• ই-পেপার

এই দহন আজীবনের

  • গেল বছর ঠিক আজকের দিনে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়েছিল যুদ্ধবিমান। অঙ্গার হয়েছিল অন্তত ৩৫টি ফুল! দুর্ঘটনার দিন থেকে ২০২৬ সালের ২১ মার্চ—দীর্ঘ নয় মাস ধরে আহত শিশুদের দেখভাল করেছেন প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার (বাংলা মাধ্যম) সহকারী শিক্ষক মেহেরুন নেসা। দুঃসহ সেই দিনগুলোর কথা তিনি বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর

মনোয়ার হোসেন রনি
জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর
অলংকরণ : তানভীর মালেক

শৈশবের স্মৃতি বড় অদ্ভুত। চারপাশের চেনা জগৎ তখন রূপকথার মতো মনে হতো। মনে পড়ে, ছোটবেলায় পুরান ঢাকার বনগ্রামে খালার বাসায় বেড়াতে যেতাম। সেই সরু গলি, পুরনো দালানের বারান্দা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পাশের বাসার কিছু বিহারি মানুষের উর্দু ভাষার এক মায়াবী সুর—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জীবন।

একদিন খালার বাসা থেকে বের হয়ে ঠাটারীবাজারের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমাদের পাশ কাটিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে গেলেন এক প্রবীণ মানুষ। মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি, কোমরে ভেজা গামছা আর কাঁধে ঝুলছে এক রহস্যময় কালো চামড়ার ব্যাগ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভাইয়া, ওই ব্যাগে কী?’ উত্তর পেয়েছিলাম, ‘খাওয়ার পানি।’

সেদিন হয়তো কৌতূহল মিটেছিল, কিন্তু আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি—সেদিন শুধু একজন মানুষকে দেখিনি, দেখেছিলাম ঢাকা শহরের এক জীবন্ত ইতিহাসকে। আজ সেই মানুষগুলো হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাদের পেশা। কিন্তু মনের মণিকোঠায় আজও তা অমলিন।

সালটা ১৮৬০। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে তখনো ভোরের কুয়াশা ভাসছে। বাকরখানির সুবাস আর ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে মাত্র জেগে উঠছে ঢাকা শহর। লালবাগ আর চকবাজারের সরু, আঁকাবাঁকা গলিগুলোর মধ্য দিয়ে একটা চেনা, ছন্দোময় শব্দ ইটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ছলাতছলাত, ছলাতছলাত। ভারী পশুর চামড়ার ব্যাগের ভেতরে পানির দুলুনির শব্দ এটি, যার সঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের ক্লান্তিহীন পদশব্দ। তিনি হলেন ভিস্তিওয়ালা—পুরান ঢাকার এক অঘোষিত জীবনদাতা, যাঁকে ছাড়া সে যুগের নগরজীবন একমুহূর্তের জন্যও কল্পনা করা যেত না।

 

‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ : স্বর্গের সুধা বিলানো মানুষ

ভিস্তি বা ভিসতি শব্দের উৎস অত্যন্ত চমৎকার। এটি এসেছে ফারসি শব্দ বেহেশত থেকে, যার অর্থ স্বর্গ। ইসলামি বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিতে তৃষ্ণার্তকে জলপান করানো এক পরম পুণ্যের কাজ। সেই স্বর্গীয় বারতা ও স্বস্তি যিনি বয়ে নিয়ে আসতেন, তিনিই ‘বেহেশতি’ বা অপভ্রংশে ‘ভিস্তিওয়ালা’। ঢাকার মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই স্বর্গের সুধা নিয়ে আসা ত্রাণকর্তা।

 

চামড়ার ‘মশক’ ও বুড়িগঙ্গার জল

আধুনিক প্লাস্টিক বা লোহার পাইপলাইনের যুগে পৌঁছানোর বহু আগে, ঢাকায় পানি ছিল এক পরম বিলাসের বস্তু। বিহার ও উত্তর ভারত থেকে আসা এই সংগ্রামী মানুষগুলো ছাগল বা ভেড়ার আস্ত চামড়া দিয়ে তৈরি মশক নামক জলরোধী ব্যাগে পানি বহন করতেন। চামড়াটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হতো, যাতে তীব্র গরমেও ভেতরের পানি চমৎকার ঠাণ্ডা থাকত। ভোরের আজানের আগেই বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ বুক কিংবা শহরের বড় বড় দিঘি থেকে প্রায় ৩৫ কেজি পানি দিয়ে মশক পূর্ণ করে তাঁরা শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়তেন। নবাবদের আলিশান প্রাসাদ থেকে শুরু করে সাধারণের রান্নাঘর—সবখানেই ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াত।

 

দিল্লি থেকে ঢাকা : রাজকীয় ইতিহাসের সাক্ষী

ভিস্তিওয়ালাদের ইতিহাস শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়, তা দিল্লি আর কলকাতার ইতিহাসেও অনন্য মর্যাদায় ভাস্বর। দিল্লির নবাব মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন শেরশাহর কাছে পরাজিত হয়ে গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিলেন, তখন ‘নিজাম’ নামের এক সাধারণ ভিস্তি নিজের মশক দিয়ে সম্রাটকে টেনে তুলে জীবন বাঁচান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে এক দিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।

 

কলকাতার বাবু কালচার

লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতার রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা ও বাবুদের ঘরে পানি সরবরাহে ভিস্তিওয়ালারা ছিলেন অপরিহার্য। ঢাকার নবাব আব্দুল গনি ১৮৭৮ সালে যখন প্রথম ফিল্টার পানির ব্যবস্থা (ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস) করেন, তখনো ভিস্তিরা প্রাসঙ্গিক ছিলেন। তাঁরাই উঁচু তলার বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতেন। পুরান ঢাকার ‘ভিস্তিখানা’ এলাকাটি আজও তাঁদের স্মৃতি বহন করছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক প্লাম্বিং ও টিউবওয়েলের আবির্ভাবে ঢাকা থেকে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে মশকের সেই ছলাতছলাত সুর। আজ বুড়িগঙ্গার জলও আর আগের মতো স্বচ্ছ নেই, আর ব্যস্ত ঢাকার রাজপথেও দেখা মেলে না সেই কাঁধে মশক নেওয়া মানুষগুলোর।

নতুন প্রজন্মের কাছে এই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন রূপকথা। আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যের স্বার্থেই এই হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালা বা সাক্কাদের কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কিভাবে এক টুকরা চামড়ার ব্যাগে চড়ে একসময় বয়ে চলত গোটা ঢাকা শহরের প্রাণশক্তি।

 

 

 

মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা ভাগ্যের ব্যাপার

লিওনেল মেসির পাঁড় ভক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দ্য বোয়িং কম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শুভেচ্ছা চক্রবর্তী। এবারের বিশ্বকাপে মাঠে বসে দেখেছেন প্রিয় তারকার হ্যাটট্টিক। সেই গল্প শুনিয়েছেন তিনি

মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা ভাগ্যের ব্যাপার
স্টেডিয়ামে পরিবারসহ লেখক

১৩ জুলাই ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল। জার্মানির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ওই রাতেই আমার ফ্লাইট। সবকিছু পেছনে ফেলে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছি। কিন্তু মনে তখন একটিই কষ্ট—আর্জেন্টিনার পরাজয়। সেই আমি আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনাল দেখলাম সরাসরি মাঠে বসে। ১৯৯৮, ২০০২-এর হতাশা দেখেছি, ২০০৬-এর আক্ষেপ দেখেছি, ২০১০-এর ব্যর্থতা দেখেছি, ২০১৪-এর ফাইনালে হৃদয়ভাঙা দেখেছি, ২০১৮-এর কষ্ট দেখেছি। তার পরও দল ছাড়িনি। অনেকেই ঠাট্টা করে আর্জেন্টিনাকে বলত, আরজেতেনা। বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে, বিশ্বাস ধরে, ভালোবাসা ধরে একই দলের পাশে থেকেছি। সময় অনেক গড়িয়েছে। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতল। আমেরিকা ২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপের আয়োজক এবং আমাদের খুব কাছের শহর কানসাস সিটিও একটি ওয়ার্ল্ড কাপ ভেন্যু। বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগেই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছিলাম। অনেক হিসাব-নিকাশ করে সম্ভাব্য সব ব্র্যাকেট আর ম্যাচআপ বিশ্লেষণ করেছিলাম। কানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আর্জেন্টিনার। মেসি বনাম রোনালদোকে একসঙ্গে মাঠে দেখার সুযোগ তো স্বপ্নের মতো! কিন্তু পর্তুগাল হতাশ করল। এরপর আশা করছিলাম আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে কলম্বিয়া। কলম্বিয়াও বিদায় নিল। আর্জেন্টিনাও মিসরের বিপক্ষে প্রায় বিদায়ের মুখে চলে গিয়েছিল। সেই ম্যাচ চলাকালে মনে হচ্ছিল, যদি আর্জেন্টিনা হেরে যায়, তাহলে আমার টিকিট বিক্রিও হবে না, পুরো টাকাটাই জলে যাবে। কিন্তু ঈশ্বর আর আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম। দুর্দান্তভাবে মিসরকে হারিয়ে দিল। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। এই ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনার তিনটি খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে মাঠে বসে। প্রথম খেলা আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া, কানসাস সিটিতে। দেখে এলাম সংগীতা, সায়েশা, সাত্ত্বিকসহ। মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা—এ এক অন্য অনুভূতি। দ্বিতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া, ডালাসে। ওই খেলায়ও মেসির দুই গোল, দেখে এলাম বন্ধু অরুপের সঙ্গে। তৃতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড, নিজেদের শহর কানসাস সিটিতে।

