একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষদের সঙ্গে কী আচরণ করে! বিশেষত যখন সেই মানুষটি একজন শিশু। আদালত, সংবিধান কিংবা উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে মানবাধিকার ঢেকে রাখা যায়; কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব কখনো মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার এক নির্মম, অনস্বীকার্য রাজনৈতিক দলিল।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম) ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান কোনো রাজনীতির মাঠে নামেননি। তিনি কোনো দল করেননি, কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো মিছিলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা হওয়ার কারণে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। এখানে অপরাধ ছিল না কোনো কর্মে, অপরাধ ছিল জন্মে। রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা যখন এই পর্যায়ে নেমে আসে, তখন সেটি আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকে না; সেটি সরাসরি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে পরিণত হয়।
শিশুর অধিকার বনাম ক্ষমতার প্রতিহিংসা
জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলে, প্রতিটি শিশুর নিজ দেশে বসবাস, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতির কাছে কতটা মূল্য পেয়েছে?
প্রায় ১৭ বছর ধরে জাইমা রহমান কার্যত এই অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই বঞ্চনা কোনো আইনি রায়ের ফল নয়, কোনো আদালতের নির্দেশও নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে উৎসারিত একটি নীরব নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্র সরাসরি ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু এমন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একটি শিশু তার নিজের দেশে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। এটি আইনের শাসন নয়; এটি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছে ফ্যাসিস্ট।
এই একই সময়কালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এক ভয়াবহ ধারাবাহিকতার কথা বলেছে—বিরোধী মত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্রমাগত সংকোচন। এসব প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন যেন জাইমা রহমানের জীবনের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত। কারণ রাষ্ট্র যখন বিরোধী রাজনীতিকে শত্রু মনে করে, তখন তার প্রতিহিংসা থামে না ব্যক্তিতে; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত।
নির্বাসিত শৈশব : রাষ্ট্রীয় শাস্তির এক নিষ্ঠুর রূপ
শৈশব কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। একটি শিশুর জন্মভূমির মাটিতে বেড়ে ওঠা, নিজের দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, জাতীয় দিবসের আবেগ অনুভব করা, এসব রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এই দায়িত্ব শুধু এড়িয়ে যায়নি; বরং উল্টো পথে হেঁটেছে।
তিনি হারিয়েছেন বাংলাদেশের মাটিতে নিজের শৈশবের গল্প লেখার সুযোগ। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দূরত্ব, অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের নীরব নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। এটি কোনো স্বাভাবিক প্রবাসজীবন নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় চাপিয়ে দেওয়া নির্বাসন। ইতিহাসে একে বলা হয় ‘collective punishment’ যেখানে একজন ব্যক্তিকে আঘাত করতে গিয়ে পুরো পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়।
সবচেয়ে নির্মম দিক হলো পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। একজন নাতনির জীবনে দাদির ভূমিকা কেবল আবেগের নয়; এটি মানসিক নিরাপত্তার এক মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জাইমা রহমান দীর্ঘ সময় তার দাদি বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, সাহচর্য ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্য হলো দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরেও তিনি দাদীকে পাননি সেই পরিচিত হাসিমুখে, পারিবারিক উষ্ণতায়। পেয়েছিলেন হাসপাতালের একটি শয্যায়, অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায়। একটি নাতনির জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে মানুষটির গল্প শুনে বড় হওয়ার কথা ছিল, যার কোলে মাথা রেখে শৈশবের স্মৃতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো হাসপাতালের বিছানায়। আর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, সেই প্রিয় দাদিও ইন্তেকাল করলেন।
প্রশ্ন তখন ইতিহাসের কাছেই ফিরে আসে, এই শূন্যতার জবাব কে দেবে? রাষ্ট্র কি দেবে? সেই সময়ের ক্ষমতাবান রাজনীতি কি দেবে? নাকি আমরা সবাই একদিন এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াব, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব ও ছিনিয়ে নেওয়া পারিবারিক মুহূর্তগুলোর জবাব কি?
দেশের গণতন্ত্র ও এক শিশুর নির্বাসন : একই সূত্রে গাঁথা
যে ১৭ বছর জাইমা রহমান দেশের বাইরে কাটিয়েছেন, সেই একই সময়ে বাংলাদেশের জনগণও ধীরে ধীরে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছে। ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, নির্বাচন পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়, বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করা হয়েছে।
একদিকে দেশের মানুষ হারিয়েছে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যদিকে জাইমা রহমান হারিয়েছেন নিজের দেশের সঙ্গে বেড়ে ওঠার অধিকার। এই দুই বাস্তবতা আলাদা নয়, এগুলো একই রাষ্ট্রীয় দর্শনের ফল, যেখানে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া হয়।
নীরবতাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ
জাইমা রহমান কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। তিনি কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেননি। কিন্তু এই নীরবতাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ। কারণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ তখনই দেখা যায়, যখন ভুক্তভোগীকে চুপ করে সহ্য করতে হয়।
এই ১৭ বছরের নির্বাসন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। মানবাধিকার ভাষায় একে বলা হয় ‘পরোক্ষ নিপীড়ন’ যেখানে রাষ্ট্র আইন ভাঙ্গে না দেখিয়ে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহটাই ভেঙে দেয়।
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রের দায়
জাইমা রহমান জন্মের আগেই হারিয়েছেন এই দেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। শৈশব ও কৈশোরে যাঁর ছায়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেই দাদী বেগম খালেদা জিয়াকেও তিনি হারালেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ। ছোট চাচ্চু আরাফাত রহমান কোকো ১/১১ পরবর্তী নির্যাতন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডি।
তিনি যা হারিয়েছেন শৈশব, সময়, পারিবারিক সান্নিধ্য, তার বিচার একদিন ইতিহাস করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় : একটি রাষ্ট্র কি কখনো একটি শিশুর হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারে.?
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা : ইতিহাস এখান থেকেই প্রশ্ন করবে
এই লেখা শুধু অতীতের কোনো কান্না নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি চার্জশিট। জেন-জি প্রজন্মকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেয়, তখন সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে নিরপরাধ মানুষদের। জাইমা রহমান কোনো বিপ্লবী ছিলেন না, কোনো বিদ্রোহীও নন-তিনি ছিলেন শুধু একটি শিশু। তবু তিনি রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বলি হয়েছেন।
আজকের প্রজন্ম যদি ভাবে, ‘এগুলো তো পুরনো গল্প’ তাহলে সেটাই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ ইতিহাস কখনো হঠাৎ করে নিষ্ঠুর হয় না; ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়। আজ একজন শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়, কাল একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আজ পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়, কাল জাতিকে।
জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে, এই রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য নিরাপদ ছিল? কার জন্য ছিল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিন পাঠ্যবইয়ে লেখা হবে না, লেখা হবে মানুষের বিবেকে। জেন-জি যদি আজ চুপ থাকে, আগামীকাল সেই নীরবতার দায় তাদেরও বইতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নিপীড়নের সময় দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। প্রতিটি জুলুম একদিন হিসাব চায়। রাষ্ট্রের শক্তি দিয়ে হয়তো একটি শিশুকে নির্বাসনে রাখা যায়, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে সেই রাষ্ট্রই কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।
ইনশা-আল্লাহ, সেই দিন আসবে, যেদিন জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হবে না, বরং দেখা হবে একটি রাষ্ট্র কিভাবে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তার প্রমাণ হিসেবে। এই লেখা তখন সাক্ষ্য দেবে, একটি শিশু কোনো অপরাধ না করেও কীভাবে তার জীবন থেকে ১৭ বছর হারিয়েছিল। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইতিহাস বাধ্য করবে একটি রাষ্ট্রকে মাথা নিচু করতে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস খুব নীরবভাবেই বিচার করে। কোনো স্লোগান ছাড়াই, কোনো মিছিল ছাড়াই সে প্রশ্ন তোলে—কেন একটি শিশুকে তার জন্মভূমি থেকে দূরে বড় হতে হলো? কেন একটি নাতনি তার দাদীর স্নেহময় কোলে নয়, হাসপাতালের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় দেখলো? সময় হয়তো সবকিছু এগিয়ে নেয়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন ইতিহাসের বুকেই থেকে যায়। জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর সেই প্রশ্নগুলোর একটি, যা একদিন আমাদের সবাইকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করবে, একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত কার?
লেখক : তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি






