ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর নাম এখন সবার জানা। কোনো ভালো কাজের জন্য নয়। ছাত্ররা তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে বলে ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম এখন সবার মুখে মুখে। তবে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন আজকের নয়। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে ককরোচ জনতা পাটি-সিজেপির আন্দোলন।
গত ৩ মে নিট পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রী তো আর প্রশ্নপত্র ফাঁস করেননি। তবু ঘটনার দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পদতাগের দাবি বা পদত্যাগের ঘটনা, এমনকি ভারতের রাজনীতিতে বিরল নয়।
তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনকে বলা যায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ধর্মেন্দ্র প্রধানের কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রী হয়ে ওঠার শুরুটাও কিন্তু রাজপথে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়েই ছাত্রনেতা হিসেবে সবার নজর কেড়েছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
চলুন একটু পেছনে ফেরা যাক। পেছনে মানে ২৯ বছর পেছনে। ১৯৯৭ সালের কথা, তখন জানকী বল্লভ পট্টনায়ক ওড়িশার কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। ভুবনেশ্বরে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, স্থানীয় একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে হাজার দেড়েক শিক্ষার্থী রাজ্য সচিবালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। সেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের নেতা ছিলেন আজকের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন জানকী পট্টনায়ক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ-এবিভিপি’র জাতীয় সম্পাদক হিসেবে ভুবনেশ্বরের রাজপথে নেমেছিলেন প্রধান। পুলিশ পিটিয়ে সেদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের হাড় ভেঙ্গে দিয়েছিল।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বরাতে ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানায় যে, প্রধান ১৮ বছর বয়সে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-আরএসএস’এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপির একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দুইবার এবিভিপির জাতীয় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৭ সালে ওড়িশায় একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় প্রধান এবিভিপির জাতীয় সম্পাদক ছিলেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।
ভুবনেশ্বরের আরএমডি ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের জুনিয়র প্রশান্ত রাউত সেই বিক্ষোভের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ’আমরা সচিবালয়ের সামনে ওড়িশা সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলাম। সেখানে আমাদের সাথে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র যোগ দিয়েছিল।’
তার বিবরণ অনুযায়ী, পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হওয়ার আগে পর্যন্ত বিক্ষোভটি শান্তিপূর্ণ ছিল। রাউত বলেন, ’আমরা বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। প্রধানকে সে সময় খুব নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছিল। পুলিশের পিটুনিতে তার শরীরের কয়েকটি হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল।’
রাউতের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ওই সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো প্রায়শই সহিংস রূপ নিত। তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্বাচন চলাকালীন প্রধানের জেতার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠলে জনতা দলের সমর্থকেরা তার ওপর হামলা চালায়। সেই ঘটনার কথা মনে করে রাউত বলেন, ’তিনি আজ কেবল ভাগ্যের জোরেই বেঁচে আছেন।’
ছাত্র রাজনীতিতে কাটানো এই বছরগুলোই বিজেপির ভেতরে প্রধানের দীর্ঘ সাংগঠনিক ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও সামলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রায়ই ওড়িশাজুড়ে কয়েক দশক ধরে বিজেপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক বিস্তারে তার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। তার সেই প্রচেষ্টারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০২৪ সালে, যখন নবীন পট্টনায়কের অধীনে থাকা বিজু জনতা দল-বিজেডি’র দুই দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ওড়িশায় প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে বিজেপি।
পদত্যাগের দাবির ব্যাপারে এততিন চুপই ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তবে গত সোমবার বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামার পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। তবে হামলার পরদিন গত মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, নিট ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের উত্তর পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুঈটার)এ ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, ‘সংসদ কক্ষে নিট নিয়ে আলোচনা করতে এবং আমাদের তরুণদের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগ নিরসন করতে আমাদের সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারতের শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে আরও অনেক বেশি ভালো কিছু পাওয়ার দাবি রাখে। বিশৃঙ্খলার চেয়ে স্থায়িত্ব, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘ্ন ঘটানোর চেয়ে দায়িত্বশীলতা তাদের প্রাপ্য।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করার চেয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমাদের তাদের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, সংস্কার করতে হবে এবং প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমাদের সরকার ঠিক এই বিষয়গুলো পূরণ করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজনীতিতে যার উত্থান, আজ সেঈ প্রশ্নপত্র ফাঁসই তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে দাড় করিয়ে দিয়েছে। এ যেন ইতিহাসের মখোমুখি হওয়া। ২৯ বছর আগে ধর্মেন্দ্র প্রধান ছিলেন ব্যারিকেডের এপারে, আজ তিনি ওপারে।








