• ই-পেপার

মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা ভাগ্যের ব্যাপার

  • লিওনেল মেসির পাঁড় ভক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দ্য বোয়িং কম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শুভেচ্ছা চক্রবর্তী। এবারের বিশ্বকাপে মাঠে বসে দেখেছেন প্রিয় তারকার হ্যাটট্টিক। সেই গল্প শুনিয়েছেন তিনি

জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর

মনোয়ার হোসেন রনি
জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর
অলংকরণ : তানভীর মালেক

শৈশবের স্মৃতি বড় অদ্ভুত। চারপাশের চেনা জগৎ তখন রূপকথার মতো মনে হতো। মনে পড়ে, ছোটবেলায় পুরান ঢাকার বনগ্রামে খালার বাসায় বেড়াতে যেতাম। সেই সরু গলি, পুরনো দালানের বারান্দা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পাশের বাসার কিছু বিহারি মানুষের উর্দু ভাষার এক মায়াবী সুর—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জীবন।

একদিন খালার বাসা থেকে বের হয়ে ঠাটারীবাজারের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমাদের পাশ কাটিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে গেলেন এক প্রবীণ মানুষ। মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি, কোমরে ভেজা গামছা আর কাঁধে ঝুলছে এক রহস্যময় কালো চামড়ার ব্যাগ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভাইয়া, ওই ব্যাগে কী?’ উত্তর পেয়েছিলাম, ‘খাওয়ার পানি।’

সেদিন হয়তো কৌতূহল মিটেছিল, কিন্তু আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি—সেদিন শুধু একজন মানুষকে দেখিনি, দেখেছিলাম ঢাকা শহরের এক জীবন্ত ইতিহাসকে। আজ সেই মানুষগুলো হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাদের পেশা। কিন্তু মনের মণিকোঠায় আজও তা অমলিন।

সালটা ১৮৬০। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে তখনো ভোরের কুয়াশা ভাসছে। বাকরখানির সুবাস আর ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে মাত্র জেগে উঠছে ঢাকা শহর। লালবাগ আর চকবাজারের সরু, আঁকাবাঁকা গলিগুলোর মধ্য দিয়ে একটা চেনা, ছন্দোময় শব্দ ইটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ছলাতছলাত, ছলাতছলাত। ভারী পশুর চামড়ার ব্যাগের ভেতরে পানির দুলুনির শব্দ এটি, যার সঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের ক্লান্তিহীন পদশব্দ। তিনি হলেন ভিস্তিওয়ালা—পুরান ঢাকার এক অঘোষিত জীবনদাতা, যাঁকে ছাড়া সে যুগের নগরজীবন একমুহূর্তের জন্যও কল্পনা করা যেত না।

 

‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ : স্বর্গের সুধা বিলানো মানুষ

ভিস্তি বা ভিসতি শব্দের উৎস অত্যন্ত চমৎকার। এটি এসেছে ফারসি শব্দ বেহেশত থেকে, যার অর্থ স্বর্গ। ইসলামি বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিতে তৃষ্ণার্তকে জলপান করানো এক পরম পুণ্যের কাজ। সেই স্বর্গীয় বারতা ও স্বস্তি যিনি বয়ে নিয়ে আসতেন, তিনিই ‘বেহেশতি’ বা অপভ্রংশে ‘ভিস্তিওয়ালা’। ঢাকার মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই স্বর্গের সুধা নিয়ে আসা ত্রাণকর্তা।

 

চামড়ার ‘মশক’ ও বুড়িগঙ্গার জল

আধুনিক প্লাস্টিক বা লোহার পাইপলাইনের যুগে পৌঁছানোর বহু আগে, ঢাকায় পানি ছিল এক পরম বিলাসের বস্তু। বিহার ও উত্তর ভারত থেকে আসা এই সংগ্রামী মানুষগুলো ছাগল বা ভেড়ার আস্ত চামড়া দিয়ে তৈরি মশক নামক জলরোধী ব্যাগে পানি বহন করতেন। চামড়াটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হতো, যাতে তীব্র গরমেও ভেতরের পানি চমৎকার ঠাণ্ডা থাকত। ভোরের আজানের আগেই বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ বুক কিংবা শহরের বড় বড় দিঘি থেকে প্রায় ৩৫ কেজি পানি দিয়ে মশক পূর্ণ করে তাঁরা শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়তেন। নবাবদের আলিশান প্রাসাদ থেকে শুরু করে সাধারণের রান্নাঘর—সবখানেই ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াত।

