একসময় পাকিস্তানের কৃষি ও রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল তুলা। দেশটির গ্রামীণ অর্থনীতি, সুতা ও বস্ত্রশিল্প এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ফসল এখন বড় সংকটে। তুলার উৎপাদন কমে যাওয়ায় নিজেদের চাহিদা মেটাতে পাকিস্তানকে ক্রমেই বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একসময়ের তুলা উৎপাদনকারী দেশটি এখন বিপুল পরিমাণ তুলা ও সুতা আমদানি করছে।
সংকটের গভীরতা কতটা ভয়াবহ, তা স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি পাকিস্তানের রেকর্ড পরিমাণ তুলা আমদানির ক্র্যাশ অর্ডারে। স্থানীয় তুলা বাজারে ওঠার আগেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২ লাখা ৬ হাজার বেল তুলা ক্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে দেশটি—যা ওই সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিক্রির প্রায় পুরোটাই। পাশাপাশি ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও তুলা আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়েছে তারা।
পাকিস্তানে তুলার উৎপাদন একসময় ছিল কয়েক কোটি বেলের কাছাকাছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে প্রায় ৫০ লাখ বেলে নেমে এসেছে। ফলে দেশের সুতা ও বস্ত্র কারখানাগুলোকে উৎপাদন চালিয়ে নিতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এটি সাধারণ কোনো ঋতুভিত্তিক ঘাটতি নয়; বরং পাকিস্তানের নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার এক স্পষ্ট দলিল।
পাকিস্তানের তুলা খাত বছরের পর বছর ধরে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হলেও চলতি মৌসুমে তা চরম রূপ নিয়েছে। এক সময়ের শীর্ষ তুলা উৎপাদনকারী এই দেশটির উৎপাদন সম্প্রতি নেমে এসেছে মাত্র ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) বেলে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো মৌসুমের শুরুতেই বিদেশি কাঁচামালের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু চাষের জমি কমে যাওয়াই নয়, বরং সরকারের ভুল নীতিমালা ও গাফিলতিই আজকের এই সংকটের মূল কারণ। সার ও বীজের আকাশছোঁয়া দাম, মানহীন বীজ সরবরাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় কৃষকরা দিশেহারা।
এ ছাড়া তুলার তুলনায় ধান, ভুট্টা ও আখের মতো ফসলকে অনেক কৃষক বেশি লাভজনক মনে করছেন। ফলে তুলা চাষের জমিও কমছে। কৃষকেরা উচ্চমূল্যের সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই সঙ্গে তুলার ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তাও চাষিদের নিরুৎসাহিত করছে।
এই তুলা সংকটের সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। দেশটিতে যখন তীব্র ডলার-সংকট ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বজায় রয়েছে, ঠিক তখনই কোটি কোটি ডলার ঢালতে হচ্ছে বিদেশি তুলা কিনতে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের সরাসরি শিকার হচ্ছে পাকিস্তান।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তুলা খাতের বর্তমান সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বীজ ব্যবস্থাপনা, কৃষি গবেষণা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।
বিশেষ করে নিম্নমানের ও অনিবন্ধিত বীজের ব্যবহার তুলা উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষকদের জন্য কার্যকর কৃষি পরামর্শ সেবা এবং সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনার অভাবও উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে সরকার কৃষি উন্নয়ন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কথা বললেও তুলা চাষে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাময়িক সহায়তা বা আমদানি নির্ভরতার মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও মূল সমস্যা থেকে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতগুলোর একটি বস্ত্রশিল্প। এই শিল্পের বড় অংশই তুলার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারে তুলার সরবরাহ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোকে বেশি দামে বিদেশ থেকে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে।
এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং মুনাফা কমছে। শিল্প মালিকরা শুল্ক ছাড়, কম দামে জ্বালানি এবং কর সুবিধার দাবি জানাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, একদিকে স্থানীয় তুলার উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানির খরচ বাড়ছে। ফলে শিল্পের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কেবল কর ছাড় বা সাময়িক প্রণোদনা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তুলার উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষি গবেষণা, উন্নতমানের বীজ, সেচব্যবস্থা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
পাকিস্তানের তুলা উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ ও অসময়ের বন্যা তুলা চাষে বড় ধরনের ক্ষতি করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং পুরোনো চাষপদ্ধতি। ফলে উৎপাদনশীলতা কমছে। অনেক কৃষক তুলা চাষ থেকে সরে গিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তুলা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারে স্থিতিশীল মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন জাতের বীজ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তুলা আমদানির কারণে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়ছে। দেশের বস্ত্রশিল্প রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সেই শিল্পের কাঁচামালের একটি বড় অংশ এখন বিদেশ থেকে কিনতে হচ্ছে।
ফলে রপ্তানি আয়ের একটি অংশ আবার কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বাড়লে বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পাকিস্তানের শিল্প খাত আরো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
একসময় যে তুলা দেশের কৃষকদের আয় এবং শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস ছিল, সেই তুলাই এখন পাকিস্তানের জন্য আমদানি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানের তুলা খাত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। উৎপাদন কমছে, চাষের জমি সংকুচিত হচ্ছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষক, সুতা কল, বস্ত্র কারখানা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে।
তুলা পাকিস্তানের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশটির বস্ত্রশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে আরো বেশি আমদানিনির্ভর হতে হবে।
একসময়ের ‘সাদা সোনা’ পাকিস্তানের অর্থনীতির শক্তি ছিল। এখন সেই তুলাই দেশটির কৃষি ও শিল্প খাতের দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠছে।








