• ই-পেপার

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে বন্দুক হামলা, নিহত ১

কারগিল যুদ্ধ

২৭ বছর পর সামনে এলো ভারতকে ইসরায়েলের গোপন সহযোগিতার তথ্য

অনলাইন ডেস্ক
২৭ বছর পর সামনে এলো ভারতকে ইসরায়েলের গোপন সহযোগিতার তথ্য
সংগৃহীত ছবি

কারগিল যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা পুনর্দখল করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছিল ইসরায়েল। যুদ্ধের ২৭ বছর পর প্রথমবারের মতো সেই গোপন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার তথ্য প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাবেক দুই কর্মকর্তা।

তাদের দাবি, এই সহযোগিতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার, প্রযুক্তিগত কর্মশালা এবং তেল আবিব ও নয়াদিল্লির মধ্যে গভীর রাতে হওয়া জরুরি যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। সেই সহায়তা ভারতীয় বিমানবাহিনীর অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারগিল বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তারা এসব তথ্য জানান। সাক্ষাৎকারে অংশ নেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সাবেক বেসামরিক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আমি এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাবেক যুদ্ধবিমানচালক ও মিরাজ স্কোয়াড্রনের সাবেক কমান্ডার শ্লোমো। তারা জানান, প্রথমে এটি ছিল একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা প্রকল্প। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ শুরু হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি জরুরি সামরিক মিশনে পরিণত হয়। তাদের ভাষ্য, এই সহযোগিতা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন বিজয়’ এবং বিমানবাহিনীর ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এ বড় ভূমিকা রাখে। এই দুই অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে কারগিল এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়।

এই সহযোগিতার শুরু ১৯৯৬ সালে। সেই বছর নভেম্বর মাসে ভারত ও রাফায়েলের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমানে ইসরায়েলের তৈরি ‘লাইটেনিং’ লক্ষ্যনির্ধারণ ব্যবস্থা বসানোর কাজ শুরু হয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিমান থেকে আরো নিখুঁতভাবে লক্ষ্য শনাক্ত করা এবং বোমা নিক্ষেপ করা সম্ভব হয়। আমি জানান, আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ার আগেই এই প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তার তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডেভিড জেইট। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রকৌশলী ও ভারতীয় কর্মকর্তারা ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেডের (এইচএএল) সঙ্গে একাধিক পরীক্ষা চালান। মার্চ মাসে প্রথম ধাপের পরীক্ষা শেষ হলেও তখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি ছিল।

আমি জানান, ঠিক সেই সময় একটি জরুরি ফোনকল আসে। ফোনটি আসে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে নয়, ইসরায়েলের তেল আবিবে অবস্থানরত ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা প্রতিনিধি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এন. এ. কে. ব্রাউনের কাছ থেকে। পরে তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান হন। ফোনটি আসে শুক্রবার রাতে। ওই সময় ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিন ‘শাবাত’ শুরু হয়। সাধারণত এ সময় ইসরায়েলে সব ধরনের কাজ প্রায় বন্ধ থাকে। তবুও জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়। রবিবার সকালে আমি, শ্লোমো এবং আরও কয়েকজন প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। তারা তখনও জানতেন না, ভারতে পৌঁছে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ভারতে পৌঁছানোর পর একটি বিমানঘাঁটির কমান্ডিং কর্মকর্তা তাদের জানান, পরিস্থিতি ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। এরপর তারা কয়েক দিন ধরে দিন-রাত কাজ করেন। কখন দেশে ফিরতে পারবেন, সেটিও তাদের জানা ছিল না।

শ্লোমো বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তিনটি ভিন্ন দেশের প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কার্যকর করা। ইসরায়েলের তৈরি লক্ষ্যনির্ধারণ ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল ফ্রান্সে তৈরি মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমানে। আর সেই ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি লেজারনির্দেশিত বোমার সঙ্গে। অর্থাৎ তিনটি ভিন্ন দেশের প্রযুক্তিকে এমনভাবে সমন্বয় করতে হয়েছে, যাতে সবকিছু একসঙ্গে নির্ভুলভাবে কাজ করে। তিনি বলেন, এই কাজ করতে তাকে বহুবার ভারতে আসতে হয়েছে। অনেক সময় বিমানের ইঞ্জিন বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিত। তখন মাটিতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রযুক্তিগত ত্রুটি ঠিক করতে হতো। সমস্যা সমাধান না হলে পাইলটরা আকাশে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও করতে পারতেন না।

