• ই-পেপার

পাকিস্তান : সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের তাৎপর্য এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ প্রায় একান্ন বছরের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনার জন্য এ লেখার অবতারণা। নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন।

২১ জুন ২০২৬ তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমসহ বেশ কয়েকজন মালয়েশীয় মন্ত্রীর সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে সফল আলোচনার পর ২২ জুন তিনি চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোরামের কয়েকটি সেশনে অংশগ্রহণ করে ভাষণ প্রদান করেন। দালিয়ান থেকে ট্রেনযোগে ২৪ জুন বেইজিং পৌঁছান। চীনের রাজধানীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সফর শেষে ২৬ জুন বিকেলে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছাড়াও দেশটির পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও তার প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা শেষে প্রকাশিত ইশতেহারে বাংলাদেশ ও চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ ও ‘অংশীদারত্ব’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে’। এশীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের সমর্থন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তন আসুক, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে পাশে থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন যে, চীন বাংলাদেশের মূল্যবান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীন তাদের উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) এগিয়ে নেওয়া, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা করবে।

সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগীতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডর স্থাপন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে। উক্ত করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক ও রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

চীন বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্র বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সচল করবে। চীন তিস্তা নদী প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ব্রিকস-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আবেদনেও চীন সমর্থন করবে।

এ সফরে বাংলাদেশ সাথে চীনের মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দু’দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এবং ১টি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আভাষ পাওয়া যায় যে, এ সফর শেষে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা ও সরাসরি অনুদান বাবদ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়ে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামীতে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

গণচীন ১৯৭৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একই বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৯৭৭ সালে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে চীন সফরে গেলে তাকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও জেনারেল জিয়াউর রহমান পুনরায় চীন সফর করেন।

বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলিক নীতি হচ্ছে সব ধরণের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাণিজ্য  ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মৌলিক চরিত্র বদলায়নি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বেশ কয়েকবার চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে গমন করেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় চীনের সহায়তায় অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পখাতে চীনের অর্থায়নে বেশ ক’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সামরিক, স্বৈরাচার বা গণতান্ত্রিক যেকোনো সরকার থাকুক না কেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কখনো খারাপ হয়নি। 

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বেশিরভাগই শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য।

২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। বেশির ভাগ ঋণ ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেল ছিল চীনের ঋণসহায়তায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।

অনেকের মতে চীন সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নির্মিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আয় থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। চীনের জি টু জি ঋনের আওতায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি না করলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে। 
চীনের ঋণসহায়তায় বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প এখনো চলমান। এগুলো যেন বাধাগ্রস্থ না হয়, সেদিকে বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে, এসব প্রকল্প চালু করে ঋণের সুদ হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার  চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সামান্য। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা প্রদান করেছে, অপ্রতুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকগণ চীনের বাজারে তেমন সুবিধা করতে পারছে না।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে উচ্চমানের তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে।

ঋণ সহায়তা ছাড়াও চীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অনুদান সহায়তায় নির্মাণ করে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯টি বড় ও মাঝারি আকারের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার সেন্টার।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরী পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চীনা প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল একচেটিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষিক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকৃত উন্নতমানের প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে—বেশকিছু প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের চুক্তি এবং চলমান স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে থাকবে। উপরন্তু বিএনপি সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগুতে হবে।

মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় করার আগ্রহকে ভারত ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। তা ছাড়া বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। 

বাংলাদেশে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকল্পের অনুকূল অর্থনৈতিক রিটার্ণ (ইআরআর) প্রাপ্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ঋনের ফাঁদে পড়ে গেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগ আকর্ষণই বড় কথা নয়; সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবাদমান সমস্যা নিরসন করে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তা ছাড়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, তার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা হতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সকলের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সামর্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বা রাষ্ট্রজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—অনুসরণ করে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ।

লেখক
সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত।

ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?

জিল্লুর রহমান
ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?

ভ্রমণের একটি সুবিধা আছে। পরিচিত শহর থেকে দূরে গেলে নিজের দেশটিকে যেন একটু দূর থেকে দেখা যায়। আকাশে উড়তে উড়তে নিচের নদী, সড়ক, জনপদ, সীমান্ত সবই ছোট মনে হয়। তখন মনে হয়, আমরা যেসব বিষয় নিয়ে প্রতিদিন এত উত্তেজিত হই, সেগুলো হয়তো সত্যিই খুব ছোট। আবার বিমান যখন মাটিতে নামে, মুঠোফোনে খবরের জানালা খুলে যায়, তখন বোঝা যায় ঘটনাগুলো ছোট নয়; আমাদের দেখার জানালাটিই ছোট।

এই সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে আরেকটি দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আবার পরিবর্তন এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর অনেক মুখ দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে, নতুন মুখ এসেছে। কিন্তু মানুষের পুরোনো প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—ক্ষমতার মানুষ বদলালেই কি ক্ষমতার চরিত্র বদলায়?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার বদলেছে বহুবার। পতাকা বদলায়নি, জাতীয় সংগীত বদলায়নি, সংবিধানের প্রচ্ছদও প্রায় একই থেকেছে। বদলেছে ক্ষমতার কেন্দ্র, ভাষা, স্লোগান ও সুবিধাভোগীদের তালিকা। আমাদের সংকটটি সম্ভবত সেখানেই। আমরা রাষ্ট্র পরিবর্তনের কথা বলি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করি রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের। তারপর নতুন পরিচালকরাও কিছুদিনের মধ্যে পুরনো চেয়ারের ভাষা শিখে ফেলেন।

চেয়ার বড় বিচিত্র বস্তু। মানুষ চেয়ারে বসে না, অনেক সময় চেয়ারই মানুষের ওপর বসে যায়।

১. রাষ্ট্রপতি গেলেন, রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়াল?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সাধারণত খুব বেশি থাকে না। কারণ আমাদের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দৃশ্যমান ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সংকটের সময়ে সীমিত ক্ষমতার পদও অসীম তাৎপর্য বহন করতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে ছাদের দিকে কেউ তাকায় না; ঝড় শুরু হলে বোঝা যায় ছাদটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ তাই শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের আরেকটি অধ্যায়। তিনি ছিলেন বিগত ক্ষমতাব্যবস্থার সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। সরকার বদলের পরও তিনি পদে ছিলেন। তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রতিবাদ এবং পদত্যাগের দাবি ছিল। অবশেষে তিনি সরে গেলেন। সংবাদমাধ্যমে চিকিৎসাজনিত কারণের কথা এসেছে, আবার রাজনৈতিক চাপের কথাও আলোচিত হচ্ছে।

কিন্তু রাষ্ট্রপতির বিদায়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে বের হতে পারছে?

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি সাংবিধানিক পদকে আমরা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বিচার করি। নির্বাচন কমিশনার কে নিয়োগ দিলেন, বিচারপতি কোন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পেলেন, রাষ্ট্রপতি কার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা কোন আমলের—এসব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু এসব প্রশ্নই যদি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে যায়, তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠানই কখনো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে না। সেটি এক সরকারের, এক দলের কিংবা এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান হয়েই থেকে যায়।

আমাদের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত বিশ্বাস প্রচলিত—আমার লোক নিরপেক্ষ, অন্যের লোক পক্ষপাতদুষ্ট। আমি যাকে নিয়োগ দিই, তিনি যোগ্য; প্রতিপক্ষ যাকে নিয়োগ দেয়, তিনি দলীয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানে তাই যোগ্যতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি। কিন্তু ধারাবাহিকতা মানে শুধু নতুন কাউকে দ্রুত শপথ পড়ানো নয়। ধারাবাহিকতা মানে এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যেখানে দেশের মানুষ বুঝতে পারে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছায় নয়, আইন ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মে চলছে।

নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি কীভাবে নির্বাচিত হবেন, তার ভূমিকা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং সংকটের সময়ে তিনি দলীয় আনুগত্যের ওপর সংবিধানের প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারবেন কি না। রাষ্ট্রপতি ভবনের বাসিন্দা বদলানো সহজ। বঙ্গভবনকে সত্যিকারের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা কঠিন।

২. জুলাইয়ের স্মৃতি, ক্ষমতার পরীক্ষা

জুলাই এখন আর বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারের একটি মাসমাত্র নয়। এটি একটি রাজনৈতিক স্মৃতি, একটি রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি। দুই বছর আগে রাজপথে যারা নেমেছিলেন, তারা কেবল একটি সরকারের পতন চাননি। তারা এমন একটি ব্যবস্থার অবসান চেয়েছিলেন, যেখানে ভোট, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক মর্যাদা ধীরে ধীরে ক্ষমতার অধীন হয়ে পড়েছিল। দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা অস্বাভাবিক নয়—সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

অভ্যুত্থান করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। রাজপথে স্লোগান সংক্ষিপ্ত হয়; রাষ্ট্র পরিচালনার বাক্য অনেক দীর্ঘ। আন্দোলনে শত্রু চিহ্নিত করা সহজ, শাসনে সমস্যা সমাধান করা কঠিন। একটি সরকারকে বিদায় করতে ঐক্য যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে প্রয়োজন নীতি, ধৈর্য, আত্মসংযম ও জবাবদিহি।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর মানুষ সাধারণত প্রথমেই এই শিক্ষাটিই ভুলে যায়। আমরা জুলাইকে কীভাবে স্মরণ করব? শুধু অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বক্তৃতা এবং স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে? নাকি রাষ্ট্রের দৈনন্দিন আচরণে? কোনো তরুণ থানায় গিয়ে হয়রানি ছাড়া অভিযোগ করতে পারলে জুলাই বেঁচে থাকবে। বিরোধী মতের একজন মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারলে জুলাই অর্থবহ হবে। সরকারি দলের সমর্থক অপরাধ করেও ছাড় না পেলে জুলাইয়ের ন্যায়বিচারের দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে। গণমাধ্যম সরকারের প্রশংসা করার স্বাধীনতার পাশাপাশি সমালোচনা করার নিরাপত্তা পেলে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তব রূপ পাবে। বিপ্লবের স্মৃতি সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয় তখনই, যখন তার নামে নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণি জন্ম নেয়।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিহাসকে প্রায়ই সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। একটি দল মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা দাবি করে, আরেকটি দল জাতীয়তাবাদের; কেউ ধর্মের, কেউ গণতন্ত্রের, কেউ আবার বিপ্লবের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হতে চায়। ইতিহাস তখন জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে রাজনৈতিক দোকানের সাইনবোর্ডে পরিণত হয়।

জুলাই কারো একার নয়। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন কোনো দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বন্দি থাকতে পারে না। জুলাইয়ের মালিকানা দাবি করার চেয়ে তার দায় বহন করা জরুরি। নতুন সরকার নির্বাচনে বড় জনসমর্থন পেয়েছে। বড় বিজয় নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। কিন্তু বড় বিজয় একই সঙ্গে বড় বিপদও। কারণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়, আবার বিরোধী কণ্ঠকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার প্রলোভনও তৈরি করে। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা নির্বাচনে জেতার দিন হয় না; শুরু হয় তার পরদিন থেকে। পূর্ববর্তী শাসনের ভুলগুলো শুধু বক্তৃতায় নিন্দা করলে হবে না। সেই ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করাই হবে জুলাইয়ের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

৩. শুল্কের হিসাব ও বন্ধুত্বের ভাষা

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্কারোপ করেছে—এ খবরটি শুধু ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বন্ধুত্বের কথা অনেক বলা হয়। কিন্তু বাণিজ্যের টেবিলে বন্ধুত্বের হাসির পাশাপাশি হিসাবের যন্ত্রটিও চালু থাকে। রাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী বন্ধু নেই—এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। স্থায়ী স্বার্থ আছে, এ কথাও আমরা মুখস্থ জানি। সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ বুঝি, নিজের স্বার্থ নির্ধারণ করতে পারি না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন স্বল্পমজুরি, তৈরি পোশাক এবং কিছু বাজারসুবিধার ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। শুল্কনীতি এখন শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অস্ত্র নয়; শ্রম অধিকার, পরিবেশ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানও এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে একটি দেশের কারখানায় কী উৎপাদিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি সেই দেশ কীভাবে শাসিত হচ্ছে, শ্রমিক কী অধিকার পাচ্ছেন এবং সে কোন কূটনৈতিক বলয়ে দাঁড়াচ্ছে—সবকিছুই বাজারে প্রবেশের শর্ত হয়ে উঠতে পারে। আমাদের কূটনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও বহুমাত্রিক হতে হবে। ওয়াশিংটনে এক ভাষা, দিল্লিতে আরেক ভাষা, বেইজিংয়ে তৃতীয় ভাষা বললেই তাকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বলা যায় না। কূটনৈতিক ভারসাম্য মানে সবার সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলা নয়। এর অর্থ হলো, দেশের স্বার্থের একটি স্পষ্ট কাঠামো থাকা এবং সেই কাঠামো অনুযায়ী অংশীদার নির্বাচন করা।

ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এটি আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। চীন অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির বড় অংশীদার। ইউরোপ আমাদের প্রধান বাজারগুলোর একটি। জাপান দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী। এই সম্পর্কগুলোর কোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখা হবে কূটনৈতিক অলসতা। বাংলাদেশকে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোর আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথাটি বক্তৃতায় যত সহজ, অর্থনীতিতে তত কঠিন। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, বন্দরের সক্ষমতা, করব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যবসায় সুশাসন ছাড়া কূটনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব দুর্বল, তার পররাষ্ট্রনীতির কণ্ঠও ধীরে ধীরে নিচু হয়ে আসে।

পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা পরিচালনা করে না। দেশের কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, বন্দর, ব্যাংক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু মিলে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হয়। দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে শক্তিশালী কূটনীতির অভিনয় করা যায়; দীর্ঘদিন চালানো যায় না।

৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আসল নির্বুদ্ধিতা

পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের নতুন আলোচনাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় বিষয় হয়ে উঠছে। কে সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরি করবে, কার কাছে সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকবে, কে সবচেয়ে উন্নত চিপ বানাবে, কার তথ্যকেন্দ্র সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে—ভবিষ্যতের ক্ষমতা অনেকটাই এসব প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে।

একসময় শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় ছিল সেনাবাহিনী, নৌবহর ও পারমাণবিক অস্ত্র। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যালগরিদম, তথ্যভাণ্ডার ও কম্পিউটিং ক্ষমতা। বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। সরকারি দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা থেকে গণমাধ্যম—সর্বত্র এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু আমরা আবারও প্রযুক্তিকে যন্ত্র হিসেবে না দেখে জাদুর কাঠি হিসেবে দেখার ঝুঁকিতে আছি।

আমাদের ধারণা, একটি নতুন সফটওয়্যার বসালেই দুর্নীতি কমে যাবে, অনলাইনব্যবস্থা চালু করলেই সেবা সহজ হবে, ক্যামেরা লাগালেই শহর নিরাপদ হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেই প্রশাসন বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের চরিত্র সংশোধন করে না। অসৎ ব্যবস্থার হাতে উন্নত প্রযুক্তি দিলে অসততা আরো দ্রুত ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়া ছবি, বক্তব্য ও সংবাদ তৈরি করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। রাজনীতি ও নির্বাচনে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। একটি সম্পাদিত দৃশ্য, নকল কণ্ঠ কিংবা বানানো নথি কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সত্য প্রকাশিত হলেও প্রথম মিথ্যাটিই মানুষের মনে থেকে যায়। কারণ মিথ্যা সাধারণত উত্তেজনাপূর্ণ; সত্যকে ব্যাখ্যা করতে সময় লাগে। আমরা এমনিতেই যাচাই না করে সংবাদ ভাগ করি। এখন যন্ত্র আমাদের সেই অভ্যাসের জন্য অসীম পরিমাণ উপকরণ তৈরি করে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রের তাই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি নয়, তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক অধিকার এবং অ্যালগরিদমিক জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। কোন তথ্য সংগ্রহ করা যাবে, কীভাবে ব্যবহার করা হবে, নাগরিকের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আপিলের সুযোগ থাকবে কি না, এসব প্রশ্ন এখনই নির্ধারণ করা দরকার।

শিক্ষাব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে উত্তর লিখছে—এ নিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে লাভ হবে না। প্রশ্নের ধরন বদলাতে হবে। মুখস্থ উত্তর নয়, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষককে পুলিশের ভূমিকায় বসিয়ে প্রযুক্তি ঠেকানো যাবে না। তাকে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় শক্তিশালী করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কাজ সহজ করতে পারে। কিন্তু চিন্তা করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে না। যন্ত্র যত বুদ্ধিমান হচ্ছে, মানুষের নিজের বুদ্ধি ব্যবহারের প্রয়োজন তত বাড়ছে।

শেষ কথা

ভ্রমণে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি কখন আসে? গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়, নাকি ফেরার পথে? আমার মনে হয়, ফেরার পথে। কারণ যাওয়ার সময় চোখে থাকে নতুন জায়গার কৌতূহল ফেরার সময় সঙ্গে থাকে তুলনা।

