সাধারণত পরিণত বয়সে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও এখন শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ প্রবণতা বেড়েই চলছে। কারো আত্মহত্যাই কাম্য নয়, তবে শিশুদের আত্মহনন আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। পরিণত বয়সে মানসিক চাপ, আর্থিক অনটন, দীর্ঘদিনের রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু একজন শিশু কিংবা কিশোর, যার নেই কোনো আর্থিক সংকট কিংবা টানাপড়েন, নেই কোনো মানসিক চাপ, তাকে কেন আত্মহননের মতো পথ বেছে নিতে হবে। সিলেটে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সম্প্রতি আত্মহত্যা করে। ঠিক কয়েক মাস আগে একই বিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষার্থীও আত্মহত্যা করে এবং বিষয়টি তখন বেশ আলোচনা সৃষ্টি করে। অভিযোগের ভিত্তিতে তখন ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অপসারণও করা হয়। এমন ঘটনা প্রায়ই আমাদের সমাজে ঘটছে। অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মতো আত্মহত্যার প্রবণতাকে আমরা কোনোভাবেই অবহেলা কিংবা ছোট করে দেখতে পারি না। যে শিশু কিংবা কিশোরটি আজ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল, তার সম্ভাবনাকে আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলছি। শিশুটি ইংরেজিতে একটি সুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত সুইসাইড নোট লিখে গেছে, যা তার মেধার বহিঃপ্রকাশ বটে। মোটাদাগে আমরা বলতে পারি, এমন একটি পরিবেশ আমরা তাদের জন্য তৈরি করি, যেখানে তারা বাধ্য হয়ে, আবেগে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের আত্মহত্যার জন্য আমরা তাদের কোনোভাবেই দায়ী করতে পারি না। কেননা
তারা নিরপরাধ এবং তাদের ব্যক্তিগত কোনো অপর্যাপ্ততার জন্য তারা এ কাজ করতে পারে না। দুটি দৃষ্টিভঙ্গিতে শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আর দুই. পরিবারকেন্দ্রিক। শিশুরা একটি নির্দিষ্ট এবং বড় সময় বিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং আড্ডায় সময় কাটে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি কারিকুলাম থাকে, থাকে নির্দিষ্ট কাজ, ক্লাসে অংশগ্রহণ, পড়ালেখা বিনিময় এবং এর ভিত্তিতে একাডেমিক মূল্যায়ন। পাশাপাশি তার আচার-আচরণেরও মূল্যায়ন হয়। এ কাজের মধ্যে রয়েছে সম্পর্ক, যেটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রধানত আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে থাকে। পড়ালেখার জন্য এই সম্পর্ক যদি কোনো ঘাটতি কিংবা মনোমালিন্য তৈরি করে এবং তা যদি তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষার্থীদের মন কোমল এবং অনেক কিছুই তারা সহজভাবে নিতে পারে না। শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে পারা হলো শিক্ষকের বড় কাজ। তাদের প্রতি যেমন খুব কঠোর হওয়া যাবে না, তেমনি হেলায় গা ভাসিয়েও দেওয়া যাবে না। কোমল মনে তাদের উপযোগী ব্যবহার তাদের সঙ্গে করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা হয়তো ক্লাসে বসেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। আড্ডার ছলে হয়তো কারো সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকদের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা এবং সমাধানের চেষ্টা করা।
একটি নির্দিষ্ট সময় আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে থাকলেও তাদের বেশি সময় কাটে পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের ধরন এবং পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবর্তিত সমাজকাঠামোর কারণে আমাদের পরিবারের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই বিভিন্ন ধরনের পরিবারে শিশুদের বসবাস। কেউ একক, কেউ যৌথ, কেউ সিঙ্গল মা-বাবা, আবার অনেকে সত্বাবা কিংবা মা দ্বারা পরিবারে মানুষ হচ্ছে। একেক ধরনের পরিবারে শিশুদের বিকাশ একেক রকম হয়। আবার এমনও হয়, যেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক, কিন্তু অযত্ন আর অবহেলার কারণে আমাদের শিশুরা মানসিক কষ্ট অনুভব করে। বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ কোনোটির জন্য শিশু-কিশোরদের আমরা দায়ী করতে পারি না। আমরা যেখানেই যে পরিবেশ দেব, তারা সেই পরিবেশেই মানুষ হবে। কাজেই শিশুদের একটি উন্নত ও সুন্দর পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। অনেক ক্ষেত্রে আমরাই তাদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী। আমাদের এ ক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে। শিশুদের জন্য একটি ভালো বিদ্যালয়ের পরিবেশ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব, যেখানে শিক্ষকরা হবেন প্রতিটি শিশুর অভিভাবক। শিক্ষার্থীদের পরম মমতা ও স্নেহ দিয়ে মানুষ করতে হবে। সঙ্গে শাসনও থাকতে হবে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শিশুর মনোজগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে বোঝা একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত দুইবার অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশ করতে হবে। এর বাইরেও প্রয়োজন মনে করলে শ্রেণিশিক্ষক অভিভাবকদের ডেকে কথা বলতে পারেন। খোলামেলা কথা বললে অনেক সমাধান বের হয়ে আসবে। শিক্ষার্থীদের শাসনের পাশাপাশি কাউন্সেলিং করতে হবে। তাদের নিয়মিত পড়াশোনা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আচার-আচরণও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনোভাবেই তাদের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাবে না। পরিবার হলো সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারে থাকবে অনেক ধরনের সমস্যা। কিছু সমস্যা আর্থিক, আবার অনেক সমস্যা সামাজিক ও মানসিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। কিছুতেই শিশুদের পরিবারের কোনো সংকট এবং টানাপড়েনে যুক্ত করা যাবে না। নিজেদের মধ্যে যতই সমস্যা থাকুক না কেন, শিশুরা থাকবে তা থেকে মুক্ত। একটি সুন্দর পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের নিজেদের সমস্যার জন্য শিশুদের জীবন নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। শিশুদের চাহিদা ও প্রয়োজন, তা প্রাত্যহিক হোক কিংবা গুণগত সময় কাটানো হোক, অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের শিশুরা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার হচ্ছে। আবার আমাদের কারণেই তারা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। আমরা চাই প্রতিরোধ, আর এর জন্য আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট



একই দিনের আরেকটি খবর, রাজধানীর উত্তর মুগদাপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেন শুভর (৪৫) অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের। কোনো কোনো পত্রিকা এই খবরটিকে নূরজাহান বেগমের খবরকে পাশাপাশি রেখেছে—নূরজাহান বেগমের খবরকে বড় করে দিয়ে, তানভীর হোসেন শুভর খবরটি কিছুটা ছোট আকারে সাজিয়ে। শুভর তো বস্তুগত কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করতেন, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পৈতৃক গৃহে থাকার কথা নিরাপদ আশ্রয়ে, কিন্তু তিনি একাকী থাকতেন একটি ভাড়া বাসায়। বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল বছর দশেক আগে। মরণের সাধ তো মানুষের এমনি এমনি হয় না, নিশ্চয়ই অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন হতাশায়। হতাশাও একটি রোগ বটে; জীবনের ওপর সে ছায়া ফেলে এবং মৃত্যুকে সুযোগ করে দেয় ওত পেতে থাকতে, সুযোগের অপেক্ষায়। 
