এ বছর বাংলাদেশ ও ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৪ বছর উদ্যাপন করছে। দুই প্রতিবেশী দেশের আগামী দিনের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন?
গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে বলে আমি আশা করি। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে উভয় দেশেরই দৃঢ় আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ কত? আগামী পাঁচ বছরে এই বাণিজ্য কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে?
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ১১ থেকে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানির তুলনায় বেশি। ভারত থেকে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আসে, আর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বাণিজ্যের মধ্যে বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানি এবং ভোগ্যপণ্য অন্যতম। আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানো, স্থলবন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
দুই দেশের বাণিজ্য সমপ্রসারণে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কি দেখছেন?
সময়ের সঙ্গে শুল্ক বাধা কিছুটা কমলেও অশুল্ক বাধাগুলো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সীমান্তে কাস্টমস জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ডকুমেন্টেশন, সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং পণ্যের মানদন্ডে পার্থক্য বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু, দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাণিজ্য আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
দেশে ব্যবসার পরিবেশ কেমন? বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকার আর কি পদক্ষেপ নিতে পারে?
অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজতার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার এবং প্রক্রিয়া আরও সহজ করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে।
ভারত সরকার বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন, ব্যবসা ও চিকিৎসা ভিসা সহজ করার কথা বলছে। ব্যবসায়িক ভিসার বর্তমান পরিস্থিতি কী? আইবিসিসিআই কীভাবে দেখছে?
বর্তমানে ভারত ধীরে ধীরে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করছে। এর মধ্যে ব্যবসায়িক ভিসাও রয়েছে, যা ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে আরও কাঠামোবদ্ধ ও ধাপে ধাপে প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইবিসিসিআই সদস্যদের ক্ষেত্রে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক চ্যানেল, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বৈধ ব্যবসায়িক ভ্রমণ সহজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সমপ্রসারণে আইবিসিসিআই কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আইবিসিসিআই কাজ করছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে সংলাপের আয়োজন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ভিসাসংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা করা আমাদের অন্যতম কাজ। পাশাপাশি নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ করতেও আমরা কাজ করছি।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সমপ্রসারণে আইবিসিসিআইয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
সার্কভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের মাধ্যমে বাণিজ্য সমপ্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আইবিসিসিআই মনে করে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা সদস্য দেশগুলোর ব্যবসায়ী-ব্যবসায়ী (বিটুবি) যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা, নিয়মিত বাণিজ্য সংলাপ আয়োজন এবং বস্ত্র, কৃষি, ওষুধশিল্প ও সেবাখাতের মতো সম্ভাবনাময় খাতে নতুন সুযোগ চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর চেম্বার, বাণিজ্য সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো সার্ক অঞ্চলে আরও কার্যকর, সংযুক্ত এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা।
বাংলাদেশ আমদানি জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়েছে। এই সমস্যার টেকসই সমাধান কিভাবে করা যায়?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানির সরবরাহ ও দামের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ওপর চাপ পড়েছে। সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৭০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম জনগণ ও শিল্পখাতের জন্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। তবে সঠিক পরিকল্পনা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দেশের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?
বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমার কারণে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক সম্পদ, শিপিং, উপকূলীয় পর্যটন এবং সমুদ্রতলের খনিজসম্পদ সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং চিংড়ি ও মাছ চাষ দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সমুদ্রের গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজসম্পদ অনুসন্ধানেরও সুযোগ রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং টেকসইভাবে সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্লু ইকোনমি দেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।