• ই-পেপার

মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে পঠিতব্য দোয়া

হাদিসের বাণী

শাসকের আনুগত্য করার গুরুত্ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শাসকের আনুগত্য করার গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুনাইদা ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালামাহ ইবনে ইয়াজিদ আল জুফি একবার মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি আমাদের ওপর এমন কোনো শাসক বা বাদশাহ নিযুক্ত হয়, যারা শুধুমাত্র নিজেদের হক আদায় করতে চায়, কিন্তু আমাদের হক আদায় করে না। সেই পরিস্থিতিতে আপনি আমাদের কী করতে বলবেন? একথা শুনে মহানবী (সা.) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তোমরা তাদের কথা শুনবে এবং তাদের আনুগত্য করবে। কারণ তাদের দায়িত্ব তাদের ওপর আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। আর তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, ৪৭৮২)

শিক্ষা ও বিধান 
১. বৈধ বিষয়ে শাসকের আনুগত্য করা জরুরি। শাসক যদি ব্যক্তিগতভাবে জুলুমও করে, তবুও আল্লাহর অবাধ্যতা নয়—এমন বিষয়ে তার আনুগত্য করতে হবে।

২. নিজ নিজ দায়িত্ব পালনই মূল বিষয়। শাসকের ওপর আবশ্যক হলো জনগণের হক যথাযথভাবে আদায় করা, আর জনগণের ওপর আবশ্যক হলো বৈধ আনুগত্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

৩. অন্যায়ের কারণে বিদ্রোহ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সমর্থিত নয়। কারণ তা সমাজে আরও বড় ফিতনা, রক্তপাত ও অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

৪. অন্যের অন্যায় আমার অন্যায়ের বৈধতা দেয় না। শাসক তার দায়িত্বে ব্যর্থ হলে সে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে; কিন্তু জনগণও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।

৫. ধৈর্য ধারণের শিক্ষা। জুলুমের পরিস্থিতিতেও ধৈর্য, দোয়া এবং শরিয়তসম্মত উপায়ে সামর্থ অনুযায়ী প্রতিবাদের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

৬. কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই নিজ নিজ আমলের হিসাব দিতে হবে। তাই অন্যের অবিচারকে অজুহাত বানিয়ে নিজের দায়িত্ব অবহেলা করা যাবে না।

৭. শাসকের জন্যও সতর্কবার্তা হলো, জনগণের হক যথাযথভাবে আদায় না করলে সে আল্লাহর কাছে কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন হবে।

সারকথা, এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, শাসকের সব অন্যায়কে সমর্থন করতে হবে। বরং ইসলামে সৎ উপদেশ (নসিহত), ন্যায়ের আদেশ, অন্যায় থেকে নিষেধ এবং বৈধ উপায়ে সংশোধনের চেষ্টা করার নির্দেশ রয়েছে। তবে যদি শাসক আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেন, তাহলে সেই ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করা বৈধ নয়।

বন্যা পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বন্যা পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়
সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিবৃষ্টি ও বন্যা অনেক সময় তা দুর্ভোগে পরিণত করে। চলমান বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট—সাপের উপদ্রব।

বন্যার পানিতে সাপের গর্ত ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ডুবে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, বিদ্যালয়, আশ্রয়কেন্দ্র, এমনকি বিছানার নিচেও আশ্রয় নিতে পারে। ফলে অসতর্কতার কারণে সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় নয়, সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান এবং দ্রুত চিকিৎসাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।

মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা
ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

যদিও এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়, তবু এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে না ফেলা ইসলামের একটি সাধারণ নীতি। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭১)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা ঈমানদারের কর্তব্য।

সাপ-বিচ্ছুর দংশন থেকে বাঁচার দোয়া
প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন সাপ-বিচ্ছুসহ বিষাক্ত প্রাণীর দংশন থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। এর মধ্যে একটি দোয়া হলো-

اِنَّا نَسْئَلُكَ بِعَهْدِ نُوْحٍ وَبِعَهْدِ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاؤُدَ اَنْ لَا تُؤْذِيْنَا

উচ্চারণ : ইন্না নাসআলুকা বিআহদি নুহ, ওয়া বিআহদি সুলাইমানাবনি দাউদা আল্লা তুযিনা।

অর্থ : ও হে সাপ! আমরা নূহ্ আলাইহিস সালাম এবং সুলাইমান আলাইহিস সালামের অঙ্গীকারের কথা তোদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তোরা আমাদের কোন ক্ষতি করিস না এবং আমাদের কষ্ট দিস না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৬০)

চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি নবীজির উৎসাহ
রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা নেই।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ২০৩৮)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দুর্ঘটনা বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং ইসলামের নির্দেশনা।


সাপে কামড়ালে কী করবেন?
সাপে কামড়ানোর পর অনেকেই ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, কামড়ানো অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে রক্ত বের করা বা শক্ত করে দড়ি বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা
বন্যার সময় কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জুতা ও কাপড় ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করা, মেঝেতে না শুয়ে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ ও ইসলামের ভারসাম্য
ইসলাম অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা সমর্থন করে না। সাপ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। তবে নিরাপদভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপেরও একটি ভূমিকা রয়েছে, কারণ তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাপ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি, বনাঞ্চলসংলগ্ন ও জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এই সচেতনতা আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ সামান্য অবহেলা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ধৈর্য, দোয়া, সতর্কতা এবং যথাযথ ব্যবস্থা—সবকিছুর প্রয়োজন।

শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ
সংগৃহীত ছবি

মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রদত্ত এক হৃদয়স্পর্শী জুমার খুতবায় শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া, ইখলাস, সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের তাৎপর্য অনুধাবনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো নিজের রবকে জানা। আর আল্লাহকে জানার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। কেননা একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জানবে, তত বেশি সে তাঁর মহিমা উপলব্ধি করবে, তাঁকে ভালোবাসবে, তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে। কারণ আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনাই প্রকৃত ঈমানের ভিত্তি।

ইয়া হাইয়্যু ও ইয়া কাইয়্যুম: আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দুই নাম
খুতবায় বিশেষভাবে আল্লাহর দুটি মহান নাম—ইয়া হাইয়্যু (চিরঞ্জীব) এবং ইয়া কাইয়্যুম (স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক)—এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘ইয়া হাইয়্যু’ নামটি আল্লাহর পরিপূর্ণ, চিরন্তন ও অনন্ত জীবনের পরিচয় বহন করে। তাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই, শেষও নেই। তিনি কখনো ক্লান্ত হন না, তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তাঁর জীবন পূর্ণাঙ্গ; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাঁর অসীম জ্ঞান, সীমাহীন ক্ষমতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, অসীম দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং পরিপূর্ণতার সব গুণ।

অন্যদিকে ‘ইয়া কাইয়্যুম’ নামটি নির্দেশ করে যে, আল্লাহ নিজে কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল। আকাশ, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন পরিচালিত হয়। তিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান, মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, মর্যাদা হ্রাস করেন, বিপদ দূর করেন, রোগমুক্তি দান করেন, তওবা কবুল করেন এবং অসহায়ের আহ্বানে সাড়া দেন।

আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নামের মর্যাদা
তিনি উল্লেখ করেন, বহু আলেমের মতে ‘ইয়া হাইয়্যু’ ও ‘ইয়া কাইয়্যুম’-ই আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম; যে নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা দান করেন। এই দুটি নামের ফজিলত সম্পর্কে মুসনাদ আহমাদ ও সুনান ইবনে মাজাহ-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা এসেছে। এছাড়া আয়াতুল কুরসি, সুরা আলে ইমরানের শুরু এবং সুরা ত্ব-হা-তেও এই মহান দুই নামের উল্লেখ রয়েছে।

কোরআনের আলোকে আল্লাহর চিরন্তন সত্তা
ইমাম আল-মুয়াইকলি স্মরণ করিয়ে দেন, একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীব; তাঁর ছাড়া সবকিছুই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী তুলে ধরেন, ‘আর তুমি সেই চিরঞ্জীবের ওপর ভরসা করো, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল। কেবল তোমার প্রতিপালকের মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তাই চিরস্থায়ী।’(সুরা : রহমান, আয়াত : ২৬–২৭)

তিনি নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ঈমানের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন। তখন তিনি কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে মুসলিমদের স্থিরতা ফিরিয়ে আনেন, ‘মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন..।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৪)

আয়াতুল কুরসি : আল্লাহর মহিমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা
খুতবায় আয়াতুল কুরসির তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করা হয়। এই আয়াতে আল্লাহর পরিপূর্ণ জীবন, স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সর্বময় কর্তৃত্ব, অসীম জ্ঞান ও অপরিসীম শক্তির ঘোষণা রয়েছে। ‘আল্লাহ! তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁর...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৫)

এই আয়াত ঘোষণা করে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সংরক্ষণ আল্লাহকে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত করে না। কারণ তিনিই সর্বোচ্চ, সর্বমহান এবং সর্বশক্তিমান।

ঈমানের বাস্তব শিক্ষা
ইমাম আল-মুয়াইকলি বলেন, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহই চিরঞ্জীব, তিনিই সবকিছুর মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী—তখন তার অন্তরে তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা), ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়। সে মানুষের ওপর নয়, একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে-বিপদে সে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।

নবী (সা.)-এর শেখানো মহামূল্যবান দোয়া
খুতবার শেষাংশে মুসলিমদের সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়। বিশেষভাবে তিনি এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার আহ্বান জানান,

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

উচ্চারণ : ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আসতাগিছ। আসলিহ লি শানি কুল্লাহু, ওয়া লা তাকিলনি ইলা নাফসি তারফাতা আইন।
অর্থ : ‘হে চিরঞ্জীব! হে সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক! আমি আপনার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সব বিষয় সংশোধন করে দিন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না।’ এছাড়া তিনি বেশি বেশি ইস্তিগফার করারও আহ্বান জানান। বিশেষ করে এই দোয়াটি পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহ ইল্লা হুয়াল হায়্যিুল কায়্যিুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি। 
অর্থ : ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক; আর আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।’

এই জুমার খুতবার মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহকে তাঁর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে জানা এবং সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। যখন একজন মুমিন উপলব্ধি করে যে আল্লাহই আল-হাইয়্যু এবং আল-কাইয়্যুম, তখন তার অন্তর থেকে ভয়, হতাশা ও নির্ভরতাহীনতা দূর হয়ে যায়। সে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করে। আর এভাবেই আল্লাহর নামের জ্ঞান মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথে পরিচালিত করে।

শায়েখ ড. হুসাইন

দাম্পত্য জীবন নিয়ে মসজিদে নববীর খতিবের হৃদয়স্পর্শী নসিহত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দাম্পত্য জীবন নিয়ে মসজিদে নববীর খতিবের হৃদয়স্পর্শী নসিহত
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। একটি সুস্থ পরিবারই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। তাই ইসলাম যেমন বিবাহকে সহজ করেছে, তেমনি সংসার রক্ষা ও পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বৈবাহিক জীবনে যখন সব ধরনের সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই শুধু তালাককে শেষ ও অনিবার্য সমাধান হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।

গতকাল মদিনায় (১৭ জুলাই ২০২৬) তারিখে মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব, শায়েখ ড. হুসাইন তাঁর জুমার খুতবায় ইসলামে বিবাহ, পারিবারিক জীবন ও তালাকের বিধান সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ইসলামী শরিয়ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, মমতা ও দয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবারকে স্থিতিশীল রাখা এবং প্রত্যেক সদস্যের অধিকার সংরক্ষণ করাই ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই বিবাহিত জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলেও ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ কর, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

কেননা কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টিতে যে বিষয়টি অপছন্দনীয় মনে হয়, আল্লাহ তাতেই বহু কল্যাণ ও বরকত রেখে দেন। তাই সাময়িক রাগ, অভিমান বা মতবিরোধের কারণে সংসার ভেঙে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। মহানবী (সা.)-ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে নিশ্চয়ই তার অন্য কোনো স্বভাব তাকে সন্তুষ্ট করবে।’ (সহিহ মুসলিম)

শায়েখ ড. হুসাইন বলেন, এই হাদিস আমাদের শেখায়—মানুষের দুর্বলতার দিকে নয়, তার ভালো গুণগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। দোষ খুঁজে সম্পর্ক ভাঙার পরিবর্তে গুণাবলিকে মূল্যায়ন করে ধৈর্যের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের পরিচয়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ইসলামে তালাক কোনো আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। বরং যখন সব ধরনের মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং একসঙ্গে বসবাস করা সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে তালাকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কখনোই তাড়াহুড়ো করে বিবাহবিচ্ছেদের অজুহাত হতে পারে না।

তিনি বৈধ তালাকের শরয়ি পদ্ধতিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বামী স্ত্রীকে এমন পবিত্রতার সময়ে একবার তালাক দেবেন, যখন সেই পবিত্রতার সময়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। অথবা স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন, তবে সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া যেতে পারে। এরপর স্ত্রীকে ইদ্দতের সময় দাম্পত্য গৃহেই থাকার সুযোগ দিতে হবে, যাতে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা বজায় থাকে। কারণ আল্লাহ চাইলে এ সময়ের মধ্যেই উভয়ের মন পরিবর্তন হতে পারে এবং পরিবার আবারও একত্রিত হতে পারে।

তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেন শরিয়তবিরোধী তালাকের প্রচলিত কিছু ভুল পদ্ধতি সম্পর্কে। যেমন—এক বৈঠকে তিন তালাক উচ্চারণ করা, ঋতুস্রাব চলাকালে তালাক দেওয়া অথবা এমন পবিত্রতার সময় তালাক দেওয়া, যখন ওই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস হয়েছে। এসব পদ্ধতি শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

খুতবায় তিনি আরেকটি সামাজিক ব্যাধির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অনেকেই কথার জোর বাড়াতে বা কাউকে বাধ্য করতে ‘তালাকের কসম’ ব্যবহার করেন। যেমন—‘তালাকের কসম, তুমি আজ এখানেই খাবে’, ‘তালাকের কসম, তুমি ওখানে যাবে না’ ইত্যাদি। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় অভ্যাস। তালাক আল্লাহর নির্ধারিত একটি গুরুতর বিধান; এটিকে খেলাচ্ছলে, শপথ হিসেবে বা কথার জোর বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা মারাত্মক অবহেলার পরিচয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী উদ্ধৃত করেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। অতএব তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তারাই জালিম।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৯)

খুতবার শেষাংশে তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ার আহ্বান জানান। রাগের মুহূর্তে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার জন্য পরে সারাজীবন অনুশোচনা করতে হয়। তিনি নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শরয়ি নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দেন। কোনো বৈধ কারণ ছাড়া শুধু আবেগ বা সাময়িক অসন্তুষ্টির বশবর্তী হয়ে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া ইসলামে বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী উল্লেখ করেন, ‘যে নারী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণও হারাম হয়ে যায়।’(তিরমিজি)

ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক বৈধ হলেও এটি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। ইসলামের লক্ষ্য সংসার ভাঙা নয়, বরং সংসার টিকিয়ে রাখা। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ একটি স্থিতিশীল পরিবার শুধু দুইজন মানুষের সুখই নিশ্চিত করে না; বরং সন্তান, সমাজ এবং পুরো জাতির কল্যাণের ভিত্তিও রচনা করে। আর যখন বিচ্ছেদ ছাড়া সত্যিই কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না, তখনও ইসলামের নির্ধারিত বিধান ও শিষ্টাচার মেনেই সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।