• ই-পেপার

টাচলাইন থেকে

আংশিক সত্য

নকল জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা!

ক্রীড়া ডেস্ক
নকল জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা!
সংগৃহীত ছবি

 


বিশ্বকাপ ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের কথা প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু সেই বিখ্যাত ম্যাচে আর্জেন্টিনা যে নকল জার্সি পরে মাঠে নেমেছিল, সে গল্প অনেকেরই অজানা।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল মেক্সিকো সিটির তীব্র গরমে। ইংল্যান্ড সাদা জার্সি পরায় আর্জেন্টিনাকে গাঢ় রঙের জার্সি পরতে হতো। কিন্তু তাদের নীল জার্সিগুলো ছিল মোটা সুতির কাপড়ে তৈরি, যা প্রচণ্ড গরমে খেলোয়াড়দের জন্য অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

এই পরিস্থিতিতে দলের গোলরক্ষক হেক্টর জেলাদা একটি অদ্ভুত সমাধানের প্রস্তাব দেন। তিনি মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত টেপিতো বাজার থেকে জার্সি খোঁজার পরামর্শ দেন, যেখানে নকল পণ্য বিক্রি হতো।

শেষ পর্যন্ত বাজার থেকে হালকা নীল রঙের পলিয়েস্টার জার্সি সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো ছিল মূলত আর্জেন্টিনার তৎকালীন কিট প্রস্তুতকারক লে কক স্পোর্টিফ-এর নকল সংস্করণ।

কথিত আছে, দুই ধরনের জার্সির মধ্যে চূড়ান্ত নির্বাচন করেছিলেন ম্যারাডোনা নিজেই। এরপর রাতভর কাজ করে জার্সিগুলোতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যাজ ও খেলোয়াড়দের নম্বর সেলাই করা হয়, যাতে সেগুলো ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।

পরদিন সেই জার্সি গায়েই ইতিহাস গড়েন ম্যারাডোনা। প্রথমে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল, এরপর একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন।

পরে আর্জেন্টিনা বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে এবং পশ্চিম জার্মানিকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।

সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সি পরবর্তীতে নিলামে প্রায় ৮.৯৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়, যা দীর্ঘদিন ফুটবল স্মারকের বিশ্বরেকর্ড ছিল।

নেইমারের চোট নিয়ে নতুন তথ্য দিলেন আনচেলত্তি

ক্রীড়া ডেস্ক
নেইমারের চোট নিয়ে নতুন তথ্য দিলেন আনচেলত্তি
সংগৃহীত ছবি

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এমন সময় ব্রাজিল শিবিরে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নেইমারের চোট। তার ডান পায়ের কাফ ইনজুরির অবস্থা জানতে আগামী সোমবার এমআরআই স্ক্যান করানো হবে বলে জানিয়েছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি বলেন, ‘নেইমারের পরিস্থিতি পরিষ্কার। সে নিজে আলাদাভাবে খুব ভালো কাজ করছে। সপ্তাহান্তের পর তার এমআরআই করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহে সে দলের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করতে পারবে।’

৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বর্তমানে দ্বিতীয়-গ্রেডের পেশির চোটে ভুগছেন। এ কারণে তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারছেন না। শনিবার মিশরের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচেও তিনি দলের সঙ্গে ক্লিভল্যান্ডে যাননি। বরং নিউ জার্সিতে দলের ক্যাম্পে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

গত ১৭ মে সান্তোসের হয়ে খেলার সময় চোট পান নেইমার। এর একদিন পরই বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল দল ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। প্রথমে সান্তোস জানায়, তার কাফে ফোলাভাব রয়েছে। তবে ২৮ মে ব্রাজিল দলের মেডিকেল পরীক্ষায় পেশির সমস্যাও ধরা পড়ে, যা সারতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন।

ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জাতীয় দলের হয়ে ৭৯ গোল করেছেন এবং তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসিএল ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামেননি। এরপর থেকে একের পর এক চোট তার ক্যারিয়ারকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

ব্রাজিল ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। এরপর গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড।

হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ, বাটলারের কণ্ঠে দৃঢ়তা

ক্রীড়া ডেস্ক
হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ, বাটলারের কণ্ঠে দৃঢ়তা
সংগৃহীত ছবি

