বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ এ সংকটে ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশে এ হার সবচেয়ে বেশি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশ করা 'দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬' শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটি সম্মিলিতভাবে তৈরি করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এতে দেখা গেছে, গত বছর পাকিস্তানে ৬৩ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য ছিল না, যেখানে বাংলাদেশে এই হার ৩৮.৬ শতাংশ।
আরো পড়ুন
ভেনেজুয়েলার মাদুরোর বিচার ২০২৭ সালের জুনে শুরুর প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
এ প্রতিবেদনে 'হেলদি ডায়েট বাস্কেট' বা স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা বলতে এমন খাবারকে বোঝানো হয়েছে, যা প্রতিদিন মাথাপিছু ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তি সরবরাহ করে। এর মধ্যে শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ, বাদাম ও বীজ, শাকসবজি, ফলমূল, তেল-চর্বি—এই ছয়টি খাদ্যগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ২.৬৯ বিলিয়ন বা ৩২.৭ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেননি। এ সংকটের হার আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি (৬৬.৬ শতাংশ)। এরপরই এশিয়া (২৮.৯ শতাংশ) এবং ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের (২৫.৭ শতাংশ) অবস্থান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা এখনো সাধ্যের বাইরে। তার মতে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ, মাংস ও ফলের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ এগুলো সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে দ্রুত দাম বাড়ে, কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে স্থানীয় বাজারে তা খুব ধীরগতিতে কমে। ফলে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও স্বাস্থ্যকর খাবার এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষের প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড়ের গড় খরচ ২০১৭ সালের ৩.০৯ ডলার পিপিপি (ক্রয়ক্ষমতার সমতা) থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪.৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এখানে 'পিপিপি' বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা বলতে বোঝায়—যুক্তরাষ্ট্রে ৪.৫৯ ডলারে যে পরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব, বাংলাদেশে ঠিক সেই একই পরিমাণ পণ্য কিনতে প্রয়োজনীয় সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা বা টাকার হিসাব।
আরো পড়ুন
কানের দুলের লোভে শিশু হত্যা, আলমারিতে মিলল মরদেহ
এ খরচের বড় অংশ ব্যয় হয় প্রাণিজ আমিষ, ফলমূল এবং শাকসবজি কিনতে। সেখানে শর্করাজাতীয় খাবারগুলোর পেছনে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেকটা কম। দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যকর খাবারের খরচের দিক থেকে ভুটান (৬.১৭ ডলার) এবং শ্রীলঙ্কার (৫.২১ ডলার) পর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্যহীন মানুষের হার সবচেয়ে বেশি হলেও সেখানে এর খরচ এ অঞ্চলে সবচেয়ে কম (৩.৯৪ ডলার)।
স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এটি কেনার সামর্থ্য আগের চেয়ে বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৬২.৮ শতাংশ বা ১০ কোটি ১৮ লাখ মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য ছিল না, ২০২৫ সালে তা কমে ৩৮.৬ শতাংশ বা ৬ কোটি ৭৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে মানুষের খাদ্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ আয় খাবারের দামের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় খরচ বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে এই খরচ ছিল ২.৯৪ ডলার এবং ২০২১ সালে ৩.৪৪ ডলার, তা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪.২৮ ডলারে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই খরচ ৪.৯১ ডলারে পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে না পারা মানুষের সংখ্যা ২.৯৭ বিলিয়ন (৩৭.৪%) থেকে কিছুটা কমে ২.৬৯ বিলিয়নে (৩২.৭%) নেমে এসেছে।
পুষ্টিকর খাবারকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে এ প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পরিস্থিতি অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার খরচ কমিয়ে আনা। এছাড়া পরিবহন ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারসংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খাদ্যের অপচয় রোধ করার ওপরও প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে।