আওয়াজটা আসছিল জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলা থেকে। হাঁটুতে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন কেউ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। সবার কাছে যাঁর পরিচিত ‘রাখালদা’ নামে। কী এমন হলো যে ভরদুপুরে কাঁদছেন? বললেন, ‘দাদা রে, মার কথা মনে পইড়ছে। মা বুড়া অই গেছে। ছ মাস অইল মাইয়াটারেও দেখি না। চাইলেই তো বাড়ি যাইতাম হারি (পারি) না।’
কেন তিনি বাড়ি যেতে পারছেন না? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে রাখালের জন্মস্থান ফেনী থেকে ঘুরে আসা যাক। শৈশবে ডানপিটে ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখে পাড়া দাপিয়ে বেড়াতেন। ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হবেন। ধরবেন সংসারের হাল। অভাবের কারণে তা আর হয়ে উঠল না। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। অনটনের সংসারে অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। ১৯৮৫ সালে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে কিশোর রাখাল চলে আসেন রাজধানীতে। তাঁর ঠিকানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। থালা-বাসন ধোয়ার কাজ জোটে সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে। মাসে ১০০ টাকা বেতন। কয়েক বছর পর সেটি বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। সুধীরবাবু মারা যাওয়ার পর রাখাল চলে যান হলের জিতেনবাবুর ক্যান্টিনে। সেখানে দৈনিক ৩০ টাকা করে পেতেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই হলেই আছেন। রাখালের বেতন এখন মাসে ১২ হাজার টাকা। এখন তিনি কাজ করেন রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ায়। সকাল-বিকাল তরকারি কাটেন। দুপুর এবং রাতে ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করেন। জগন্নাথ হলের ছাত্ররা রাখালকে চেনেন কিছুটা ‘রাগী’ মানুষ হিসেবে। এর পেছনে আছে এক করুণ গল্প। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক রাখাল। বাড়িতে তাদের সঙ্গে থাকেন মা-ও। প্রায় ১০ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি তাঁর ছোট ভাই। প্যারালিসিসে আক্রান্ত সেই ভাইয়ের ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব খরচ রাখালকেই বহন করতে হয়। এমন অবস্থায় অনেককে দেখা যায়, ভাই তো দূরে থাক, মায়েরও খোঁজ নেন না। রাখাল ব্যতিক্রম। মা ও অসুস্থ ভাইকে নিয়ে সংসারের বিশাল বোঝা সামলান একা। তাঁর আয় স্বল্প, কিন্তু মন বড়। রাখালের ছেলে এখন চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে এবং মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের খরচও দিতে হয়। বৃদ্ধা মা ও নিজের কন্যাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া-আসায় প্রায় দুই হাজার টাকা লাগে। ফলে সংসারের খরচের কথা ভেবে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন। রাখালের কান্নার কারণ এই আর্থিক অসংগতি। বললেন, ‘বাড়িত মা আছে, মাইয়া আছে। কিন্তু মন চাইলেই তো আর যাইতাম হারি না। যাওন-আইওনের ম্যালা খরচ।’
এখন রাতে রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলার বারান্দায় একটি বেঞ্চের ওপর ঘুমান। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক শংকর বিশ্বাস বলেন, ‘২৫-২৬ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে রাখাল। ফাঁকিবাজি করে না। খুব সৎ। তবে মাথাটা একটু গরম তাঁর।’ এই হলের বহু ঘটনার সাক্ষী রাখাল। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আমনেরা তো সব দ্যান (দেখেন) ন। অন (এখন) তো হল শান্ত। আমি দেখছি, সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে ছাত্ররা টেবিলে অস্ত্র রাখি খাইত। ডরে কেউ কথা কওয়ার সাহস হাইত (পেত) না। কদিন হর হর (পর পর) মারামারি লাইগত।’ কৈশোর-যৌবন পার করেছেন এই হলে। বহু ছাত্রকে দেখেছেন। সবাই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু রাখালের ভাগ্য বদলায়নি। ‘সবাই চলে যায়, কিন্তু আংগো (আমাদের) খবর কেউ লয় না (রাখে না)। হলের যেসব দাদা এখন বড় বড় চাকরি করেন, তাঁরা যদি আমারে একটু সহযোগিতা করেন, তাইলে আমার একটু উপকার হয়।’ সজল চোখে বলছিলেন রাখাল।





