আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক কোরো না এবং মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের আয়ত্তাধীন দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই লোককে ভালোবাসেন না, যে অহংকারী, দাম্ভিক।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রশ্ন হলো, যদি সেই নিকটাত্মীয়রাই একজন মানুষের ঈমান ও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে পড়ে, কিংবা জীবনের জন্য হুমকি না হলেও সবচেয়ে বড় মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে ওঠেন? যদি প্রতিদিন নতুন অভিযোগ, অপমান, আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ, অযথা দোষারোপ, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে বা কালো জাদুর আশ্রয় নিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন, তাহলে একজন মুমিন কী করবেন?
আল্লাহকে হাজির নাজির রেখে চিন্তার পর যদি ফলাফল এই যে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা কোনো স্বার্থ নয়, বরং ব্যক্তি আসলেই নিকটাত্মীয়দের মানসিক শোষণে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে, অতিরিক্ত মানসিক অস্থিরতা থেকে ঈমান হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে (নাউজুবিল্লাহ), তবে এ ক্ষেত্রে তাকে মনে রাখতে হবে, ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে বলে, কিন্তু আত্মবিনাশের নির্দেশ দেয় না। শারীরিক আঘাতের মতো মানসিক শোষণও মানুষের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘদিনের অপমান, অবমূল্যায়ন, কটূক্তি ও মানসিক নির্যাতন একজন মানুষের ঈমান, ব্যক্তিত্ব, দাম্পত্য জীবন এবং সন্তানদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের ওপর আমল করা যেতে পারে, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
রক্তের সম্পর্ক অটুট রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। এটা বজায় রাখার জন্য ইখলাসের সহিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যদি তা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে বসে, তখন বিকল্প উপায়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কারণ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
তবে কেউ যদি এই অসহনীয় কষ্টেও ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে এর জন্য বিশেষ পুরস্কার পাবে। আর আত্মীয়রাও তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমার আত্মীয়-স্বজন আছেন। আমি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করি; কিন্তু তারা আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। আমি তাদের উপকার করে থাকি; কিন্তু তারা আমার অপকার করে। আমি তাদের সহনশীলতা প্রদর্শন করি আর তারা আমার সঙ্গে মূর্খসুলভ আচরণ করে।’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যা বললে, তাহলে যদি প্রকৃত অবস্থা তা-ই হয়, তুমি যেন তাদের ওপর জ্বলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করছ। আর সর্বদা তোমার সঙ্গে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের বিপক্ষে একজন সাহায্যকারী (ফেরেশতা) থাকবে, যতক্ষণ তুমি এ অবস্থায় বহাল থাকবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪১৯)
তবে কেউ যদি অসহনীয় নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে আত্মীয়তা বজায় রাখে, তা দোষনীয় নয়। কারণ ইসলামের একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি হলো, ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সওয়াও যাবে না। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪১)
যদি কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নিয়মিত মানসিক অশান্তি, অপমান ও পারিবারিক ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে যোগাযোগ সীমিত করা, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা আত্মীয়তা ছিন্ন করার শামিল নয়। এ বিষয়ে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। কোরআনে এসেছে, ‘ইবরাহিম বলল, আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান। আমি পরিত্যাগ করছি আপনাদের আর আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ডাকেন তাদের।’ (সুরা : মারিয়াম, আয়াত : ৪৭-৪৮)
এ থেকে বোঝা যায়, আত্মীয়তা বজায় রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তা যদি জীবন ও ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, প্রয়োজন শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে দূর থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মীয়তা রক্ষা করার অবকাশ আছে।




