• ই-পেপার

সালতামামি এবং নতুন বছরের সম্ভাবনা

  • আবুল কাসেম ফজলুল হক

শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিন

সাধারণত পরিণত বয়সে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও এখন শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ প্রবণতা বেড়েই চলছে। কারো আত্মহত্যাই কাম্য নয়, তবে শিশুদের আত্মহনন আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। পরিণত বয়সে মানসিক চাপ, আর্থিক অনটন, দীর্ঘদিনের রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু একজন শিশু কিংবা কিশোর, যার নেই কোনো আর্থিক সংকট কিংবা টানাপড়েন, নেই কোনো মানসিক চাপ, তাকে কেন আত্মহননের মতো পথ বেছে নিতে হবে। সিলেটে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সম্প্রতি আত্মহত্যা করে। ঠিক কয়েক মাস আগে একই বিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষার্থীও আত্মহত্যা করে এবং বিষয়টি তখন বেশ আলোচনা সৃষ্টি করে। অভিযোগের ভিত্তিতে তখন ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অপসারণও করা হয়। এমন ঘটনা প্রায়ই আমাদের সমাজে ঘটছে। অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মতো আত্মহত্যার প্রবণতাকে আমরা কোনোভাবেই অবহেলা কিংবা ছোট করে দেখতে পারি না। যে শিশু কিংবা কিশোরটি আজ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল, তার সম্ভাবনাকে আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলছি। শিশুটি ইংরেজিতে একটি সুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত সুইসাইড নোট লিখে গেছে, যা তার মেধার বহিঃপ্রকাশ বটে। মোটাদাগে আমরা বলতে পারি, এমন একটি পরিবেশ আমরা তাদের জন্য তৈরি করি, যেখানে তারা বাধ্য হয়ে, আবেগে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের আত্মহত্যার জন্য আমরা তাদের কোনোভাবেই দায়ী করতে পারি না। কেননা শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিনতারা নিরপরাধ এবং তাদের ব্যক্তিগত কোনো অপর্যাপ্ততার জন্য তারা এ কাজ করতে পারে না। দুটি দৃষ্টিভঙ্গিতে শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আর দুই. পরিবারকেন্দ্রিক। শিশুরা একটি নির্দিষ্ট এবং বড় সময় বিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং আড্ডায় সময় কাটে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি কারিকুলাম থাকে, থাকে নির্দিষ্ট কাজ, ক্লাসে অংশগ্রহণ, পড়ালেখা বিনিময় এবং এর ভিত্তিতে একাডেমিক মূল্যায়ন। পাশাপাশি তার আচার-আচরণেরও মূল্যায়ন হয়। এ কাজের মধ্যে রয়েছে সম্পর্ক, যেটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রধানত আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে থাকে। পড়ালেখার জন্য এই সম্পর্ক যদি কোনো ঘাটতি কিংবা মনোমালিন্য তৈরি করে এবং তা যদি তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষার্থীদের মন কোমল এবং অনেক কিছুই তারা সহজভাবে নিতে পারে না। শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে পারা হলো শিক্ষকের বড় কাজ। তাদের প্রতি যেমন খুব কঠোর হওয়া যাবে না, তেমনি হেলায় গা ভাসিয়েও দেওয়া যাবে না। কোমল মনে তাদের উপযোগী ব্যবহার তাদের সঙ্গে করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা হয়তো ক্লাসে বসেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। আড্ডার ছলে হয়তো কারো সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকদের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা এবং সমাধানের চেষ্টা করা।

