প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুতে কিছুটা বিপাকেই পড়েছে ইউক্রেন। গ্রাহাম ছিলেন ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গ্রাহাম ১০ বার কিয়েভ সফর করেছেন, যার সর্বশেষটি ছিল গত সপ্তাহে। কিয়েভ থেকে ফেরার কয়েক ঘণ্টা পরই শনিবার সন্ধ্যায় আকস্মিক অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন সাউথ ক্যারোলাইনার এই সিনেটর।
লিন্ডসে গ্রাহামের হঠাৎ মৃত্যুতে শোকাহত ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিভি রিডেনকো তার শোকবার্তায় বলেন, ‘রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনজুড়ে সিনেটর গ্রাহাম ইউক্রেনের পাশে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সবসময় অবিচল ছিলেন।’
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্রাহাম সেখানে অস্ত্র পাঠানো থেকে শুরু করে অব্যাহত সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে গেছেন। রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইন প্রণয়নেও সহ-উদ্যোক্তা ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এই সহযোগী। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক বৈরিতা সম্পর্কেও পুরোপুরি সচেতন ছিলেন তিনি। ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়েই তিনি ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষা এবং ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কৌশলী ভূমিকা রাখেন।
গত সপ্তাহে সর্বশেষ কিয়েভ সফরে গ্রাহাম ইউক্রেনের একটি ড্রোন কারখানা পরিদর্শন করেন এবং আবারও ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের কথা জোর দিয়ে বলেন। কিয়েভ ছাড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ করার সূত্র আমাদের কাছে রয়েছে। ইউক্রেনকে আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করুন। যারা রাশিয়াকে সমর্থন করছে তাদের জানিয়ে দিন যে, এই সমর্থন অব্যাহত রাখলে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।’ কিয়েভ থেকে ফেরার কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া দখল করে নেয়, তখন গ্রাহামই প্রথম ইউক্রেনকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছিলেন, কারণ সে সময় দেশটির সামরিক বাহিনীর সক্ষমতায় মারাত্মক ঘাটতি ছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হত্যায় তার ঘনিষ্ঠ কাউকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পুতিনের সম্ভাব্য হত্যাকারীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি নিজের দেশ ও বিশ্বের অনেক বড় উপকার করবেন।’ পরবর্তীতে তিনি পুতিনকে একজন ’সন্ত্রাসী ও গুণ্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
লিন্ডসে গ্রাহাম এমন একটি আইনেরও সমর্থন করেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের কোনো অংশে রাশিয়ার সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত রাখতো এবং ইউক্রেনের মাটিতে মার্কিন সৈন্যদের দিয়ে ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলোকে প্রশিক্ষণ দিত। যদিও এ প্রস্তাব কখনো আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া তিনি ‘স্ট্যান্ড উইথ ইউক্রেন অ্যাক্ট’-এরও সহ-প্রণেতা ছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে অস্ত্র ও সরঞ্জামের সরবরাহ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো। এই বিলের পক্ষে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বকে একটি বার্তা দিচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের পাশে থাকবে, তাদের লড়াই আমাদের লড়াই এবং তাদের ও আমাদের উভয়ের স্বাধীনতাই আজ বিপন্ন।’ তবে গ্রাহামের এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি।
গ্রাহাম ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন। গতবছরের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির উত্তপ্ত বৈঠকের পর গ্রাহাম প্রথমে জেলেনস্কির পদত্যাগও দাবি করেছিলেন। তবে খুব শিগ্গিরই তিনি আবার ইউক্রেনের পক্ষে ওকালতির শুরু করেন। তিনি ট্রাম্পকে ইউক্রেনে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করেন এবং রাশিয়ান তেল আমদানিকারী যে কোনো দেশের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের খসড়া তৈরি করেন।
লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যু ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।