• ই-পেপার

ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ : স্বপ্ন বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সংস্কার

জাইমা রহমানের নির্বাসিত শৈশব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দলিল

মশিউর রহমান যাদু
জাইমা রহমানের নির্বাসিত শৈশব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দলিল
সংগৃহীত ছবি

একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষদের সঙ্গে কী আচরণ করে! বিশেষত যখন সেই মানুষটি একজন শিশু। আদালত, সংবিধান কিংবা উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে মানবাধিকার ঢেকে রাখা যায়; কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব কখনো মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার এক নির্মম, অনস্বীকার্য রাজনৈতিক দলিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম) ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান কোনো রাজনীতির মাঠে নামেননি। তিনি কোনো দল করেননি, কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো মিছিলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা হওয়ার কারণে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। এখানে অপরাধ ছিল না কোনো কর্মে, অপরাধ ছিল জন্মে। রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা যখন এই পর্যায়ে নেমে আসে, তখন সেটি আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকে না; সেটি সরাসরি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে পরিণত হয়।

শিশুর অধিকার বনাম ক্ষমতার প্রতিহিংসা

জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলে, প্রতিটি শিশুর নিজ দেশে বসবাস, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক বিকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতির কাছে কতটা মূল্য পেয়েছে?

প্রায় ১৭ বছর ধরে জাইমা রহমান কার্যত এই অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই বঞ্চনা কোনো আইনি রায়ের ফল নয়, কোনো আদালতের নির্দেশও নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে উৎসারিত একটি নীরব নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্র সরাসরি ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু এমন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একটি শিশু তার নিজের দেশে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। এটি আইনের শাসন নয়; এটি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছে ফ্যাসিস্ট।

এই একই সময়কালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এক ভয়াবহ ধারাবাহিকতার কথা বলেছে—বিরোধী মত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্রমাগত সংকোচন। এসব প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন যেন জাইমা রহমানের জীবনের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত। কারণ রাষ্ট্র যখন বিরোধী রাজনীতিকে শত্রু মনে করে, তখন তার প্রতিহিংসা থামে না ব্যক্তিতে; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত।

নির্বাসিত শৈশব : রাষ্ট্রীয় শাস্তির এক নিষ্ঠুর রূপ

শৈশব কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। একটি শিশুর জন্মভূমির মাটিতে বেড়ে ওঠা, নিজের দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, জাতীয় দিবসের আবেগ অনুভব করা, এসব রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এই দায়িত্ব শুধু এড়িয়ে যায়নি; বরং উল্টো পথে হেঁটেছে।

তিনি হারিয়েছেন বাংলাদেশের মাটিতে নিজের শৈশবের গল্প লেখার সুযোগ। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দূরত্ব, অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের নীরব নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। এটি কোনো স্বাভাবিক প্রবাসজীবন নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় চাপিয়ে দেওয়া নির্বাসন। ইতিহাসে একে বলা হয় ‘collective punishment’ যেখানে একজন ব্যক্তিকে আঘাত করতে গিয়ে পুরো পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়।

সবচেয়ে নির্মম দিক হলো পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। একজন নাতনির জীবনে দাদির ভূমিকা কেবল আবেগের নয়; এটি মানসিক নিরাপত্তার এক মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জাইমা রহমান দীর্ঘ সময় তার দাদি বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহ, সাহচর্য ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্য হলো দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরেও তিনি দাদীকে পাননি সেই পরিচিত হাসিমুখে, পারিবারিক উষ্ণতায়। পেয়েছিলেন হাসপাতালের একটি শয্যায়, অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায়। একটি নাতনির জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে মানুষটির গল্প শুনে বড় হওয়ার কথা ছিল, যার কোলে মাথা রেখে শৈশবের স্মৃতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো হাসপাতালের বিছানায়। আর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, সেই প্রিয় দাদিও ইন্তেকাল করলেন।

প্রশ্ন তখন ইতিহাসের কাছেই ফিরে আসে, এই শূন্যতার জবাব কে দেবে? রাষ্ট্র কি দেবে? সেই সময়ের ক্ষমতাবান রাজনীতি কি দেবে? নাকি আমরা সবাই একদিন এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াব, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব ও ছিনিয়ে নেওয়া পারিবারিক মুহূর্তগুলোর জবাব কি?

দেশের গণতন্ত্র ও এক শিশুর নির্বাসন : একই সূত্রে গাঁথা

যে ১৭ বছর জাইমা রহমান দেশের বাইরে কাটিয়েছেন, সেই একই সময়ে বাংলাদেশের জনগণও ধীরে ধীরে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছে। ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, নির্বাচন পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়, বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করা হয়েছে।

একদিকে দেশের মানুষ হারিয়েছে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যদিকে জাইমা রহমান হারিয়েছেন নিজের দেশের সঙ্গে বেড়ে ওঠার অধিকার। এই দুই বাস্তবতা আলাদা নয়, এগুলো একই রাষ্ট্রীয় দর্শনের ফল, যেখানে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া হয়।

নীরবতাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ

জাইমা রহমান কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। তিনি কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেননি। কিন্তু এই নীরবতাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ। কারণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ তখনই দেখা যায়, যখন ভুক্তভোগীকে চুপ করে সহ্য করতে হয়।

এই ১৭ বছরের নির্বাসন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। মানবাধিকার ভাষায় একে বলা হয় ‘পরোক্ষ নিপীড়ন’ যেখানে রাষ্ট্র আইন ভাঙ্গে না দেখিয়ে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহটাই ভেঙে দেয়।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রের দায়

জাইমা রহমান জন্মের আগেই হারিয়েছেন এই দেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। শৈশব ও কৈশোরে যাঁর ছায়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেই দাদী বেগম খালেদা জিয়াকেও তিনি হারালেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ। ছোট চাচ্চু আরাফাত রহমান কোকো ১/১১ পরবর্তী নির্যাতন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডি।

তিনি যা হারিয়েছেন শৈশব, সময়, পারিবারিক সান্নিধ্য, তার বিচার একদিন ইতিহাস করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় : একটি রাষ্ট্র কি কখনো একটি শিশুর হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারে.?

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা : ইতিহাস এখান থেকেই প্রশ্ন করবে

এই লেখা শুধু অতীতের কোনো কান্না নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি চার্জশিট। জেন-জি প্রজন্মকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানবিকতা বিসর্জন দেয়, তখন সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে নিরপরাধ মানুষদের। জাইমা রহমান কোনো বিপ্লবী ছিলেন না, কোনো বিদ্রোহীও নন-তিনি ছিলেন শুধু একটি শিশু। তবু তিনি রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বলি হয়েছেন।

আজকের প্রজন্ম যদি ভাবে, ‘এগুলো তো পুরনো গল্প’ তাহলে সেটাই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ ইতিহাস কখনো হঠাৎ করে নিষ্ঠুর হয় না; ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়। আজ একজন শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়, কাল একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আজ পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়, কাল জাতিকে।

জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে, এই রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য নিরাপদ ছিল? কার জন্য ছিল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিন পাঠ্যবইয়ে লেখা হবে না, লেখা হবে মানুষের বিবেকে। জেন-জি যদি আজ চুপ থাকে, আগামীকাল সেই নীরবতার দায় তাদেরও বইতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নিপীড়নের সময় দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। প্রতিটি জুলুম একদিন হিসাব চায়। রাষ্ট্রের শক্তি দিয়ে হয়তো একটি শিশুকে নির্বাসনে রাখা যায়, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে সেই রাষ্ট্রই কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

ইনশা-আল্লাহ, সেই দিন আসবে, যেদিন জাইমা রহমানের জীবনের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হবে না, বরং দেখা হবে একটি রাষ্ট্র কিভাবে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তার প্রমাণ হিসেবে। এই লেখা তখন সাক্ষ্য দেবে, একটি শিশু কোনো অপরাধ না করেও কীভাবে তার জীবন থেকে ১৭ বছর হারিয়েছিল। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইতিহাস বাধ্য করবে একটি রাষ্ট্রকে মাথা নিচু করতে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস খুব নীরবভাবেই বিচার করে। কোনো স্লোগান ছাড়াই, কোনো মিছিল ছাড়াই সে প্রশ্ন তোলে—কেন একটি শিশুকে তার জন্মভূমি থেকে দূরে বড় হতে হলো? কেন একটি নাতনি তার দাদীর স্নেহময় কোলে নয়, হাসপাতালের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় দেখলো? সময় হয়তো সবকিছু এগিয়ে নেয়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন ইতিহাসের বুকেই থেকে যায়। জাইমা রহমানের হারিয়ে যাওয়া ১৭ বছর সেই প্রশ্নগুলোর একটি, যা একদিন আমাদের সবাইকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করবে, একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত কার?

লেখক : তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি

ভারতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

বিশেষ প্রতিনিধি
ভারতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

গণতন্ত্রকে প্রায়ই ভোটদানের দিবস দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু এর প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় ভোটের পর যখন নাগরিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, জবাবদিহি দাবি করে এবং প্রয়োজনে ভুল সংশোধনের আহ্বান জানায়।

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর কাছে পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অগ্রগতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই তারা যখন ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা দাবি করে, তখন তারা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত সাম্প্রতিক ঘটনায় একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেছে। নির্বাচিত সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরো জবাবদিহি ও সংস্কারের পথে এগোনোর ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন-সমালোচনা শোনা, তা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের পথে হাঁটা। এটি দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার শাসনের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু সেই ম্যান্ডেট পাঁচ বছরের জন্য জনগণকে উপেক্ষা করার সুযোগ নয়। নির্বাচন সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, আর সাংবিধানিক গণতন্ত্র সেই ক্ষমতার ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে। সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। তাই সরকারকে শুধু নির্বাচনের দিন নয়, প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, তরুণরা আর রাজনীতির নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। তারা ন্যায্যতা, জবাবদিহি এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে সচেতন। তাদের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনকে ঘিরে নয়; তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান সুযোগ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মানও চায়।

গণতন্ত্র শুধু নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো-ক্ষমতার পালা বদলের পরও নাগরিকরা যেন তাদের নেতাদের প্রশ্ন করতে পারে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। সরকার জনগণের দাবি ও সমালোচনার প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, ইতিহাস সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

যুক্তরাজ্যে সরকারকে সংসদ, আদালত, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের ধারাবাহিক নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় জবাবদিহি জোরদারে নাগরিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে নাগরিক, আদালত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়। তবে চীন এ ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উদাহরণ সামনে আনে। অধিকতর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক সংস্কার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৮৯ সালে তিয়েন আনমেন স্কয়ারে হওয়া ছাত্র আন্দোলন মর্মান্তিক সামরিক দমন-পীড়নের মুখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আধুনিক ইতিহাসে একটি শক্তিশালী নিদর্শন-যেখানে দেখা যায়, সরকার যখন সংলাপের বদলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের দাবির জবাব দেয়, তখন কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য অনেক সময়ই নির্ভর করে নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কতটা অর্থবহ সুযোগ রয়েছে তার ওপর।

এই উদাহরণগুলো এ কথা বলে না যে গণতন্ত্র নিখুঁত। প্রতিটি সমাজেই বিক্ষোভ, মতবিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ থাকে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সরকার কীভাবে সেসব সমস্যার মোকাবিলা করে। তারা কি শোনে, ভেবে দেখে এবং সংস্কার আনে, নাকি সমালোচনাকে হুমকি হিসেবে উড়িয়ে দেয়? একটি পরিণত গণতন্ত্র তার নাগরিকদের প্রশ্নকে ভয় পায় না। বরং সেই প্রশ্নকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।

এই নীতিটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সংবিধান কেবল নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা দেয় না, একই সঙ্গে নাগরিকদের সেই ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে সুরক্ষাও দেয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হতে পারে না, আর নির্বাচনী বিজয় নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় বিজয়ের পর। শক্তিশালী নেতা তারা নন, যাঁরা কখনও সমালোচনার মুখে পড়েন না। বরং তারাই শক্তিশালী, যাঁরা উদ্বেগগুলো স্বীকার করার বিনয় রাখেন এবং ভুল সংশোধনের আত্মবিশ্বাস দেখান।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: নির্বাচন নির্ধারণ করে কে শাসন করবে, কিন্তু এতে জনগণের কণ্ঠ রোধ হয় না। গণতন্ত্র নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়েও টিকে থাকে জন-সংলাপ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।

শাসকরা কতটা ক্ষমতাবান দেখায় তা দিয়ে একটি জাতির শক্তি পরিমাপ করা হয় না; বরং তা নির্ভর করে সাধারণ নাগরিকরা কথা বলার সাহস রাখে কি না, এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা শুনতে, আত্মসমালোচনা করতে এবং প্রয়োজন হলে পথ সংশোধন করতে কতটা বিনয় ও প্রজ্ঞা দেখায় তার ওপর।

পাকিস্তান : সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়

অনলাইন ডেস্ক
পাকিস্তান : সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়
এআই দিয়ে বানানো ছবি

কোনো দেশের সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তির পরিচয় শুধু কতগুলো যুদ্ধ জিতেছে তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং ক্ষমতা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো লড়াইয়ে সংযত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরে দেশকে। আর ইতিহাসের নানা সময়ে বহু দেশের মতোই, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আবিষ্কার করে। প্রশ্ন ছিল, সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না। আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, তারা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজেদের সাংবিধানিক সীমা মেনে চলবে কি না?

ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক সংকট প্রায়ই সামরিক বাহিনীর জন্য ক্ষমতায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী এই যুক্তি দেখিয়ে হস্তক্ষেপ করেছে যে একমাত্র তারাই জাতিকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে, যখন সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশও এ অভিজ্ঞতার বাইরে নয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের পরিণতি দেশ দেখেছে। তাই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় সংকটকে স্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সুযোগে পরিণত করেনি। এই সংযমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা— কিন্তু অনুসরণ করার মতো কোনো মডেল নয়। ১৯৫৮ সালের প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে পাকিস্তান জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া-উল-হক এবং পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে বারবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক প্রভাবের অধীনে ছিল। প্রতিবারই হস্তক্ষেপকে স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি দমন কিংবা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল হয়েছে ভিন্ন। বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, আর এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে নির্বাচিত সরকারগুলো প্রায়ই পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে কাজ করতে পারেনি।

এই ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট; সেনাবাহিনী তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করে। বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস এই তুলনাকে আরও গভীর অর্থ দেয়। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধ শুধু স্বাধীনতার জন্য লড়াই ছিল না; এটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও এক সংগ্রাম। ইতিহাসকে কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে, আজও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং বেসামরিক বিষয়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। পাকিস্তানের মানবাধিকার আইনজীবী হিনা জিলানিসহ অনেকেই আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক পরিসর সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও পাকিস্তানকে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার সময় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ও যোগাযোগের কেন্দ্রে দেখা যাওয়া বিশ্লেষকদের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

সমালোচকরা মনে করেন, এই ‘প্রতীকী উপস্থিতি’ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে। তা হলো— একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে দেশের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব কি নির্বাচিত নেতারা করবেন, নাকি সামরিক কমান্ডাররা? সৈন্যদের আত্মত্যাগকে খাটো করা এই বিতর্কের উদ্দেশ্য নয়। কিংবা এটি পাকিস্তানের জন্যও কোনো পৃথক বিষয় নয়। বরং এটি একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর তা হলো; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই থাকবে, আর সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের পেশাদার রক্ষক হিসেবে তাদের ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা দেশটির অভ্যন্তরেও রয়েছে। ভারতের মাটিতে পাকিস্তানভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয় নিয়ে সামরিক বাহিনীর দেওয়া সরকারি বর্ণনার সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বোন নরিন নিয়াজি। তার অভিযোগ, সরকারি বয়ান ঘটনাপ্রবাহকে সঠিকভাবে তুলে ধরেনি।

তার দাবির সঙ্গে কেউ একমত হোন বা না হোন, এতে একটি বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন ঘটেছে। তা হলো— স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সামরিক ক্ষমতা ও জনগণের আস্থার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক পরিসর দখল করে, তা কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী নয়। বরং যে সেনাবাহিনী গণতন্ত্রের পথকে সুগম রাখে, সেই সেনাবাহিনীই শক্তিশালী।

একটি দেশ তখনই নিরাপদ হয়, যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নিজ নিজ অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। সংসদকে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। আদালতকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। আর সশস্ত্র বাহিনীকে দেশ ও সংবিধান রক্ষা করতে হবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যখন সেনাবাহিনী স্থায়ী রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র এবং সেনাবাহিনী— উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী দেশ পরিচালনা করে নয়, বরং দেশকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই দীর্ঘস্থায়ী সম্মান অর্জন করবে। জুলাই ২০২৪-এর সম্মুখসারিতে থাকা প্রজন্মের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা : যারা ক্ষমতা দখল করে— তারা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী যারা ক্ষমতার সীমা মেনে চলার মতো সুশৃঙ্খল।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের তাৎপর্য এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ প্রায় একান্ন বছরের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনার জন্য এ লেখার অবতারণা। নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন।

২১ জুন ২০২৬ তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমসহ বেশ কয়েকজন মালয়েশীয় মন্ত্রীর সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে সফল আলোচনার পর ২২ জুন তিনি চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোরামের কয়েকটি সেশনে অংশগ্রহণ করে ভাষণ প্রদান করেন। দালিয়ান থেকে ট্রেনযোগে ২৪ জুন বেইজিং পৌঁছান। চীনের রাজধানীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সফর শেষে ২৬ জুন বিকেলে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছাড়াও দেশটির পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও তার প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা শেষে প্রকাশিত ইশতেহারে বাংলাদেশ ও চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ ও ‘অংশীদারত্ব’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে’। এশীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের সমর্থন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তন আসুক, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে পাশে থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন যে, চীন বাংলাদেশের মূল্যবান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীন তাদের উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) এগিয়ে নেওয়া, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা করবে।

সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগীতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডর স্থাপন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে। উক্ত করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক ও রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

চীন বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্র বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সচল করবে। চীন তিস্তা নদী প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ব্রিকস-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আবেদনেও চীন সমর্থন করবে।

এ সফরে বাংলাদেশ সাথে চীনের মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দু’দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এবং ১টি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আভাষ পাওয়া যায় যে, এ সফর শেষে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা ও সরাসরি অনুদান বাবদ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়ে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামীতে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

গণচীন ১৯৭৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একই বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৯৭৭ সালে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে চীন সফরে গেলে তাকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও জেনারেল জিয়াউর রহমান পুনরায় চীন সফর করেন।

বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলিক নীতি হচ্ছে সব ধরণের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাণিজ্য  ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মৌলিক চরিত্র বদলায়নি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বেশ কয়েকবার চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে গমন করেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় চীনের সহায়তায় অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পখাতে চীনের অর্থায়নে বেশ ক’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সামরিক, স্বৈরাচার বা গণতান্ত্রিক যেকোনো সরকার থাকুক না কেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কখনো খারাপ হয়নি। 

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বেশিরভাগই শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য।

২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। বেশির ভাগ ঋণ ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেল ছিল চীনের ঋণসহায়তায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।

অনেকের মতে চীন সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নির্মিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আয় থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। চীনের জি টু জি ঋনের আওতায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি না করলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে। 
চীনের ঋণসহায়তায় বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প এখনো চলমান। এগুলো যেন বাধাগ্রস্থ না হয়, সেদিকে বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে, এসব প্রকল্প চালু করে ঋণের সুদ হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার  চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সামান্য। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা প্রদান করেছে, অপ্রতুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকগণ চীনের বাজারে তেমন সুবিধা করতে পারছে না।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে উচ্চমানের তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে।

ঋণ সহায়তা ছাড়াও চীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অনুদান সহায়তায় নির্মাণ করে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯টি বড় ও মাঝারি আকারের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার সেন্টার।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরী পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চীনা প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল একচেটিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষিক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকৃত উন্নতমানের প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে—বেশকিছু প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের চুক্তি এবং চলমান স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে থাকবে। উপরন্তু বিএনপি সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগুতে হবে।

মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় করার আগ্রহকে ভারত ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। তা ছাড়া বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। 

বাংলাদেশে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকল্পের অনুকূল অর্থনৈতিক রিটার্ণ (ইআরআর) প্রাপ্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ঋনের ফাঁদে পড়ে গেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগ আকর্ষণই বড় কথা নয়; সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবাদমান সমস্যা নিরসন করে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তা ছাড়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, তার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা হতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সকলের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সামর্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বা রাষ্ট্রজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—অনুসরণ করে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ।

লেখক
সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত।