kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুস্থ থাকতে নিয়মিত দুধ খেতে হবে

তামান্না চৌধুরী
প্রধান পুষ্টিবিদ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা

শরিফ রনি   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুস্থ থাকতে নিয়মিত দুধ খেতে হবে

একটা সময় ছিল যখন এ দেশে মনে করা হতো—দুধ খায় বোকারা। কিন্তু বুড়ো বয়সে ওই মানুষটিই যখন হাড়ের সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান এবং ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন ‘দুধ খেতে হবে’। তখন তাঁর আর আফসোসের সীমা থাকে না। তাই হাড়ের সমস্যা হওয়ার আগেই সবাইকে নিয়মিত দুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন অ্যাপোলো হাসপাতাল ঢাকার প্রধান পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী।

তাঁর মতে, হাড়ের ওপর ভর করেই মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। ভিত্তি মজবুত না হলে যেমন বিল্ডিং টেকসই হয় না, তেমনি হাড় মজবুত না থাকলে শরীর ভালো থাকে না। দেশের অনেকেই গরুর মাংস খাওয়ায় যতটা উৎসাহী, দুধের বেলায় ততটা নন। তবে সময়ের সঙ্গে ইতিবাচক পরিবর্তনও হচ্ছে। দিন দিনই দেশের মানুষ সচেতন হচ্ছে। তাদের মধ্যে দুধ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ছে। ফুড পিরামিডে সব সময় এক গ্লাস দুধের ছবি দেওয়া থাকে। অর্থাৎ শরীর ভালো রাখতে হলে প্রতিদিন দুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষের মাংসপেশি আশপাশের দেশের মানুষের তুলনায় বলিষ্ঠ নয়। আমরা মনে করি জিম করলে মজবুত পেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। আসলে মাংশপেশি তৈরি হয় মূলত প্রোটিন থেকে। দুধ হলো প্রোটিনের অন্যতম উৎস। একজন মা যদি গর্ভাবস্থায় ভালোভাবে দুধ খান তাহলে তাঁর সন্তান ভালোভাবে বেড়ে উঠবে। সন্তানও যদি নিয়মিত দুধ খায় তাহলে তার মাংসপেশি মজবুত হবে। দুধের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম ও প্রোটিন আছে যেগুলো মাংসপেশি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

দুধে ফ্যাট থাকে। মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে মধ্যবয়সীদের অনেকে দুধ খেতে চান না। এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। তাঁদের বেলায় পরামর্শ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব বয়সের মানুষের দুধের প্রয়োজন আছে। জন্মের পর শিশু মায়ের বুকের দুধ খাবে। প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ খাবে। এরপর বুকের দুধের পাশাপাশি তাকে অন্য খাবার দিতে হয়। শিশুর বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে কৈশোর এমনকি পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন দুধ খাওয়া উচিত। যাঁরা প্রচুর পরিশ্রম করেন, নিয়মিত হাঁটেন তাঁরা রোজ ২০০ থেকে ২৫০ মিলি পর্যন্ত দুধ খেতে পারেন। কিন্তু যাঁরা কোনো পরিশ্রম করেন না তাঁদের জন্য এক কাপ দুধও বাড়তি ক্যালরির জোগান হয়ে যেতে পারে।

শুধু কিডনি রোগীদের বেলায় দুধ খাওয়ায় বিধি-নিষেধ আছে।

তিনি বলেন, চাহিদা বিবেচনা করে সারা দুনিয়ায় দুধ ডিজাইন করা হয়। লো ফ্যাট, ফ্যাট ফ্রি, ১ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১০ শতাংশ। ওরা কিন্তু তাদের চাহিদা অনুসারে দুধ কেনে, তবে আমাদের দেশে কিছু কনসেপ্ট আছে—গুঁড়া দুধ মানেই খারাপ। তাই খেতে হবে গরুর খাঁটি দুধ। গরু থেকে পাওয়া তরল দুধই হচ্ছে প্রধান উপাদান। তা দিয়ে নানা খাবার তৈরি করা যায়। তবে গুঁড়া দুধের মধ্যে অনেক ধরনের পুষ্টিগুণ লোডেড থাকে। পাস্তুরিত আর গুঁড়া দুধের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো গুঁড়া দুধ বেশিদিন সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু পাস্তুরিত দুধ অল্প সময়ের মধ্যে খেয়ে ফেলতে হয়। 

আরো বিস্তারিত তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, দুধ হচ্ছে পুষ্টিকর খাবার। দুধে অবশ্যই ফ্যাট থাকে। দুধ থেকে যেহেতু বাটার হয়, তাই ফ্যাট অবশ্যই আছে। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি নির্ভর করে একজন ব্যক্তির ওপর।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরুন কেউ একজন নিয়মিত দুধ খান আবার ফাস্ট ফুডও খান কিন্তু হাঁটেন না, পরিশ্রম করেন না। তখন তো তাঁর মোটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবেই। তখন দোষটা দুধের ওপর দেবেন নাকি তাঁর লাইফস্টাইলের। সুতরাং দুধ খেলে মোটা হয় এটি একেবারেই ভুল ধারণা। দুধ খেলে কখনোই মোটা হয় না, যদি কারোর লাইফস্টাইল ঠিক থাকে, স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ ঠিক থাকে। তিনি যদি ক্যালরি বিবেচনা করে খাদ্য গ্রহণ করেন, তাহলে মোটা হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই।

বাজারে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর তরল দুধ পাওয়া যায়, এগুলো কত স্বাস্থ্যসম্মত—এ সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লো ফ্যাট দুধ পাওয়া যাচ্ছে। পুষ্টিবিদরাও সেগুলো লিখছেন। যাঁরা খাচ্ছেন তাঁদের কাছ থেকে গত চার-পাঁচ বছরে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কেউ বলেননি দেশি প্যাকেটজাত দুধ খেয়ে তিনি এই সমস্যায় পড়েছেন। তা ছাড়া প্যাকের গায়ে সব ধরনের তথ্য থাকে। যে কেউ সেটা পড়ে নিতে পারছেন। এগুলো বিএসটিআইয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং তাতে মেয়াদের তারিখও উল্লেখ থাকে।

গরু থেকে সরাসরি পাওয়া দুধ খেয়েও সমস্যা হতে পারে। পরিচ্ছন্ন উপায়ে দুধ দোহন করা না হলে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, গরু কী খাচ্ছে? গরুকে যদি উল্টাপাল্টা কিছু খাওয়ানো হয়, তাহলে সেই দুধ খেলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সুতরাং যাঁরা দুধ বাজারে বিক্রি করছেন তাঁদের মধ্যে যেমন সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকতে হবে তেমনি গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে। 

দুধে নানা উপাদান মিশিয়ে খাওয়ার স্বাস্থ্য দিক জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুধ হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাবার। এর মধ্যে ভিটামিন, মিনারেল সবই আছে। তবে এর মধ্যে আরো অনেক উপাদান মিশিয়ে যেমন মল্টেড ড্রিংকস মিশিয়ে স্বাদ পরিবর্তন করে খাওয়া একেবারেই ঠিক নয়। দুধে অন্য কিছু মিশিয়ে সেটাকে আরো শক্তিশালী বা সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। দুধ যেহেতু আল্লাহ সাদা রঙে তৈরি করেছেন, সুতরাং এর রং পরিবর্তন করে খাওয়া সঠিক পন্থা নয়। দুধ খাওয়ায় যদি কারো ক্ষেত্রে গন্ধের সমস্যা হয়, তাহলে তিনি প্রাকৃতিক কোনো উপাদান ব্যবহার করে খেতে পারেন। যেমন—গোলাপ পানি, দারচিনির গুঁড়া ইত্যাদি। তা ছাড়া চায়ের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে খেলে সেটা দীর্ঘ মেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর। গ্রিন চা, আদা চা, লেবু চা এগুলো স্বাস্থ্যকর।

রাতে দুধ খাওয়ার উপকারিতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুধের মধ্যে প্রোটিন আছে। সুতরাং দুধ খেলে ভালো ঘুম হয়। আমরা যেমন সবাইকে আর্লি ডিনারের পরামর্শ দিয়ে থাকি। সে ক্ষেত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনেকটা সময় গ্যাপ থাকে। শোয়ার আগে রাতের দীর্ঘ সময় ঘুমে ভালো এনার্জি দেবে।

 

স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে দুধ উৎপাদনের ধাপগুলো


গাভীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি খাওয়াতে হবে


পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে


সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে


সঠিক সময় রোগ নিরাময় করতে হবে


জাতের উন্নয়ন বৃদ্ধি করতে হবে


দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা