বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ সব সময়ই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আর বড় দলগুলোর জন্য তো আরো। প্রথম ম্যাচের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে থাকে। ব্রাজিলের জন্যও মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়, বিশেষ করে এমন একটি দলের বিপক্ষে, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের প্রমাণ করেছে। কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনাল খেলেছিল মরক্কো এবং এবারও তারা সহজে হাল ছাড়বে না। ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপেও নতুন কোনো গল্প লিখতে চাইবে দলটি।
যদিও বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের প্রস্তুতি আশাব্যঞ্জক। দলটি ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে এবং কোচিং স্টাফ খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আধুনিক ফুটবলে প্রতিভার পাশাপাশি ফিটনেস, রিকভারি এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের বর্তমান দলটিতে এই তিনটিরই সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। কার্লো আনচেলোত্তির মতো অভিজ্ঞ একজন কোচ থাকায় কাজগুলো আরো সহজ হয়ে গেছে। তিনি জানেন খেলোয়াড়দের কী প্রয়োজন, কাকে কোথায় ব্যবহার করতে হবে। তবে তার জন্যও কাজটা কঠিন। বিকল্প ফুটবলারের সংখ্যা খুব বেশি নেই তার হাতে। এতে তিনি খেলোয়াড়দের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খুব বেশি খেলাতে পারবেন না। এর পরও আনচেলোত্তির যে অভিজ্ঞতা, তাতে ব্রাজিল সমর্থকরা আস্থা রাখতেই পারে। বিশ্বকাপ জিততে হলে একটি দলের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড। শক্তিশালী রক্ষণ, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এবং কার্যকর আক্রমণভাগ—সব কিছুর সমন্বয় থাকতে হয়। তবে এই ব্রাজিল দলকে যদি একটি জায়গায় সবচেয়ে বেশি নম্বর দিতে হয়, তাহলে আমি আক্রমণভাগকেই বেছে নেব। কারণ তাদের এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে সক্ষম।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিঃসন্দেহে এই আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় তারকা। গত কয়েক বছরে বিশ্বের অন্যতম সেরা উইঙ্গারে পরিণত হয়েছেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং আলাদা নজর কেড়েছে। লেফট উইংয়ে বড় ভরসা হতে পারেন রাফিনিয়া। এ ছাড়া অভিজ্ঞ নেইমার এখনো ভয়ংকর। তরুণ এনদ্রিক কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মাতানো ইগর থিয়াগো প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হতে পারেন। মরক্কোর বিপক্ষেই বোঝা যাবে, ব্রাজিলের এই আক্রমণভাগ কতটা কার্যকর। মরক্কোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারা দ্রুতগতির ট্রানজিশন ফুটবল খেলতে পছন্দ করে এবং সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজের মতো ক্লাব ফুটবল মাতানো তারকা খেলোয়াড়রা আছেন এই দলে।
আমি মনে করি, ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। মরক্কো চাইবে খেলার গতি কমিয়ে ব্রাজিলকে হতাশ করতে, আর ব্রাজিল চাইবে দ্রুত গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে। যদি ব্রাজিল শুরুতেই গোল বের করতে পারে, তাহলে জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে। কিন্তু মরক্কো তাদের রক্ষণ আগলে রাখতে পারলে খেলা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। মধ্যমাঠের লড়াইটিও এখানে নির্ধারক হতে পারে। ব্রাজিলকে বলের দখল ধরে রাখার পাশাপাশি রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কারণ মরক্কোর দ্রুত ট্রানজিশনই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর জন্য প্রথম ম্যাচে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষ নয়, বরং প্রত্যাশার চাপ। ব্রাজিলের ওপর সব সময়ই শিরোপার দাবি থাকে, আর সেই চাপ সামলে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলেই তারা এগিয়ে থাকবে। অভিজ্ঞতা, প্রতিভা ও স্কোয়াডের গভীরতায় ব্রাজিল নিঃসন্দেহে এগিয়ে। তবে মরক্কোর সংগঠিত ফুটবল এবং লড়াকু মানসিকতাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আমার বিশ্বাস, ম্যাচটি একতরফা হবে না। মরক্কো ব্রাজিলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। কিন্তু ব্রাজিল যদি নিজেদের সেরা ছন্দে খেলতে পারে, তাহলে তাদের আক্রমণভাগের গুণগত মানই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেবে।
লেখক : বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হেড কোচ