মুরগির খামারটি মূলত বাবার। তবে মুরগি পালন, পরিচর্যা, খাবার দেওয়া এবং খামার পরিষ্কার রাখাসহ সামগ্রিকভাবে দেখভাল করি আমি। মুরগি বিক্রির লভ্যাংশ ব্যয় করি বই, গাছের চারা এবং মাটির কলস কেনার কাজে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ইসরাইল মোড় এলাকার সন্তান আমি।
বই এবং প্রকৃতি নিয়ে কাজের চিন্তা প্রায় এক যুগ আগের। ২০১৪ সালে। সেবার সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বিছানায় ছিলাম দীর্ঘদিন। সাত দিন পর জ্ঞান ফিরেছিল। এই দুর্ঘটনায় আমার প্রাণহানিও ঘটতে পারত। সেরে ওঠার পর তাই ভাবলাম, বাকি জীবন সমাজের উপকারে লাগে এমন কাজে ব্যয় করব। আমাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষক। অনেকের নিজেদের জায়গাজমি নেই। এসব পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের ঠিকমতো বই, গাইড বই, খাতা, কলম কিনতে পারেন না। বেশি জটিলতায় পড়তে হয় এসএসসির ফরম পূরণের সময়। এসব কারণে অনেকে ঝরে পড়ে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। শুরুতে এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের গাইড বই ও শিক্ষা উপকরণ কিনে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। অনেককে ফরম পূরণেও সহযোগিতা করেছি, যাতে কেউ ঝরে না পড়ে।

খামারে মুরগির পরিচর্যা করছেন নাহিদ। ছবি : সংগৃহীত
কাজটি ছোট পরিসরে একান্তই ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালিয়েছি। ২০২০ সালের দিকে ভাবলাম, বাড়ি বাড়ি না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বই রাখব। সেখানে পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। যারা বাসায় বই নিতে চায়, নিয়ে পড়তে পারবে। এই ভাবনার ফসল ‘শান্তি নিবিড় পাঠাগার’। মাত্র ১৮টি বই নিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন পাঠাগারে বই আছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি রয়েছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, জীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মীয় ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ। প্রতিদিন অনেক শিক্ষার্থী এখানে এসে একাডেমিক ও নন-একাডেমিক বিভিন্ন বই পড়ে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয় এবং প্রয়োজনীয় বই বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে বইয়ের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী যেন পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই পাঠাগার। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তুলছে। সময়ের পরিক্রমায় পাঠাগারটি তাদের জন্য জ্ঞানচর্চা, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতির প্রতিও আমাদের দায়িত্ব আছে। তাই গাছ লাগাই, পরিচর্যা করি। আমরা মূলত ফল ও ফুলের গাছ লাগাই বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠে। পাঠাগার শুরুর পর থেকে পাঠকদের হাতে বইয়ের সঙ্গে উপহার হিসেবে গাছের চারা বিতরণ করছি। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েও বৃক্ষ রোপণ করেছি। এভাবে এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছি।
পাখিদের আবাসস্থল সংকট বিবেচনায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মাটির কলস ঝুলিয়ে দিচ্ছি গাছের ডালে ডালে। তীব্র গরম কিংবা বর্ষার দিনে পাখিরা যেন একটু নিরাপদে থাকতে পারে, সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা বিজয় দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে মাটির হাঁড়ি দেওয়া হয়। সেগুলোতে ‘শুভ নববর্ষ’, ‘ঈদ মোবারক’সহ নানা শুভেচ্ছা বার্তা লেখা থাকে। রাস্তার পাশে, মাঠের ধারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বর ও খোলা প্রান্তরের গাছগুলোতে দেখা যায় এসব কলস। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক গাছের ডালে মাটির কলস দিতে পেরেছি আমরা। দূর থেকে সাধারণ মাটির কলস মনে হলেও পাখিদের কাছে এগুলোই নিরাপদ বাসা। সেখানে তারা বাসা বাঁধছে, ডিম দিচ্ছে এবং নিরাপদে বাচ্চা বড় করছে। আমাদের লাগানো অনেক গাছই আজ পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া রাস্তার ধারে পথচারীদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশ্রামের স্থানও করে দিয়েছি। সেগুলো রঙিন। কয়েক জায়গায় বসিয়েছি দুটি টিউবওয়েল।
এসব কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘চাঁপাই ব্লাড ডোনেশন’ সম্মাননা দিয়েছে। সনদ দিয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। পেয়েছি ‘এনজিএফবি এক্সিলেন্স সাকসেস অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’। তবে কোনো স্বীকৃতি বা পুরস্কারের আশায় নয়, বরং মানুষ বা প্রকৃতির উপকারে আমার আনন্দ। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন বই, গাছ, পাখি ও মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই। বিশ্বাস করি, একটি বই একজন মানুষকে আলোকিত করতে পারে, একটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, আর একটি মানবিক উদ্যোগ অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
কানসাট সোলেমান ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আমি। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজগুলো চালিয়ে যাই। এ কাজে পরিবার আমাকে সমর্থন জোগায়। আমার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে প্রায় ১৫জন তরুণ। ভবিষ্যতে পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিস্তৃত করা, পাখিদের জন্য আরো বেশি আশ্রয় তৈরি করা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে বড় পরিসরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা আছে।