ম্যাচের দিন খুব ভোরেই যাত্রা শুরু করলাম। আমার শহর উইচিটা থেকে স্টেডিয়ামের দূরত্ব প্রায় তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। টানা গাড়ি চালিয়ে প্রথমে পৌঁছে গেলাম কানসাস সিটির ফিফা ফ্যান ফেস্টিভালে। সেখানে উৎসবের অসাধারণ আমেজ। চারদিকে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী, নানা ধরনের ফ্যান অ্যাক্টিভিটি। সেখানে অল আমেরিকান ব্যান্ডের লাইভ কনসার্ট উপভোগ করলাম। বিশাল স্ক্রিনে ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচের প্রথমার্ধ দেখলাম। পরে রওনা দিলাম স্টেডিয়ামের দিকে। যাত্রাপথে দেখা হলো আর্জেন্টিনা থেকে আগত সাপোর্টারদের সঙ্গে। ওরা বাংলাদেশের পতাকা দেখে সহজেই চিনে ফেলল—আমি বাংলাদেশি। বলল, আমরা বাংলাদেশিরা নাকি অলমোস্ট আর্জেন্টাইন। আমাকে অনুরোধ করল আর্জেন্টিনা ভ্রমণের জন্য। স্টেডিয়ামের ভেতরেই উইচিটা থেকে আসা বাংলাদেশের কয়েকজন আর্জেন্টিনা সমর্থকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পরিচয় হলো প্রশান্ত, শৈবাল, সুদীপ, অনীক, সারজিল, রেজা নেহাল, সুমিতসহ আরো অনেকের সঙ্গে। মনে হচ্ছিল, যেন কানসাস সিটিতেই ছোট্ট একটি বাংলাদেশ। পুরো স্টেডিয়ামটাই যেন নীল-সাদা সমুদ্র। তারা আমাকে একদম নিজেদের একজন করে নিয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, ছবি তুলেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা গোল করে বসে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। সবাই নাচছে, গাইছে, হাততালি দিচ্ছে। সে মুহূর্তটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পাশের আর্জেন্টাইন সমর্থকরা আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর সুইজারল্যান্ডও গোল শোধ করে দিল। মুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখালেন। ঠিক তখনই বড় স্ক্রিনে দেখানো হলো, ভিএআরে ভুল ধরা পড়েছে। রেফারি লাল কার্ড বের করলেন। সুইজারল্যান্ডের একজন খেলোয়াড়কে দেখানো হয়েছে। তখন যেন সবাই আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জয় পেল। পুরো স্টেডিয়াম আবার উৎসবে মেতে উঠল। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, এ আনন্দের কোনো শেষ নেই।

আমার নিজের রাজ্যেই চোখের সামনে সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে খেলতে দেখা—এটি সত্যি জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদগুলোর একটি। এই স্মৃতি সারা জীবন হৃদয়ে আগলে রাখব।

 

 

 

 

[ প্রাণ প্রকৃতি ]

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা

শরীফ তানভীর আহম্মেদ

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা
বামন মাছরাঙা ছবি : লেখক

কয়েক দিন ধরেই টানা বৃষ্টি। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার হাজারীখিল বনে যেতেই হবে। রাত প্রায় সাড়ে আটটা। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা দিলাম বিবিরহাটের উদ্দেশে। জ্যাম ঠেলে রাত সাড়ে ১০টায় পৌঁছলাম। পথে বনের গাইড নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বললাম, আমি না পৌঁছানো পর্যন্ত যেন সে জেগে থাকে। বনের প্রবেশমুখে এলে নাহিদ আমাকে বন বিভাগের অতিথিশালায় পৌঁছে দিল। অতিথিশালাটি বনের গভীরে, চারপাশে ঘন অন্ধকার। বিশাল নির্জন ভবনে একা। বারান্দাজুড়ে বাদুড়ের ওড়াউড়ি, মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াসব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পরদিন ভোরে জানালা খুলেই দেখি অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। মনে পড়ল, সিএনজিতে ছাতা ফেলে এসেছি। ইন্টারনেটও নেই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু পাখির ডাক শুনছিলাম। হঠাৎ একটি দাগি পেঁচা উড়ে গিয়ে সামনের একটি ডালে আশ্রয় নিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামতেই ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লাম।

একদিকে জোঁকের ভয়, অন্যদিকে বৃষ্টি নামার শঙ্কা। তবু পাখির ডাক অনুসরণ করে বনের ভেতরে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর যেতেই বড় মালা পেঙ্গার একটি দল চোখে পড়ল। এদের কাছেই হঠাৎ দেখা মিলল এক জোড়া সবুজ তাউড়া (English: Common Green Magpie, Scientific name: Cissa chinensis)|

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা

সবুজ তাউড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বনজ পাখিগুলোর একটি। পুরো শরীর উজ্জ্বল পান্না-সবুজ, মাথার ওপর কালো রঙের ছাপ, উজ্জ্বল লাল ঠোঁট এবং লম্বা নীলাভ-সবুজ লেজ তাকে সহজেই অন্য পাখি থেকে আলাদা করে। এরা সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে এবং ঘন চিরসবুজ বনের উঁচু ডালে বসে শিকার খোঁজে। খাদ্যতালিকায় থাকে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা, টিকটিকি, ছোট ব্যাঙ, গিরগিটি, পাখির ডিম ও ছানা, এমনকি ছোট ফলও। বৃষ্টিভেজা সকালের নীরব বনে এদের উপস্থিতি যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক সুর। মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করলাম। এরপর নাহিদের সহযোগিতায় আরো গভীর বনের দিকে এগোলাম। পাহাড়ি ছড়া ধরে হাঁটছি। আকাশ মেঘলা, আলো খুবই কম। এমন সময়ে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থাকে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পথেই দেখলাম কালো ঘাড় রাজনের একটি বাসা। কিছুদূর এগোতেই কয়েকবার মাছরাঙার ডাক কানে এলো। প্রথমে মনে হলো নীলকান মাছরাঙা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটি ঝুলন্ত লতার ওপর যে পাখিটি এসে বসল, তা দেখে মুহূর্তেই সব ক্লান্তি উবে গেল। সেটি ছিল বামন মাছরাঙা (English: Oriental Dwarf Kingfisher, Scientific name: Ceyx erithaca)। বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মাছরাঙাগুলোর একটি। ছোট্ট শরীরজুড়ে যেন প্রকৃতি তার সবচেয়ে উজ্জ্বল রংগুলো মেলে ধরেছে। মাথা ও পিঠে বেগুনি-নীল আভা, পিঠের নিচে উজ্জ্বল নীল, বুক ও পেট গাঢ় কমলা-হলুদ, ঠোঁট টকটকে লাল-কমলা এবং পা উজ্জ্বল লাল। ঘন ছায়াময় বন ও পাহাড়ি ছড়ার আশপাশেই এদের আবাস। নামের সঙ্গে মাছরাঙা থাকলেও এদের প্রধান খাদ্য শুধু মাছ নয়, বরং ছোট ব্যাঙ, ঝিঁঝি পোকা, ফড়িং, বিটল, মাকড়সা, ছোট কাঁকড়া, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী এরা বেশি খেয়ে থাকে। ঝুলন্ত ডাল বা লতায় নিশ্চুপ বসে থেকে সুযোগ বুঝে মুহূর্তেই শিকার ধরে ফেলে। বৃষ্টিভেজা হাজারীখিলের সেই মেঘলা সকালে রঙিন বামন মাছরাঙাকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন ঘন অন্ধকার বনের বুক চিরে হঠাৎ এক টুকরা রংধনু নেমে এসেছে।

[ আরো জীবন ]

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন

১৯৮৫ সাল থেকে প্রায় চার দশক ধরে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন
মাত্র ১২ হাজার টাকায় ছয়জনের সংসার চালাতে হয় রাখালকে। ছবি : লেখক

আওয়াজটা আসছিল জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলা থেকে। হাঁটুতে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন কেউ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। সবার কাছে যাঁর পরিচিত রাখালদা নামে। কী এমন হলো যে ভরদুপুরে কাঁদছেন? বললেন, দাদা রে, মার কথা মনে পইড়ছে। মা বুড়া অই গেছে। ছ মাস অইল মাইয়াটারেও দেখি না। চাইলেই তো বাড়ি যাইতাম হারি (পারি) না।

কেন তিনি বাড়ি যেতে পারছেন না? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে রাখালের জন্মস্থান ফেনী থেকে ঘুরে আসা যাক। শৈশবে ডানপিটে ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখে পাড়া দাপিয়ে বেড়াতেন। ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হবেন। ধরবেন সংসারের হাল। অভাবের কারণে তা আর হয়ে উঠল না। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। অনটনের সংসারে অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। ১৯৮৫ সালে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে কিশোর রাখাল চলে আসেন রাজধানীতে। তাঁর ঠিকানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। থালা-বাসন ধোয়ার কাজ জোটে সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে। মাসে ১০০ টাকা বেতন। কয়েক বছর পর সেটি বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। সুধীরবাবু মারা যাওয়ার পর রাখাল চলে যান হলের জিতেনবাবুর ক্যান্টিনে। সেখানে দৈনিক ৩০ টাকা করে পেতেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই হলেই আছেন। রাখালের বেতন এখন মাসে ১২ হাজার টাকা। এখন তিনি কাজ করেন রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ায়। সকাল-বিকাল তরকারি কাটেন। দুপুর এবং রাতে ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করেন। জগন্নাথ হলের ছাত্ররা রাখালকে চেনেন কিছুটা রাগী মানুষ হিসেবে। এর পেছনে আছে এক করুণ গল্প। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক রাখাল। বাড়িতে তাদের সঙ্গে থাকেন মা-ও। প্রায় ১০ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি তাঁর ছোট ভাই। প্যারালিসিসে আক্রান্ত সেই ভাইয়ের ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব খরচ রাখালকেই বহন করতে হয়। এমন অবস্থায় অনেককে দেখা যায়, ভাই তো দূরে থাক, মায়েরও খোঁজ নেন না। রাখাল ব্যতিক্রম। মা ও অসুস্থ ভাইকে নিয়ে সংসারের বিশাল বোঝা সামলান একা। তাঁর আয় স্বল্প, কিন্তু মন বড়। রাখালের ছেলে এখন চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে এবং মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের খরচও দিতে হয়। বৃদ্ধা মা ও নিজের কন্যাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া-আসায় প্রায় দুই হাজার টাকা লাগে। ফলে সংসারের খরচের কথা ভেবে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন। রাখালের কান্নার কারণ এই আর্থিক অসংগতি। বললেন, বাড়িত মা আছে, মাইয়া আছে। কিন্তু মন চাইলেই তো আর যাইতাম হারি না। যাওন-আইওনের ম্যালা খরচ।

এখন রাতে রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলার বারান্দায় একটি বেঞ্চের ওপর ঘুমান। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক শংকর বিশ্বাস বলেন, ২৫-২৬ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে রাখাল। ফাঁকিবাজি করে না। খুব সৎ। তবে মাথাটা একটু গরম তাঁর। এই হলের বহু ঘটনার সাক্ষী রাখাল। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, আমনেরা তো সব দ্যান (দেখেন) ন। অন (এখন) তো হল শান্ত। আমি দেখছি, সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে ছাত্ররা টেবিলে অস্ত্র রাখি খাইত। ডরে কেউ কথা কওয়ার সাহস হাইত (পেত) না। কদিন হর হর (পর পর) মারামারি লাইগত। কৈশোর-যৌবন পার করেছেন এই হলে। বহু ছাত্রকে দেখেছেন। সবাই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু রাখালের ভাগ্য বদলায়নি। সবাই চলে যায়, কিন্তু আংগো (আমাদের) খবর কেউ লয় না (রাখে না)। হলের যেসব দাদা এখন বড় বড় চাকরি করেন, তাঁরা যদি আমারে একটু সহযোগিতা করেন, তাইলে আমার একটু উপকার হয়। সজল চোখে বলছিলেন রাখাল।