একটি নির্দিষ্ট সময় আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে থাকলেও তাদের বেশি সময় কাটে পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের ধরন এবং পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবর্তিত সমাজকাঠামোর কারণে আমাদের পরিবারের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই বিভিন্ন ধরনের পরিবারে শিশুদের বসবাস। কেউ একক, কেউ যৌথ, কেউ সিঙ্গল মা-বাবা, আবার অনেকে সত্বাবা কিংবা মা দ্বারা পরিবারে মানুষ হচ্ছে। একেক ধরনের পরিবারে শিশুদের বিকাশ একেক রকম হয়। আবার এমনও হয়, যেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক, কিন্তু অযত্ন আর অবহেলার কারণে আমাদের শিশুরা মানসিক কষ্ট অনুভব করে। বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ কোনোটির জন্য শিশু-কিশোরদের আমরা দায়ী করতে পারি না। আমরা যেখানেই যে পরিবেশ দেব, তারা সেই পরিবেশেই মানুষ হবে। কাজেই শিশুদের একটি উন্নত ও সুন্দর পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। অনেক ক্ষেত্রে আমরাই তাদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী। আমাদের এ ক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে। শিশুদের জন্য একটি ভালো বিদ্যালয়ের পরিবেশ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব, যেখানে শিক্ষকরা হবেন প্রতিটি শিশুর অভিভাবক। শিক্ষার্থীদের পরম মমতা ও স্নেহ দিয়ে মানুষ করতে হবে। সঙ্গে শাসনও থাকতে হবে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শিশুর মনোজগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে বোঝা একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত দুইবার অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশ করতে হবে। এর বাইরেও প্রয়োজন মনে করলে শ্রেণিশিক্ষক অভিভাবকদের ডেকে কথা বলতে পারেন। খোলামেলা কথা বললে অনেক সমাধান বের হয়ে আসবে। শিক্ষার্থীদের শাসনের পাশাপাশি কাউন্সেলিং করতে হবে। তাদের নিয়মিত পড়াশোনা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আচার-আচরণও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনোভাবেই তাদের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাবে না। পরিবার হলো সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারে থাকবে অনেক ধরনের সমস্যা। কিছু সমস্যা আর্থিক, আবার অনেক সমস্যা সামাজিক ও মানসিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। কিছুতেই শিশুদের পরিবারের কোনো সংকট এবং টানাপড়েনে যুক্ত করা যাবে না। নিজেদের মধ্যে যতই সমস্যা থাকুক না কেন, শিশুরা থাকবে তা থেকে মুক্ত। একটি সুন্দর পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের নিজেদের সমস্যার জন্য শিশুদের জীবন নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। শিশুদের চাহিদা ও প্রয়োজন, তা প্রাত্যহিক হোক কিংবা গুণগত সময় কাটানো হোক, অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের শিশুরা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার হচ্ছে। আবার আমাদের কারণেই তারা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। আমরা চাই প্রতিরোধ, আর এর জন্য আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবে

ইকরামউজ্জমান

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবে

বিশ্বের কয়েক শ কোটি মানুষের চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নিবদ্ধ। আমাদের সময় অনুযায়ী আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায় ভরপুর ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা দখলের জন্য নামবে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় দেশ স্পেন। দুটি দেশই বিশ্ব ফুটবলে পরাশক্তি। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন বিজয়ী, আর আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। এবারই প্রথম ফাইনালে পরস্পর পরস্পরের মুখোমুখি হবে ফুটবলে রোমাঞ্চ ছড়ানোর জন্য। ১৯৭০, ১৯৮৬ ও ১৯৯৪ সালে উত্তর আমেরিকায় যখন বিশ্বকাপের আসর বসেছে, তখন লাতিন দেশ ছাড়া কেউ জিততে পারেনি। এবার আবার উত্তর আমেরিকায় খেলা। লাতিন দেশ আর্জেন্টিনা আছে ফাইনালে, তাহলে কি আবার লাতিন দেশকে ট্রফি হাতে দেখা যাবে?

মাঠের লড়াই দর্শন এবং ফুটবল ক্যারেক্টার প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আছে উভয় দেশের মধ্যে বেশ পার্থক্য। স্পেন তার খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসার পর সত্যি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তাদের মাথা আর ফুটবলের কৌশলে অন্য পরাশক্তিগুলোর চেয়ে অন্য রকম। এটি তারা প্রমাণ দিয়েছে আবার এই বিশ্বকাপে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মানসিক শক্তি ভীষণ। তারা ভেঙে পড়তে জানে না। আর তাই পেছনে পড়েও এগিয়ে আসার লড়াই ওদের বড় বেশি। ভীষণভাবে আত্মবিশ্বাসী। স্পেন জিততে চায়, তবে তারা ব্যাকরণের বাইরে আসতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। এই দুটি দেশের ফুটবল নিয়ে যত গল্প আর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, অন্য কোনো দেশের ফুটবল নিয়ে তেমনটি হয়নি। কেননা তাদের ফুটবলে গল্পের উপাদান যে সবচেয়ে বেশি। তারা ফুটবলকে দেখে অন্য চোখে। তাই বলা মুশকিল নিউজার্সিতে কে জিতবে? কে ট্রফির সঙ্গে জিতে নিয়ে যাবে বাংলাদেশের টাকায় ৬১৫ কোটি টাকা।

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবেআর্জেন্টিনার দখলে আছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি। এটি তারা জয় করেছে ২০২২ বিশ্বকাপে। ৩৬ বছর পর। তারা চাইছে কাপটি রিটেইন করতে। অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের অবশ্য সেই সামর্থ্য আছে। যদি তারা এবার দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা ব্রাজিলের পাশে তাদের নাম লেখাতে পারবে। ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পর পর দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছে। আর্জেন্টিনাও তো লাতিন আমেরিকার দেশ।

স্পেন তাদের প্রথম গ্রুপ ম্যাচে প্রথম খেলায় নবাগত এবং দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করেছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সৌদি আরবের কাছে প্রথম খেলায় পরাজিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে আগাম কিছু বলা যাবে না। ফুটবল তার নিজস্ব মতে চলে। স্পেন যদি প্রথমে ধাক্কা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, তাহলে ফুটবল ইতিহাস বলবে সময়মতো জ্বলে ওঠার বিকল্প নেই। ফুটবল চলে সব সময় এমন সব আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে।

এবার আমরা দেখলাম, যে চারটি দেশ বিগত বছরগুলোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারাই আবার সেমিফাইনালে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এতে ফুটবল আকর্ষণীয় হয়েছে। পাশাপাশি ভুগতে হয়েছে অনিশ্চয়তায়। সবাই দেখেছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড কিভাবে সেমিফাইনালে বিদায় নিয়েছে যথাক্রমে স্পেন আর আর্জেন্টিনার কাছে হেরে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড কিন্তু কেউই দৃঢ়চেতা আক্রমণাত্মক এবং গোছানো ফুটবল খেলতে পারেনি। তারা চেষ্টা করেছে, তবে এটি যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিয়তি তাদের সঙ্গে ছিল না। ইংল্যান্ড সেই ১৯৬৬ সালে জয়ের পর আর এই শতাব্দীতে ফাইনাল খেলতে পারেনি। শক্তিশালী এবং ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়েও ফ্রান্স বিদায় নিয়েছে সেমিফাইনালে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে ঘিরে অনেক আলোচনা, প্রত্যাশা আর স্বপ্ন দেখা হয়েছেসব চুরমার করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক গ্রেটরা অনেক কথাই বলেছেনতবে বাস্তবতা হলো, ফ্রান্সের তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। আর ইংল্যান্ড তো এই শতাব্দীতে এসে আর জয়ের মুখ দেখেনি, যেটি আগেই উল্লেখ করেছি। ফ্রান্সের অর্থনীতিবিদ এবং অন্যরা এখন কী বলবেন?

বিশ্বকাপের ইতিহাসটিকে নাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তারা বিগত বছরগুলোতে তিনবার চ্যাম্পিয়ন আর তিনবার রানার্স আপ। যদি আর্জেন্টিনা এবার মেসির নেতৃত্বে শিরোপা জিততে পারে, তাহলে তারা জার্মানি ও ইতালির চারবার বিজয়ের পাশে তাদের নাম লেখাতে পারবে। জার্মানি এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে মোট আটবার। আর আর্জেন্টিনার এবার নিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা হবে সাতবার। আর্জেন্টিনা শুধু এবার নয়, এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে ফাইনালে খেলেছে। অর্থাৎ এবার নিয়ে পর পর ফাইনাল খেলা (২০২২ ও ২০২৬) হবে তাদের দ্বিতীয়বার। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা জিতলেও ১৯৯০ সালে জিতেছে জার্মানি। স্পেনের বিশ্বকাপ জয় ২০১০ সালে। এই ২০১৯ সালের পর আর কোনো নতুন দেশ বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। স্পেনের সামনে এখন সুযোগ এসেছে। এবার যদি তারা জিততে পারে, তাহলে এটি হবে তাদের দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা বিজয়, যেটি জেতার সামর্থ্য তাদের আছে।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ফুটবল পণ্ডিতরা ছিলেন ভীষণ সতর্ক। তাঁরা বলেছেন, কাউকে ফেভারিট বলা মুশকিল। তবে তাঁদের বেশির ভাগের মতামত কিন্তু ফ্রান্স ও স্পেনের দিকেই ঝুঁকে ছিল। আর্জেন্টিনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে অনেক পরে, সতর্কতার সঙ্গে। তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিগত বছরগুলোতে যে আটটি দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারা ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অন্য কোনো দেশকে কাপ উঁচু করে ওপরে তুলে ধরতে দেখা যাবে না। অর্থাৎ ২০১০ সালে স্পেনের পর আর এবার কোনো নতুন দেশকে দেখার সম্ভাবনা নেই। এটি সঠিক হয়েছে। তবে তাঁদের কারো কারো সেমিফাইনালের প্রেডিকশন সঠিক হয়নি। ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলা হয় অনেক তথ্য এবং বিভিন্ন বিষয় ঘাঁটাঘাঁটি করে। ফ্রান্সের অর্থনীতিবিদরা তো সোজাসুজি বলেছেন, ফ্রান্স এবার তৃতীয়বারের চ্যাম্পিয়ন হবে। সেই ফ্রান্স তো তাদের জার্নি শেষ করেছে সেমিফাইনালেই। ঘটনাবহুল এবং বহু আলোচিত বিশ্বকাপে যেটি দেখলাম, সেটি হলো সেমিফাইনালে যে চারটি দেশ কোয়ালিফাই করেছে, এই চারটি দেশ ফিফার র‌্যাংকিংয়ের ওপরে আছেএই ধরনের অবস্থা কিন্তু বিশ্বকাপে আগে কখনো হয়নি। এতে সেমিফাইনাল দুটি ছিল টান টান উত্তেজনায় ভরপুর।

৪৮টি দেশ নিয়ে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, কিন্তু কোনো স্তরেই মাঠের খেলা ঝুলে যায়নি। আর তাই পুরো বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলের আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি। একে একে বিদায় নিয়েছে উরুগুয়ে, জার্মানি ও ব্রাজিলের মতো বিশ্বকাপ বিজয়ী দল। এটির কারণ হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দিনের খেলা। নক আউটে তো সাধ্যমতো যুদ্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না। দিনের খেলায় দুর্বলতা মানেই বিদায়। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, নরওয়ে ও মরক্কো কেন এগিয়ে আসতে পারেনি, এটি তো দেখা গেল।

বিশ্ব ফুটবল ডমিনেট করছে ইউরোপ। পরিসংখ্যানের এখন যে অবস্থা, এবার যদি লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা কাপ জেতে, এর পরও পিছিয়ে থাকতে হবে। সেমিফাইনালে চারটি দেশের মধ্যে একমাত্র আর্জেন্টিনা ছিল লাতিন আমেরিকার দেশ। কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকান দেশ মরক্কো ছিল।

সবচেয়ে বেশি মানবসম্পদ নিয়ে এশিয়া মহাদেশের ৯টি দেশ বিশ্বকাপ থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার দেশগুলোর পারফরম্যান্স হতাশাজনক। ৪৭টি দেশ নিয়ে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন। বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এবার চোখে পড়ার মতো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে এএফসি দেশগুলোর গুরুত্ব কিন্তু অন্য জায়গায়। সেটি হলো ভোট। আফ্রিকান দেশগুলোর মেধা চলে যাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এটি এবার লক্ষ করা গেছে মাঠে প্রকটভাবে। আফ্রিকা মহাদেশ কী ভাবছে? ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তো হবে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগালে। আর ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ সৌদি আরব। আরববিশ্বে তো লক্ষণীয় হচ্ছে ফুটবলের ক্ষেত্রে অনেক বড় বিনিয়োগ, বিশেষ করে ক্লাবগুলোতে। তবে তাদের বিনিয়োগ হতে হবে পরিকল্পনামাফিক।

ফুটবল অর্থই সব। স্পন্সর ছাড়া উপায় নেই। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ব্র্যান্ড তো বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এবার ফাইনালে দুটি দেশ আর্জেন্টিনা ও স্পেন লড়বে। এই দুটি দেশের ফুটবল স্পন্সর তো অ্যাডিডাস। তারা পরাজিত করেছে সেমিফাইনালে নাইকির স্পন্সর করা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী খেলায় আবার নাইকির স্পন্সর করা দুটি দেশ (ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড) লড়বে। ফুটবল চত্বরে অ্যাডিডাসের দলের জয় মানে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেকাংশে বেড়ে যাওয়া। ব্র্যান্ডের এই যুদ্ধে আবার লক্ষ করতে হচ্ছে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল, সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা তরুণ খেলোয়াড় কোন ব্র্যান্ডের এনডোর্সমেন্টের আওতায় খেলোয়াড়রা পেতে যাচ্ছেন।

ফুটবল শুধু খেলা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদে পদে ব্যবসা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বর্ণবৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব আর ফিফার প্রচণ্ড ভণ্ডামি। ফিফা কখনো নিরপেক্ষ ছিল না, এখনো নয়। ইরানের বিষয় ফিফা কিছুই করতে পারেনি। কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে তারা চটাতে চায়নি নিজ স্বার্থের কথা ভেবে। বাজে রেফারিং এবং পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কথা উঠেছে। ফিফা তাদের সুন্দর সুন্দর বয়ান শুনিয়েছে লিখিতভাবে। দুর্বল এবং পিছিয়ে পড়া দেশগুলো ফুটবল বিশ্বকাপে বিভিন্নভাবে অবহেলিত হয়েছে। তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। বড় কথা হলো, খেলার চেয়ে ব্যবসাকে এখন বড় করে দেখা হয়েছে। চড়া মূল্যে টিকিট কেটে খেলা দেখেছে মানুষ, কিন্তু এটি তো ফিফার দর্শন নয়। বিশ্বজুড়ে ফুটবল কাদের খেলা? এবার বিশ্বকাপে এই প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা ভীষণ ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে। উত্তর দেওয়ার সময় কোথায়? তাদের তো বাংলাদেশের টাকায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিজনেস এস্টিমেট। এটি তো অ্যাচিভ করতেই হবে, যেভাবেই হোক। শেষে এসে সান্ত্বনা একটিই, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবল সাঙ্গ হতে যাচ্ছে। কয়েক শ কোটি মানুষ খেলা উপভোগ করেছে ফুটবলকে ভালোবেসে। একটি মিথ আবার সত্য হলো, বিদেশি পেশাদার কোচ কখনো দেশকে জেতাতে পারেন না।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবে

মোদ্দাকথা হচ্ছে, সমাজ মোটেই সুস্থ অবস্থায় নেই। ৩ জুনের সব কটি জাতীয় দৈনিকে একটি খবর খুব গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে, যেটির মূল ঘটনা উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত তিন পুত্র ও এক কন্যার জননী নূরজাহান বেগমের অপমৃত্যু। না, কেউ তাঁকে খুন করেনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫, ঢাকার মিরপুর এলাকায় একাকী থাকতেন একটি কামরায়, সেই কামরায়ই শয্যাশায়ী অবস্থায় মারা গেছেন। পাশের কামরায়ই থাকেন তাঁর কন্যা, যিনি উচ্চশিক্ষিতা, সাত বছর আগে যিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন, বিধবা এবং নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি তাঁর মাকে নিজের ফ্ল্যাটে এনে রেখেছেন, খাবার পৌঁছে দিতেন মায়ের কামরায়, কিন্তু মায়ের স্বাস্থ্যের তেমন একটা খবর রাখতেন না, মা যে বেঁচে নেই, সেটিও তিনি টের পেয়েছেন নাকি দিন দুয়েক পরে, মায়ের ঘরে কোনো সাড়াশব্দ নেই দেখে। মেয়ে ভেবেছিলেন মা বুঝি অসুস্থ, তাই নার্সিং হোম থেকে একজন নার্সকে ডেকে এনেছিলেন; নার্সটি কামরার ভেতর ঢুকে দেখেন নূরজাহান বেগম অসুস্থ নন, মৃত; শুধু মৃত নন, তাঁর দেহে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ৯৯৯ নম্বরে খবর দিলে পুলিশের লোকজন এসে মৃত দেহটি উদ্ধার করে। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, নূরজাহান বেগমকে তাঁরা দেখেননি এবং তাঁর কন্যা মহিলাটিও, যিনি একটি স্কুলের শিক্ষিকা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশতেন না; কারো কারো ধারণা, মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একটি পত্রিকা শিরোনাম দিয়েছে এই ভাবে, ‘সন্তানের অবহেলায় রত্নগর্ভা মাতার মৃত্যু’। তা অনেক প্রকার মন্তব্যই করা যাবে বৈকি, কিন্তু মূল সত্যটি হলো এই যে ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে এবং সবকিছুর আগে সেটি এই বাস্তবিকতাকেই তুলে ধরে যে আমাদের এই ‘উন্নত’ সমাজে ঘনিষ্ঠতম মানবিক সম্পর্কগুলোও এখন আর অক্ষত নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ সমাজে মানুষের পক্ষে সুস্থ থাকা তো অবশ্যই, টিকে থাকাটাও চ্যালেঞ্জের মুখে গিয়ে পড়েছে। আট বছরের শিশু রামিসা তাই ৩০ উত্তীর্ণ বিবাহিত প্রতিবেশী পশুকেও-ছাড়িয়ে যাওয়া যুবকের নৃশংসতার শিকার হয়; ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগমের খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হন তাঁরই আদর-যত্নে মানুষ হওয়া সমাজে সম্মানিত সন্তানরা।

