বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এমনিতেই মিডিয়ার শিরোনাম হয়। তবে শিকারির ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত এক বাঘিনী এবার মিডিয়ায় বেশ সাড়া ফেলেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ রবিবার নিজ বাড়ি সুন্দরবনে ফিরছে সেই বাঘিনী। দীর্ঘ ছয় মাস চিকিত্সা ও নিবিড় পরিচর্যার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া রয়েল বেঙ্গল বাঘিনীকে আজ সুন্দরবনের গভীরে অবমুক্ত করা হবে। তবে আগামী এক বছর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে বাঘিনীকে। এ জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞদল গঠন, ক্যামেরা স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সুন্দরবন বন বিভাগ। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পেতে রাখা হরিণ ধরার ফাঁদে বাঘিনীটি আটকা পড়ে। পরদিন গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়। ফাঁদে বাঘিনীর বাম পায়ে তিন ইঞ্চি ক্ষত সৃষ্টি হয়ে পচন ধরে যায়। এ ছাড়া বেশ কিছু পেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ও পরিচর্যা করা হয়। এতে গড়ে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।
নির্মল কুমার পাল জানান, দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ। আজ রবিবার পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এ জন্য বন বিভাগ বাঘিনীটিকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখবে। এ জন্য বিচরণ এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে প্রাথমিকভাবে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা (গবেষণায় ব্যবহূত বিশেষ ক্যামেরা) স্থাপন করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবমুক্ত করা জায়গাটি বাঘিনীটির জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা যাচাই করার জন্য আগে থেকেই ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘিনীটির বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। উদ্ধারের সময় সামনের বাঁ পায়ে প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। উদ্ধার করার সময় এটি ছিল কঙ্কালসার।
বন্য প্রাণি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ বা বাঘিনীর একটি নির্দিষ্ট বিচরণক্ষেত্র বা টেরিটরি থাকে। যে এলাকা থেকে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি এখনো তার নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো বাঘ বা বাঘিনী সেখানে বিচরণ শুরু করে থাকতে পারে। যদি সে ফিরে গিয়ে নিজের পুরনো এলাকা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তাহলে তাকে নতুন এলাকা খুঁজতে হবে অথবা অন্য বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হবে। পূর্ণবয়স্ক বাঘের মধ্যে এ ধরনের সংঘর্ষ কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়। তবে বাঘিনীটির চিকিৎসা ও করণীয় নির্ধারণ করতে গঠিত কমিটিতে সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, টেরিটরি বা বিচরণ এলাকা মূলত পাহারা দেয় পুরুষ বাঘ। এটি বাঘিনী হওয়াতে একটি সুবিধা হয়েছে। সাধারণত স্ত্রী বাঘ আরেকটি স্ত্রী বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় না। অন্যদিকে একটি পুরুষ বাঘ এক থেকে তিনটি পর্যন্ত স্ত্রী বাঘকে তার বিচরণ এলাকায় স্বাগত জানায়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ বাঘিনী অবমুক্ত করার সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ের মধ্যেই বাঘিনীটিকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে স্যাটেলাইট কলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাঘিনীটির বিচরণ এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে প্রাথমিকভাবে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে।’