 

দিল্লি থেকে ঢাকা : রাজকীয় ইতিহাসের সাক্ষী

ভিস্তিওয়ালাদের ইতিহাস শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়, তা দিল্লি আর কলকাতার ইতিহাসেও অনন্য মর্যাদায় ভাস্বর। দিল্লির নবাব মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন শেরশাহর কাছে পরাজিত হয়ে গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিলেন, তখন ‘নিজাম’ নামের এক সাধারণ ভিস্তি নিজের মশক দিয়ে সম্রাটকে টেনে তুলে জীবন বাঁচান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে এক দিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।

 

কলকাতার বাবু কালচার

লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতার রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা ও বাবুদের ঘরে পানি সরবরাহে ভিস্তিওয়ালারা ছিলেন অপরিহার্য। ঢাকার নবাব আব্দুল গনি ১৮৭৮ সালে যখন প্রথম ফিল্টার পানির ব্যবস্থা (ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস) করেন, তখনো ভিস্তিরা প্রাসঙ্গিক ছিলেন। তাঁরাই উঁচু তলার বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতেন। পুরান ঢাকার ‘ভিস্তিখানা’ এলাকাটি আজও তাঁদের স্মৃতি বহন করছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক প্লাম্বিং ও টিউবওয়েলের আবির্ভাবে ঢাকা থেকে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে মশকের সেই ছলাতছলাত সুর। আজ বুড়িগঙ্গার জলও আর আগের মতো স্বচ্ছ নেই, আর ব্যস্ত ঢাকার রাজপথেও দেখা মেলে না সেই কাঁধে মশক নেওয়া মানুষগুলোর।

নতুন প্রজন্মের কাছে এই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন রূপকথা। আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যের স্বার্থেই এই হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালা বা সাক্কাদের কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কিভাবে এক টুকরা চামড়ার ব্যাগে চড়ে একসময় বয়ে চলত গোটা ঢাকা শহরের প্রাণশক্তি।

 

 

 

এই দহন আজীবনের

গেল বছর ঠিক আজকের দিনে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়েছিল যুদ্ধবিমান। অঙ্গার হয়েছিল অন্তত ৩৫টি ফুল! দুর্ঘটনার দিন থেকে ২০২৬ সালের ২১ মার্চ—দীর্ঘ নয় মাস ধরে আহত শিশুদের দেখভাল করেছেন প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার (বাংলা মাধ্যম) সহকারী শিক্ষক মেহেরুন নেসা। দুঃসহ সেই দিনগুলোর কথা তিনি বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

এই দহন আজীবনের
হাসপাতালে আহত শিশুর সঙ্গে মেহেরুন নেসা। প্রতিকৃতি : তানভীর মালেক

সেদিন আমি মাইলস্টোন কলেজের ক্যাম্পাসে হায়দার আলী ভবনের অদূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলাম নৌবাহিনীতে কর্মরত ভাইয়ার সঙ্গে। তাঁকে ঠাট্টা করে বলছিলাম, ‘ভাইয়া, তুমি নেভিতে আছ বলে কী হয়েছে? আমিও তো বড় এক ক্যাম্পাসে কাজ করি! প্রতিদিন কত বড় বড় প্লেন আমার মাথার ওপর দিয়ে যায়!’ ভাইয়া তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে হয়তো ঐ বিমানটির শব্দের অস্বাভাবিকতা টের পেয়েছিলেন। কিছুটা ঠাট্টার সুরে বলে উঠলেন, ‘তোর মাথার ওপর দিয়ে প্লেন যায় ভালো কথা, আজকে কি তোর মাথার ওপর প্লেন পড়বে?’

ভাইয়ার কথা শেষ হতে না হতেই ওপরের দিকে তাকালাম। দেখলাম একটি বিমান অদ্ভুতভাবে বাঁকা হয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে সেটি মাইলস্টোন কলেজের ঠিক পাশেই বিধ্বস্ত হলো। বিকট এক শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা কালো ধোঁয়া আর আগুনে ছেয়ে গেল।

 

আমি কি বেঁচে আছি!

বিস্ফোরণের তীব্রতায় ক্যান্টিনের দিকে দৌড় দিতে গিয়ে সামনে পড়ে গেলাম। মাঠের ভেতরে কিছু শিশু খেলা করছিল, তারাও ভয়ে দৌড় দিতে গিয়ে মাঠেই মুখ থুবড়ে পড়ল। চারদিকে শুধু আর্তনাদ আর মানুষের ছোটাছুটি। ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে এলেন সহকর্মী মাহফুজা মিস। সেদিন তিনি সবুজ রঙের শাড়ি পরেছিলেন। তাঁর কাপড় পুড়ে গিয়েছিল, চুল ঝলসে রক্ত ঝরছিল। কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিস, আমি কি বেঁচে আছি?’ আমি তাঁকে পানির ট্যাংকের কাছে নিয়ে অন্য সহকর্মীদের হাতে সোপর্দ করে আবার দুর্ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়ালাম।

 

মিস, আমাকে বাঁচাও

সেখানে এক বীভৎস দৃশ্য। ক্লাস থ্রির এক শিশু আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘মিস, আমাকে বাঁচাও!’ বাচ্চাটির পিঠের চামড়া একদম ঝলসে ঝুলে ছিল, কপালে প্লেনের কিছু একটা ঢুকে গলগল করে রক্ত ঝরছিল। হাত দিয়ে তার কপাল চেপে ধরে শুধু চিন্তা করছিলাম—যেভাবেই হোক, বাচ্চাটিকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে হবে।

ওকে নিয়ে যখন মাইলস্টোন থেকে বের হলাম, দেখলাম বাইরের পৃথিবীর অন্য এক রূপ। উত্তরার সেই ব্যস্ত গোলচত্বর এলাকায় তখন প্রচণ্ড জ্যাম। রক্তাক্ত শিশুদের নিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলাম, কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে বেশিরভাগ মানুষ মোবাইলে ভিডিও করতে ব্যস্ত। মানুষের এই চরম নির্লিপ্ততা দেখে আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক রিকশাযাত্রীর কলার ধরে তাঁকে টেনে নামিয়ে দিলাম। বললাম, ‘ভাইয়া নামেন! আমার বাচ্চাটি মরে যাচ্ছে!’ আমার কোলে থাকা শিশুটির নাম সাইবা মেহজাবিন। এর মধ্যে বিএনসিসির এক ভলান্টিয়ার আরেকটি বাচ্চা নিয়ে এলো। ওদের নিয়ে প্রথমে ইবনে সিনা পরে লুবানা হাসপাতালে পৌঁছলাম। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও রোগীর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে ডাক্তাররা আমাদের বার্ন ইনস্টিটিউটে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।

 

দীর্ঘ ও যন্ত্রণাময় সে যাত্রা

বার্ন ইনস্টিটিউটে যাওয়ার পথটি ছিল জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাময় পথ। আমার কানে আজও বাজে অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে দগ্ধ শিশুদের গগনবিদারী চিৎকার আর আর্তনাদ। তানভীর নামের এক ছাত্র আমার হাতে ধরা অবস্থায় দুইবার ‘মিস’ আর দুইবার মাকে ডেকে নিথর হয়ে গেল। বার্ন ইনস্টিটিউটে পৌঁছে যখন তার বাবাকে খবর দিলাম, তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে যখন বললাম, তাঁর ছেলে আর নেই, তখন ফোনের ওপাশে শুধুই নিস্তব্ধতা!

 

বাপ্পিও চলে গেল

আইসিইউয়ের ভেতরে ঢুকে দেখলাম, মৃত্যু যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। মাহরীন মিস এবং উক্য চিং মারমা নামের এক শিশু আমাদের ছেড়ে চলে গেল। সেখানে দেখা হলো প্রিয় ছাত্র বাপ্পির মায়ের সঙ্গে। বাপ্পি সব সময় আমাকে দেখলেই খুব সুন্দর করে বলত, ‘মিস, আই এম ফাইন।’ কিন্তু সেদিন তাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে সে-ই প্রাণোচ্ছল বাপ্পি। তার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে আমি নির্বাক হয়ে রইলাম।

 

শেষ সময়েও একা মাসুকা

সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল সহকর্মী মাসুকার শেষ কয়েক ঘণ্টা। তাঁর শরীরের ৯৮ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তীব্র তৃষ্ণায় বারবার একটু পানি চাচ্ছিলেন। ডাক্তাররা পানি দিতে নিষেধ করলেও তাঁর তৃষ্ণার্ত আকুতি দেখে সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি শুধু তাঁর ঠোঁটগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছিলাম। মাসুকা হয়তো জানতেন আর বাঁচবেন না। তিনি একাকী জীবনযাপন করতেন। অত্যন্ত করুণ সুরে আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘যদি আপনজনরা আমার লাশ নিতে না চায়, তবে তুমি বোন হয়ে আমাকে দাফন দিয়ো।’ এই বলেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি সেখানেই শেষ হয়নি। মাসুকার মৃত্যুর পর তাঁর বোন ও ভগ্নিপতিকে বারবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি। অথচ যখন তারা জানল, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, তখন সেই আত্মীয়রাই দাবি নিয়ে হাজির। মাসুকা সারা জীবন যে একাকিত্ব আর অবহেলা সহ্য করেছেন, মৃত্যুর পরও তাঁকে সেই স্বার্থপরতার শিকার হতে হলো।

 

ওরা এখন স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়

বিমান দুর্ঘটনায় যাঁরা মারা গেছেন, এক অর্থে তাঁদের মুক্তি মিলেছে। কিন্তু যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁরা প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আরিয়ান আফিফ নামের এক শিশু, যার বাবা নেই, সে দীর্ঘ সাত মাস হাসপাতালে ছিল। তার মা একজন ‘সিঙ্গল মাদার’, যে অমানবিক পরিশ্রম তিনি করছেন, তার কোনো সান্ত্বনা নেই। নিলয় নামের এক কিশোর পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখত, দুর্ঘটনায় তার একটি কান এবং আত্মবিশ্বাস দুটিই হারিয়ে গেছে। সে এখন স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দগ্ধ হওয়া মেয়েশিশুরা। পায়েল, জায়ানা, সাইবা, সাইরা, মেহজাবিন, মুনতাহা, পায়েল, মেহেরিন, আলভিরা, সামিয়া, হাফসা, রুপি, শিক্ষিকা নিশি বা লরিন নুসরাতরা। যে অবয়ব তাদের ছিল তা আর ফিরে পাবে না। যে মেয়েটি মেহেদি দিতে ভালোবাসত, তার দুই হাত আজ পোড়া; যে মেয়েটি চোখে কাজল দিতে পছন্দ করত, তার চোখ আজ বিকৃত। যে মেয়েটি সাজতে ভালোবাসত, কানে দুল পরতে ভালোবাসত, সে আর কোনো দিন কানে দুল পরতে পারবে না। এই ভবিষ্যত্হীনতার উত্তর কার কাছে পাব? আবিদুর রহিম নামের যে বাচ্চাটির সাত মাসের হাসপাতালের জার্নি, ওর আর্তচিৎকার, ওর বেঁচে ফেরার লড়াই, ওর ফিরে আসার গল্পটিও নির্মম।

 

অন্তহীন দহন

এই দুর্ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে মানুষ কত অসহায় হতে পারে, কত নিষ্ঠুর হতে পারে। মাসুকার মতো নারীরা জীবনভর একাকী লড়াই করে যান, পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন, অথচ মৃত্যুর পর তাঁরা পান শুধু একদল লোভী আত্মীয়র নাটক। আরিয়ানের মায়ের লড়াই আজীবন এক করুণগাথা হয়ে থাকবে। এটি শুধু এক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা নয়, এটি মানবতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং চরম স্বার্থপরতার এক অমলিন দলিল। আমি যখন বিভিন্ন মানুষের কাছে এই বর্ণনাগুলো দিই, তখন গলার স্বর ভেঙে আসে, শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সত্যগুলো বলা প্রয়োজন, যাতে সমাজ এই বেঁচে থাকা শিশুদের প্রতি অন্তত কিছুটা সহমর্মিতা প্রকাশ করে। যাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা হয়তো শান্তিতে আছেন, কিন্তু আমাদের মতো যাঁরা সেই স্মৃতি বহন করছেন, তাঁদের জন্য এই দহন আজীবনের।

 

 

 

[ প্রাণ প্রকৃতি ]