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবেএকই দিনের আরেকটি খবর, রাজধানীর উত্তর মুগদাপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেন শুভর (৪৫) অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের। কোনো কোনো পত্রিকা এই খবরটিকে নূরজাহান বেগমের খবরকে পাশাপাশি রেখেছে—নূরজাহান বেগমের খবরকে বড় করে দিয়ে, তানভীর হোসেন শুভর খবরটি কিছুটা ছোট আকারে সাজিয়ে। শুভর তো বস্তুগত কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করতেন, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পৈতৃক গৃহে থাকার কথা নিরাপদ আশ্রয়ে, কিন্তু তিনি একাকী থাকতেন একটি ভাড়া বাসায়। বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল বছর দশেক আগে। মরণের সাধ তো মানুষের এমনি এমনি হয় না, নিশ্চয়ই অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন হতাশায়। হতাশাও একটি রোগ বটে; জীবনের ওপর সে ছায়া ফেলে এবং মৃত্যুকে সুযোগ করে দেয় ওত পেতে থাকতে, সুযোগের অপেক্ষায়।

এক পাষণ্ডের হাতে শিশু রামিসার মৃত্যু, সচ্ছল সন্তানদের উপেক্ষায় নূরজাহান বেগমের গলিত লাশে পরিণত হওয়া, নিঃসঙ্গতার বোঝা বহন করতে অসমর্থ হয়ে তানভীর হোসেন শুভর আত্মহত্যা—ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন অবশ্যই, কিন্তু আরো বহু মর্মন্তুদ ঘটনার সঙ্গে এই তিনটিও একই বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত, সেটি হলো পুঁজিবাদী সমাজে উন্নতির গভীরে মানবিক বিপর্যয়।

কন্যাশিশু ধর্ষণের নিত্যনতুন খবর এড়ানোর উপায় থাকে না, প্রত্যহ পাওয়া যায়। ২৫ মের একটি দৈনিকের খবর, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে সাতটি শিশু ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার’। সাত শিশু ধর্ষণের ওই ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনটির বিবরণ অন্য একটি পত্রিকায় এসেছে এই ভাবে—১. গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা এক যুবকের গ্রেপ্তার হওয়ার। ২. রাজধানীর ভাসানটেকে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা, কারাগারে রিকশাচালক; শিশুটি নিজেদের বাড়ির কাছে খেলছিল, রিকশাচালক তাকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে। ৩. ছয় বছরের শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ, লাকসামে। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে, ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিকমহল থেকে। থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিটিকে (বয়স তাঁর ৭৩) গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। খবর তিনটি পড়লে মনে হবে তিনটি শিশু পাশাপাশি শায়িত রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার হাতে চরম নৃশংসতায় নিপীড়িত হয়ে। সব ঘটনাই যে প্রকাশ পায় তা তো নয়, সামাজিক সম্ভ্রম হারানোর আতঙ্কে পারতপক্ষে মা-বাবা থানায় যান না। তা ছাড়া থানা নিরাপদও নয়, সেখানে গেলে অপমানিত হওয়ার শঙ্কাও থাকে।

ওই দিনের শিশু ধর্ষণের অপর একটি ঘটনার বিবরণ এই রকমের—নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নিজেদের বাড়ির কাছেই বিকেলবেলায় শিশুটি খেলছিল, হিরো ও সোহেল নামের দুই যুবক কৌশলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। আর্তনাদ শুনে স্থানীয় লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করে; সোহেল পালিয়ে যায়, জনতা হিরোকে আটক করে এবং পিটুনি দেয়। শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সীগঞ্জ হাসপাতালে, অবস্থার অবনতি ঘটলে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যালে। জনতার হাত থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় হিরোকে উদ্ধার করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশের প্রয়োজন পড়ে। থানায় গিয়ে রাতেই মামলা করেন শিশুটির মা। ওই একই অপরাধে জনতার হাতে ধরা পড়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মসজিদের এক ইমাম এবং জনতা যথারীতি তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছে।

জনতা যে অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শায়েস্তা করে তার কারণ দুটি। প্রথমত, তাদের ক্রোধ; দ্বিতীয়ত, পুলিশের ওপর তাদের অনাস্থা। জনতা মনে করে, পুলিশ এসে অপরাধীকে উদ্ধার করবে এবং থানায় গিয়ে সে উকিল লাগিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে এবং অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাবে। শাস্তিটা তাই নগদানগদি মিটিয়ে ফেলাই ভালো।

লিখতে লিখতেই পত্রিকায় পড়লাম কন্যাশিশু ধর্ষণের আরেক খবর। সেটি একটু ভিন্ন মাত্রার। শিরোনামটি এই রকমের—‘শিশু ধর্ষণের শাস্তি একটি থাপ্পড় ও ক্ষমা প্রার্থনা’। ভেতরের খবর বলছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বেলালকে একটি থাপ্পড় দিয়ে ভুক্তভোগীর বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে এবং পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় করা মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। রায়টি এসেছে পৌর বিএনপির সেক্রেটারির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সালিশি বৈঠক থেকে। বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ চকোলেটের লোভ দেখিয়ে সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণের। অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই ধরনের কাজে নাকি অনভ্যস্ত নন; এর আগে তিনি নিজের ভাবিকে, এমনকি পুত্রবধূকেও আক্রমণ করেছিলেন। ওদিকে ভুক্তভোগী পরিবার অপরাধীকে ক্ষমা করবে কী, ভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। একই দিনে ঘটা আরেকটি খবর, পাবনার সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার। মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ত। এ ক্ষেত্রে ধর্ষক ও হত্যাকারী অন্য কেউ নয়, মেয়েটির আপন চাচাতো ভাই। তাদের ভেতর নাকি প্রেমের সম্পর্ক ছিল; তবে মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির কথা-কাটাকাটি হয় এবং তারই পরিণতিতে চাচাতো ভাইটি তাকে প্রথমে ধর্ষণ, পরে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। অবশেষে বস্তাবন্দি অবস্থায় লাশটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে আসে। সকালবেলা কয়েকজন কৃষক কাজে যাওয়ার সময় একটি ভাসমান বস্তা দেখতে পান; খুলে দেখেন ভেতরে একটি মৃতদেহ। প্রধান অভিযুক্তসহ তিনজন তরুণকে এবং তাদের ব্যবহৃত মোটরগাড়িটিকে যে আটক করা হয়েছে, পুলিশের সেই সাফল্যের কথাও অবশ্য সংবাদ বিবরণীটিতে রয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে মে মাসে ৮৩টি ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই শিশু।

শিশুরা নিরাপদে নেই এমনকি তাদের স্কুলেও। ঢাকারই এক স্কুলে—ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার নাম, আত্মহত্যা করেছে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুননাহার। আত্মহত্যার কারণ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তাকে শুধু নয়, তার মাকেও স্কুলে ডেকে এনে ভীষণ রকমের অপমান করেছেন। সাবিকুনের অপরাধ, প্রস্তুতির অভাবে মডেল টেস্ট পরীক্ষার খাতায় সে কিছু লিখতে পারছিল না, বসে বসে আঁকাজোখা করছিল। সেটি দেখতে পেয়ে এক শিক্ষিকা তাকে তার খাতাসহ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান। চেয়ারম্যান ছাত্রীটিকে গালমন্দ তো করেনই, তার মাকে ডেকে এনে তার সামনেই মেয়েটিকে কান ধরে স্কুল ক্যাম্পাসে ঘোরানোর ব্যবস্থা নেন। নিজের এবং মায়ের অপমানে বিদ্ধ হয়ে সাবিকুননাহার বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেছে।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাজধানী ঢাকায় সুপেয় পানির সংকট

ড. হারুন রশীদ

রাজধানী ঢাকায় সুপেয় পানির সংকট

ভোর ৫টা। অ্যালার্মে নয়, কলের শব্দে ঘুম ভাঙে ঢাকার অনেক পরিবারে। কারণ কখন পানি আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পানি এলেই বালতি, ড্রাম, বোতল, যা আছে সব ভরে রাখতে হয়। কোনো কোনো বাসায় রাত ২টায় মোটর চালু করা হয়। কারণ ওই সময়ই নাকি একটু বেশি চাপ পাওয়া যায়। যে শহরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, সেই শহরের হাজারো মানুষ আজও পানির অপেক্ষায় দিন শুরু করে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আর মৌলিক নাগরিক অধিকার নয়, বরং ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শহর আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা উঁচু ভবনের গর্ব করে, সেই শহরের বহু মানুষ প্রতিদিন পানির জন্য সংগ্রাম করে। উন্নয়নের এই বৈপরীত্য আমাদের নগর পরিকল্পনার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।

ঢাকার পানিসংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শিতার ফল। রাজধানীর জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সেভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। একদিকে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে, অন্যদিকে একই পুরনো পাইপলাইন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে লাখো মানুষকে।

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের পরিস্থিতি এই সংকটকে আরো স্পষ্ট করেছে। মেট্রো রেল চালুর পর এলাকাটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা। কিন্তু পানির উৎপাদন ও সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে উন্নত যোগাযোগের সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে মানুষ পড়েছে আরেক মৌলিক সংকটে।

এই ঘটনাটি শুধু মিরপুরের নয়, এটি পুরো ঢাকার উন্নয়ন দর্শনের এক প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রায়ই অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের সমার্থক মনে করি। কিন্তু একটি শহর শুধু রাস্তা, সেতু বা রেলপথ দিয়ে টিকে থাকে না। একটি শহর টিকে থাকে পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর। এই মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে চকচকে উন্নয়নও খুব দ্রুত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

বিশ্বের বেশির ভাগ মহানগর এখন পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট হবে নিরাপদ পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের কারণে এই চাপ আরো বাড়বে।

ঢাকার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ আরো গভীর। রাজধানীর পানির বড় অংশ এখনো ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। যে পানি হাজার বছর ধরে মাটির নিচে জমা হয়েছে, তা আমরা কয়েক দশকেই শেষ করে ফেলছি। প্রকৃতি যে গতিতে সেই ভাণ্ডার পূরণ করতে পারে, আমরা তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুত তা খালি করছি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলাধার ধ্বংসের প্রবণতা। একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাভূমি ছিল। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানি ধারণ করত না, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আজ সেই জলাধারের বড় অংশই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাছে, মাটির নিচে পৌঁছতে পারছে না।

পানিসংকটের আরেকটি দিক খুব কম আলোচিত হয়। সেটি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা গভীর নলকূপ বসায়, জারজাত পানি কেনে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সামনে সেই সুযোগ থাকে না। ফলে একই শহরে কেউ দিনে ২৪ ঘণ্টা পানি পায়, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এক বালতি পানি সংগ্রহ করতে পারে না। এটি শুধু সেবার বৈষম্য নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।

বিশ্বের অনেক শহর এই সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর চারটি উেসর ওপর নির্ভর করে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে—বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহৃত পানি, আমদানি করা পানি এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহার। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কার্যত বাধ্যতামূলক। জাপানের টোকিওতে পাইপলাইনের পানির অপচয় পৃথিবীর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সংকটের সমাধান প্রযুক্তিতে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সুশাসনেও।

বাংলাদেশের জন্যও এখন নতুন চিন্তার সময় এসেছে। শুধু নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণ করলেই হবে না। সমন্বিত নগর জলনীতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি নতুন আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানি সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বড় ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা আইনগতভাবে নিশ্চিত করা দরকার। পাইপলাইনের লিকেজ কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদীর পানি শোধনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে নগর উন্নয়নের দর্শনেও পরিবর্তন জরুরি। ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প নগর, পরিকল্পিত উপশহর এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দেশের সব সুযোগ-সুবিধা যদি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে পানি থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক সেবার সংকট আরো তীব্র হবে।

নাগরিকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রায়ই পানি অপচয় করি, কল খোলা রেখে দিই, লিকেজ মেরামত করি না, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা ভাবি না। অথচ পানি সাশ্রয় এখন শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

ঢাকার পানিসংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। উন্নয়ন মানে শুধু দৃশ্যমান স্থাপনা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা। একটি শহরের সাফল্য মাপা উচিত তার উঁচু ভবনের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ কত সহজে নিরাপদ পানি, নির্মল বাতাস এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন পাচ্ছে, তা দিয়ে।

আমরা যদি আজও এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই, তাহলে ভবিষ্যতের ঢাকা আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। তখন হয়তো পানির জন্য সামাজিক সংঘাতও সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি হবে সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ। সেই বাস্তবতায় এখনই পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

একটি সভ্য শহর তার নাগরিককে আকাশছোঁয়া ভবনের প্রতিশ্রুতি দেয় না, দেয় নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। সেই নিশ্চয়তার প্রথম শর্তই হলো বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পানি। ঢাকার উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণ হবে, যখন কোনো নাগরিককে ভোররাতে কলের সামনে দাঁড়িয়ে পানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় সেখানেই।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

সালতামামি এবং নতুন বছরের সম্ভাবনা | কালের কণ্ঠ