• ই-পেপার

বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধস : একটি সতর্কবার্তা

  • সুমিত বণিক

দেশের নৌপথ সংস্কারের উদ্যোগ জরুরি

মুস্তফা নঈম

দেশের নৌপথ সংস্কারের উদ্যোগ জরুরি

ষাটের দশকের মধ্যভাগেও দেশের নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য মাত্র পাঁচ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সেটি আরো কমে গিয়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৬৫ কিলোমিটারে। বিগত ৬৫ বছরে দেশের নৌপথ কমেছে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার।

নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নৌপথ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ডুবোচরে আটকা পড়ছে বহু পণ্যবাহী নৌযান। এতে দেশের অর্থনীতির বহুমুখী ক্ষতি হচ্ছে। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রতিবছর প্রায় ৫০ থেকে ৫৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়, যা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। সড়ক ও রেলপথের তুলনায় পণ্য পরিবহনে খরচ প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কম হওয়ায় ভারী পণ্য, সার, জ্বালানি এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে কাঁচামাল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হলো এই নৌপথ।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি লাইটার জাহাজ সারা দেশে পণ্য পরিবহন করে থাকে। অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় পণ্য পরিবহনের জন্য দুই হাজারের বেশি কার্গো এবং হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। নদীপথে কি শুধু পণ্য পরিবহন হয়? বহু মানুষের পছন্দ এই নৌপথ। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ভোলা-বরিশাল-পটুয়াখালী ছাড়াও চাঁদপুর অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত নৌপথে যাতায়াত করে থাকে। এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। একসময় চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া হয়ে ভোলা ও বরিশাল রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল করত। পরবর্তী সময়ে ডুবোচর ও নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

দেশের নৌ রুটের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় নৌ রুট চিহ্নিতকরণ, পুরনো রুটগুলো ড্রেজিং করে সচল করতে ২০১৮ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্ল্যান বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১১ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সে সময় এই কমিটি নৌপথ চিহ্নিতকরণের মাস্টারপ্ল্যানের একটি ধারণাপত্র জমা দেয়। ধারণাপত্রে ৪৯১টি নদী চিহ্নিত করা হয়। এসব নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দেশের নৌপথকে ১৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছিল। ৪৯১টি নদীর মধ্যে ১৭৮টি নদী রক্ষণাবেক্ষণ ও নৌপথ উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব ছিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদীসহ ৩৩১টি নদীর নৌপথের উন্নয়ন তত্ত্বাবধানের। গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠিত ১১ সদস্যের কমিটিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কমিটির প্রধান রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, নদীপথ উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যানের প্রায় ৩৪ বছর আগে দেশের নৌ রুট নির্ণয়, নৌ রুটের সংস্কারসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে ১৯৮৪ সালে সর্বশেষ জরিপ হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় তিন বছর মেয়াদি ওই জরিপ কার্যক্রম শেষ হয় ১৯৮৭ সালে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রথম জরিপ কার্যক্রম। আশির দশকের দিকে হাইওয়ে, হাইওয়ের সঙ্গে জেলার সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থায় সড়ককে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী নদীপথের গুরুত্বকে অবহেলা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, গত ৩৪ বছরে দেশের নদী ও নৌপথের বিস্তারিত জরিপ হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএ দেশের নৌ রুটগুলো সচল রাখার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছু নদীপথের জরিপ ও ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়কপথের চেয়ে কম খরচে পণ্য পরিবহনের জন্য উপযুক্ত এই যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘ সময় অবহেলিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ পুনরায় চালু, নতুন নৌপথ সৃষ্টি, নৌ রুট বৃদ্ধিসর্বোপরি নৌপথের সুরক্ষার জন্য একটি ধারণাপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। ধারণাপত্রে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করতে বিভিন্ন নদী ও নৌপথের ড্রেজিংয়ের জন্য একটি মডেল তৈরি এবং ড্রেজিং কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয় সেই বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও জরুরি ভিত্তিতে কতটি নদী পরিকল্পনায় আনা হবে, তা-ও উল্লেখ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের নদীতে প্রকৃতিগতভাবেই পলি জমতে থাকে। অতিপলির কারণে দেশের নৌপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মাঝে মাঝে চর জেগে ওঠে। পৃথিবীর যেসব নদী পলি তৈরি করে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলি প্রবাহিত হয় পদ্মা দিয়ে। প্রবহমান এই পলির কিছু পরিমাণ জমতে জমতে একসময় চর জেগে ওঠে।

বিআইডব্লিউটিএর তথ্যানুসারে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। এ ছাড়া ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা একলাফে কয়েক লাখ বৃদ্ধি পায়। সারা বছর এই সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর স্বাভাবিক সময়ে নৌপথের যাত্রীসংখ্যা প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রায় ৫০টির মতো লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন রুটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং সমপরিমাণ লঞ্চ ঢাকায় প্রবেশ করে। ঈদের ছুটিসহ যেকোনো উৎসবে লম্বা সরকারি ছুটি হলে নৌপথে যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পায়, তা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখে পৌঁছায়।

নদীপথ সুরক্ষায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর যে পরিকল্পনা এর আগে গৃহীত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে আশা করছি।

লেখক : সাংবাদিক

ধান গবেষণার নতুন সমীকরণ চাই টেকসই উদ্ভাবন ব্যবস্থা

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

ধান গবেষণার নতুন সমীকরণ চাই টেকসই উদ্ভাবন ব্যবস্থা

বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) একটি বিশেষ নাম। এই প্রতিষ্ঠান শুধু ধানের জাত উদ্ভাবন করেনি, বরং একটি খাদ্যঘাটতির দেশকে ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তার শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল দুর্ভিক্ষ, খাদ্যঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। আজ জনসংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও দেশের প্রধান খাদ্য ভাতের জোগান মোটামুটি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে কৃষকের পরিশ্রম, সম্প্রসারণকর্মীর ভূমিকা, নীতিনির্ধারণী সহায়তা এবং সর্বোপরি ব্রির দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অবদান রেখেছে।

ব্রির ধান গবেষণার গত পাঁচ দশকের পথচলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গবেষণার লক্ষ্য এক জায়গায় থেমে থাকেনি। সত্তরের দশকে প্রধান লক্ষ্য ছিল আধুনিক উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন। সে সময় লম্বা, ঢলে পড়া ও কম ফলনশীল স্থানীয় জাতের পরিবর্তে খাটো গাছ, বেশি কুশি, সারের প্রতি ভালো সাড়া এবং বেশি ফলনএসব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আধুনিক জাত কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। আশির দশকে গবেষণা আরো বিস্তৃত হয় মৌসুম ও পরিবেশ ভিত্তিক অভিযোজনের দিকে। নব্বইয়ের দশকে ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯-এর মতো মেগাজাত বোরো মৌসুমের উৎপাদনে বিপ্লব ঘটায়। এগুলো শুধু জাত ছিল না, এগুলো ছিল জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার স্তম্ভ।

ধান গবেষণার নতুন সমীকরণ চাই টেকসই উদ্ভাবন ব্যবস্থাপরবর্তী সময়ে ব্রির গবেষণা আরো জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। শুধু ফলন বাড়ালেই চলবে নাএই উপলব্ধি ক্রমে শক্তিশালী হয়। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা, হাওরে আগাম বন্যা ও ঠাণ্ডা, বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলমগ্নতা, চরাঞ্চলে অনিশ্চিত মাটি-পানি পরিবেশএসব সমস্যার জন্য এক ধরনের জাত যথেষ্ট নয়। ফলে ব্রির গবেষণায় আসে লবণসহনশীল, খরাসহনশীল, জলমগ্নতা সহনশীল, ঠাণ্ডাসহনশীল, রোগপ্রতিরোধী ও স্বল্পমেয়াদি জাত। সাম্প্রতিক সময়ে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও বাজারের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দস্তাসমৃদ্ধ চাল, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের চাল, উচ্চ প্রোটিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ কালো চাল, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের চালএসব এখন ধান গবেষণার নতুন বাস্তবতা।

তবে এই অর্জনের মধ্যেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই কি আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? উত্তরটি সরল নয়। কারণ এখনকার কৃষি আগের কৃষি নয়। কৃষিজমি কমছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। কৃষি শ্রমিকের সংকট আছে। একই সঙ্গে মাটির জৈব পদার্থ কমছে, সারের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, কীটনাশক ও আগাছানাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কাজেই ধান গবেষণাকে এখন আরো সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে।

একটি উচ্চ ফলনশীল জাত মাঠে ভালো ফলন দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই জাতের জন্য বেশি পুষ্টি প্রয়োজন হয়, অথচ কৃষক শুধু ইউরিয়া প্রয়োগ করেন এবং পটাশ, ফসফরাস, সালফার, দস্তা বা জৈব পদার্থ উপেক্ষা করেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে মাটির উর্বরতা কমে যেতে পারে। তখন জাতের দোষ নয়, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি উৎপাদনের স্থায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একইভাবে একটি জাত গবেষণা প্লটে ভালো ফলন দিলেও যদি কৃষকের জমিতে রোগ, পোকা, আগাছা, পানিসংকট বা বাজার অনাগ্রহের কারণে গ্রহণযোগ্যতা না পায়, তবে সেটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

এই কারণে ভবিষ্যতের ধান গবেষণার মূল্যায়ন শুধু প্রতি হেক্টরে কত টন দিয়ে করা যথেষ্ট নয়। ফলন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে দেখতে হবে ফলনের স্থায়িত্ব, মাটির স্বাস্থ্য, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবহার দক্ষতা, রোগ-পোকা প্রতিরোধ, জলবায়ুসহনশীলতা, বীজপ্রাপ্যতা, কৃষকের লাভ এবং ভোক্তার চাহিদা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সাফল্য হবে একটি সমন্বিত সূচকে, যেখানে জিনেটিক উন্নয়ন, পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও কৃষক-অর্থনীতি একসঙ্গে বিবেচিত হবে।

এই ভাবনাকে সহজভাবে বলা যায়ধান গবেষণার নতুন সমীকরণ। আগে সমীকরণটি ছিল : নতুন জাত মানে বেশি ফলন। এখন সমীকরণটি হওয়া উচিত : নতুন জাত + সুস্থ মাটি + সুষম সার + সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা + সমন্বিত বালাই দমন + ভালো বীজ + বাজার + কৃষকের আস্থা। এই সমন্বিত ব্যবস্থাই আগামী দিনের প্রকৃত ধান উদ্ভাবন ব্যবস্থা।

মাটির স্বাস্থ্য এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। উচ্চ ফলনশীল বা হাইব্রিড জাত যত বেশি উৎপাদন করে, জমি থেকে তত বেশি পুষ্টি উপাদান সরিয়ে নেয়। ধান শুধু নাইট্রোজেন নেয় না; পটাশ, ফসফরাস, সালফার, দস্তাসহ বিভিন্ন উপাদানও প্রয়োজন। আবার খড় জমি থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে পুষ্টির ক্ষয় আরো বাড়ে। তাই প্রতিটি বড় জাতের সঙ্গে থাকা উচিত একটি মাটি-স্বাস্থ্য পাসপোর্ট। সেখানে উল্লেখ থাকবে : ওই জাত কত পুষ্টি গ্রহণ করে, কোন জমিতে কী মাত্রার সার দরকার, জৈব পদার্থ কতটুকু ফেরত দিতে হবে, কোন ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হতে পারে এবং কোন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ মেয়াদে মাটির উৎপাদনক্ষমতা বজায় থাকবে।

ছত্রাকনাশক, কীটনাশক ও আগাছানাশকের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া জরুরি। অপ্রয়োজনে বা আগাম কীটনাশক প্রয়োগ করলে অনেক সময় উপকারী পোকা মারা যায়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং গৌণ পোকা প্রধান ক্ষতিকর পোকার রূপ নিতে পারে। বারবার একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করলে পোকা প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। একইভাবে একই আগাছানাশক বারবার ব্যবহার করলে আগাছার গঠন বদলায় এবং হার্বিসাইড (আগাছানাশক) প্রতিরোধী আগাছার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই ভবিষ্যতের গবেষণা হতে হবে রাসায়নিক প্রথম নয়, নজরদারি প্রথম। আগে মাঠে পর্যবেক্ষণ, পরে অর্থনৈতিক ক্ষতিসীমা বিচার, তারপর প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, প্রতিরোধী জাত, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত প্রকৌশল এবং ডিজিটাল সতর্কবার্তাএসবকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো একক মেগাজাতের অতিবিস্তার। কোনো একটি জাত দীর্ঘদিন বিশাল এলাকায় এককভাবে চাষ হলে উৎপাদনব্যবস্থা এক ধরনের জিনেটিক ঝুঁকিতে পড়ে। নতুন রোগ বা পোকা দেখা দিলে বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই অঞ্চলভিত্তিক জাতবৈচিত্র্য প্রয়োজন। একই অঞ্চলে একই মৌসুমে কয়েকটি উপযোগী জাতের পরিকল্পিত বিস্তার থাকলে ঝুঁকি কমে। এটি এক ধরনের জৈবিক বীমা। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য শুধু মোট উৎপাদন নয়, উৎপাদনের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রির ভবিষ্যৎ গবেষণায় আধুনিক বিজ্ঞানকে আরো দ্রুত প্রয়োগ করতে হবে। জিনোমিক নির্বাচন, জিন পিরামিডিং, মার্কার সহায়ক নির্বাচন, স্পিড ব্রিডিং, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফেনোটাইপিং, জিন সম্পাদনা, ফসল মডেলিং এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্য ব্যবস্থাএসব শুধু ল্যাবরেটরির বিষয় নয়, এগুলো মাঠের সমস্যা দ্রুত সমাধানের উপায়। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষক-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে যুক্ত করতেই হবে। কারণ গবেষণা প্লটে সফল জাত কৃষকের জমিতে, মিলারের মিলে এবং ভোক্তার হাঁড়িতে সফল না হলে তার গ্রহণযোগ্যতা সীমিত থাকবে।

এখন সময় এসেছে একটি ব্রি ধান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এই ব্যবস্থায় মৌসুমভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হবেকোন জাত কত জমিতে আছে, কোথায় ফলন কমছে, কোথায় মাটির স্বাস্থ্য দুর্বল, কোথায় পোকা বাড়ছে, কোথায় লবণাক্ততা বা ঠাণ্ডা সমস্যা তীব্র হচ্ছে, কোথায় বীজসংকট আছে এবং কোন জাত বাজারে ভালো দাম পাচ্ছে। এ ধরনের তথ্যভিত্তিক গবেষণা পরিকল্পনা ব্রিকে আরো বাস্তবমুখী করবে।

বাংলাদেশের ধান গবেষণা একসময় খাদ্যঘাটতি মোকাবেলার বিজ্ঞান ছিল। এখন সেটি হতে হবে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, পরিবেশ ও কৃষকের লাভজনকতার বিজ্ঞান। ব্রির প্রথম ৫০ বছর আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে জাত উন্নয়ন একটি দেশের খাদ্যভাগ্য বদলাতে পারে। আগামী ৫০ বছর নির্ভর করবে আমরা সেই অর্জনকে কতটা টেকসই করতে পারি তার ওপর।

সুতরাং ধান গবেষণার নতুন বার্তা স্পষ্ট : শুধু নতুন জাত নয়, চাই নতুন ব্যবস্থাপনা দর্শন। জাতের সঙ্গে মাটি, পুষ্টি, পানি, বালাই, বীজ, বাজার ও কৃষকের সিদ্ধান্তকে একত্রে দেখতে হবে। কারণ আগামী দিনের প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন উচ্চফলন একই সঙ্গে হবে স্থিতিশীল, মাটি থাকবে সুস্থ, পরিবেশ থাকবে নিরাপদ, কৃষক থাকবেন লাভবান এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা থাকবে দীর্ঘ মেয়াদে সুরক্ষিত।

লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচার ও মহাপরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত) বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

ফুটবলপ্রেমী জাতির স্বপ্ন অপূর্ণ কেন

আরিফুর রহমান খাদেম

ফুটবলপ্রেমী জাতির স্বপ্ন অপূর্ণ কেন

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন রঙিন এক ফুটবলের রাজ্যে পরিণত হয়। অজপাড়াগাঁ থেকে শহর, অলিগলি থেকে ক্যাম্পাস, আকাশে-বাতাসে সর্বত্রই ফুটবল নিয়ে মাতামাতি চোখে পড়ে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের পতাকায় ছেয়ে যায় ছাদ, বারান্দা। রাত জেগে মানুষ খেলা দেখার পর সামাজিক মাধ্যমে চলে দিনভর তর্কবিতর্ক। এমনকি আমার ক্লাসে নিয়মিত অধ্যয়নরত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যেও এতটা উন্মাদনা আমি দেখি না। ফলে কিছু প্রশ্ন বারবার আমাদের আহত করেযে দেশে ফুটবল এত জনপ্রিয়, যেখানে এই খেলা নিয়ে বন্ধুত্বে ধরে ফাটল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হয় সিরিয়াস ঝগড়া-বিবাদ, সেই দেশের ফিফা র‌্যাংকিং ১৮১তম কেন? বিশ্বকাপ তো অনেক দূরের কথা, এশিয়ান কাপেও কেন এখনো নাম লেখাতে পারছে না বাংলাদেশ? কেন আমাদের ভাবতে হয়, মালদ্বীপ, ভুটান বা নেপালের সঙ্গে জয়লাভ করতে পারব কি পারব না?

বাংলাদেশের ফুটবলের সংকটের মূল কারণ প্রতিভার অভাব নয়, বরং প্রতিভা বিকাশের কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থার অভাব। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল উন্নয়নের ধারাবাহিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। স্কুল ফুটবল, জেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার যে কাঠামো প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় একটি কারণ। দেশের বহু এলাকায় এখনো মানসম্মত খেলার মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং আধুনিক ফুটবল একাডেমির অভাব রয়েছে। একসময় কিছু মাঠে অনিয়মিত খেলাধুলা হলেও সেখানে এখন নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে মাঠ সংকুচিত করা হয়েছে। অনেক প্রতিভাবান তরুণ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক কোচিং কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ না পাওয়ায় মাঝপথেই ঝরে পড়ে। আবার কিছু প্রতিভা ঝরে যায় শুধু স্বজনপ্রীতির বেড়াজালে আটকে পড়ে।

আমার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা ছিল করুণ। তখন অনেক ক্ষেত্রেই খেলাধুলাকে এক ধরনের অপরাধ বা সময়ের অপচয় বলে মনে করা হতো। ফলে লুকিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার কাটা কিংবা ভলিবল খেলতাম। জাপানিজ কারাতে শিখতাম অনেকটা চুরি করে। এসব করতে গিয়ে মা-বাবা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে যে কত গালি হজম করেছি এবং মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অনেক মা-বাবা সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, সুইমিং বা মার্শাল আর্ট ক্লাবে ভর্তি করান। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের জোরজবরদস্তি করেও ভর্তি করাতে হয়। কারণ সচেতন মা-বাবা খেলাধুলাকে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। এমন সুযোগ স্কুলজীবনে আমি বা আমার মতো আরো অনেকেই পেলে হয়তো এখন আমরাও পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, রোনালদো বা ইমরান খান, টেন্ডুলকার হয়ে যেতাম।

ফুটবল উন্নয়ন কোনো এক বা দুই বছরের প্রকল্প নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সফল দেশগুলো সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এর পেছনে আরো একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ক্ষমতার পালাবদল হলে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অনেক ভালো উদ্যোগও হারিয়ে যায়। ঘরোয়া ফুটবলের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বের সফল ফুটবল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শক্তিশালী জাতীয় দলের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লীগের ওপর। বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লীগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও দর্শকসংখ্যা, বাণিজ্যিক আকর্ষণ এবং প্রতিযোগিতার গভীরতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কুরাসাও। জনসংখ্যার দিক থেকে এই দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় অত্যন্ত ছোট। যে দেশগুলোর নাম কয়েক সপ্তাহ আগেও পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ জানত না, সেই কেপ ভার্দে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দারুণ লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মুহূর্তেই দেশটির পরিচিতি ও আত্মপরিচয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। দু-চার দিন আগেও যেসব খেলোয়াড়ের অনুসারী সংখ্যা ছিল গড়ে ১০ থেকে ২০ হাজার, রাতারাতি তা হয়ে দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন। মাত্র পাঁচ লাখের মতো জনসংখ্যার (বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলার চেয়েও কম) পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ ফুটবল বিশ্বের বড় বড় শক্তির বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের উত্থান ও সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো দেশপ্রেম, ফুটবল অবকাঠামো, জাতীয় দল পরিচালনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ। একই সঙ্গে প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলের সঙ্গে সংগঠিত ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা, অভিজ্ঞ স্কাউটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুসরণ করা এবং সরকার পরিবর্তন হলেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোকে অব্যাহত রাখা। কেপ ভার্দে তাদের বৃহৎ প্রবাসী সম্প্রদায়ের ফুটবলারদের ব্যবহার করে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেছে, আর কুরাসাও নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা নিজেদের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সফলভাবে জাতীয় দলের অংশ করেছে। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ সম্প্রতি এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। তবে বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন দেশের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি বা ঘুষের লেনদেনকে নিরুৎসাহ করতে বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়াও জরুরি।

যেহেতু ১৮ কোটির বেশি মানুষের এই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ আজও প্রবল, তাই প্রতিভার সংকট থাকার কথা নয়। প্রয়োজন সেই প্রতিভাকে খুঁজে বের করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত তদারকি। স্কুল ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা চালু করা, তৃণমূল উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা, প্রতিটি স্কুল ও কলেজে একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, বয়সভিত্তিক একাডেমি সম্প্রসারণ, আধুনিক কোচ তৈরিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস ব্যবস্থাপনা ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ফুটবলের উন্নয়নে করপোরেট বিনিয়োগও জরুরি। শুধু ফেডারেশনের ওপর নির্ভর করে একটি দেশের ফুটবলকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যপুস্তক থেকে অকার্যকর কিছু বিষয় কমিয়ে শরীরচর্চা ও খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচিত্র বিশদ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করাও সময়ের দাবি। বর্তমান যুবসমাজের একাংশ শরীরচর্চা বাদ দিয়ে জুয়া ও মাদক চর্চায় বেশি আসক্ত। খেলাধুলাই পারে তাদের সুস্থ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে।

স্বপ্ন সঠিকভাবে দেখলে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে, কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের মতো অপরিচিত উন্নয়নশীল দেশ যদি ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে জায়গা করে নিতে পারে, বাংলাদেশের মতো সুপরিচিত দেশ কেন পারবে না? আমরাও দেখতে চাই, একদিন পুরো বিশ্ব বাংলাদেশকে টিভিতে দেখুক, প্রিয় দেশ টক অব দ্য ওয়ার্ল্ডে পরিণত হোক।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

রথযাত্রা

তারাপদ আচার্য্য

রথযাত্রা

রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।

পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,

মূর্তি ভাবে আমি দেবহাসেন অন্তর্যামী।

রথযাত্রা ঘিরে উৎসবে মাতোয়ারা সবাই। ভক্তরা ফুল, বাতাসা, নকুলদানা ও কাঁদি কাঁদি কলা নিয়ে সকাল থেকে উপস্থিত রথযাত্রায় অংশ নিতে। হাজার হাজার ভক্ত রথের রশি টেনে নিয়ে যাবেন। রথটানা শুরুর আগেই আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে। রথটানা শুরু মাত্রই আশ্চর্যভাবে অনেকটা ভারাক্রান্ত ও বেদনাচ্ছন্ন হয়ে এসব ঘন মেঘ দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে মাটির পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নেচে-গেয়ে মতোয়ারা হন সবাই। সেই সঙ্গে সমান তালে বাজতে থাকে ঘণ্টাবাদ্যি। একদিকে পুরুষরা শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসা, ঢাক, ঢোল বাজিয়ে পরিবেশমুখর করে তোলেন, অন্যদিকে নারীরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে রথটানায় আনন্দচিত্তে শামিল হন। রথ থেকে রাস্তায় দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় কলা আর ধানের খই। শাস্ত্রে রয়েছে, রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যাতে অর্থাৎ রথে চড়ে বামন জগন্নাথকে দেখতে পেলে জীবের আর পুনর্জন্ম হয় না। এ বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ মহা উৎসবের আয়োজন।

শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসব। মিলনের এক মহামেলা। আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বর্ষা ঋতুর আগমনের শুরুতেই রথযাত্রা উৎসব গ্রামে-গঞ্জে, নগরে বিপুলভাবে সর্বজনীন রূপ নেয়। এ মহা উৎসবকে কেন্দ্র করে বর্ষাবিধুর আবহাওয়ার মধ্যেও মেলা বসে। রথযাত্রা উপলক্ষে জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সবারই পদচারণে মুখরিত থাকে বিভিন্ন সড়ক। শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সবাই রথযাত্রায় সারথি হতে পথে নেমে পড়ে। ভক্তকুলের ব্যাপক অংশগ্রহণে রথযাত্রা উৎসব মহা উৎসবে রূপ নেয়। বিশ্বের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর হৃদয়ে শ্রীশ্রী জগন্নাথ প্রত্যক্ষ দেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।

পদ্মপুরাণে উল্লিখিত রথযাত্রায় শ্রী বিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রী বিষ্ণুরই আরেকটি রূপ, তা সবাই স্বীকার করে। স্কন্দপুরাণে কিন্তু প্রায় সরাসরিভাবে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষী জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। পুরুষোত্তম ক্ষেত্র বা শ্রীক্ষেত্র বলতে পুরীকেই বোঝায়। তাই দেখা যাচ্ছে যে সেই পুরাণের যুগেও এই রথযাত্রার প্রচলন ছিল।

উৎকলখণ্ড এবং দেউল তোলা নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথমন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা উৎসব অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশেও সাড়ম্বরে পালিত হয়। ঢাকা শহরের অদূরে ধামরাইয়ের এ উৎসব বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। ধামরাই রথযাত্রার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। জানা যায়, ১০৭৯ বাংলা সন থেকে দীর্ঘ ৩৪০ বছর ধরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা ও রথমেলা উৎসব পালিত হয়ে আসছে। কিভাবে এই বাঁশের রথটি কাঠের রথে পরিণত হয়, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ বাংলা সন পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে পর পর চারটি রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ বাংলা সনের রথের ঠিকাদার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সূর্য নারায়ণ সাহা। এই রথটি তৈরি করতে সময় লাগে এক বছর। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর থানার বিভিন্ন কাঠশিল্পী যৌথভাবে নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথটি তৈরি করেন। এই রথটি ছিল ত্রিতলাবিশিষ্ট, যার প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোণে চারটি এবং তৃতীয় তলায় একটি প্রকোষ্ঠ ছিল। এর নাম নবরত্ন। রথটি টানার জন্য প্রায় ২৭ মণ পাটের কাছি দরকার হতো, যদিও আজ সেই বড় রথটি আর নেই। কিন্তু এখন ছোট আকারের ৩০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথ তৈরি করে উৎসব পালন করা হচ্ছে এবং রথ টানার সময় একই আনন্দের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

রাজধানী ঢাকার সূত্রাপুরে রামসীতা মন্দির কমিটির আয়োজনে ৫০০ বছরের পুরনো রথযাত্রার অনুষ্ঠান চলে আসছে। পুরান ঢাকায় শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ দেববিগ্রহ মন্দির, ঠাটারীবাজার শিবমন্দির ও রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দিরেও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় সবচেয়ে বড় রথযাত্রার উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ইসকন মন্দিরে। শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ সুসজ্জিত রথ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে ইসকন মন্দির থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, আবার অষ্টম দিবসে উল্টো রথযাত্রা হিসেবে রথ তিনটিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বানিয়াজুরী, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, যশোরের কেশবপুর, নড়াইলের লোহাগড়া, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, হবিগঞ্জ এবং সিলেট অঞ্চলে উৎসবের উচ্ছ্বাসটা অন্য এলাকার চেয়ে একটু বেশিই।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