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আজ ভারতের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের বিপক্ষে লাল-সবুজের মেয়েরা মাঠে নামার আগে দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন দলের প্রধান কোচ পিটার বাটলার।

গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে আজ শনিবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে এই ফাইনাল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ভারতের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের সামনে।

ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর বাটলার স্পষ্ট করে দিয়েছেন দলের লক্ষ্য। তিনি জানান, ফাইনালে দল কেমন খেলছে তা বড় কথা নয়, জয় নিশ্চিত করাই বড় কথা। দৃঢ় সংকল্প নিয়ে খেললেই কেবল ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনা যায় বলেও মন্তব্য করেছেন বাটলার।  কোচের এই বার্তায়ই ফুটে উঠছে দলের মানসিক প্রস্তুতি। বড় ম্যাচে চাপ সামলে ফল এনে দেওয়ার চ্যালেঞ্জটাই এখন সবচেয়ে বড়।

দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে ভারত। ২০১০ সাল থেকে শুরু করে একাধিকবার শিরোপা জিতে তারা নিজেদের আধিপত্য দেখিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে এবং আঞ্চলিক ফুটবলে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে গত এক দশকে দেশের ফুটবলে মেয়েদের অবদানই সবচেয়ে উজ্জ্বল। যখন পুরুষ দল প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন নারী ফুটবলাররাই এনে দিয়েছে সাফল্য ও গর্বের মুহূর্ত।

এবারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সুযোগ সামনে। এখন দেখার বিষয়, বাটলারের শিষ্যরা কতটা দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নেমে শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে।  

আর্জেন্টিনার ‘কলঙ্কিত ও পাতানো’ প্রথম বিশ্বকাপ জয়

ফুয়াদ হাসান
আর্জেন্টিনার ‘কলঙ্কিত ও পাতানো’ প্রথম বিশ্বকাপ জয়
সংগৃহীত ছবি

১৯৭৮ সালের ২১ জুন, এক থমথমে রাত। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের কুখ্যাত নেভি মেকানিক্যাল স্কুলের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রাজনৈতিক বন্দি ম্যানুয়েল কালমেস হঠাৎ শুনতে পেলেন পুরো শহরজুড়ে এক গগনবিদারী গর্জন।

সেখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে, এস্তাদিও জিগান্তে দে আরয়িতো স্টেডিয়ামে তখন চলছে বিশ্বকাপের এক ভাগ্যনির্ধারণী ম্যাচ। পেরুর জালে বল পাঠিয়েছে আর্জেন্টিনা। প্রায় আশি হাজার মানুষের সেই উল্লাস রোজারিওর হিমশীতল বাতাস ভেদ করে আছড়ে পড়ল লাতিন আমেরিকার অন্যতম নৃশংস এক টর্চার সেলের দেয়ালে।

ফুটবলপ্রেমী কালমেস বন্দিদশাতেও স্বভাবসুলভভাবেই সেই গোলের আনন্দ উদযাপন করে উঠলেন। মুহূর্তেই এক জল্লাদ গার্ড তার দিকে ঘুরে তাকাল। হিমশীতল গলায় ফিসফিস করে বলল, ‘ওটাই তোমার জীবনের শেষ গোল, যা তুমি উদযাপন করলে।’

এই একটি বাক্যই আসলে ফুটিয়ে তোলে ১৯৭৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আসল আবহ। বাইরের দুনিয়ার কাছে ওটা ছিল ফুটবলের এক বর্ণিল উৎসব, উগ্র জাতীয়তাবাদ আর নান্দনিক বিজয়ের গল্প। কিন্তু আর্জেন্টিনার ভেতরের গল্পটা ছিল গুম, টর্চার সেল, সেন্সরশিপ আর জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার সামরিক স্বৈরশাসনের এক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দলিল।

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ কেবল কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত এক ক্রীড়া প্রদর্শনী। যে মাসে ফুটবল একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল স্বৈরাচারের প্রচারণামূলক হাতিয়ার এবং নৃশংসতা ঢাকার এক রঙিন মুখোশ।