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা

শরীফ তানভীর আহম্মেদ

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা
বামন মাছরাঙা ছবি : লেখক

কয়েক দিন ধরেই টানা বৃষ্টি। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার হাজারীখিল বনে যেতেই হবে। রাত প্রায় সাড়ে আটটা। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা দিলাম বিবিরহাটের উদ্দেশে। জ্যাম ঠেলে রাত সাড়ে ১০টায় পৌঁছলাম। পথে বনের গাইড নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বললাম, আমি না পৌঁছানো পর্যন্ত যেন সে জেগে থাকে। বনের প্রবেশমুখে এলে নাহিদ আমাকে বন বিভাগের অতিথিশালায় পৌঁছে দিল। অতিথিশালাটি বনের গভীরে, চারপাশে ঘন অন্ধকার। বিশাল নির্জন ভবনে একা। বারান্দাজুড়ে বাদুড়ের ওড়াউড়ি, মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াসব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পরদিন ভোরে জানালা খুলেই দেখি অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। মনে পড়ল, সিএনজিতে ছাতা ফেলে এসেছি। ইন্টারনেটও নেই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু পাখির ডাক শুনছিলাম। হঠাৎ একটি দাগি পেঁচা উড়ে গিয়ে সামনের একটি ডালে আশ্রয় নিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামতেই ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লাম।

একদিকে জোঁকের ভয়, অন্যদিকে বৃষ্টি নামার শঙ্কা। তবু পাখির ডাক অনুসরণ করে বনের ভেতরে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর যেতেই বড় মালা পেঙ্গার একটি দল চোখে পড়ল। এদের কাছেই হঠাৎ দেখা মিলল এক জোড়া সবুজ তাউড়া (English: Common Green Magpie, Scientific name: Cissa chinensis)|

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা

সবুজ তাউড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বনজ পাখিগুলোর একটি। পুরো শরীর উজ্জ্বল পান্না-সবুজ, মাথার ওপর কালো রঙের ছাপ, উজ্জ্বল লাল ঠোঁট এবং লম্বা নীলাভ-সবুজ লেজ তাকে সহজেই অন্য পাখি থেকে আলাদা করে। এরা সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে এবং ঘন চিরসবুজ বনের উঁচু ডালে বসে শিকার খোঁজে। খাদ্যতালিকায় থাকে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা, টিকটিকি, ছোট ব্যাঙ, গিরগিটি, পাখির ডিম ও ছানা, এমনকি ছোট ফলও। বৃষ্টিভেজা সকালের নীরব বনে এদের উপস্থিতি যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক সুর। মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করলাম। এরপর নাহিদের সহযোগিতায় আরো গভীর বনের দিকে এগোলাম। পাহাড়ি ছড়া ধরে হাঁটছি। আকাশ মেঘলা, আলো খুবই কম। এমন সময়ে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থাকে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পথেই দেখলাম কালো ঘাড় রাজনের একটি বাসা। কিছুদূর এগোতেই কয়েকবার মাছরাঙার ডাক কানে এলো। প্রথমে মনে হলো নীলকান মাছরাঙা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটি ঝুলন্ত লতার ওপর যে পাখিটি এসে বসল, তা দেখে মুহূর্তেই সব ক্লান্তি উবে গেল। সেটি ছিল বামন মাছরাঙা (English: Oriental Dwarf Kingfisher, Scientific name: Ceyx erithaca)। বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মাছরাঙাগুলোর একটি। ছোট্ট শরীরজুড়ে যেন প্রকৃতি তার সবচেয়ে উজ্জ্বল রংগুলো মেলে ধরেছে। মাথা ও পিঠে বেগুনি-নীল আভা, পিঠের নিচে উজ্জ্বল নীল, বুক ও পেট গাঢ় কমলা-হলুদ, ঠোঁট টকটকে লাল-কমলা এবং পা উজ্জ্বল লাল। ঘন ছায়াময় বন ও পাহাড়ি ছড়ার আশপাশেই এদের আবাস। নামের সঙ্গে মাছরাঙা থাকলেও এদের প্রধান খাদ্য শুধু মাছ নয়, বরং ছোট ব্যাঙ, ঝিঁঝি পোকা, ফড়িং, বিটল, মাকড়সা, ছোট কাঁকড়া, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী এরা বেশি খেয়ে থাকে। ঝুলন্ত ডাল বা লতায় নিশ্চুপ বসে থেকে সুযোগ বুঝে মুহূর্তেই শিকার ধরে ফেলে। বৃষ্টিভেজা হাজারীখিলের সেই মেঘলা সকালে রঙিন বামন মাছরাঙাকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন ঘন অন্ধকার বনের বুক চিরে হঠাৎ এক টুকরা রংধনু নেমে এসেছে।

[ আরো জীবন ]

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন

১৯৮৫ সাল থেকে প্রায় চার দশক ধরে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন
মাত্র ১২ হাজার টাকায় ছয়জনের সংসার চালাতে হয় রাখালকে। ছবি : লেখক

আওয়াজটা আসছিল জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলা থেকে। হাঁটুতে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন কেউ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। সবার কাছে যাঁর পরিচিত রাখালদা নামে। কী এমন হলো যে ভরদুপুরে কাঁদছেন? বললেন, দাদা রে, মার কথা মনে পইড়ছে। মা বুড়া অই গেছে। ছ মাস অইল মাইয়াটারেও দেখি না। চাইলেই তো বাড়ি যাইতাম হারি (পারি) না।

কেন তিনি বাড়ি যেতে পারছেন না? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে রাখালের জন্মস্থান ফেনী থেকে ঘুরে আসা যাক। শৈশবে ডানপিটে ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখে পাড়া দাপিয়ে বেড়াতেন। ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হবেন। ধরবেন সংসারের হাল। অভাবের কারণে তা আর হয়ে উঠল না। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। অনটনের সংসারে অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। ১৯৮৫ সালে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে কিশোর রাখাল চলে আসেন রাজধানীতে। তাঁর ঠিকানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। থালা-বাসন ধোয়ার কাজ জোটে সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে। মাসে ১০০ টাকা বেতন। কয়েক বছর পর সেটি বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। সুধীরবাবু মারা যাওয়ার পর রাখাল চলে যান হলের জিতেনবাবুর ক্যান্টিনে। সেখানে দৈনিক ৩০ টাকা করে পেতেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই হলেই আছেন। রাখালের বেতন এখন মাসে ১২ হাজার টাকা। এখন তিনি কাজ করেন রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ায়। সকাল-বিকাল তরকারি কাটেন। দুপুর এবং রাতে ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করেন। জগন্নাথ হলের ছাত্ররা রাখালকে চেনেন কিছুটা রাগী মানুষ হিসেবে। এর পেছনে আছে এক করুণ গল্প। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক রাখাল। বাড়িতে তাদের সঙ্গে থাকেন মা-ও। প্রায় ১০ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি তাঁর ছোট ভাই। প্যারালিসিসে আক্রান্ত সেই ভাইয়ের ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব খরচ রাখালকেই বহন করতে হয়। এমন অবস্থায় অনেককে দেখা যায়, ভাই তো দূরে থাক, মায়েরও খোঁজ নেন না। রাখাল ব্যতিক্রম। মা ও অসুস্থ ভাইকে নিয়ে সংসারের বিশাল বোঝা সামলান একা। তাঁর আয় স্বল্প, কিন্তু মন বড়। রাখালের ছেলে এখন চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে এবং মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের খরচও দিতে হয়। বৃদ্ধা মা ও নিজের কন্যাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া-আসায় প্রায় দুই হাজার টাকা লাগে। ফলে সংসারের খরচের কথা ভেবে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন। রাখালের কান্নার কারণ এই আর্থিক অসংগতি। বললেন, বাড়িত মা আছে, মাইয়া আছে। কিন্তু মন চাইলেই তো আর যাইতাম হারি না। যাওন-আইওনের ম্যালা খরচ।

এখন রাতে রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলার বারান্দায় একটি বেঞ্চের ওপর ঘুমান। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক শংকর বিশ্বাস বলেন, ২৫-২৬ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে রাখাল। ফাঁকিবাজি করে না। খুব সৎ। তবে মাথাটা একটু গরম তাঁর। এই হলের বহু ঘটনার সাক্ষী রাখাল। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, আমনেরা তো সব দ্যান (দেখেন) ন। অন (এখন) তো হল শান্ত। আমি দেখছি, সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে ছাত্ররা টেবিলে অস্ত্র রাখি খাইত। ডরে কেউ কথা কওয়ার সাহস হাইত (পেত) না। কদিন হর হর (পর পর) মারামারি লাইগত। কৈশোর-যৌবন পার করেছেন এই হলে। বহু ছাত্রকে দেখেছেন। সবাই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু রাখালের ভাগ্য বদলায়নি। সবাই চলে যায়, কিন্তু আংগো (আমাদের) খবর কেউ লয় না (রাখে না)। হলের যেসব দাদা এখন বড় বড় চাকরি করেন, তাঁরা যদি আমারে একটু সহযোগিতা করেন, তাইলে আমার একটু উপকার হয়। সজল চোখে বলছিলেন রাখাল।