সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার শুরু হওয়া সংঘর্ষে নিহত চার মার্কিন সেনার নাম পেন্টাগনের সরকারি ‘ইরান যুদ্ধ’ হতাহত তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য আলাদা একটি নতুন বিভাগ তৈরি করা হয়েছে।
এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সঠিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে কি না। বিশেষ করে ইরানের ওপর হামলা বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করার সময় ট্রাম্প প্রশাসন সেনাদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অনেক মার্কিন নাগরিক এই সংঘাতের বিরোধিতা করলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চায়, সে বিষয়েও খুব কম তথ্য দিচ্ছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। পেন্টাগনের ‘ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম’ (ডিসিএএস) নামের অনলাইন হতাহত বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে এতদিন ইরান সংঘাতে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের সরকারি তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছিল।
তবে গত সপ্তাহে ওই সিস্টেম থেকে ইরান যুদ্ধের তালিকা সরিয়ে নেওয়া হয় চার নিহত সেনার নাম। একই সঙ্গে কয়েক ডজন আহত সেনার তথ্যও ওই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর রবিবার ওয়েবসাইটে ‘বিদেশি অভিযান’ নামে নতুন একটি বিভাগ যুক্ত করা হয়। সেখানে ওই চার নিহত সেনার নাম প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৭ জন আহত সেনার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। তবে এই ২০৭ জনের সবাই ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে আহত হয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড প্রশ্নগুলো পেন্টাগনের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তবে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আরো পড়ুন
‘প্রেমে রাজি না হলে পদ্মায় ফেলে দেব’– রাবি ছাত্রীকে সিনিয়র শিক্ষার্থী
এর আগে পেন্টাগনের মুখপাত্র জোয়েল ভালদেজ বলেন, অনলাইন তালিকায় হতাহতের সংখ্যা কমে যাওয়া যুদ্ধের প্রাণহানি লুকানোর কোনো চেষ্টা নয়। তিনি দাবি করেন, এটি কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা ও সাময়িক তথ্যগত বিভ্রাটের কারণে হয়েছে। তার ভাষায়, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হচ্ছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে ইরান যুদ্ধে ১৮ জন নিহত এবং ৪৮২ জন আহত সেনার তথ্য দেখানো হচ্ছিল। তালিকায় বলা হয়েছিল, গত মাসে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পর সংঘর্ষ আবার শুরু হলে চার সেনা নিহত হন। এর মধ্যে ১৭ জুলাই জর্ডানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তিন সেনা নিহত হন। পরদিন ইরাকের একটি ঘাঁটিতে ইরানের একটি ড্রোন বিস্ফোরণে আরেক সেনা নিহত হন।
জর্ডানে নিহত দুই সেনার মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়ার সময় পেন্টাগন জানিয়েছিল, তারা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সহায়তা করছিলেন। অন্য দুই সেনার মৃত্যুর ক্ষেত্রে শুধু বলা হয়েছিল, তারা বিদেশি অভিযানে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছিলেন। মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইরান সামরিক সংঘাতে’ ১৮ জন নিহত হয়েছেন। তবে পরদিন বুধবার পেন্টাগনের অনলাইন ব্যবস্থায় আবার সংখ্যা পরিবর্তন হয়ে ১৪ জন নিহত এবং ৪২০ জন আহত দেখানো হয়। একই সময়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, বাস্তবে আহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ৫০০ জনের বেশি হতে পারে। সেদিন পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, হতাহতের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি ছিল একটি 'অস্থায়ী তথ্যগত বিঘ্ন'।
আরো পড়ুন
দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতে সোচ্চার বসুন্ধরা শুভসংঘ নকলা উপজেলা শাখা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাতের প্রথম পর্যায়ে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। এরপর এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। জুনের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিও হয়। তবে সেই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৭ জুলাই ইরান হরমুজ প্রণালিতে ওমান উপকূলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলা নৌপথে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় বলে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে। এর জবাবে মার্কিন বাহিনী পাল্টা হামলা শুরু করে। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। পেন্টাগনের নতুন ‘বিদেশি অভিযান’ বিভাগে বলা হয়েছে, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষের হতাহতের হিসাব সেখানে রাখা হচ্ছে।
নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর পেন্টাগন সামরিক অভিযান ও হতাহতের বিষয়ে আগের তুলনায় কম তথ্য প্রকাশ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মে মাসের শুরুর পর থেকে পেন্টাগন যুদ্ধ নিয়ে আর কোনো নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেনি। একই সঙ্গে সেন্ট্রাল কমান্ডের কর্মকর্তারাও সাংবাদিকদের সর্বশেষ হতাহতের তথ্য দেওয়া বন্ধ করেছেন। তবে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, 'ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের' তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই তারা স্বচ্ছতা বজায় রাখছেন। তাদের বক্তব্য, অনলাইন ব্যবস্থার সাময়িক সমস্যার কারণে তথ্যের পরিবর্তন হয়েছে, তবে হতাহত সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।