ইসরায়েলি দুই কর্মকর্তা ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্যদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বিশেষভাবে স্কোয়াড্রন লিডার গেরশন অরোরা এবং তৎকালীন তরুণ কর্মকর্তা রাজীব কুমার দাশের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। পরে রাজীব কুমার দাশ গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। এ ছাড়া এয়ার মার্শাল রঘুনাথ নাম্বিয়ার এবং এয়ার মার্শাল নর্মদেশ্বর তিওয়ারির ভূমিকাও তারা তুলে ধরেন। শ্লোমোর মতে, টাইগার হিলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর নিখুঁত হামলা ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার ভাষায়, ওই হামলাই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অন্যতম ঘটনা ছিল।

আমি জানান, ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে তিনি শতাধিকবার ভারত সফর করেছেন। তার মতে, এই সহযোগিতা শুধু একটি পেশাগত সম্পর্ক ছিল না। সময়ের সঙ্গে এটি ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে পরিণত হয়। তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতার পর তিনি ভারতের প্রেমে পড়ে যান। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে তিনি ব্যবসায়িক নয়, বরং ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বলে মনে করেন। অন্যদিকে শ্লোমো জানান, তার ছেলে বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসে কাজ করেন। কাজের সূত্রে তিনি প্রায় প্রতি মাসেই ভারতে আসেন। তার মতে, তিন দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে শ্লোমো ব্যক্তিগত একটি তথ্যও জানান। তিনি বলেন, আগামী মাসে জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি কারগিল সফরে যাবেন। সেখানে তিনি কারগিল যুদ্ধস্মৃতিস্তম্ভ এবং সেই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দেখতে চান, যেখানে বহু বছর আগে পরিচালিত একটি গোপন প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভারতের যুদ্ধজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত

অনলাইন ডেস্ক
প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত
সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা, বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা আরো বাড়ছে। দুই দেশ এখন নির্ভরযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারেও একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী সচিব এস পল কাপুর এ তথ্য জানিয়েছেন। 

হুভার ইনস্টিটিউটে ভারত নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনডোলিজা রাইস এবং ভারতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড সি মুলফোর্ডও অংশ নেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এস পল কাপুর বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আরো বেড়েছে। তার ভাষায়, এই সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন আরো শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এখন প্রতিরক্ষা এবং বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা আরো বাড়ানোর কাজ করছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে নির্ভরযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হবে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বড় প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের কাঠামোতে সই করে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো স্থল, সমুদ্র, আকাশ, মহাকাশ এবং সাইবার—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের যৌথভাবে কাজ করার সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করা। দুই দেশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করছে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে ভারত। ২০০২ সাল থেকে দেশটি অ্যাপাচি ও চিনুক যুদ্ধ হেলিকপ্টার, সি-১৭ ও সি-১৩০জে সামরিক পরিবহন বিমান, পি-৮আই সামুদ্রিক টহল বিমান এবং এম৭৭৭ হাউইটজার কামানসহ বিভিন্ন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি ভারতের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতেও আগ্রহ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগ এবং প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। ভারত সরকার ‘শান্তি’ আইন পাস করে পারমাণবিক প্রকল্পে দায়বদ্ধতা-সংক্রান্ত কিছু নিয়ম শিথিল করার পর নতুন বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাই করতেই এই সফর করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
 

ভারতে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নাম ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ

অনলাইন ডেস্ক
ভারতে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নাম ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ
ছবি: রয়টার্স

ভারতে বেশি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় আর ‘এনার্জি ড্রিংক’ নামে বিক্রি করা যাবে না। দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন কম্পানিকে এই নাম ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের দাবি, ভারতে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নামে কোনো নির্ধারিত খাদ্যমান বা সরকারি সংজ্ঞা নেই। তাই এই নাম ব্যবহার করলে ভোক্তারা বিভ্রান্ত হতে পারেন।

