বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার রূপকল্প ঘোষণা করে সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি উচ্চাভিভাষী ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি শুধু নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি কৌশলগত অঙ্গীকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত এই ভিশন বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের পথ সুগম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রশাসনিক সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাস্তবায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল মোট দেশজ উৎপাদন। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কেবল একটি সংখ্যাগত মাইলফলক নয়; এটি শিল্পায়নের গভীরতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতিফলন। বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও নীতির ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও একটি নতুন অর্থনৈতিক অভিযাত্রার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদ-স্বল্প ও সীমিত শিল্পভিত্তির দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। কৃষির আধুনিকায়ন, তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, প্রবাস আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উত্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সামাজিক সূচকের অগ্রগতি দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। যে বাংলাদেশকে একসময় অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাহীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম।
এই অগ্রযাত্রা কোনো একক খাতের নয়; কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি, প্রবাস আয় এবং উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। স্বাধীনতার পর কৃষির আধুনিকায়ন ও সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য এনে দেয়। পরে তৈরি পোশাকশিল্প লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। একই সঙ্গে প্রবাস আয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, শিক্ষা, আবাসন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০০০ সালের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন গতি লাভ করে। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প শিল্পায়ন, আঞ্চলিক সংযোগ ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গড় আয়ুসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এই ধারাবাহিক সাফল্যের ভিত্তিতেই সরকার অর্থনীতিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে সরকার স্পষ্ট করেছে যে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হবে উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার সরলীকরণ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল সেবা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিক খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণ শুধু প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির গুণগত রূপান্তরের প্রশ্ন। শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে না পারলে শুধু জিডিপির আকার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের বিকাশ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন।
বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি এই অভিযাত্রা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। আগামী এক দশকে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারণ করতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়; অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বাড়াতে হবে। এই যাত্রার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ জ্বালানি নিরাপত্তা।
শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অথচ দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা উৎপাদন ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকায় সম্ভাবনাময় বিনিয়োগও বিলম্বিত হচ্ছে। তাই অনশোর ও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা শিল্পায়নের পূর্বশর্ত।
বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় বিনিয়োগ বাড়লেও প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা যায়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, জমি প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। যদিও সরকার আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের সরলীকরণ, মুনাফা সহজে প্রত্যাবাসনের সুযোগ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং সরকারি সেবার ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এসব সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি। কারণ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে দেশীয় মূলধনের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অপরিহার্য।
আর্থিক খাতের সংস্কারও সময়ের অন্যতম বড় দাবি। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার এখনো দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়নের কার্যকর উৎসে পরিণত হতে পারেনি। সরকার গতিশীল পুঁজিবাজার, স্টার্টআপ উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়নের কথা বলেছে। তবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট গভর্ন্যান্স, কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে পারলেই আর্থিক খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রকৃত চালিকাশক্তি হবে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের, যা একটি বিরল জনমিতিক সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বিনিয়োগ অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের কার্যকর অংশীদারি গড়ে তুলতে হবে।
রপ্তানি বৈচিত্র্যও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের অধিকাংশই তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আসে। এই খাত প্রধান শক্তি হলেও একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ওষুধশিল্প, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজনির্মাণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও চামড়াজাত শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস এবং ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা যথাযথ নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ শ্রমশক্তির মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব।
এসব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অপরিহার্য। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য ও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক রোডম্যাপ। উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জাহাজনির্মাণ খাতে গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সরকারি সহায়তা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কগুলোকে উৎপাদন, উদ্ভাবন ও রপ্তানির কার্যকর কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণ সাধারণ মানুষের জীবনমানেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থনীতির আকার বাড়লে মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও ভোগক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে আরো বেশি বিনিয়োগ সম্ভব হবে। পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের সম্প্রসারণ তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তির সমন্বয়ে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অবকাঠামো, জ্বালানি, দক্ষ মানবসম্পদ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, বায়োটেকনোলজি, সবুজ জ্বালানি ও ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের মূলধারায় আনতে হবে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক লজিস্টিকস এবং গবেষণা-উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি আরো শক্তিশালী করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর কোনো শর্টকাট নেই। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ মানবসম্পদই টেকসই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশেরও নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে সেই পথেই এগোতে হবে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি। প্রায় ২০ কোটির জনসংখ্যা, সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার এবং তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম শক্তি। মধ্যবিত্তের সম্প্রসারণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের সমন্বয়ই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ় না হলে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা প্রমাণ করেছে যে সুদূরপ্রসারী নীতি, জনগণের পরিশ্রম, উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন পরিকল্পনা একটি দেশকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদ-স্বল্প রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সরকার ঘোষিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপকল্প কেবল জিডিপির আকার বৃদ্ধির পরিকল্পনা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপান্তর কর্মসূচি। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই শূন্য থেকে প্রায় হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে উত্তরণ। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক সংস্কার, কৌশলগত বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় ঐকমত্য নিশ্চিত করা গেলে ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ কোনো অলীক কল্পনা নয়; বরং আগামী দশকের একটি বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট




