• ই-পেপার

আজকের বোনা বীজেই আগামীর ফসল ফলবে

এনবিআরের দ্বিমুখী শর্ত সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে জটিলতা তৈরি করছে

মাসুদুর রহিম
এনবিআরের দ্বিমুখী শর্ত সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে জটিলতা তৈরি করছে

সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা প্রবল সংকটের মুখে পড়ে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের দিকে আমাদের মনোযোগ বাড়তে শুরু করেছে। এ খাতের অগ্রগতি, খাতসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ মিলল বণিক বার্তা আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে। বিগত দেড় দশকে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের জন্য অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। তবু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য আমাদের অর্জিত হয়নি, বরং আমরা পিছিয়ে আছি। অর্থনৈতিক সংকটকালে এলএনজি, কয়লা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যের দরপতন ঘটে চলেছে বলে দেশীয় শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে। এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তা করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি সঠিক ও বাস্তব নির্দেশনা।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) মূল্যায়ন বলছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ভবন যার বিশালসংখ্যক শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ অব্যবহৃত পড়ে আছে। এসব ছাদে সোলার স্থাপনে দৈনিক অন্তত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সুযোগ রয়েছে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে দৈনিক ৪ ঘণ্টা সূর্যালোক সংরক্ষণের মাধ্যমে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে বছরে বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ৪-৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। এছাড়া ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে। তবু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আমরা কেন পিছিয়ে আছি? স্রেডার তথ্যই বলছে, সোলারের মাধ্যমে আমরা ৪০০-৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। অর্থাৎ বিশাল অংশের অব্যবহৃত ছাদে সোলার স্থাপনের কাজে আমরা পিছিয়ে আছি। অথচ আমরা জানি একেকটি ভবনের ছাদই একেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আমরা এখন স্বপ্ন দেখছি এবং তা নিয়ে কথাও বলছি। কিন্তু যখনই এটিকে বাস্তব রূপ দিতে যাই তখন নানা প্রতিবন্ধকতা আমাদের পিছু টেনে ধরে।

সম্প্রতি সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে কিছুটা আশা জাগিয়েছে। এ ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে পাঁচ হাজারই রুফটপ সোলারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে সোলার সরঞ্জামে ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাস্তবতা হলো আমদানিকারকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিমুখী শর্ত জুড়ে দেয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। শুল্কহার শূন্য বলা হলেও এসআরওতে ভিন্ন অবস্থা দেখা গেছে। বড় মেগা প্রজেক্ট ও স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদকের (আইপিপি) নিয়মাবলি ছোট ছোট রুফটপ প্রজেক্টের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আইপিপি প্রকল্প বড় পরিসরে হয়। আর রুফটপ প্রকল্প ২০০ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের হয়। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধাপে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। আগে ৪০০-৫০০ মেগাওয়াটের রুফটপ স্থাপন সম্ভব হলেও এ এসআরওর নির্দেশনায় বিনিয়োগ যে ব্যাহত হবে তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। দ্বিমুখী শর্তের জটে এনলিস্টমেন্ট ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। অথচ এখন ছোট প্রকল্পগুলো বেশি হচ্ছে। ছোট প্রকল্পের অনুমোদন নিতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ বাড়ায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম প্রজেক্ট ভিত্তিতে আনা হয়। অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা বাড়লে তাই ব্যয় বাড়ে। সেজন্য এ খাতে এখন বিনিয়োগে ভালো ফল মিলবে এমন আশা বিনিয়োগকারীরা দেখতে পাচ্ছেন না। তারা উৎসাহ হারাচ্ছেন বলে কাঙ্ক্ষিত ‘নেট মিটারিং’ সুবিধার সঠিক বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এ জটিলতার দ্রুত নিরসন জরুরি।

প্রযুক্তিগতভাবে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। ওমেরা সোলার এ পর্যন্ত ১২০ মেগাওয়াটেরও বেশি রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরো ২০০ মেগাওয়াট সোলার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে। দেশেই এখন আন্তর্জাতিক মানের রোবোটিক সিস্টেম ও ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে নিজস্ব সোলার প্যানেল উৎপাদন করছি আমরা। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এ প্যানেল এখন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানিও হচ্ছে। তাই ইউটিলিটি স্কেল এবং রুফটপ—উভয় প্রজেক্টেই দেশীয় উৎপাদিত প্যানেল ব্যবহারে অগ্রাধিকার ও নীতিগত সুবিধা দেয়া দরকার। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্প বিকশিত হবে। যখন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাবেন তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এ খাতে আগ্রহী হতে শুরু করবেন।

আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। বিদ্যুৎ কমানোর প্রধান উৎস হিসেবে এটিকে এখন বিবেচনা করা হয়। ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থার জন্য একটি সঠিক নীতিমালা দরকার। পিক সেভিং এবং লোডশেডিংয়ের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোগান্তি বাড়ে। অথচ আমরা যদি সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাখতে পারি তাহলে তা রাতে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা যাবে। আবার অপ্রয়োজনে পাইকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে। এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক কমবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এখন শুধু উৎপাদনই মূল কথা নয়। দেশের রফতানিমুখী শিল্প অর্থাৎ তৈরি পোশাক খাত, টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্যগুলোকে পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। ক্রেতাদের দেয়া শর্তের অংশ হিসেবেই এটি নিশ্চিত করতে হচ্ছে। আবার এসডিজি-৭ লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বহুমুখী করা জরুরি। কিছুক্ষণ আগে কার্বণ নিঃসরণ কমার যে পরিসংখ্যান দিয়েছি সেটিই এ সম্ভাবনার প্রমাণ। সেক্ষেত্রে এদিকে নীতিমালা প্রয়োগ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার পায়। জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নীতিগত সহায়তা আরো বাড়ানো দরকার। আবার এ নীতিমালা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশের শিল্পের অগ্রগতি বহুমুখী হবে। আমরাও অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বাবলম্বী হব। বিদ্যুতের ব্যয় কমলে গ্রাহক পর্যায়ে স্বস্তি আসবে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এমনকি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি কমবে। এজন্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা বিলাসিতা নয়, এটা আমাদের জন্য অর্থনৈতিক কৌশল। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এ খাত ঘিরে যে স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে তা বাস্তবায়নে যথাযথ নীতিসহায়তা দেবে। আর তা খুব দ্রুত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেয়া হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হন এবং এ খাতের সম্প্রসারণ ঘটে।
লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেড

ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ : স্বপ্ন বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সংস্কার

ড. মো. মিজানুর রহমান
ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ : স্বপ্ন বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সংস্কার
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার রূপকল্প ঘোষণা করে সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি উচ্চাভিভাষী ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি শুধু নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি কৌশলগত অঙ্গীকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত এই ভিশন বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের পথ সুগম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রশাসনিক সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাস্তবায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল মোট দেশজ উৎপাদন। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কেবল একটি সংখ্যাগত মাইলফলক নয়; এটি শিল্পায়নের গভীরতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতিফলন। বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও নীতির ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও একটি নতুন অর্থনৈতিক অভিযাত্রার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদ-স্বল্প ও সীমিত শিল্পভিত্তির দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। কৃষির আধুনিকায়ন, তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, প্রবাস আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উত্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সামাজিক সূচকের অগ্রগতি দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। যে বাংলাদেশকে একসময় অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাহীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম।

এই অগ্রযাত্রা কোনো একক খাতের নয়; কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি, প্রবাস আয় এবং উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। স্বাধীনতার পর কৃষির আধুনিকায়ন ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য এনে দেয়। পরে তৈরি পোশাকশিল্প লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। একই সঙ্গে প্রবাস আয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, শিক্ষা, আবাসন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০০০ সালের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন গতি লাভ করে। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প শিল্পায়ন, আঞ্চলিক সংযোগ ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গড় আয়ুসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের ভিত্তিতেই সরকার অর্থনীতিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে সরকার স্পষ্ট করেছে যে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হবে উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার সরলীকরণ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল সেবা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিক খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণ শুধু প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির গুণগত রূপান্তরের প্রশ্ন। শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে না পারলে শুধু জিডিপির আকার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের বিকাশ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন।

বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি এই অভিযাত্রা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। আগামী এক দশকে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারণ করতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়; অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বাড়াতে হবে। এই যাত্রার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ জ্বালানি নিরাপত্তা। 

শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অথচ দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা উৎপাদন ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকায় সম্ভাবনাময় বিনিয়োগও বিলম্বিত হচ্ছে। তাই অনশোর ও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা শিল্পায়নের পূর্বশর্ত।

বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় বিনিয়োগ বাড়লেও প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা যায়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, জমি প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। যদিও সরকার আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের সরলীকরণ, মুনাফা সহজে প্রত্যাবাসনের সুযোগ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং সরকারি সেবার ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এসব সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি। কারণ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে দেশীয় মূলধনের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অপরিহার্য।

আর্থিক খাতের সংস্কারও সময়ের অন্যতম বড় দাবি। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার এখনো দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়নের কার্যকর উৎসে পরিণত হতে পারেনি। সরকার গতিশীল পুঁজিবাজার, স্টার্টআপ উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়নের কথা বলেছে। তবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট গভর্ন্যান্স, কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে পারলেই আর্থিক খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রকৃত চালিকাশক্তি হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের, যা একটি বিরল জনমিতিক সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বিনিয়োগ অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের কার্যকর অংশীদারি গড়ে তুলতে হবে।

রপ্তানি বৈচিত্র্যও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের অধিকাংশই তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আসে। এই খাত প্রধান শক্তি হলেও একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ওষুধশিল্প, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজনির্মাণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও চামড়াজাত শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস এবং ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা যথাযথ নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ শ্রমশক্তির মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব।

এসব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অপরিহার্য। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য ও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক রোডম্যাপ। উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জাহাজনির্মাণ খাতে গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সরকারি সহায়তা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কগুলোকে উৎপাদন, উদ্ভাবন ও রপ্তানির কার্যকর কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণ সাধারণ মানুষের জীবনমানেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থনীতির আকার বাড়লে মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও ভোগক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে আরো বেশি বিনিয়োগ সম্ভব হবে। পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের সম্প্রসারণ তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তির সমন্বয়ে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অবকাঠামো, জ্বালানি, দক্ষ মানবসম্পদ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে।

একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, বায়োটেকনোলজি, সবুজ জ্বালানি ও ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের মূলধারায় আনতে হবে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক লজিস্টিকস এবং গবেষণা-উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি আরো শক্তিশালী করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর কোনো শর্টকাট নেই। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ মানবসম্পদই টেকসই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশেরও নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে সেই পথেই এগোতে হবে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি। প্রায় ২০ কোটির জনসংখ্যা, সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার এবং তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম শক্তি। মধ্যবিত্তের সম্প্রসারণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের সমন্বয়ই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ় না হলে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা প্রমাণ করেছে যে সুদূরপ্রসারী নীতি, জনগণের পরিশ্রম, উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন পরিকল্পনা একটি দেশকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদ-স্বল্প রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সরকার ঘোষিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপকল্প কেবল জিডিপির আকার বৃদ্ধির পরিকল্পনা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপান্তর কর্মসূচি। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই শূন্য থেকে প্রায় হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে উত্তরণ। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক সংস্কার, কৌশলগত বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় ঐকমত্য নিশ্চিত করা গেলে ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ কোনো অলীক কল্পনা নয়; বরং আগামী দশকের একটি বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

জাইমা রহমানের নির্বাসিত শৈশব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দলিল

মশিউর রহমান যাদু
জাইমা রহমানের নির্বাসিত শৈশব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দলিল
সংগৃহীত ছবি

একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষদের সঙ্গে কী আচরণ করে! বিশেষত যখন সেই মানুষটি একজন শিশু। আদালত, সংবিধান কিংবা উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে মানবাধিকার ঢেকে রাখা যায়; কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব কখনো মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার এক নির্মম, অনস্বীকার্য রাজনৈতিক দলিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম) ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান কোনো রাজনীতির মাঠে নামেননি। তিনি কোনো দল করেননি, কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো মিছিলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা হওয়ার কারণে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। এখানে অপরাধ ছিল না কোনো কর্মে, অপরাধ ছিল জন্মে। রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা যখন এই পর্যায়ে নেমে আসে, তখন সেটি আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকে না; সেটি সরাসরি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে পরিণত হয়।

শিশুর অধিকার বনাম ক্ষমতার প্রতিহিংসা

জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলে, প্রতিটি শিশুর নিজ দেশে বসবাস, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতির কাছে কতটা মূল্য পেয়েছে?

প্রায় ১৭ বছর ধরে জাইমা রহমান কার্যত এই অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই বঞ্চনা কোনো আইনি রায়ের ফল নয়, কোনো আদালতের নির্দেশও নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে উৎসারিত একটি নীরব নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্র সরাসরি ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু এমন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একটি শিশু তার নিজের দেশে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। এটি আইনের শাসন নয়; এটি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছে ফ্যাসিস্ট।

এই একই সময়কালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এক ভয়াবহ ধারাবাহিকতার কথা বলেছে—বিরোধী মত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্রমাগত সংকোচন। এসব প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন যেন জাইমা রহমানের জীবনের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত। কারণ রাষ্ট্র যখন বিরোধী রাজনীতিকে শত্রু মনে করে, তখন তার প্রতিহিংসা থামে না ব্যক্তিতে; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত।

নির্বাসিত শৈশব : রাষ্ট্রীয় শাস্তির এক নিষ্ঠুর রূপ

শৈশব কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। একটি শিশুর জন্মভূমির মাটিতে বেড়ে ওঠা, নিজের দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, জাতীয় দিবসের আবেগ অনুভব করা, এসব রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এই দায়িত্ব শুধু এড়িয়ে যায়নি; বরং উল্টো পথে হেঁটেছে।

তিনি হারিয়েছেন বাংলাদেশের মাটিতে নিজের শৈশবের গল্প লেখার সুযোগ। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দূরত্ব, অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের নীরব নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। এটি কোনো স্বাভাবিক প্রবাসজীবন নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় চাপিয়ে দেওয়া নির্বাসন। ইতিহাসে একে বলা হয় ‘collective punishment’ যেখানে একজন ব্যক্তিকে আঘাত করতে গিয়ে পুরো পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়।

সবচেয়ে নির্মম দিক হলো পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। একজন নাতনির জীবনে দাদির ভূমিকা কেবল আবেগের নয়; এটি মানসিক নিরাপত্তার এক মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জাইমা রহমান দীর্ঘ সময় তার দাদি বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, সাহচর্য ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্য হলো দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরেও তিনি দাদীকে পাননি সেই পরিচিত হাসিমুখে, পারিবারিক উষ্ণতায়। পেয়েছিলেন হাসপাতালের একটি শয্যায়, অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায়। একটি নাতনির জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে মানুষটির গল্প শুনে বড় হওয়ার কথা ছিল, যার কোলে মাথা রেখে শৈশবের স্মৃতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো হাসপাতালের বিছানায়। আর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, সেই প্রিয় দাদিও ইন্তেকাল করলেন।

প্রশ্ন তখন ইতিহাসের কাছেই ফিরে আসে, এই শূন্যতার জবাব কে দেবে? রাষ্ট্র কি দেবে? সেই সময়ের ক্ষমতাবান রাজনীতি কি দেবে? নাকি আমরা সবাই একদিন এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াব, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব ও ছিনিয়ে নেওয়া পারিবারিক মুহূর্তগুলোর জবাব কি?

দেশের গণতন্ত্র ও এক শিশুর নির্বাসন : একই সূত্রে গাঁথা

যে ১৭ বছর জাইমা রহমান দেশের বাইরে কাটিয়েছেন, সেই একই সময়ে বাংলাদেশের জনগণও ধীরে ধীরে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছে। ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, নির্বাচন পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়, বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করা হয়েছে।

একদিকে দেশের মানুষ হারিয়েছে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যদিকে জাইমা রহমান হারিয়েছেন নিজের দেশের সঙ্গে বেড়ে ওঠার অধিকার। এই দুই বাস্তবতা আলাদা নয়, এগুলো একই রাষ্ট্রীয় দর্শনের ফল, যেখানে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া হয়।

নীরবতাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ

জাইমা রহমান কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। তিনি কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেননি। কিন্তু এই নীরবতাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ। কারণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ তখনই দেখা যায়, যখন ভুক্তভোগীকে চুপ করে সহ্য করতে হয়।

এই ১৭ বছরের নির্বাসন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। মানবাধিকার ভাষায় একে বলা হয় ‘পরোক্ষ নিপীড়ন’ যেখানে রাষ্ট্র আইন ভাঙ্গে না দেখিয়ে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহটাই ভেঙে দেয়।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রের দায়

জাইমা রহমান জন্মের আগেই হারিয়েছেন এই দেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। শৈশব ও কৈশোরে যাঁর ছায়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেই দাদী বেগম খালেদা জিয়াকেও তিনি হারালেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ। ছোট চাচ্চু আরাফাত রহমান কোকো ১/১১ পরবর্তী নির্যাতন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডি।

তিনি যা হারিয়েছেন শৈশব, সময়, পারিবারিক সান্নিধ্য, তার বিচার একদিন ইতিহাস করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় : একটি রাষ্ট্র কি কখনো একটি শিশুর হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারে.?

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা : ইতিহাস এখান থেকেই প্রশ্ন করবে

এই লেখা শুধু অতীতের কোনো কান্না নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি চার্জশিট। জেন-জি প্রজন্মকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেয়, তখন সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে নিরপরাধ মানুষদের। জাইমা রহমান কোনো বিপ্লবী ছিলেন না, কোনো বিদ্রোহীও নন-তিনি ছিলেন শুধু একটি শিশু। তবু তিনি রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বলি হয়েছেন।

আজকের প্রজন্ম যদি ভাবে, ‘এগুলো তো পুরনো গল্প’ তাহলে সেটাই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ ইতিহাস কখনো হঠাৎ করে নিষ্ঠুর হয় না; ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়। আজ একজন শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়, কাল একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আজ পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়, কাল জাতিকে।

জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে, এই রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য নিরাপদ ছিল? কার জন্য ছিল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিন পাঠ্যবইয়ে লেখা হবে না, লেখা হবে মানুষের বিবেকে। জেন-জি যদি আজ চুপ থাকে, আগামীকাল সেই নীরবতার দায় তাদেরও বইতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নিপীড়নের সময় দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। প্রতিটি জুলুম একদিন হিসাব চায়। রাষ্ট্রের শক্তি দিয়ে হয়তো একটি শিশুকে নির্বাসনে রাখা যায়, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে সেই রাষ্ট্রই কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

ইনশা-আল্লাহ, সেই দিন আসবে, যেদিন জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হবে না, বরং দেখা হবে একটি রাষ্ট্র কিভাবে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তার প্রমাণ হিসেবে। এই লেখা তখন সাক্ষ্য দেবে, একটি শিশু কোনো অপরাধ না করেও কীভাবে তার জীবন থেকে ১৭ বছর হারিয়েছিল। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইতিহাস বাধ্য করবে একটি রাষ্ট্রকে মাথা নিচু করতে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস খুব নীরবভাবেই বিচার করে। কোনো স্লোগান ছাড়াই, কোনো মিছিল ছাড়াই সে প্রশ্ন তোলে—কেন একটি শিশুকে তার জন্মভূমি থেকে দূরে বড় হতে হলো? কেন একটি নাতনি তার দাদীর স্নেহময় কোলে নয়, হাসপাতালের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় দেখলো? সময় হয়তো সবকিছু এগিয়ে নেয়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন ইতিহাসের বুকেই থেকে যায়। জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর সেই প্রশ্নগুলোর একটি, যা একদিন আমাদের সবাইকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করবে, একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত কার?

লেখক : তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি

ভারতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

বিশেষ প্রতিনিধি
ভারতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

গণতন্ত্রকে প্রায়ই ভোটদানের দিবস দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু এর প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় ভোটের পর যখন নাগরিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, জবাবদিহি দাবি করে এবং প্রয়োজনে ভুল সংশোধনের আহ্বান জানায়।

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর কাছে পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অগ্রগতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই তারা যখন ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা দাবি করে, তখন তারা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত সাম্প্রতিক ঘটনায় একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেছে। নির্বাচিত সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরো জবাবদিহি ও সংস্কারের পথে এগোনোর ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন-সমালোচনা শোনা, তা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের পথে হাঁটা। এটি দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার শাসনের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু সেই ম্যান্ডেট পাঁচ বছরের জন্য জনগণকে উপেক্ষা করার সুযোগ নয়। নির্বাচন সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, আর সাংবিধানিক গণতন্ত্র সেই ক্ষমতার ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে। সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। তাই সরকারকে শুধু নির্বাচনের দিন নয়, প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, তরুণরা আর রাজনীতির নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। তারা ন্যায্যতা, জবাবদিহি এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে সচেতন। তাদের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনকে ঘিরে নয়; তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান সুযোগ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মানও চায়।

গণতন্ত্র শুধু নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো-ক্ষমতার পালা বদলের পরও নাগরিকরা যেন তাদের নেতাদের প্রশ্ন করতে পারে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। সরকার জনগণের দাবি ও সমালোচনার প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, ইতিহাস সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

যুক্তরাজ্যে সরকারকে সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের ধারাবাহিক নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় জবাবদিহি জোরদারে নাগরিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে নাগরিক, আদালত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়। তবে চীন এ ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উদাহরণ সামনে আনে। অধিকতর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক সংস্কার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৮৯ সালে তিয়েন আনমেন স্কয়ারে হওয়া ছাত্র আন্দোলন মর্মান্তিক সামরিক দমন-পীড়নের মুখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আধুনিক ইতিহাসে একটি শক্তিশালী নিদর্শন-যেখানে দেখা যায়, সরকার যখন সংলাপের বদলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের দাবির জবাব দেয়, তখন কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য অনেক সময়ই নির্ভর করে নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কতটা অর্থবহ সুযোগ রয়েছে তার ওপর।

এই উদাহরণগুলো এ কথা বলে না যে গণতন্ত্র নিখুঁত। প্রতিটি সমাজেই বিক্ষোভ, মতবিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ থাকে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সরকার কীভাবে সেসব সমস্যার মোকাবিলা করে। তারা কি শোনে, ভেবে দেখে এবং সংস্কার আনে, নাকি সমালোচনাকে হুমকি হিসেবে উড়িয়ে দেয়? একটি পরিণত গণতন্ত্র তার নাগরিকদের প্রশ্নকে ভয় পায় না। বরং সেই প্রশ্নকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।

এই নীতিটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সংবিধান কেবল নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা দেয় না, একই সঙ্গে নাগরিকদের সেই ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে সুরক্ষাও দেয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হতে পারে না, আর নির্বাচনী বিজয় নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় বিজয়ের পর। শক্তিশালী নেতা তারা নন, যাঁরা কখনও সমালোচনার মুখে পড়েন না। বরং তারাই শক্তিশালী, যাঁরা উদ্বেগগুলো স্বীকার করার বিনয় রাখেন এবং ভুল সংশোধনের আত্মবিশ্বাস দেখান।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: নির্বাচন নির্ধারণ করে কে শাসন করবে, কিন্তু এতে জনগণের কণ্ঠ রোধ হয় না। গণতন্ত্র নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়েও টিকে থাকে জন-সংলাপ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।

শাসকরা কতটা ক্ষমতাবান দেখায় তা দিয়ে একটি জাতির শক্তি পরিমাপ করা হয় না; বরং তা নির্ভর করে সাধারণ নাগরিকরা কথা বলার সাহস রাখে কি না, এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা শুনতে, আত্মসমালোচনা করতে এবং প্রয়োজন হলে পথ সংশোধন করতে কতটা বিনয় ও প্রজ্ঞা দেখায় তার ওপর।