এদিকে বিশ্বের দ্রুত বাড়তে থাকা এনার্জি ড্রিংকের বাজারগুলোর একটি হলো ভারত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশটির এনার্জি ড্রিংকের বাজার ১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এমন সময় সরকারের এই সিদ্ধান্তে বড় ধরনের চাপে পড়েছে পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। জুলাইয়ের শুরুতে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান সংস্থা (এফএসএসএআই) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানায়, তারা বিভিন্ন কম্পানিকে নোটিশ পাঠিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে ভারতে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নামে কোনো স্বীকৃত মান নেই। তাই কোনো পানীয়কে ‘শরীর ও মনকে চাঙা করে’ বা ‘সাধারণ দুর্বলতা দূর করে’—এভাবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর। তবে রয়টার্সের হাতে আসা গোপন নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কম্পানিগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে পাঠানো নির্দেশ আরো কঠোর ছিল। ওই নির্দেশে পেপসি, রেড বুল, মনস্টার বেভারেজ, মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স এবং হেল এনার্জিকে তাদের পণ্যের গায় ‘এনার্জি ড্রিংক’ বা এ ধরনের অন্য কোনো নাম ব্যবহার বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের দাবি, বহু বছর ধরে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নামেই এসব পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে। হঠাৎ এই নাম সরিয়ে ফেলতে হলে ব্র্যান্ডের পরিচিতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বিক্রিও কমে যেতে পারে। এ নিয়ে শুক্রবার শিল্প খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান সংস্থার একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত দুই ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী রাজিত পুনহানি ব্যাবসায়িক ক্ষতির যুক্তি গ্রহণ করেননি। তিনি বলেন, কম্পানিগুলো চাইলে এই সিদ্ধান্ত আদালতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে এফএসএসএআই, রাজিত পুনহানি কিংবা সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ কম্পানি এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। শুধু পেপসি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ভারত সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের পর শিল্প খাত শেষ পর্যন্ত নতুন নিয়ম মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। নতুন লেবেল ব্যবহার করতে কম্পানিগুলোকে ৯০ দিনের সময় দিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান সংস্থা। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে তাদের পণ্যের মোড়ক থেকে ‘এনার্জি ড্রিংক’ নাম সরিয়ে নতুনভাবে বাজারজাত করতে হবে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এনার্জি ড্রিংক নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, এসব পানীয়তে সাধারণত অতিরিক্ত ক্যাফেইন, চিনি এবং টরিন নামে একটি অ্যামিনো এসিড থাকে। বেশি পরিমাণে এসব উপাদান শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে আগামী বছরের এপ্রিল থেকে ইংল্যান্ডে ১৬ বছরের কম বয়সীদের কাছে বেশি ক্যাফেইনযুক্ত এনার্জি ড্রিংক বিক্রি নিষিদ্ধ করা হবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে এসব পানীয়কে ‘উত্তেজক পানীয়’ নামে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এনার্জি ড্রিংকের ব্যবসা মূলত তাৎক্ষণিক শক্তি পাওয়ার ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে রেড বুলের পরিচিত স্লোগান হলো, ‘রেড বুল আপনাকে ডানা দেয়।’ ভারতে আবার পেপসির স্টিং পানীয়র বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, এটি শরীরজুড়ে বিদ্যুতের মতো শক্তি ছড়িয়ে দেয় এবং ‘বিদ্যুতের মতো শক্তি’ দেয়। এ কারণেই শিল্প খাতের আশঙ্কা, ‘এনার্জি ড্রিংক’ নাম বাদ দিলে এসব ব্র্যান্ডের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভারতের বড় পানীয় কম্পানিগুলোর সংগঠন ইন্ডিয়ান বেভারেজ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তারা সব নিয়ম মেনে চলতে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতি তৈরিতে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে ৬ জুলাই খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাকে পাঠানো একটি গোপন চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, নোটিশ প্রকাশ্যে আনলে কম্পানিগুলোর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, এতে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে সমস্যা হবে এবং ভোক্তারাও বিভ্রান্ত হবেন। সংগঠনটি আরো বলেছে, বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা উচিত। এতে নিয়ম বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং আদালতে মামলাও কম হবে। তারা আরো দাবি করেছে, ব্যবসার জন্য পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

২০১৭ সালে পেপসি স্টিং বাজারে আনার পর থেকেই ভারতে এনার্জি ড্রিংকের বাজার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ রুপির প্লাস্টিক বোতলে বিক্রি হওয়া স্টিং বিশেষ করে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ এবং গ্রামীণ এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে এটি বাজারের শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে যায়। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের এনার্জি ড্রিংকের বাজারের খুচরা বিক্রি ১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। প্রতি বছর গড়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে এই বাজার বাড়বে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায়ও বেশি। এ ছাড়া ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এ ধরনের পানীয়র বিক্রি বছরে প্রায় ১০০ শতাংশ হারে বেড়েছে। উত্তর প্রদেশের ২৪ বছর বয়সী মোটরসাইকেল মেকানিক সানি রাজবংশী নিয়মিত স্টিং ও রিলায়েন্সের ক্যাম্পা এনার্জি পান করেন। তিনি বলেন, ক্ষুধা লাগলে বা ধূমপান করতে বাইরে গেলে তিনি একটি বোতল কিনে পান করেন। তার ভাষায়, ‘এতে আমার পেট ভরে যায়। কাজ করার শক্তিও পাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি এগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি।’ 

সরকারের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে দেখা গেছে, চলতি মাসে রাজস্থান রাজ্যে অভিযান চালিয়ে স্টিং, ক্যাম্পা এনার্জি ও রেড বুলের হাজার হাজার বোতল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮ জুলাই রাজ্য সরকার অ্যামাজন, ওয়ালমার্টের ফ্লিপকার্ট, ব্লিংকিট এবং সুইগির ইনস্টামার্টসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, কোনো পণ্য যেন অনলাইন প্ল্যাটফরমে  ‘এনার্জি ড্রিংক’ নামে প্রচার বা বিক্রি করা না হয়।

অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার ঢেউয়ে মালয়েশিয়ায় বন্ধ রোহিঙ্গা স্কুল

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার ঢেউয়ে মালয়েশিয়ায় বন্ধ রোহিঙ্গা স্কুল
ছবি: রয়টার্স

মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী ১২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী নুর গত জুন মাস থেকে আর স্কুলে যেতে পারছে না। স্কুলে যাওয়ার পথে দুই ব্যক্তি তাকে মারধরের হুমকি দেয়। এরপর থেকে ভয়ে তার পরিবার তাকে আর স্কুলে পাঠায়নি।

নুর জানায়, ওই দুই ব্যক্তি তাকে বলেছিল, "তুমি স্কুলে যেতে চাও কেন? আমাদের দেশ দখল করতে চাও?" নিরাপত্তার কারণে নুরের পরিবার তার পুরো নাম প্রকাশ করতে চায়নি। অধিকারকর্মী ও শিক্ষকদের ভাষ্য, নুরের মতো আরো অনেক রোহিঙ্গা শিশু একই ধরনের হুমকি, হয়রানি ও ভয়ের মুখে পড়েছে। এর ফলে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শরণার্থীদের জন্য পরিচালিত একের পর এক শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশেই বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ বলেন, অনেক শিশু এখন এতটাই ভয় পেয়েছে যে তারা ঘরের বাইরে বের হতেও চায় না। তার ভাষায়, একটি শিশুকে কয়েক দিনের জন্য ভয় দেখানো মানে শুধু ওই সময়টুকুর ক্ষতি নয়। এতে তাদের মনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি হয়।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে অন্তত নয়টি শরণার্থী স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। অনলাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য, উসকানিমূলক পোস্ট এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের ওপর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতাও বেড়েছে। স্কুল বন্ধ ও এসব ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলেও মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি। মালয়েশিয়া সরকার রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসাবে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন তাদের বিরুদ্ধে করোনা ছড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতিকে অসম্মান করা এবং চাকরির প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মতো অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী লুকানিসমান আওয়াং সাউনি পার্লামেন্টে বলেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে দেশের মানুষ নিজেদের ওপর অতিরিক্ত চাপ অনুভব করছেন।

