'আমি তবলা বাজানো শুরু করলাম, কিছুদিন পর সেও শুরু করল। গিটার বাজানো ধরলাম, সেটাও ধরল। এরপর কিবোর্ড ধরলাম, কিবোর্ডও নিয়ে নিল। ছোটবেলায় আমি যা যা করেছি, তার সবটাই করেছে ও।' ছোট ভাই আরাফাত মহসিন সম্পর্কে বলছিলেন আরাফাত র্কীতি। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছয় বছর। গান ও বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলের জুটি হিসেবে এরই মধ্যে নাম করেছেন। শোনাচ্ছিলেন নিজেদের শুরুর গল্প। বড় ভাইয়ের কথা শুনে হেসেই খুন আরাফাত মহসিন! 'ছোটবেলায় ছেলেমেয়েদের ব্যস্ততা থাকে ক্লাস, কোচিং, প্রাইভেটকে ঘিরে। আর আমরা সারা দিন পড়ে থাকতাম মিউজিকের নানা ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে। ভালোলাগা কাজ বলেই এসব করতাম।' 'পারিবারিকভাবেই সংগীতটা আমাদের ভেতর ঢুকে আছে। মামাদের ব্যান্ড ছিল 'নোভা'। খালা গান গাইতেন। নানা ছিলেন ভীষণ গানপাগল মানুষ। বাবারও বেশ ঝোঁক ছিল সংগীতের ওপর। ফলে বাসায় প্রায়ই গানের আসর বসত। তাঁদের দেখে দেখে আমরাও আকৃষ্ট হই।' বলছিলেন আরাফাত কীর্তি। খানিকটা থেমে শুরু করেন আবার, 'প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে জোর সাউন্ডে গান ছাড়তেন আমার নানা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অঞ্জন দত্ত, সুমন চট্টোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কেউ বাদ ছিল না। শুনে শুনে আমাদেরও কান পেকে গেছে। কিছু গানের তো কর্ড, পিচসহ মাথায় ঝালাই করা।' 'তবে এসএসসির আগ পর্যন্ত বাসায় হিন্দি গান অ্যালাউ ছিল না। বাংলা গানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টিতে এটা আমাদের খুব কাজে দিয়েছে।' বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগ করেন ছোট ভাই। দুজনে একসঙ্গেই মিউজিক করেন। তবে কাজ ভাগ করা। মহসিন কম্পোজিশন করেন। মিক্স, মাস্টার ও টেকনিক্যাল সাইডগুলো দেখেন কীর্তি। অবশ্য সুরটা দুজন মিলেই করেন। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলালিংকের একটি জিঙ্গেল দিয়ে অভিষেক। কাজটি শেষ করেই শোনান মাকে। মা খুশি হয়ে তাঁদের স্টুডিও করার উৎসাহ দেন। এরপর তাঁরা গড়ে তোলেন নিজেদের স্টুডিও 'স্টুডিও ৫৮'। এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শ বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে বাংলালিংক, এয়ারটেল, রবি, প্রাণ, মোজো, বাটা, স্যামসং উল্লেখযোগ্য। তিনটি গানের অ্যালবামও প্রকাশ করেছেন তাঁরা। প্রথমটি ২০১১ সালে প্রকাশিত পল্বাশার 'ভালোবাসি তাই'। যে অ্যালবামের 'জলস্বপ্ন' গানটি খুব জনপ্রিয়। দ্বিতীয়টি 'স্টুডিও ৫৮ অ্যান্ড সিঙ্গারস' (২০১২)। যাতে কণ্ঠ দেন তপু, আরজে রাজু এবং নবীন শিল্পী রিন্তি, রাইসা, হাদী ও বিপরীত ব্যান্ড। এ অ্যালবামের 'রাজকুমারী' গানটি শ্রোতারা খুব পছন্দ করেন। তৃতীয়টি গত বছরের অক্টোবরে অনলাইনে প্রকাশিত '#৩'। এতে কণ্ঠ দেন 'স্টুডিও ৫৮' ব্যান্ডের সদস্যরা। যাতে আরাফাত মহসিন (ভোকাল, গিটার) ও আরাফাত কীর্তির (গিটার, কিবোর্ড) পাশাপাশি রয়েছেন রাফি (বেজ) ও নিয়াজ (ড্রাম)। কিছুদিন আগে এয়ারটেলের পৃষ্ঠপোষকতায় 'বাজ স্টুডিও' নামে পুরনো দিনের ১২টি গান নিয়ে একটি প্রজেক্ট করেন কীর্তি-মহসিন। সেটি প্রচার করে রেডিও স্বাধীন। সব কিছুকে ছাপিয়ে 'স্টুডিও ৫৮' নাম করেছে বিভিন্ন ভালোবাসা দিবসে প্রকাশিত এয়ারটেলের পাঁচটি নাটকে গান করে। নাটকগুলো হলো 'ভালোবাসি তাই', 'ভালোবাসি তাই, ভালোবেসে যাই', 'এট এইটিন', 'ভালোবাসা ওয়ান ওয়ান' এবং এবার ভালোবাসা দিবসে প্রচারের অপেক্ষায় থাকা 'মাঙ্কি বিজনেস'। যাতে দুটি গান রয়েছে তাঁদের করা। কীর্তি বলেন, 'মিউজিক নিয়ে আমরা এখন খুব সন্তুষ্ট। প্রতিদিনই নতুন নতুন কাজ করতে পারছি। আরো ভালো কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত নিজেদের আপডেট করার চেষ্টা করছি।' সম্প্রতি নতুন একটি অ্যালবাম তৈরিতে হাত দিয়েছেন। নাম 'ফোকউল্লাহ অ্যান্ড কোং'। যাতে শাহ আব্দুল করিম, লালন সাঁই, আবদুর রহমান বয়াতি, হাছন রাজা, শচীন দেববর্মণ প্রমুখের ১১টি গান থাকবে। চলচ্চিত্রের গানের সংগীত পরিচালনায়ও নাম লেখিয়েছেন তাঁরা। 'কলকাতা কলিং'য়ে অর্ণবের গাওয়া 'একটা একটা এলোমেলো পায়ে' গানটির সংগীতায়োজন করেছেন কীর্তি ও মহসিন। সংগীত নিয়ে স্বপ্ন কী? আরাফাত মহসিন বলেন, 'আমাদের দেশে মিউজিক শেখার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। যেখান থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা শেখা যাবে। কাজ করতে গিয়ে আমরা এ বিষয়টি খুব অনুভব করেছি। তাই আমাদের খুব ইচ্ছা একটি ওয়ার্কশপ করার।' কীর্তি বলেন, 'গান আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে। এটা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। গানই আমাদের জীবন।'