• ই-পেপার

বৈশ্বিক লজিস্টিকস জায়ান্টের প্রশংসা

৬ মাসেই বদলে গেল চট্টগ্রাম বন্দর

  • বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে সফলভাবে ইলেকট্রনিক ই-গেট পাস প্রবর্তন করা হয়েছে

এআই ও প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে পোশাক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
এআই ও প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে পোশাক খাত
‘বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬’ নিয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বায়লার উদ্যোক্তারা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অটোমেশন, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এবং টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যয় হ্রাস এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তরকে সামনে রেখে আগামী ২০ ও ২১ জুলাই ঢাকার র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬

গতকাল শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত বনানী শেলটেক গার্ডেনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডারস অ্যালায়েন্স (বায়লা) এ সম্মেলনের বিস্তারিত তুলে ধরে। আয়োজকদের মতে, থিংক বিয়ন্ড টুডে প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলন দেশের পোশাকশিল্পকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে, নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে দেড় হাজারেরও বেশি অংশগ্রহণকারী, ৫০০-এর বেশি সিএক্সও এবং দেশি-বিদেশি ২০ জনের বেশি বক্তা অংশ নেবেন। সম্মেলনের বিভিন্ন সেশনে নেতৃত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্ডাস্ট্রি ৪.০, টেকসই উন্নয়ন, অর্থায়নের ভবিষ্যৎ, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের নতুন প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলছেন, বর্তমানে এআই-সমন্বিত ইআরপি ও এমআইএস ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুততর হচ্ছে। ভয়েসভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগকে আরো সহজ ও কার্যকর করছে। একই সঙ্গে কোনো পোশাকের ছবি বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক কস্টিং ও স্যাম্পলিংয়ের মতো প্রযুক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরো দক্ষ ও সময় সাশ্রয়ী করে তুলছে।

আয়োজকরা জানান, এআই শুধু স্বয়ংক্রিয়করণের প্রযুক্তি নয়, এটি মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধিরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর ফলে একই জনবল দিয়ে অধিক উৎপাদন ও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তি, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম টেকসই উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করছে। সম্মেলনে বিশ্ববাজারে দ্রুত সম্প্রসারিত ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) খাতের সম্ভাবনা, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সরবরাহ চেইনের চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হবে। উদ্যোক্তারা মনে করেন, এমএমএফ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্মেলনের আলোচনায় অংশ নেবেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, উদ্যোক্তা কুতুবউদ্দিন আহমেদ, লেখক ও ব্যাংকার মাশরুর আরেফিন, অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজ, উদ্যোক্তা মিরন আলীসহ দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা শিল্পের আগামী দশকের রূপান্তর, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের কৌশল নিয়ে মতামত তুলে ধরবেন।

সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব

বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে আবারও গতি ফিরছে। প্রায় দুই বছর ভ্রমণ ভিসা বন্ধ থাকলেও আবার তা সচল হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সভাপতি মো. মশিউর রহমান। কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মিরাজ

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব
মো. মশিউর রহমান

এ বছর বাংলাদেশ ও ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৪ বছর উদ্যাপন করছে। দুই প্রতিবেশী দেশের আগামী দিনের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন?

গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে বলে আমি আশা করি। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে উভয় দেশেরই দৃঢ় আগ্রহ রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ কত? আগামী পাঁচ বছরে এই বাণিজ্য কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে?

বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ১১ থেকে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানির তুলনায় বেশি। ভারত থেকে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আসে, আর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বাণিজ্যের মধ্যে বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানি এবং ভোগ্যপণ্য অন্যতম। আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানো, স্থলবন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

দুই দেশের বাণিজ্য সমপ্রসারণে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কি দেখছেন?

সময়ের সঙ্গে শুল্ক বাধা কিছুটা কমলেও অশুল্ক বাধাগুলো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সীমান্তে কাস্টমস জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ডকুমেন্টেশন, সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং পণ্যের মানদন্ডে পার্থক্য বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু, দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাণিজ্য আরও সহজ ও গতিশীল হবে।

দেশে ব্যবসার পরিবেশ কেমন? বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকার আর কি পদক্ষেপ নিতে পারে?

অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজতার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার এবং প্রক্রিয়া আরও সহজ করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে।

ভারত সরকার বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন, ব্যবসা ও চিকিৎসা ভিসা সহজ করার কথা বলছে। ব্যবসায়িক ভিসার বর্তমান পরিস্থিতি কী? আইবিসিসিআই কীভাবে দেখছে?

বর্তমানে ভারত ধীরে ধীরে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করছে। এর মধ্যে ব্যবসায়িক ভিসাও রয়েছে, যা ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে আরও কাঠামোবদ্ধ ও ধাপে ধাপে প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইবিসিসিআই সদস্যদের ক্ষেত্রে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক চ্যানেল, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বৈধ ব্যবসায়িক ভ্রমণ সহজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা।

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সমপ্রসারণে আইবিসিসিআই কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আইবিসিসিআই কাজ করছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে সংলাপের আয়োজন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ভিসাসংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা করা আমাদের অন্যতম কাজ। পাশাপাশি নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ করতেও আমরা কাজ করছি।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সমপ্রসারণে আইবিসিসিআইয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

সার্কভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের মাধ্যমে বাণিজ্য সমপ্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আইবিসিসিআই মনে করে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা সদস্য দেশগুলোর ব্যবসায়ী-ব্যবসায়ী (বিটুবি) যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা, নিয়মিত বাণিজ্য সংলাপ আয়োজন এবং বস্ত্র, কৃষি, ওষুধশিল্প ও সেবাখাতের মতো সম্ভাবনাময় খাতে নতুন সুযোগ চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর চেম্বার, বাণিজ্য সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো সার্ক অঞ্চলে আরও কার্যকর, সংযুক্ত এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা।

বাংলাদেশ আমদানি জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়েছে। এই সমস্যার টেকসই সমাধান কিভাবে করা যায়?

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানির সরবরাহ ও দামের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ওপর চাপ পড়েছে। সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৭০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম জনগণ ও শিল্পখাতের জন্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। তবে সঠিক পরিকল্পনা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

দেশের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?

বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমার কারণে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক সম্পদ, শিপিং, উপকূলীয় পর্যটন এবং সমুদ্রতলের খনিজসম্পদ সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং চিংড়ি ও মাছ চাষ দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সমুদ্রের গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজসম্পদ অনুসন্ধানেরও সুযোগ রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং টেকসইভাবে সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্লু ইকোনমি দেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

অভিমত

দেশে ডুরিয়ান চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ

ড. জাহাঙ্গীর আলম খান

দেশে ডুরিয়ান চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ

বাংলাদেশে ডুরিয়ান ফলের বাণিজ্যিক চাষ ও রপ্তানির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ডুরিয়ান দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো হলেও আকারে তুলনামূলক ছোট এবং অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ। ছোট আকৃতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন, সংরক্ষণ ও রপ্তানি করা তুলনামূলক সহজ। এ কারণেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া ডুরিয়ানকে উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

দেশে ডুরিয়ান চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগমালয়েশিয়া গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস সনদের আওতায় ডুরিয়ান উৎপাদন ও রপ্তানিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। এর ফলে দেশটি প্রতিবছর ডুরিয়ান রপ্তানি থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে ডুরিয়ান একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বাংলাদেশে কাঁঠালের ব্যাপক উৎপাদন হয় এবং দেশের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় ডুরিয়ান চাষেরও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরাসরি বাণিজ্যিক চাষে যাওয়ার পরিবর্তে প্রথমে গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে প্রকল্প আকারে ডুরিয়ানের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করা যেতে পারে। বিভিন্ন জাতের উপযোগিতা, উৎপাদনশীলতা, রোগবালাই এবং বাজার সম্ভাবনা মূল্যায়নের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ডুরিয়ান বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা প্রমাণ করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এ ফলের চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও ডুরিয়ানের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে দেশে সফলভাবে ডুরিয়ান উৎপাদন করা গেলে একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, ফলের বহুমুখীকরণ ঘটবে এবং কৃষি খাতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

ডুরিয়ানের সম্ভাবনা মূল্যায়নে ড্রাগন ফলের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। একসময় বাংলাদেশে ড্রাগন ফল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। কিন্তু গত এক দশকে দেশে এর বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। উৎপাদন বাড়ায় বাজারে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে এবং এর বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে। একইভাবে পরিকল্পিত গবেষণা, উন্নত চারা, কৃষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উৎপাদন এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ডুরিয়ানও বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডুরিয়ানের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করে সফল হলে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা উচিত। একই সঙ্গে উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে ভবিষ্যতে ডুরিয়ান বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফল ও রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে।

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ

অনুলিখন : সজীব আহমেদ

বিশ্বে ডুরিয়ান রপ্তানিতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের হাতছানি

আনিকা জীনাত
বিশ্বে ডুরিয়ান রপ্তানিতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের হাতছানি

ডুরিয়ানের শাঁস খুবই নরম, ঘন ও ক্রিমের মতো। এক কথায় এর স্বাদ বোঝানো কঠিন। তবে বাংলাদেশি ফল কাঁঠালের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি কিং অব ফ্রুটস নামে পরিচিত। তীব্র গন্ধের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের পাঁচতারা হোটেলে নিষিদ্ধ ডুরিয়ান। তবে এই ফল এখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক রপ্তানি পণ্যের একটি। ডুরিয়ানের বৈশ্বিক বাজার ২০২৫ সালে পৌঁছেছে ৯২৩ কোটি ডলারে। ডাবলিনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের তথ্য মতে, ২০৩১ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার বেড়ে এক হাজার ৫০৪ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। এই বাজার দখলে এখন প্রতিযোগিতায় রয়েছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো।

বিশ্বে ডুরিয়ান রপ্তানিতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের হাতছানিথাইল্যান্ড : ডুরিয়ান রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ স্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। গত বছর তারা ৪৩০ কোটি ডলারের ডুরিয়ান রপ্তানি করে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটি শুধু চীনেই ৩১০ কোটি ডলারের ডুরিয়ান রপ্তানি করেছে। বছরের শেষে এ আয় ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রপ্তানিতে শীর্ষ স্থান ধরে রাখতে থাইল্যান্ড সরকার কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করে। বাগান থেকে ডুরিয়ান সংগ্রহের আগেও কৃষকদের অনুমতি নিতে হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ফলের মান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই রপ্তানির অনুমোদন মেলে এবং এরপর ফল ডিপোতে পাঠানো হয়।

ভিয়েতনাম : মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ডুরিয়ান রপ্তানিতে দ্রুত উত্থান ঘটিয়েছে ভিয়েতনাম। চার বছর ধরে আলোচনা শেষে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো চীনে ডুরিয়ান রপ্তানির অনুমতি পায় দেশটি। সে বছর তাদের আয় ছিল ৪২ কোটি ডলার। পরের বছর সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২২৪ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালে তা আরো বেড়ে হয় ৩৩০ কোটি ডলার। গত বছর চীনের কঠোর আমদানি নীতিমালা অনুসরণ করেও দেশটি ৩৮৬ কোটি ডলারের ডুরিয়ান রপ্তানি করে। বিশ্ববাজার মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে। দেশটির সবজি ও ফল রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে ডুরিয়ান থেকে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের ২৮টি দেশে ডুরিয়ান রপ্তানি করে ভিয়েতনাম। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই তারা রপ্তানি করেছে ৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের ডুরিয়ান, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে ডুরিয়ানের চাষ হচ্ছে।

মালয়েশিয়া : মালয়েশিয়ার অন্যতম রপ্তানি আয়ের উৎস ডুরিয়ান। ফলটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরো বাড়াতে দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয় গত ৪ জুলাই কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টাওয়ারের নিচে উদ্বোধন করেছে কুয়ালালামপুর ডুরিয়ান এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার (কেএলডিইএক্স)। কেন্দ্রটির মূল উদ্যোক্তা ডুরিয়ান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মাইবোলেবোলেহ। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত টিকিট কেটে দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতে পারেন প্রায় এক হাজার ৯০০ বর্গমিটারের এ প্রদর্শনীকেন্দ্র। এখানে রয়েছে ডুরিয়ান জাদুঘর, ছোট নাট্যমঞ্চ ও আর্ট গ্যালারি। দর্শনার্থীরা ডুরিয়ানের ইতিহাস, চাষাবাদ ও বিভিন্ন উদ্ভাবনের গল্প সম্পর্কে জানতে পারে। চাইলে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন জাতের ডুরিয়ানের স্বাদও নিতে পারে। মালয়েশিয়া শুধু টাটকা ডুরিয়ান নয়, হিমায়িত, পাল্প ও পেস্টও রপ্তানি করে। সব মিলিয়ে গত বছর দেশটি ডুরিয়ান রপ্তানি করে প্রায় ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় করেছে। বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে তাদের ডুরিয়ান রপ্তানি হয়। এর মধ্যে রয়েছে কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেন। গত বছর শুধু চীনে প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ ডলারের ডুরিয়ান রপ্তানি করেছে মালয়েশিয়া। এদিকে ট্রানজিট ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে হংকংও গত বছর ডুরিয়ান বাণিজ্য থেকে সাড়ে চার কোটি ডলার আয় করেছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও ভেনেজুয়েলাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ডুরিয়ান রপ্তানি করে থাকে।

সবচেয়ে বড় বাজার চীন : বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডুরিয়ান ক্রেতা এখন চীন। দেশটির শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তারা ৭৪৯ কোটি ডলারের ডুরিয়ান আমদানি করেছে। আমদানি করা ডুরিয়ানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৬৮ হাজার টন। চীনের বাজারে ডুরিয়ান সরবরাহকারী শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন। এর মধ্যে ভিয়েতনাম থেকে ৯৪ হাজার মেট্রিক টন, থাইল্যান্ড থেকে ৭২ হাজার মেট্রিক টন ও মালয়েশিয়া থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন ডুরিয়ান আমদানি করেছে চীন। চীনে রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গেছে ভিয়েতনাম। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হতে পারে।

বাংলাদেশের কাঁঠালের সুযোগ : ডুরিয়ানের জাতভাই হিসেবে পরিচিত কাঁঠাল এখন বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। সম্প্রতি চীন সফরের সময় এসংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হয়, যার ফলে দেশটিতে বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির পথ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের কাঁঠালের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং শিগগিরই রপ্তানি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি আরো জানান, চীন সফরের আগে মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া প্রতিবছর ডুরিয়ান রপ্তানি করে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। একইভাবে বাংলাদেশও যদি আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠালের অবস্থান তৈরি করতে পারে, তবে জাতীয় ফলটিও হতে পারে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি নতুন উৎস।

সূত্র : এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক, ভিএনএক্সপ্রেস