অন্য দেশের বিমানবন্দর, সড়ক, শৃঙ্খলা কিংবা নাগরিকসেবা দেখে আমরা প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র শুধু চকচকে অবকাঠামোর নাম নয়। উন্নত রাষ্ট্র হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তি জানেন তার সীমা কোথায়, প্রতিষ্ঠান জানে তার দায়িত্ব কী এবং নাগরিক জানে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে কোথায় প্রতিকার চাইতে হবে।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি বদলেছে। সরকার বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও সত্যের ধারণা বদলে দিচ্ছে। এত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিষয় বদলানো সবচেয়ে কঠিন—ক্ষমতার সংস্কৃতি। আমরা প্রায়ই মনে করি, ভালো মানুষকে ক্ষমতায় বসাতে পারলেই ভালো রাষ্ট্র তৈরি হবে। ভালো মানুষের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু রাষ্ট্র শুধু ভালো মানুষের সদিচ্ছার ওপর চলতে পারে না। এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা খারাপ মানুষকেও খারাপ কাজ করতে বাধা দেবে এবং ভালো মানুষকেও সীমা অতিক্রম করতে দেবে না। আইনের শক্তি এখানেই। আইন কোনো শাসকের মহানুভবতার বিকল্প নয়; আইন শাসকের মহানুভবতার প্রয়োজনই কমিয়ে দেয়।

জুলাইয়ের স্মৃতি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, বাণিজ্যিক চাপ এবং প্রযুক্তির বিস্তার—চারটি আলাদা ঘটনা বলে মনে হতে পারে। আসলে চারটিই ক্ষমতার গল্প। কোথাও সাংবিধানিক ক্ষমতা, কোথাও জনতার ক্ষমতা, কোথাও অর্থনৈতিক ক্ষমতা, কোথাও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতা। প্রশ্ন একটাই—এই ক্ষমতাগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করবে?

উত্তরটি কোনো এক নেতা, দল কিংবা সরকারের কাছে নেই। উত্তরটি থাকতে হবে সংবিধানে, প্রতিষ্ঠানে, নাগরিক সচেতনতায় এবং আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। ক্ষমতা বদলানো একটি ঘটনা। রাষ্ট্র বদলানো একটি দীর্ঘ সাধনা।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরকারের আশ্বাস : অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত

ড. মো. মিজানুর রহমান
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরকারের আশ্বাস : অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত
সংগৃহীত ছবি

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি এখন শুধু উন্নয়নের একটি সহায়ক উপাদান নয়; বরং অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে দেশ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই দেশ ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। দেশে সেমিকন্ডাক্টরবিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা প্রমাণ করে, দেশে ইতোমধ্যে এমন একটি প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের সরকারপ্রধান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তেমনি সুপরিকল্পিত নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বয়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশের অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এটি শুধু একটি কারখানা স্থাপনের বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রতিবেশ গড়ে তোলার বিষয়। এর সঙ্গে জড়িত দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি। তাই বাংলাদেশের সামনে যেমন বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করাই এ আলোচনার উদ্দেশ্য।

সেমিকন্ডাক্টর এমন একটি উপাদান, যার বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং যার ভিত্তিতে আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মূল কাঠামো গড়ে ওঠে। সহজ ভাষায়, এটি সেই প্রযুক্তি যার মাধ্যমে মাইক্রোচিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি হয়। এই ক্ষুদ্র চিপই আজকের বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, মহাকাশ প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম, রোবোটিকস এবং ইন্টারনেট অব থিংস—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। একটি আধুনিক গাড়িতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার চিপ ব্যবহৃত হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসরের ভিত্তিও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি।

এ কারণেই সেমিকন্ডাক্টরকে অনেকেই ‘ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন তেল’ বলে অভিহিত করেন। বিংশ শতাব্দীর শিল্প অর্থনীতি যেমন জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তেমনি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি নির্ভর করছে চিপের ওপর। এর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও এটি নিবিড়ভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর এখন একটি কৌশলগত সম্পদ। কোনো দেশের শিল্পোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের ওপর।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাত। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বিক্রয় প্রায় ৬২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্মার্ট প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে আগামী দশকে এ বাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে উন্নত প্রসেসর ও গ্রাফিক্স চিপের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। একইভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সম্প্রসারণও সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, কারণ একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রচলিত গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি চিপ ব্যবহৃত হয়।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল। একটি উন্নতমানের চিপের নকশা যুক্তরাষ্ট্রে, উৎপাদন তাইওয়ানে, যন্ত্রপাতি নেদারল্যান্ডসে, বিশেষ উপকরণ জাপানে এবং সংযোজন ও পরীক্ষা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, একটি চিপ তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক দেশ অংশগ্রহণ করে। করোনা মহামারির সময় সৃষ্ট বৈশ্বিক চিপ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপানসহ অনেক দেশ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো উন্নত চিপ উৎপাদনে সক্ষম নয়, তবু চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং শিল্পভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে যুক্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বের সফল সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। তাইওয়ানের টিএসএমসি বিশ্বের শীর্ষ চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম; দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স মেমোরি চিপ উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র চিপ নকশা ও গবেষণায় অগ্রণী, আর নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল উন্নত লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে প্রায় একচ্ছত্র অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হলো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা। তারা শুরুতেই অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সেবায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বৈশ্বিক শিল্পব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত একই বাস্তবধর্মী কৌশল অনুসরণ করা—প্রথমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করা। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভবিষ্যতে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মতো উন্নত চিপ বা ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি; তবে তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রকৌশল শিক্ষায় গত দুই দশকের অগ্রগতি ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এ শিল্পের পুরো মূল্যশৃঙ্খলে একযোগে প্রবেশ বাস্তবসম্মত নয়। চিপ ডিজাইন, সংযোজন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, সফটওয়্যার সমন্বয় ও উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তি, মূলধন ও দক্ষতার প্রয়োজন। তাই কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগসাপেক্ষ উন্নত চিপ উৎপাদনের পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রথম পর্যায়ে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।

দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাত ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন এবং বৈশ্বিক আউটসোর্সিং বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু বাংলাদেশি প্রকৌশলী বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, ভিএলএসআই ডিজাইন ও চিপ প্রকৌশলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক্স শিল্পও সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন, পরীক্ষা এবং সহায়ক শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হলো বিপুল তরুণ জনশক্তি। প্রতিবছর হাজার হাজার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি স্নাতক কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এই মানবসম্পদই প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ‘চীন প্লাস এক’ কৌশলের ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও দক্ষ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পে অর্জিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও গভীর। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্বের অন্যতম মূলধননির্ভর, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তিঘন খাত। একটি আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু প্রকৌশলী তৈরি করলেই হবে না; চিপ ডিজাইন, মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন, উপাদান বিজ্ঞান, মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতিশুদ্ধ পানি, উন্নত লজিস্টিকস, বিশেষায়িত রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ছাড়া এ শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববাজারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের সামনে উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে উন্নত প্রসেসর উৎপাদনের পরিবর্তে চিপ ডিজাইন, প্যাকেজিং, পরীক্ষা, অ্যানালগ ও শিল্পভিত্তিক চিপ এবং প্রকৌশল সেবার মতো উচ্চ মূল্যসংযোজন খাতে বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করা। এতে তুলনামূলক কম মূলধন বিনিয়োগে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে উঠবে।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয় প্রধানত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পের মূল্যসংযোজন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক বাজারের সামান্য অংশীদারিত্ব অর্জন করলেও তা বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ে রূপ নিতে পারে, যার বাস্তব উদাহরণ মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। একই সঙ্গে এ শিল্প উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহায়তা করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের অংশ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শ্রমনির্ভরতা থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল প্রণয়ন, যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর প্রণোদনা, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারত্বকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, চিপ নকশা কেন্দ্র, দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোগের সহায়তা কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকারের সমন্বয়ে একটি ‘বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করা গেলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

উপসংহারে বলা যায়, সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি নতুন শিল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামোর রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চ মূল্যসংযোজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের একটি কৌশলগত সুযোগ। তৈরি পোশাক শিল্প যেমন বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতিসহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও দেশকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘বাংলাদেশে তৈরি’ নয়, বরং ‘বাংলাদেশে নকশাকৃত, উদ্ভাবিত ও প্রকৌশলায়িত’ প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করা—যেখানে বাংলাদেশ কেবল উৎপাদনকারী নয়, উদ্ভাবন, নকশা ও প্রযুক্তি সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবেও বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানের পদ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত বিশ্বস্ত ব্যক্তিটিও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়ার জন্য চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা বিএনপি নেতৃত্বের পক্ষেও সহজ হলো রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক ও শীর্ষ সাংবিধানিক পদে তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে আসীন করার। গত ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে গুঞ্জন শুরু হয়, কে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন! সম্ভাব্য নামগুলো এখন আরও বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে হবে। অতএব মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারকে আগাম সুযোগ দিয়েছেন তাদের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের। আশা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি সংসদীয় দল এমন একজনকে মনোনীত করতে চায়, যাতে তিনি সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হতে পারেন। সেই লক্ষ্যে বিএনপি বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছে এবং দেশের তথাকথিত ‘ক্রান্তিকাল’-এর কখনো অবসান ঘটছে না। অতএব সময়ের এক এক পর্যায়ে সংবিধানে সংসদীয় সরকারপদ্ধতি, রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থার তালগোলের মধ্যে দেশবাসী রাষ্ট্রের শীর্ষ পদটিতে কখনো নির্বাহী ক্ষমতাহীন, কখনো সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে আসীন এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগকারী জেনারেল, কখনোবা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিকে দেখেছেন। দুজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে, একজন সামরিক একনায়ককে রাজপথের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁদের শাসনের অবসান ঘটানো হয়েছে। বেশ কজন রাষ্ট্রপতিকে বন্দুকের নলের মুখে অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পদ থেকে হটানোর ঘটনাও ঘটেছে। ১৯৯১ সালের পর যদিও জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি হয়ে আসছেন। কিন্তু এর মাঝেও কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অথবা বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্যের হেরফের হলে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন একাধিক ব্যক্তির নাজেহাল হওয়ার ইতিহাসও বাংলাদেশেই বিদ্যমান।

কোনো কোনো রাষ্ট্রপতি একাধিক মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপ্রধান ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। খুব কমসংখ্যক রাষ্ট্রপতির পক্ষেই তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মাত্রা বিচার করার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫৫ বছর বয়সি বাংলাদেশে ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ বিবেচনা করাই যথেষ্ট। রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদের গড় হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিজন রাষ্ট্রপতি গড়ে আড়াই বছর দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একজন রাষ্ট্রপতি উপহার পাবে, যিনি হবেন রাষ্ট্রের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। পাশের দেশ ভারতকেও অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক ধারা বহাল রাখার ক্ষেত্রে তারা কোনো আপস করেনি। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সময় বাদ দিলে গত ৭৬ বছরে বর্তমান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পর্যন্ত ভারপ্রাপ্তসহ মাত্র ১৮ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্রৌপদী মুর্মু ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি। উত্তম দৃষ্টান্ত গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা কে কত দিন তাঁদের পদে ছিলেন, তা সামনে থাকলে পাঠকদের বোঝা সহজ হবে যে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় অস্থিতিশীলতার মধ্যে কাটিয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান (প্রবাসী সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতি) : ২৭০ দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) : ২৭০ দিন, আবু সাঈদ চৌধুরী : ১ বছর ৩৪৬ দিন, মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী : ১ বছর ৩২ দিন, শেখ মুজিবুর রহমান : ২০২ দিন, খোন্দকার মোশতাক আহমদ : ৮৩ দিন, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম : ১ বছর ১৬৬ দিন, লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান : ৪ বছর ৩৯ দিন, বিচারপতি আবদুুস সাত্তার : ২৯৮ দিন, বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী : ১ বছর ২৫৮ দিন, লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ : ৬ বছর ৩৬০ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ (ভারপ্রাপ্ত) : ১০৪ দিন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ : ২০৪ দিন, আবদুর রহমান বিশ্বাস : ৫ বছর, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ : ৫ বছর ৩৬ দিন, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী : ২১৯ দিন, মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত) : ৭৭ দিন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ : ৬ বছর ১৫৯ দিন, জিল্লুর রহমান : ৪ বছর ৩৬ দিন, মোহাম্মদ আবদুল হামিদ : ১০ বছর ৪১ দিন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন : ৩ বছর ৯১ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে পদাধিকারবলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত) হয়েছেন। 

মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করে ভলোই করেছেন। পদত্যাগের জন্য তাঁর ওপর সরকারের কোনো চাপ ছিল কি না, তা তখনই জানা যাবে, যখন তিনি কথা বলার মতো নিরাপদবোধ করবেন। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বিপরীত আদর্শের রাজনৈতিক সরকারের সুরে সুরে কথা বলতে বাধ্য হওয়ায় তাঁর মধ্যে অন্তর্দহন চলছিল। তিনি একজন পরীক্ষিত ও কমিটেড আওয়ামী লীগার। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্ভবত এজন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি প্রটোকল ভেঙে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পদধূলি গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতেও দ্বিধা করেননি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সাহাবুদ্দিন মাত্র ১৫ মাস সময় পেয়েছিলেন শেখ হাসিনার গুণগান করার। কিন্তু প্রায় রাতারাতি সব পাল্টে যাওয়ায় ২০২৪ সালের পর তাঁকেই শেখ হাসিনার সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সরকার বলতে হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ স্বীকার করতে হয়েছে, এমনকি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বক্তৃতা শেষ করতে হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বিরোধী দল, এমনকি বিএনপির অনেকে তাঁকে আপন ভাবতে পারেননি।

কয়েক দিন ধরে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের সব মহলে আলোচনা ও গুজব ছিল তুঙ্গে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দলবলসহ দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণার সঙ্গে গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লন্ডন অবস্থানকালে হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন আলাপের খবর ছিল সব আলোচনার ভিত্তি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হাসিনার সঙ্গে তাঁর আলাপের কথা জানার পর তাঁকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই-একজনের সঙ্গে এ ধরনের আলাপের কথা অস্বীকার করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তবে এটা ঠিক যে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণার পর তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এর রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল। সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনেই বাংলাদেশে কোনো কোনো রাষ্ট্রপতির সহসা ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা গেছে। একাধিক রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হলেও সব ক্ষেত্রে তা ছিল না। রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি তাঁর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে ব্রতী হলে তাঁকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া অপসারণ করা কঠিন।

রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে একজন দুর্বল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের মে মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের অনুকূলে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার ও তাঁর অনুগত কয়েকজন পদস্থ সেনা অফিসারকে চাকরিচ্যুত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এজন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর শেষ মেয়াদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কারচুপি, সহিংসতার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানায় নির্বাচন বাতিল করতে। যদিও নির্বাচনসংক্রান্ত এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের, আওয়ামী লীগ কেন রাষ্ট্রপতির কাছে এই দাবি উত্থাপন করেছিল, তা রহস্যাবৃত। রাষ্ট্রপতি এটি তাঁর এখতিয়ারবহির্ভূত এবং এক বিবৃতি দিয়ে এ ব্যাপারে তাঁর অক্ষমতার কথা জানালে আওয়ামী লীগ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, অক্টোবরের নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকাকে বিতর্কিত বলে বর্ণনা করে। আওয়ামী লীগের বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতিকে আক্রমণ করে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে ‘শেখ হাসিনা তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তার প্রতিদান তিনি কীভাবে দিয়েছেন, ইতিহাস তার বিচার করবে।’ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পাল্টা বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের চোখে তাদের ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তিনি ফেরেশতা, না হলে তিনি শয়তান।’

বিএনপি সরকার ২০০১ সালে বিএনপির  অন্যতম সংগঠক, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রের আলংকারিক সাংবিধানিক প্রধানের পরিবর্তে মোটামুটি তাঁর পদকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার চেষ্টা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সরকার এবং বিএনপিকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীসম্পর্কিত সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করার জন্য জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর মাজার জিয়ারতে যাননি এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রদত্ত বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তৃতা ও বাণীতে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ব্যবহার বর্জন করেছিলেন। বিএনপির ওই সময়ের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমাহীন ব্যাপার। ভুলেরও একটা মাত্রা থাকে। তিনি সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।’ বিএনপি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ওপর আস্থা হারালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ওপর বিএনপি সরকারের আস্থা রাখা কঠিন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি তা অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং তারেক রহমান এবং বিএনপির প্রশংসা করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ক্ষমতা যত সীমিতই হোক, আইনানুগভাবে তিনি অনেক কিছু করতে পারেন না। মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর দলীয় আনুগত্যের কারণে যদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপ্রধান, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সংগত কাজ করেননি। এ অভিযোগ যদি সত্য না-ও হয়ে থাকে তাহলেও বিএনপি সরকার তাদের দলীয় আদর্শবিরোধী ও আস্থাভাজন নন এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর পদে রেখে সার্বক্ষণিক সংশয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে পারে না। অতএব তাঁকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকলেও বিএনপি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে।  

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক