১৩ জুলাই ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল। জার্মানির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ওই রাতেই আমার ফ্লাইট। সবকিছু পেছনে ফেলে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছি। কিন্তু মনে তখন একটিই কষ্ট—আর্জেন্টিনার পরাজয়। সেই আমি আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনাল দেখলাম সরাসরি মাঠে বসে। ১৯৯৮, ২০০২-এর হতাশা দেখেছি, ২০০৬-এর আক্ষেপ দেখেছি, ২০১০-এর ব্যর্থতা দেখেছি, ২০১৪-এর ফাইনালে হৃদয়ভাঙা দেখেছি, ২০১৮-এর কষ্ট দেখেছি। তার পরও দল ছাড়িনি। অনেকেই ঠাট্টা করে আর্জেন্টিনাকে বলত, আরজেতেনা। বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে, বিশ্বাস ধরে, ভালোবাসা ধরে একই দলের পাশে থেকেছি। সময় অনেক গড়িয়েছে। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতল। আমেরিকা ২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপের আয়োজক এবং আমাদের খুব কাছের শহর কানসাস সিটিও একটি ওয়ার্ল্ড কাপ ভেন্যু। বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগেই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছিলাম। অনেক হিসাব-নিকাশ করে সম্ভাব্য সব ব্র্যাকেট আর ম্যাচআপ বিশ্লেষণ করেছিলাম। কানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আর্জেন্টিনার। মেসি বনাম রোনালদোকে একসঙ্গে মাঠে দেখার সুযোগ তো স্বপ্নের মতো! কিন্তু পর্তুগাল হতাশ করল। এরপর আশা করছিলাম আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে কলম্বিয়া। কলম্বিয়াও বিদায় নিল। আর্জেন্টিনাও মিসরের বিপক্ষে প্রায় বিদায়ের মুখে চলে গিয়েছিল। সেই ম্যাচ চলাকালে মনে হচ্ছিল, যদি আর্জেন্টিনা হেরে যায়, তাহলে আমার টিকিট বিক্রিও হবে না, পুরো টাকাটাই জলে যাবে। কিন্তু ঈশ্বর আর আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম। দুর্দান্তভাবে মিসরকে হারিয়ে দিল। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। এই ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনার তিনটি খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে মাঠে বসে। প্রথম খেলা আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া, কানসাস সিটিতে। দেখে এলাম সংগীতা, সায়েশা, সাত্ত্বিকসহ। মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা—এ এক অন্য অনুভূতি। দ্বিতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া, ডালাসে। ওই খেলায়ও মেসির দুই গোল, দেখে এলাম বন্ধু অরুপের সঙ্গে। তৃতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড, নিজেদের শহর কানসাস সিটিতে।
ম্যাচের দিন খুব ভোরেই যাত্রা শুরু করলাম। আমার শহর উইচিটা থেকে স্টেডিয়ামের দূরত্ব প্রায় তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। টানা গাড়ি চালিয়ে প্রথমে পৌঁছে গেলাম কানসাস সিটির ফিফা ফ্যান ফেস্টিভালে। সেখানে উৎসবের অসাধারণ আমেজ। চারদিকে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী, নানা ধরনের ফ্যান অ্যাক্টিভিটি। সেখানে অল আমেরিকান ব্যান্ডের লাইভ কনসার্ট উপভোগ করলাম। বিশাল স্ক্রিনে ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচের প্রথমার্ধ দেখলাম। পরে রওনা দিলাম স্টেডিয়ামের দিকে। যাত্রাপথে দেখা হলো আর্জেন্টিনা থেকে আগত সাপোর্টারদের সঙ্গে। ওরা বাংলাদেশের পতাকা দেখে সহজেই চিনে ফেলল—আমি বাংলাদেশি। বলল, আমরা বাংলাদেশিরা নাকি অলমোস্ট আর্জেন্টাইন। আমাকে অনুরোধ করল আর্জেন্টিনা ভ্রমণের জন্য। স্টেডিয়ামের ভেতরেই উইচিটা থেকে আসা বাংলাদেশের কয়েকজন আর্জেন্টিনা সমর্থকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পরিচয় হলো প্রশান্ত, শৈবাল, সুদীপ, অনীক, সারজিল, রেজা নেহাল, সুমিতসহ আরো অনেকের সঙ্গে। মনে হচ্ছিল, যেন কানসাস সিটিতেই ছোট্ট একটি বাংলাদেশ। পুরো স্টেডিয়ামটাই যেন নীল-সাদা সমুদ্র। তারা আমাকে একদম নিজেদের একজন করে নিয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, ছবি তুলেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা গোল করে বসে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। সবাই নাচছে, গাইছে, হাততালি দিচ্ছে। সে মুহূর্তটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পাশের আর্জেন্টাইন সমর্থকরা আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর সুইজারল্যান্ডও গোল শোধ করে দিল। মুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখালেন। ঠিক তখনই বড় স্ক্রিনে দেখানো হলো, ভিএআরে ভুল ধরা পড়েছে। রেফারি লাল কার্ড বের করলেন। সুইজারল্যান্ডের একজন খেলোয়াড়কে দেখানো হয়েছে। তখন যেন সবাই আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জয় পেল। পুরো স্টেডিয়াম আবার উৎসবে মেতে উঠল। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, এ আনন্দের কোনো শেষ নেই।
আমার নিজের রাজ্যেই চোখের সামনে সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে খেলতে দেখা—এটি সত্যি জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদগুলোর একটি। এই স্মৃতি সারা জীবন হৃদয়ে আগলে রাখব।





