শৈশবের স্মৃতি বড় অদ্ভুত। চারপাশের চেনা জগৎ তখন রূপকথার মতো মনে হতো। মনে পড়ে, ছোটবেলায় পুরান ঢাকার বনগ্রামে খালার বাসায় বেড়াতে যেতাম। সেই সরু গলি, পুরনো দালানের বারান্দা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পাশের বাসার কিছু বিহারি মানুষের উর্দু ভাষার এক মায়াবী সুর—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জীবন।
একদিন খালার বাসা থেকে বের হয়ে ঠাটারীবাজারের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমাদের পাশ কাটিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে গেলেন এক প্রবীণ মানুষ। মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি, কোমরে ভেজা গামছা আর কাঁধে ঝুলছে এক রহস্যময় কালো চামড়ার ব্যাগ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভাইয়া, ওই ব্যাগে কী?’ উত্তর পেয়েছিলাম, ‘খাওয়ার পানি।’
সেদিন হয়তো কৌতূহল মিটেছিল, কিন্তু আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি—সেদিন শুধু একজন মানুষকে দেখিনি, দেখেছিলাম ঢাকা শহরের এক জীবন্ত ইতিহাসকে। আজ সেই মানুষগুলো হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাদের পেশা। কিন্তু মনের মণিকোঠায় আজও তা অমলিন।
সালটা ১৮৬০। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে তখনো ভোরের কুয়াশা ভাসছে। বাকরখানির সুবাস আর ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে মাত্র জেগে উঠছে ঢাকা শহর। লালবাগ আর চকবাজারের সরু, আঁকাবাঁকা গলিগুলোর মধ্য দিয়ে একটা চেনা, ছন্দোময় শব্দ ইটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ছলাতছলাত, ছলাতছলাত। ভারী পশুর চামড়ার ব্যাগের ভেতরে পানির দুলুনির শব্দ এটি, যার সঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের ক্লান্তিহীন পদশব্দ। তিনি হলেন ভিস্তিওয়ালা—পুরান ঢাকার এক অঘোষিত জীবনদাতা, যাঁকে ছাড়া সে যুগের নগরজীবন একমুহূর্তের জন্যও কল্পনা করা যেত না।
‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ : স্বর্গের সুধা বিলানো মানুষ
ভিস্তি বা ভিসতি শব্দের উৎস অত্যন্ত চমৎকার। এটি এসেছে ফারসি শব্দ বেহেশত থেকে, যার অর্থ স্বর্গ। ইসলামি বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিতে তৃষ্ণার্তকে জলপান করানো এক পরম পুণ্যের কাজ। সেই স্বর্গীয় বারতা ও স্বস্তি যিনি বয়ে নিয়ে আসতেন, তিনিই ‘বেহেশতি’ বা অপভ্রংশে ‘ভিস্তিওয়ালা’। ঢাকার মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই স্বর্গের সুধা নিয়ে আসা ত্রাণকর্তা।
চামড়ার ‘মশক’ ও বুড়িগঙ্গার জল
আধুনিক প্লাস্টিক বা লোহার পাইপলাইনের যুগে পৌঁছানোর বহু আগে, ঢাকায় পানি ছিল এক পরম বিলাসের বস্তু। বিহার ও উত্তর ভারত থেকে আসা এই সংগ্রামী মানুষগুলো ছাগল বা ভেড়ার আস্ত চামড়া দিয়ে তৈরি মশক নামক জলরোধী ব্যাগে পানি বহন করতেন। চামড়াটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হতো, যাতে তীব্র গরমেও ভেতরের পানি চমৎকার ঠাণ্ডা থাকত। ভোরের আজানের আগেই বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ বুক কিংবা শহরের বড় বড় দিঘি থেকে প্রায় ৩৫ কেজি পানি দিয়ে মশক পূর্ণ করে তাঁরা শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়তেন। নবাবদের আলিশান প্রাসাদ থেকে শুরু করে সাধারণের রান্নাঘর—সবখানেই ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াত।
দিল্লি থেকে ঢাকা : রাজকীয় ইতিহাসের সাক্ষী
ভিস্তিওয়ালাদের ইতিহাস শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়, তা দিল্লি আর কলকাতার ইতিহাসেও অনন্য মর্যাদায় ভাস্বর। দিল্লির নবাব মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন শেরশাহর কাছে পরাজিত হয়ে গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিলেন, তখন ‘নিজাম’ নামের এক সাধারণ ভিস্তি নিজের মশক দিয়ে সম্রাটকে টেনে তুলে জীবন বাঁচান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে এক দিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।
কলকাতার বাবু কালচার
লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতার রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা ও বাবুদের ঘরে পানি সরবরাহে ভিস্তিওয়ালারা ছিলেন অপরিহার্য। ঢাকার নবাব আব্দুল গনি ১৮৭৮ সালে যখন প্রথম ফিল্টার পানির ব্যবস্থা (ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস) করেন, তখনো ভিস্তিরা প্রাসঙ্গিক ছিলেন। তাঁরাই উঁচু তলার বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতেন। পুরান ঢাকার ‘ভিস্তিখানা’ এলাকাটি আজও তাঁদের স্মৃতি বহন করছে।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক প্লাম্বিং ও টিউবওয়েলের আবির্ভাবে ঢাকা থেকে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে মশকের সেই ছলাতছলাত সুর। আজ বুড়িগঙ্গার জলও আর আগের মতো স্বচ্ছ নেই, আর ব্যস্ত ঢাকার রাজপথেও দেখা মেলে না সেই কাঁধে মশক নেওয়া মানুষগুলোর।
নতুন প্রজন্মের কাছে এই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন রূপকথা। আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যের স্বার্থেই এই হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালা বা সাক্কাদের কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কিভাবে এক টুকরা চামড়ার ব্যাগে চড়ে একসময় বয়ে চলত গোটা ঢাকা শহরের প্রাণশক্তি।





