মোদ্দাকথা হচ্ছে, সমাজ মোটেই সুস্থ অবস্থায় নেই। ৩ জুনের সব কটি জাতীয় দৈনিকে একটি খবর খুব গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে, যেটির মূল ঘটনা উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত তিন পুত্র ও এক কন্যার জননী নূরজাহান বেগমের অপমৃত্যু। না, কেউ তাঁকে খুন করেনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫, ঢাকার মিরপুর এলাকায় একাকী থাকতেন একটি কামরায়, সেই কামরায়ই শয্যাশায়ী অবস্থায় মারা গেছেন। পাশের কামরায়ই থাকেন তাঁর কন্যা, যিনি উচ্চশিক্ষিতা, সাত বছর আগে যিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন, বিধবা এবং নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি তাঁর মাকে নিজের ফ্ল্যাটে এনে রেখেছেন, খাবার পৌঁছে দিতেন মায়ের কামরায়, কিন্তু মায়ের স্বাস্থ্যের তেমন একটা খবর রাখতেন না, মা যে বেঁচে নেই, সেটিও তিনি টের পেয়েছেন নাকি দিন দুয়েক পরে, মায়ের ঘরে কোনো সাড়াশব্দ নেই দেখে। মেয়ে ভেবেছিলেন মা বুঝি অসুস্থ, তাই নার্সিং হোম থেকে একজন নার্সকে ডেকে এনেছিলেন; নার্সটি কামরার ভেতর ঢুকে দেখেন নূরজাহান বেগম অসুস্থ নন, মৃত; শুধু মৃত নন, তাঁর দেহে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ৯৯৯ নম্বরে খবর দিলে পুলিশের লোকজন এসে মৃত দেহটি উদ্ধার করে। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, নূরজাহান বেগমকে তাঁরা দেখেননি এবং তাঁর কন্যা মহিলাটিও, যিনি একটি স্কুলের শিক্ষিকা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশতেন না; কারো কারো ধারণা, মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একটি পত্রিকা শিরোনাম দিয়েছে এই ভাবে, ‘সন্তানের অবহেলায় রত্নগর্ভা মাতার মৃত্যু’। তা অনেক প্রকার মন্তব্যই করা যাবে বৈকি, কিন্তু মূল সত্যটি হলো এই যে ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে এবং সবকিছুর আগে সেটি এই বাস্তবিকতাকেই তুলে ধরে যে আমাদের এই ‘উন্নত’ সমাজে ঘনিষ্ঠতম মানবিক সম্পর্কগুলোও এখন আর অক্ষত নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ সমাজে মানুষের পক্ষে সুস্থ থাকা তো অবশ্যই, টিকে থাকাটাও চ্যালেঞ্জের মুখে গিয়ে পড়েছে। আট বছরের শিশু রামিসা তাই ৩০ উত্তীর্ণ বিবাহিত প্রতিবেশী পশুকেও-ছাড়িয়ে যাওয়া যুবকের নৃশংসতার শিকার হয়; ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগমের খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হন তাঁরই আদর-যত্নে মানুষ হওয়া সমাজে সম্মানিত সন্তানরা।
একই দিনের আরেকটি খবর, রাজধানীর উত্তর মুগদাপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেন শুভর (৪৫) অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের। কোনো কোনো পত্রিকা এই খবরটিকে নূরজাহান বেগমের খবরকে পাশাপাশি রেখেছে—নূরজাহান বেগমের খবরকে বড় করে দিয়ে, তানভীর হোসেন শুভর খবরটি কিছুটা ছোট আকারে সাজিয়ে। শুভর তো বস্তুগত কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করতেন, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পৈতৃক গৃহে থাকার কথা নিরাপদ আশ্রয়ে, কিন্তু তিনি একাকী থাকতেন একটি ভাড়া বাসায়। বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল বছর দশেক আগে। মরণের সাধ তো মানুষের এমনি এমনি হয় না, নিশ্চয়ই অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন হতাশায়। হতাশাও একটি রোগ বটে; জীবনের ওপর সে ছায়া ফেলে এবং মৃত্যুকে সুযোগ করে দেয় ওত পেতে থাকতে, সুযোগের অপেক্ষায়।
এক পাষণ্ডের হাতে শিশু রামিসার মৃত্যু, সচ্ছল সন্তানদের উপেক্ষায় নূরজাহান বেগমের গলিত লাশে পরিণত হওয়া, নিঃসঙ্গতার বোঝা বহন করতে অসমর্থ হয়ে তানভীর হোসেন শুভর আত্মহত্যা—ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন অবশ্যই, কিন্তু আরো বহু মর্মন্তুদ ঘটনার সঙ্গে এই তিনটিও একই বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত, সেটি হলো পুঁজিবাদী সমাজে উন্নতির গভীরে মানবিক বিপর্যয়।
কন্যাশিশু ধর্ষণের নিত্যনতুন খবর এড়ানোর উপায় থাকে না, প্রত্যহ পাওয়া যায়। ২৫ মের একটি দৈনিকের খবর, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে সাতটি শিশু ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার’। সাত শিশু ধর্ষণের ওই ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনটির বিবরণ অন্য একটি পত্রিকায় এসেছে এই ভাবে—১. গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা এক যুবকের গ্রেপ্তার হওয়ার। ২. রাজধানীর ভাসানটেকে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা, কারাগারে রিকশাচালক; শিশুটি নিজেদের বাড়ির কাছে খেলছিল, রিকশাচালক তাকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে। ৩. ছয় বছরের শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ, লাকসামে। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে, ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিকমহল থেকে। থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিটিকে (বয়স তাঁর ৭৩) গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। খবর তিনটি পড়লে মনে হবে তিনটি শিশু পাশাপাশি শায়িত রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার হাতে চরম নৃশংসতায় নিপীড়িত হয়ে। সব ঘটনাই যে প্রকাশ পায় তা তো নয়, সামাজিক সম্ভ্রম হারানোর আতঙ্কে পারতপক্ষে মা-বাবা থানায় যান না। তা ছাড়া থানা নিরাপদও নয়, সেখানে গেলে অপমানিত হওয়ার শঙ্কাও থাকে।
ওই দিনের শিশু ধর্ষণের অপর একটি ঘটনার বিবরণ এই রকমের—নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নিজেদের বাড়ির কাছেই বিকেলবেলায় শিশুটি খেলছিল, হিরো ও সোহেল নামের দুই যুবক কৌশলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। আর্তনাদ শুনে স্থানীয় লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করে; সোহেল পালিয়ে যায়, জনতা হিরোকে আটক করে এবং পিটুনি দেয়। শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সীগঞ্জ হাসপাতালে, অবস্থার অবনতি ঘটলে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যালে। জনতার হাত থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় হিরোকে উদ্ধার করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশের প্রয়োজন পড়ে। থানায় গিয়ে রাতেই মামলা করেন শিশুটির মা। ওই একই অপরাধে জনতার হাতে ধরা পড়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মসজিদের এক ইমাম এবং জনতা যথারীতি তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছে।
জনতা যে অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শায়েস্তা করে তার কারণ দুটি। প্রথমত, তাদের ক্রোধ; দ্বিতীয়ত, পুলিশের ওপর তাদের অনাস্থা। জনতা মনে করে, পুলিশ এসে অপরাধীকে উদ্ধার করবে এবং থানায় গিয়ে সে উকিল লাগিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে এবং অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাবে। শাস্তিটা তাই নগদানগদি মিটিয়ে ফেলাই ভালো।
লিখতে লিখতেই পত্রিকায় পড়লাম কন্যাশিশু ধর্ষণের আরেক খবর। সেটি একটু ভিন্ন মাত্রার। শিরোনামটি এই রকমের—‘শিশু ধর্ষণের শাস্তি একটি থাপ্পড় ও ক্ষমা প্রার্থনা’। ভেতরের খবর বলছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বেলালকে একটি থাপ্পড় দিয়ে ভুক্তভোগীর বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে এবং পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় করা মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। রায়টি এসেছে পৌর বিএনপির সেক্রেটারির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সালিশি বৈঠক থেকে। বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ চকোলেটের লোভ দেখিয়ে সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণের। অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই ধরনের কাজে নাকি অনভ্যস্ত নন; এর আগে তিনি নিজের ভাবিকে, এমনকি পুত্রবধূকেও আক্রমণ করেছিলেন। ওদিকে ভুক্তভোগী পরিবার অপরাধীকে ক্ষমা করবে কী, ভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। একই দিনে ঘটা আরেকটি খবর, পাবনার সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার। মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ত। এ ক্ষেত্রে ধর্ষক ও হত্যাকারী অন্য কেউ নয়, মেয়েটির আপন চাচাতো ভাই। তাদের ভেতর নাকি প্রেমের সম্পর্ক ছিল; তবে মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির কথা-কাটাকাটি হয় এবং তারই পরিণতিতে চাচাতো ভাইটি তাকে প্রথমে ধর্ষণ, পরে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। অবশেষে বস্তাবন্দি অবস্থায় লাশটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে আসে। সকালবেলা কয়েকজন কৃষক কাজে যাওয়ার সময় একটি ভাসমান বস্তা দেখতে পান; খুলে দেখেন ভেতরে একটি মৃতদেহ। প্রধান অভিযুক্তসহ তিনজন তরুণকে এবং তাদের ব্যবহৃত মোটরগাড়িটিকে যে আটক করা হয়েছে, পুলিশের সেই সাফল্যের কথাও অবশ্য সংবাদ বিবরণীটিতে রয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে মে মাসে ৮৩টি ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই শিশু।
শিশুরা নিরাপদে নেই এমনকি তাদের স্কুলেও। ঢাকারই এক স্কুলে—ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার নাম, আত্মহত্যা করেছে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুননাহার। আত্মহত্যার কারণ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তাকে শুধু নয়, তার মাকেও স্কুলে ডেকে এনে ভীষণ রকমের অপমান করেছেন। সাবিকুনের অপরাধ, প্রস্তুতির অভাবে মডেল টেস্ট পরীক্ষার খাতায় সে কিছু লিখতে পারছিল না, বসে বসে আঁকাজোখা করছিল। সেটি দেখতে পেয়ে এক শিক্ষিকা তাকে তার খাতাসহ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান। চেয়ারম্যান ছাত্রীটিকে গালমন্দ তো করেনই, তার মাকে ডেকে এনে তার সামনেই মেয়েটিকে কান ধরে স্কুল ক্যাম্পাসে ঘোরানোর ব্যবস্থা নেন। নিজের এবং মায়ের অপমানে বিদ্ধ হয়ে সাবিকুননাহার বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেছে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