স্বৈরাচারের বুটের নিচে ফুটবল

১৯৬৬ সালে যখন ফিফা আর্জেন্টিনাকে এই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়, তখনো দেশটি সামরিক শাসনের অধীনে যায়নি। কিন্তু টুর্নামেন্ট যখন শুরু হলো, ততদিনে আর্জেন্টিনা রূপ নিয়েছে এক ভয়ার্ত একনায়কতন্ত্রে। 

১৯৭৬ সালে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল ভিদেলার জান্তা সরকার। এরপরই তারা শুরু করে কুখ্যাত ‘ডার্টি ওয়ার’—যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ছাত্র, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের নির্মমভাবে দমন করা। হাজার হাজার মানুষ রাতারাতি উধাও হয়ে যাচ্ছিল। বন্দিশালায় চলত অমানুষিক নির্যাতন। অনেককে ড্রাগ খাইয়ে অজ্ঞান করে সামরিক বিমান থেকে জীবন্ত ফেলে দেওয়া হতো আটলান্টিক মহাসাগরে। 

ভয়াবহ এই সন্ত্রাসের মধ্যেও জান্তা সরকার ফুটবলের মধ্যে এক দারুণ সুযোগ দেখতে পেয়েছিল।

স্বৈরশাসকেরা সবসময়ই নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য মরিয়া থাকে, আর বিশ্বকাপ ছিল তার মোক্ষম হাতিয়ার। আর্জেন্টিনা যদি সফলভাবে এই টুর্নামেন্ট আয়োজন এবং জয় করতে পারে, তবে বিশ্বমঞ্চে তারা নিজেদের খুনে শাসক হিসেবে নয়, বরং জাতীয় গৌরব ও স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে জাহির করতে পারবে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ শব্দটা জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই এই জেনারেলরা বুঝে গিয়েছিলেন, ফুটবলের জয় মানুষের স্মৃতিতে সাময়িক বিস্মৃতি বা ‘ইমোশনাল অ্যামনেসিয়া’ তৈরি করতে পারে।

এক মিথ্যা ভ্রমের দেয়াল

বিশ্বকাপের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে জান্তা সরকার বিপুল অর্থ ঢেলেছিল। বুয়েনস আইরেসে আসা বিদেশী সাংবাদিকদের দেখানো হতো সুপরিকল্পিত দেশপ্রেমের দৃশ্য। স্টেডিয়ামের আশেপাশের বস্তিগুলোকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল বড় বড় রঙিন দেয়াল দিয়ে। কুখ্যাত বন্দিশালাগুলো থেকে রাজনৈতিক বন্দিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল দূরের দুর্গম ক্যাম্পে। আন্তর্জাতিক মহলের যেকোনো সমালোচনাকে উড়িয়ে দেওয়া হতো ‘আর্জেন্টিনা-বিরোধী অপপ্রচার’ বলে।

অথচ, উৎসবমুখর স্টেডিয়ামগুলো থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে টর্চার সেলগুলোতে বন্দিদের ওপর নির্যাতন চলত অবিরাম।

পরিস্থিতিটা ছিল পরাবাস্তব বা সুরিয়ালিস্টিক। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন কনফেত্তি আর গগনবিদারী স্লোগানে জাতীয় দলকে বরণ করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই স্টেডিয়ামের বাইরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে হন্যে হয়ে কাঁদছিল হাজারো পরিবার।

বিখ্যাত লেখক পাবলো ইয়োন্তো সেই গুমোট পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছিলেন এক নির্মম সত্য দিয়ে। তিনি বলেন, ‘লাখো মানুষ সরকারের তৈরি করা সেই ধারণার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল—যেখানে মাঠের জয়কে দেখানো হচ্ছিল এক শান্তিময় দেশের বিজয় হিসেবে।’

পেরু ম্যাচ এবং ৬-০ গোলের সেই কালো রাত

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের ফরম্যাটটাই এমন ছিল যা সন্দেহের সব দুয়ার খুলে দিয়েছিল। আধুনিক নকআউট পর্বের মতো তখন সেমিফাইনাল ছিল না। শেষ আটটি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হতো, আর দুই গ্রুপের দুই চ্যাম্পিয়ন সরাসরি খেলত ফাইনাল। আর্জেন্টিনার গ্রুপে ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল। শেষ ম্যাচের আগে ব্রাজিল তাদের সব খেলা শেষ করে ফেলায় সমীকরণ দাঁড়িয়েছিল একদম পরিষ্কার।

ব্রাজিলকে গোল ব্যবধানে পেছনে ফেলে ফাইনালে যেতে হলে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে জিততেই হতো অন্তত ৪-০ গোলের ব্যবধানে।

সাধারণত ফিক্সচারের এই সুবিধা বন্ধ করতে সমসাময়িক সময়ে একই সঙ্গে ম্যাচ আয়োজন করা হয়। কিন্তু ফিফা কয়েক মাস আগেই সম্প্রচারস্বত্ব আর টিকিট বিক্রির অজুহাতে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি পরে আয়োজন করতে রাজি হয়। ফলে মাঠের নামার আগেই মেনোত্তির দল জানত তাদের ঠিক কী করতে হবে। 

এরপর যা ঘটেছিল, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ হিসেবে আজো কুখ্যাত। যে পেরু দলকে তখন লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা রক্ষণভাগের দল ধরা হতো, যারা আগের ৫ ম্যাচে মাত্র ৬টি গোল হজম করেছিল, তারা সেই রাতে মাঠে যেন স্রেফ পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর্জেন্টিনাকে কোনো বাধাই দিল না তারা। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা জিতে একেবারে ৬-০ গোলের ব্যবধানে!

ম্যাচের এই অবিশ্বাস্য ফল রাতারাতি বিশ্বজুড়ে সন্দেহের ঝড় তোলে।

ড্রেসিংরুমে স্বৈরশাসক ভিদেলা ও কিসিঞ্জার

ম্যাচের বাঁশি বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগে পেরুর ড্রেসিংরুমে ঘটেছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। হঠাৎ করেই পেরুর ড্রেসিংরুমে হাজির হন স্বয়ং আর্জেন্টিনার একনায়ক জেনারেল ভিদেলা এবং আমেরিকার সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভিদেলা পেরুর খেলোয়াড়দের সামনে দুই দেশের ‘ভ্রাতৃত্বের’ বাণী শোনান, যা ছিল আসলে পেরুর তৎকালীন স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো মোরালেস বারমুদেজের পক্ষ থেকে এক পরোক্ষ বার্তা।

কাগজে-কলমে এটি কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ বলা হলেও, খেলোয়াড়দের জন্য তা ছিল স্পষ্ট এক রাজনৈতিক হুমকি বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ।

পরবর্তী দশকগুলোতে পেরুর অনেক খেলোয়াড় স্বীকার করেছেন যে, সেই ম্যাচের আগে তাদের ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক চাপ দেওয়া হয়েছিল, এমনকি পরোক্ষ প্রাণনাশের হুমকিও ছিল। যদিও অনেকে তা অস্বীকার করে দলের ক্লান্তি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করেছেন।

কিন্তু এর পেছনের রহস্য কখনো ঢাকা পড়েনি। বিশ্বকাপের ঠিক পরপরই আর্জেন্টিনা কোনো কারণ ছাড়াই পেরুকে ৩৫ হাজার টন শস্য সাহায্য পাঠায় এবং পেরুর ফ্রিজ হয়ে থাকা মিলিয়ন ডলারের আর্থিক তহবিল অবমুক্ত করে দেয়। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, লাতিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের মধ্যকার কুখ্যাত ‘অপারেশন কনডর’ এর অধীনে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বন্দি বিনিময়ের চুক্তিও হয়েছিল এই ম্যাচের বিনিময়ে।

পেরুর সিনেটর জেনারো লেদেসমা পরবর্তীতে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, দুই সরকারের মধ্যে গোপন চুক্তি হয়েছিল—পেরু আর্জেন্টিনাকে প্রয়োজনীয় গোল ব্যবধানে জিততে দেবে, আর বিনিময়ে ভিদেলা সরকার বারমুদেজের স্বৈরাচারী সরকারকে রাজনৈতিক ও সামরিক সুবিধা দেবে। 

খেলোয়াড়েরা বীর নাকি স্রেফ দাবার ঘুঁটি?

১৯৭৮ সালের এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আত্মগ্লানির মধ্যে। তারা কি এই নোংরা রাজনৈতিক খেলার অংশ ছিলেন? নাকি তারা ছিলেন বিশাল এক দানবীয় মেশিনের ভেতরে আটকে পড়া নিরীহ কিছু ফুটবলার?

পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার অনেক খেলোয়াড়ই স্বীকার করেছেন, খেলার সময় তারা কিছু না বুঝলেও, পরে তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন যে পেরু ম্যাচটি আগে থেকেই সাজানো ছিল।

দলের অন্যতম স্ট্রাইকার লিওপোল্ডো লুকে বছরের পর বছর পর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আজ আমি যা জানি, তারপর বুক ফুলিয়ে বলতে পারি না যে আমি ওই বিজয়ের জন্য গর্বিত। কিন্তু তখন আমরা কিছুই জানতাম না। আমরা স্রেফ ফুটবল খেলেছিলাম।’

মিডফিল্ডার রিকার্ডো ভিলা তো আরও সরাসরি বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, আমাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।’

এই কথাগুলোই আসলে সেই বিশ্বকাপের নৈতিক জটিলতাকে ফুটিয়ে তোলে। ফুটবলাররা কোনো জেনারেল ছিলেন না, তারা কাউকে টর্চারও করেননি। কিন্তু তাদের পায়ের জাদু আর ঘাম আলটিমেটলি ব্যবহৃত হয়েছিল এক খুনে শাসকের প্রোপাগান্ডা মেশিনের জ্বালানি হিসেবে।

রক্তের দাগ লাগা এক ট্রফি

ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে আর্জেন্টিনা।

বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল। তবে মজার বিষয় হলো, মানুষ স্বৈরশাসককে নয়, উদযাপন করছিল তাদের ফুটবল দলকে। সামরিক জান্তা এই জয়ের আবেগকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, ফুটবলের শক্তি স্বৈরাচারের চেয়েও বড় প্রমাণিত হয়েছিল।

সাময়িকভাবে এই বিশ্বকাপ ভিদেলা সরকারকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল এবং দেশের ভেতরে এক ভুয়া একতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল। কিন্তু ফুটবল কখনোই একটা রাষ্ট্রের ভেতরের রক্তপাতকে চিরতরে আড়াল করতে পারে না। মাত্র পাঁচ বছর পর, ফকল্যান্ডস যুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয় এবং জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সেই সামরিক একনায়কতন্ত্র।

বিশ্বকাপ স্বৈরাচারকে কিছুটা সময় বা প্রচারের আলো হয়তো দিয়েছিল, কিন্তু চিরস্থায়ী করতে পারেনি।

ইতিহাসের সবচেয়ে ‘অভিশপ্ত’ ট্রফি

প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও, ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনার সেই প্রথম বিশ্বকাপ জয় আজও গৌরব আর গ্লানির এক দোলাচলে দুলছে। খাতায়-কলমে এটিই আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা, যে গৌরবের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ২০২২ সালে লিওনেল মেসি বিশ্বজয় করেছেন। কিন্তু পরের দুটি জয় আর ১৯৭৮ সালের জয়টি এক নয়। এর গায়ে লেগে আছে এক দীর্ঘ, অন্ধকার ছায়া।

ফিফা বা কোনো অফিসিয়াল তদন্ত কমিটি কখনোই পেরু ম্যাচের ফিক্সিংয়ের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করেনি, হয়তো তারা এই প্যান্ডোরার বাক্স আর খুলতে চায়নি। বহু প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।

তবে আসল কেলেঙ্কারিটা কিন্তু একটা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের চেয়েও অনেক বড়। আসল কেলেঙ্কারি হলো, যে শাসনব্যবস্থা গুম, খুন আর নির্যাতনের জন্য দায়ী ছিল, তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার থিয়েটার বানিয়ে ফেলেছিল।

গ্যালারি পূর্ণ ছিল, পতাকা উড়ছিল, গগনবিদারী চিৎকারে কাঁপছিল স্টেডিয়াম। আর পর্দার আড়ালে স্বৈরশাসকেরা কান খাড়া করে সেই চিৎকার শুনছিল এই আশায় যে, ফুটবলের এই উন্মাতাল উল্লাস যেন রাজপথের সব আর্তনাদ আর রক্তের দাগকে চিরতরে ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়! 

আংশিক সত্য | কালের কণ্ঠ