঞ্জীব, তিনিই সবকিছুর মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী—তখন তার অন্তরে তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা), ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়। সে মানুষের ওপর নয়, একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে-বিপদে সে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।

নবী (সা.)-এর শেখানো মহামূল্যবান দোয়া
খুতবার শেষাংশে মুসলিমদের সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়। বিশেষভাবে তিনি এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার আহ্বান জানান,

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

উচ্চারণ : ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আসতাগিছ। আসলিহ লি শানি কুল্লাহু, ওয়া লা তাকিলনি ইলা নাফসি তারফাতা আইন।
অর্থ : ‘হে চিরঞ্জীব! হে সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক! আমি আপনার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সব বিষয় সংশোধন করে দিন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না।’ এছাড়া তিনি বেশি বেশি ইস্তিগফার করারও আহ্বান জানান। বিশেষ করে এই দোয়াটি পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহ ইল্লা হুয়াল হায়্যিুল কায়্যিুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি। 
অর্থ : ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক; আর আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।’

এই জুমার খুতবার মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহকে তাঁর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে জানা এবং সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। যখন একজন মুমিন উপলব্ধি করে যে আল্লাহই আল-হাইয়্যু এবং আল-কাইয়্যুম, তখন তার অন্তর থেকে ভয়, হতাশা ও নির্ভরতাহীনতা দূর হয়ে যায়। সে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করে। আর এভাবেই আল্লাহর নামের জ্ঞান মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথে পরিচালিত করে।

সফল হতে কোরআনের যে তিন সূত্র মানা জরুরি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সফল হতে কোরআনের যে তিন সূত্র মানা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

এখানে এমন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হচ্ছে, যা দ্বিন ও দুনিয়ার সফলতার সূত্র।

১. দোয়া : দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতে হবে, যেন তিনি কাজটি সহজ করে দেন এবং সফলতা দান করেন। কারণ দোয়া হলো ইবাদত, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম এবং সেই মহান রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা, যার হাতেই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অপমানিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৭৯)

একজন বান্দার উচিত দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিটি ছোট-বড় প্রয়োজন আল্লাহর কাছেই চাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার সকল প্রয়োজনই তার রবের কাছে চায়; এমনকি তার জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও সেটিও যেন আল্লাহর কাছেই চায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬০৪)

২. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা : দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে হবে, যেন তিনি কাজকে সহজ করে দেন এবং সফলতা দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : আত-তালাক, আয়াত : ৩)
অর্থাৎ আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট সাহায্যকারী ও অভিভাবক।

তাওয়াক্কুলের অন্যতম সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমিন (রহ.)। তিনি বলেন, ‘তাওয়াক্কুল হলো, উপকার লাভ ও ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য আল্লাহর ওপর আন্তরিকভাবে নির্ভর করা, পাশাপাশি আল্লাহ যে উপায়-উপকরণ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন, তা যথাযথভাবে অবলম্বন করা।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, ১/১০৬)

সুতরাং একজন মুমিন ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে এবং তার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত রাখে। কারণ সে বিশ্বাস করে, সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর ফয়সালায় এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণেই সংঘটিত হয়।

৩. উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা : সফলতা অর্জনের জন্য কল্যাণকর উপায় গ্রহণ করা এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। এটি কখনো তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ তাওয়াক্কুলকারী ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি যেমন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করতেন, তেমনি শরিয়তসম্মত ও বাস্তবসম্মত সব উপায়ও অবলম্বন করতেন। তিনি বিভিন্ন জিকিরের মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতেন। ঘুমানোর আগে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করতেন। যুদ্ধে বর্ম পরিধান করতেন। খন্দকের যুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য খন্দক খনন করেছিলেন। এভাবে তিনি সব বৈধ উপায় গ্রহণ করতেন। তিনি আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। এমনকি দুর্বল উপায় হলেও তা গ্রহণ করা উচিত। উপায় গ্রহণের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি তখন ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, সদ্য সন্তান প্রসবকারী এক নারী। অথচ আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন একটি বিশাল খেজুরগাছের কাণ্ড ঝাঁকাতে, যা শক্তিশালী পুরুষদের পক্ষেও সহজ ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তুমি খেজুরগাছের কাণ্ডটি তোমার দিকে নাড়াও; তাহলে তোমার ওপর ঝরে পড়বে তাজা ও পাকা খেজুর।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৫)

আল্লামা আশ-শানকিতি (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা চাইলে গাছ না ঝাঁকিয়েই মারইয়ামের ওপর খেজুর ঝরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁকে গাছের কাণ্ড নাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে মানুষ শিক্ষা লাভ করে যে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি বৈধ উপায়-উপকরণ গ্রহণ করাও অপরিহার্য।’

অতএব একজন মুসলিমের জন্য দ্বিন ও দুনিয়ার প্রতিটি কাজে এই তিনটি নীতি সর্বদা অনুসরণ করা উচিত—
১. আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
২. পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতাসহ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা।
৩. শরিয়তসম্মত ও বৈধ সব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা।

যখন এই তিনটি বিষয় একত্র হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় কাজ সহজ হয়, অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের পথ সুগম হয়।

নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ

আলেমা হাবিবা আক্তার
নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ
সংগৃহীত ছবি

আদি পিতা আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন করলেন এবং স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন, তখন আল্লাহ অঙ্গীকার করলেন—‘যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৩৮)

আল্লাহ তাআলা এই অঙ্গীকার পূরণের প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক।’ (সুরা : রাআদ, আয়াত : ৭)
আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের বাহক হিসেবে যুগে যুগে যেসব নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের মৌলিক কাজ ছিল চারটি। তা হলো—‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতগুলো; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ২)

ক. কিতাব তিলাওয়াত করা, খ. আত্মশুদ্ধি করা, গ. কিতাব শিক্ষা দেওয়া, ঘ. প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘পশু প্রবৃত্তিকে বিবেকের নিয়ন্ত্রণে রাখা, অবাধ্যতার পরিবর্তে দাসত্বকে বরণ করে নেওয়া, পার্থিব জীবন পরকালীন জীবনে অনুকূলে পরিচালিত করা এবং সর্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই আল্লাহ নবীদের ওপর এই চারটি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ)

প্রধান চার মিশন
আয়াতে বর্ণিত চারটি কাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো—
আয়াত তিলাওয়াত করা
আয়াত তিলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর কিতাব যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়া মানুষকে পাঠ করে শোনানো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল! আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তা প্রচার করলেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটা তো ওহি। যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)

কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব : প্রশ্ন হলো—কোরআন তিলাওয়াতকে আল্লাহ নবী-রাসুলদের অন্যতম প্রধান মিশন বানালেন কেন? উত্তর হলো—আল্লাহ কোরআনকে হেদায়েত, ঈমান ও সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন।

ক. হেদায়েতের উৎস : আল্লাহর কিতাবগুলো মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উৎস। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে বিকৃতি আসায় তার অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন হেদায়েত করে সেই পথের দিকে, যা সুদৃঢ়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)
খ. ঈমানের উৎস : আল্লাহ তাঁর কিতাব তথা কোরআনকে ঈমানের উৎস বানিয়েছেন। তাই মানুষের উচিত তা পাঠ করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তার আয়াত তাদের কাছে তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)

গ. সব জ্ঞানের উৎস : আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিতাবে কোনো কিছুই আমি বাদ দিইনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

আত্মিক পরিশুদ্ধি
নবী-রাসুলদের দ্বিতীয় প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, তাদেরকে পবিত্র করবেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে মন্দ স্বভাব, অন্তরের কলুষতা, মূর্খতাসুলভ কাজ থেকে পবিত্র করবেন। ফলে তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৬৪)

আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক স্তর হলো মানুষের মন্দ স্বভাব ও চরিত্র দূর করে তার ভেতর উত্তম স্বভাব-চরিত্র সৃষ্টি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম আখলাক পূর্ণতা দানের জন্য।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৭৩)

আর সর্বোচ্চ স্তর হলো ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়া। তা হলো দুনিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতি। সহিহ বুখারিতে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহ ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি)

পবিত্র কোরআনে আত্মশুদ্ধিকে সাফল্যের চাবিকাঠি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেই সফল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সেই ব্যর্থ যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করল।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৮-৯)

কিতাব শিক্ষা দেওয়া
মুফাসসিররা বলেন, কিতাব শিক্ষা দেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা দেওয়া। শরিয়ত হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত জীবন বিধান। এর মাধ্যমে বান্দা পার্থিব জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্জি অনুসারে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। আল্লাহ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে চূড়ান্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)

মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মনোনীত দ্বিন ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে বলেন, ‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বিন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)

আর আল্লাহ প্রণীত জীবন বিধান ছাড়া মানুষের ভেতর ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেননা মানব প্রণীত বিধান অপূর্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত হতে পারে না।

প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া
আয়াতে বর্ণিত, হিকমত শব্দের ব্যাখ্যা দুইভাবে করা হয় : ক. হিকমত হলো শরিয়তের উচ্চতর জ্ঞান, খ. হিকমত হলো পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। তাফসিরবিদদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যদিও পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান নববী মিশনের অপরিহার্য অংশ নয়, তবে ইসলাম মানুষকে পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ থাকতে বলে না, বরং পার্থিব জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে যে উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হয়, তা গ্রহণ করতে বলে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কোরো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

মুসলিম ঐতিহাসিকরা লেখেন, নুহ (আ.) ছিলেন প্রথম রাসুল। তিনি প্রথম শরিয়ত লাভ করেন। তাঁর পূর্ববর্তী নবীরা ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানুষকে পার্থিব জীবনের ব্যবস্থাপনাগুলো শিখিয়েছেন।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

আজ শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩, ৩ সফর, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ৮ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৫ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৪টা ০০ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৯ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।