গত মে মাস থেকে আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা বাড়তে শুরু করে। মেটার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস এবং বাইটড্যান্সের টিকটকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এসব পোস্টে একটি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর কোরবানির সময় গরু জবাই করার ধর্মীয় রীতিকে পরিচ্ছন্নতা-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। জুন মাসে সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি অনলাইন আবেদন চালু হয়। পরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের পর সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এর আগেই প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন। শারিফা শাকিরাহ বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা করোনা মহামারির সময়কার চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্টে রোহিঙ্গাদের, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে। মেটার মালিকানাধীন থ্রেডসে একটি আলোচনার শিরোনাম ছিল 'লেমপাং রোহিঙ্গা'। মালয় ভাষায় যার অর্থ, 'রোহিঙ্গাকে চড় মারো'। কিছু জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্ব মানুষকে রোহিঙ্গা বসতির ভিডিও ধারণ করতে এবং তাদের অবস্থান কর্তৃপক্ষকে জানাতে উৎসাহিত করেছেন। তবে জুন মাসে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল বলেন, সরকার চাইলে ইচ্ছেমতো শরণার্থীদের দেশ থেকে বের করে দিতে পারে না। তিনি জানান, জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সরকার ব্যবস্থা নেবে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন 'আর্টিকেল ১৯' বলেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি বেড়েছে। এর ফলে তদন্ত, অভিযান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘটনা ঘটছে। তবে সম্প্রদায়টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানবাধিকারভিত্তিক কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে সংগঠনটির অভিযোগ। সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, সরকারের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরো উত্তেজনা তৈরি করছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে বাড়তে থাকা ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য এবং মানবিক মর্যাদা অস্বীকারের প্রচারণা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। সংস্থাটি জানায়, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা করছে। তবে বিবৃতিতে স্কুল বন্ধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমতি ছাড়া পরিচালিত হওয়ায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে শরণার্থীদের আইনগতভাবে কাজ করার অনুমতি নেই। তাদের সন্তানরাও সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। তাই তারা মূলত বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র ও অনানুষ্ঠানিক স্কুলের ওপর নির্ভরশীল। নুরের ঘটনার পর তার স্কুলের শিক্ষক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ করে দেন। একই এলাকার আরো দুটি শরণার্থী স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়।

ওই স্কুলের শিক্ষক জানান, অনেক সময় রোহিঙ্গা শিশুদের সরকারি খেলার মাঠ থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২২ সালে এই শিক্ষা কেন্দ্র চালু করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে তারা অন্য কোনো দেশে পুনর্বাসিত হতে পারে অথবা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার স্কুল রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে মালয়েশিয়ায় বসবাসে উৎসাহিত করে না বা স্থানীয়দের চাকরি নিতে সহায়তা করে না। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই স্কুলের মাধ্যমে তিনি শিশুদের আইন মেনে চলতে শেখানোর চেষ্টা করছেন।

উত্তরাঞ্চলের কেদাহ রাজ্যের একটি শরণার্থী স্কুলও চলতি মাসে কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় অনুমতির অভাবের কথা বলা হয়। এর আগে স্কুলটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা ও শিক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠার পর নিরাপত্তাজনিত কারণ বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে অন্তত নয়টি শরণার্থী স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।এখনও চালু থাকা কয়েকটি স্কুল নিরাপত্তার জন্য নতুন ব্যবস্থা নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরতে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের বাইরের কার্যক্রমও বন্ধ রাখা হয়েছে।

অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে সামাজিক সমস্যা আরো বাড়বে। তার মতে, এতে রোহিঙ্গা কিশোরীদের অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে অনেক শিশু রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে বা ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, অনেকেই অভিযোগ করেন যে রোহিঙ্গা শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করে। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকলে এমন শিশুর সংখ্যা আরো বাড়বে। অধিকারকর্মীদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতামূলক কনটেন্ট কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। আর্টিকেল ১৯ জানিয়েছে, তাদের অভিযোগের পর মেটা ও টিকটক কিছু পোস্ট সরিয়ে ফেলেছে। তবে অনেক পোস্ট এখনও অনলাইনে রয়েছে। 

রয়টার্সের পাঠানো ১০টি পোস্টের মধ্যে মেটা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস থেকে সাতটি সরিয়েছে। টিকটক ১১টি পোস্টের মধ্যে আটটি সরিয়ে দিয়েছে। আর্টিকেল ১৯-এর ভাষ্য, নীতিমালা থাকলেও এসব প্ল্যাটফর্মে তার প্রয়োগ সব সময় একরকম হয় না। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অনেক সময় সাংকেতিক ভাষা, ছবি বা স্থানীয় ভাষার সূক্ষ্ম অর্থ বুঝতে পারে না। মেটা ও টিকটক জানিয়েছে, তারা ঘৃণামূলক বক্তব্য ঠেকাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও মানব পর্যালোচনা—দুই পদ্ধতিই ব্যবহার করে। টিকটক আরো জানায়, ক্ষতিকর মন্তব্য করার আগে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করার ব্যবস্থাও তাদের প্ল্যাটফর্মে রয়েছে। 

স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন নুরের মতো অনেক শিশুর সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নুর রয়টার্সকে বলে, 'আমি যদি স্কুলে যেতে না পারি, তাহলে কিছুই শিখতে পারব না। আর জীবনে কিছুই হতে পারব না।'