চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলা বহুমুখী নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মায়াবী রূপ। বাংলাদেশে এমন উপজেলা হাতে গোনা দুয়েকটি। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, খাল ও সমতল ভূমিবেষ্টিত বাঁশখালীতে রয়েছে ২৫ কিলোমিটার বালুচর সমৃদ্ধ সৈকত, ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি হ্রদ ও প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা সম্বলিত নানা জীব বৈচিত্র্য নিয়ে বাঁশখালী ইকোপার্ক, ৩৬৬২ একর সীমানাজুড়ে পুুকরিয়ায় সুচারু চাঁনপুর বৈলগাঁও চা-বাগান, নাপোড়া পাহাড়ি এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সাজানো তারেক পার্ক, সমুদ্র মোহনায় খাটখালী মিনি বন্দর, বাহারছড়া ও খানখানাবাদের সমুদ্র উপকূলে বিশাল সমুদ্রচর, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও চিংড়ি চাষের মনলোভা দৃশ্য, লবণ উৎপাদনের মাধ্যমে পানি থেকে টাকা আয়ের মোহনীয় দৃশ্য, নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, পুরাকীর্তি, বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, কেয়াং এবং আলেম-ওলেমা, পীর-মাশায়েখ, দরবেশ-আউলিয়া এবং সাধু-সন্ন্যাসী তথা ভিক্ষুদের তীর্থভূমি। কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের নক্ষত্র। বাঁশখালী উপজেলা কক্সবাজার জেলার সাথে লাগোয়া একটি উপজেলা। অদূর ভবিষ্যতে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমিয়ে বাঁশখালীর উপর দিয়ে কক্সবাজারে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা স্থায়ীভাবে যাতায়াত করবে। বর্তমানেও আঞ্চলিক সড়ক হয়ে যানবাহান অস্থায়ীভাবে চলছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম-বাঁশখালী-কক্সবাজার মহাসড়কের নির্মিতব্য প্রস্তাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নজর দিলে বাঁশখালীকে পর্যটন সিটি হিসেবে রূপান্তর করা মোটেও অসম্ভব নয়। বাঁশখালী ইকোপার্কের সুউচ্চ পাহাড় থেকে চা বাগান ও সমুদ্র বালুচরে ক্যাবল কার সংযোজনে পর্যটনের আকর্ষণের মাত্রা বাড়ালে পর্যটন শিল্পে এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হবে। বহুমুখী সৌন্দর্যের অপরূপ মায়ায় প্রাকৃতিক সৃষ্টি, হূদয় ছোঁয়া অনন্য অনুভূতি, দুর্লভ মুহূর্তে প্রকৃতির নানাবিধ ঘটনায় দেশ-বিদেশের পর্যটকরা নিঃসন্দেহে বিমোহিত হবেন। শিল্প-সংস্কৃতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে এলাকার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হবে নতুন জাগরণ। বাঁশখালী ইকোপার্ককে ঘিরে এখন পর্যটকদের আগ্রহের শেষ নেই। নায়ক-নায়িকারাও শুটিং করার জন্য বেছে নিচ্ছেন এ স্থানটিকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ইকোপার্ককে গবেষণা কাজেও ব্যবহার করছেন। বাঁশখালী ইকোপার্কে রয়েছে বহুমুখী কৃত্রিম সৌন্দর্যের স্থাপনা আর বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু। বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি, জলজ উদ্ভিদ, লেকের বিশাল জলরাশি, কাশফুলের দৃশ্য ও বন্য প্রাণীর সুরেলা কোলাহলে এক অন্যন্য অনুভূতি সৃষ্টি হয় ছয় ঋতুতে। সারি সারি পাহাড় চূড়ায় নানা প্রজাতির বৃক্ষের সমাহার গ্রাম্য বধূর মতোই শান্তরূপ নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সুউচ্চ পাহাড়ের শীর্ষদেশে উঠে অনায়াসে দূরবীন ছাড়া খালি চোখেই দেখা যায় অদূরে বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলরাশি। বিকেলে উপভোগ করা যায় সূর্যাস্ত দেখার দুর্লোভ মুহূর্ত। বাঁশখালীর পশ্চিমাঞ্চলে ২৫ কিলোমিটার সমুদ্র বালুচর অযত্ন অবহেলায় পড়ে রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন নাপোড়া তারেক পার্ক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাঁশখালী উপকূলকে রক্ষণাবেক্ষণ করে সরাসরি কক্সবাজারের বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোললে বহুমুখী সুবিধা সৃষ্টি হবে। প্রতিবছর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূল রক্ষা পাবে, দেশীয় সম্পদ চোরাচালান রোধ করা যাবে। মৎস্য চাষিরা জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাবে, পর্যটন শিল্পে ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি হবে। কুতুবদিয়া চ্যানেল, মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁশখালী চ্যানেল নিয়ে সংযোজিত মোহনায় সামুদ্রিক জলের নানা বর্ণিল দৃশ্য সহজেই দেখা যাবে। উপকূলবর্তী জমিগুলোতে লবণ উৎপাদন, চিংড়ি চাষ ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের দৃশ্য দেখাও সম্ভব হবে। এ ছাড়া ব্রিটিশ যুদ্ধে গণ্ডামারার সাগরবক্ষে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান, সাধনপুরে কামানের মহড়ার দৃশ্য, ইলশার ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাণীগ্রামের শিখ মন্দিরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নানা ধরনের পুরাকীর্তি সত্যিই দেখার মতো। পুরো বাঁশখালী ঘিরে রহস্যের যে অফুরন্ত ভাণ্ডার তা পর্যটন শিল্পরূপে প্রতিফলন ঘটুক তা সকলের প্রত্যাশা। বাঁশখালীর সম্ভাবনাময় স্থানসমূহ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে অদূর ভবিষ্যতে বাঁশখালীকে পর্যটন সিটি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।