• ই-পেপার

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

অর্থনীতির নয়া অভিযাত্রায় সরকার : প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী

মোস্তফা কামাল
অর্থনীতির নয়া অভিযাত্রায় সরকার : প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী

গতি মন্থর হলেও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরছে একটু একটু করে। রূপান্তরিত দেশ গড়তে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম বাদে রাজনৈতিক সহাবস্থানও মন্দ নয়। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তানসহ আশপাশের দেশের তুলনায় তা ইতিবাচক। সামরিক খাতে ধরা দিচ্ছে কিছু আশাজাগানিয়া খবর। সামরিক শক্তিধর বিশ্বের ১৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪০তম স্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালে বার্ষিক গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের প্রতিবেদন এ বার্তা দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। যে সকল দেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ১২তম। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের প্রতিবেদন করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তির বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করে।

বিভিন্ন খাতে নানা সূচকে এমন অগ্রগতির মাঝে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও চেষ্টা অর্থ খাত নিয়ে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারি গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ কিছু খাত ও সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ওষুধ শিল্প ও উন্নত টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস অন্যতম। লক্ষ্য পূরণে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সহজ এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারি সেবা খাতগুলোকে সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশনের চেষ্টা চলছে। যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং উৎপাদন হাব করার চেষ্টাও চলমান। তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টাও দৃশ্যমান। সেই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার।

এ অভিযাত্রায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সংশ্লিষ্ট টার্গেট গ্রুপকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খোলামেলা জানিয়েছেন তার আন্তরিকতার কথা। বলেছেন, ‘নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়, আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা প্রসারিত করুন’। দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, তারা মূলধন বিনিয়োগ করলে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকবে। এটি কেবল আশ্বাস নয়, সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এর পাশাপাশি আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তিও রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এ বাস্তবতা বাংলাদেশকে একটি টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে বলে বিশ্বাস তার।

প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় দেশকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যাবসায়িক চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতি-নির্ধারকরা চান, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের সুদৃঢ় আইনি সুরক্ষা, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজীকৃত কর ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে অর্জিত মুনাফা প্রত্যাহারের নির্বিঘ্ন প্রক্রিয়া, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো। সরকার তাদের পালস বুঝেছে। এরই মধ্যে সেই দৃষ্টে কাজও শুরু করেছে। লাল ফিতার যন্ত্রণা কাটাতে আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোর আধুনিকায়ন চলছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে নেওয়া হয়েছে আরো বিভিন্ন ব্যবস্থা। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে। কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে সহজ এবং মুনাফা অর্জনের পর তা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত করার দিকেও বিশেষ অ্যাটেনশন দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রায় ৬০০ বিশিষ্ট প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রী তার এ বিষয়ক আন্তরিকতা ও চেষ্টার কথা জানিয়েছেন। পরিষ্কার করে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, যেকোনো ব্যবসা কেবল উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সফল হতে পারে না, ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর। সম্মেলনটির দিন দুয়েকের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য পদক্ষেপ। শ্রমমান ও জোরপূর্বক শ্রম-সংক্রান্ত তদন্তের পর ৮৬ দেশের ওপর নতুন মার্কিন শুল্ক নীতি। সেখানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান বাংলাদেশের।

এখানে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর হলো, দেশটিকে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে পড়তে হয়েছে সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়। তা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকার একটি আভাস। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, কেবল কম শুল্ক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না। শ্রমমান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এই সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে আশাবাদ জানিয়েছে, শ্রমমান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সহযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় বাংলাদেশ নিম্ন শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। ফলে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে দেশটিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে এই বাজার থেকে। ফলে মার্কিন বাণিজ্যনীতির যেকোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন যাই হোক, বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারও খুঁজতে হবে। রাশিয়া, লাতিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি ট্যারিফ রেট কোটা ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে সেকশন ৩০১-এর অতিরিক্ত শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরো বাড়তে পারে এবং মার্কিন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অংশীদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় শ্রমমান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চাপও বাড়ছে। সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের এ সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমন্ত্রণ কূটনীতির সমান্তরালে অর্থনীতির আরেক বার্তা। বিশ্লেষণের অনেক উপাদান। দিল্লিতে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর হবে সম্মেলনটি। ১১ সদস্যবিশিষ্ট ব্রিকসে বাংলাদেশ সদস্য না হলেও বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এই মুহূর্তে ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকসের সদস্য। ব্রিকস জোটে যোগ দিলে বা এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ও কৌশলগত কিছু সুবিধা রয়েছে, যার মধ্যে সহজ ঋণ প্রাপ্তি, বিকল্প বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো অন্যতম।

এ জোটে একদিকে যেমন নতুন অর্থায়ন ও বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা আছে, অন্যদিকে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা বাংলাদেশকে নানাভাবে ফ্যাক্টর তথা ওজনদার ভেবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ আমন্ত্রন। চীন, রাশিয়া, ভারতসহ পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে অনেক দিন থেকেই চলছে নানা আলোচনা। বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণের পাশাপাশি সামনে আসছে অর্থনীতির বিভিন্ন লাভ-ক্ষতির হিসাবও।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি : স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়

সিরাজুল ইসলাম
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি : স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- আমরা কী কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, শিল্পভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হব? এই প্রশ্নের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে এনেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার জন্য সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ফরেন ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে দেওয়া তার বক্তব্য শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে কোনো আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকারের ঘোষণা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত? উত্তর হলো- সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় পাঁচশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আগামী আট বছরে অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এটি অর্জন করতে হলে শুধু বার্ষিক উচ্চ প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সবচেয়ে বড় কথা—বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যেসব অগ্রাধিকার খাতের কথা বলেছেন- নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস—এসবই বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দশকের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের এরইমধ্যে কিছু শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সঠিক নীতি সহায়তা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পেলে এই খাতগুলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রায় ২০ কোটি মানুষের এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার এখনো অনেক বেশি। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ যখন দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'। কিন্তু এই সম্ভাবনা কেবল তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উপযোগী দক্ষতা দেওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে—শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আগামী দশকের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন হাবে পরিণত করার যে লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, সেটিও সময়োপযোগী। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্যের কারণে বহু আন্তর্জাতিক কম্পানি নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।
তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু বক্তৃতা নয়, বাস্তব সংস্কারই হবে মূল চাবিকাঠি।

প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন- আইনি সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, মুনাফা নির্বিঘ্নে নিজ দেশে নেওয়ার সুযোগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো—এসবই বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবি ছিল। ইতিবাচক দিক হলো, সরকার এসব দাবিকে স্বীকার করেছে এবং বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। একটি শিল্প স্থাপনে কখনো কখনো কয়েক ডজন সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি বিনিয়োগ ব্যয়ও বেড়ে যায়। ডিজিটাল সরকারি সেবা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কেবল শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; পণ্য কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কত নির্ভরযোগ্যভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটিকে আরো বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। উচ্চমূল্যের টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, মেডিকেল টেক্সটাইল, পরিবেশবান্ধব পোশাক এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি আয়ে নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ- ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর- তাদের শিল্প বিপ্লবের বড় অংশই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশও যদি সেই পথ অনুসরণ করতে চায়, তাহলে নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা নয়; সরকারের প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতিও ব্যবসার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সফল অর্থনীতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন সরকার নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত উৎপাদক এবং জনগণ অংশীদারে পরিণত হয়।

তবে এই যাত্রাপথে কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন- সবকিছুই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিক নীতি, দক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহি এবং সময়মতো সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান। এই প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অর্থনীতির আকার বড় হলেও যদি তার সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করা এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ।

সবশেষে বলা যায়, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনো জাদুকরী সংখ্যা নয়; এটি একটি দিকনির্দেশনা। এই লক্ষ্য জাতিকে বড় করে ভাবতে শেখায়, নীতিনির্ধারকদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়- বাংলাদেশ বড় হতে চায়, আরো দ্রুত এগোতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ঘোষণাকে যদি কার্যকর সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে ২০৩৪ সালের বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার দেশ হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস বলে, বড় জাতিগুলো বড় স্বপ্ন দেখেই এগিয়েছে। আমাদের এখন প্রয়োজন এমন স্বপ্নকে পরিকল্পনায়, পরিকল্পনাকে কর্মে এবং কর্মকে ফলাফলে রূপান্তর করার। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং জনগণ একই লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে না; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

স্বাস্থ্যখাতের অবক্ষয় ও বিদেশমুখী চিকিৎসা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
স্বাস্থ্যখাতের অবক্ষয় ও বিদেশমুখী চিকিৎসা
প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু মানুষের জীবন রক্ষা করে না; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সুদৃঢ় করে। তাই উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যখাতকে কেবল জনকল্যাণমূলক সেবা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপরীতে, যখন কোনো দেশের নাগরিক জটিল বা বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত বিদেশে যেতে বাধ্য হন, তখন তা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্যখাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কেন সেই চিকিৎসা নিজের দেশে দিতে পারব না? আমরা কেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারব না?’ তার মতে, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা ও মানসম্পন্ন সেবার মাধ্যমে এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এর কয়েক দিন পর ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, ‘একটি বিশেষ দেশকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে খুশি করতে বিগত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছিল।’ তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী নীতির ফলে দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এটিকে প্রতিবেশী ভারতের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এ ব্যাখ্যা জনপরিসরের আলোচনার অংশ হলেও, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্ক হিসেবে সামনে এনেছে।

তবে একটি বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো মতভেদ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতসহ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে ব্যয় হচ্ছে এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটও গভীরতর হচ্ছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা অন্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্নটি কেবল কোন দেশ লাভবান হয়েছে তা নয়; বরং কেন বাংলাদেশ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না।

যদি কোনো দেশের নাগরিক নিয়মিত বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন, তবে তা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এটি নির্দেশ করে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব অবস্থা, বিদেশমুখী চিকিৎসার কারণ, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এবং উত্তরণের পথ বিশ্লেষণ করা আজ সময়ের দাবি। এই প্রবন্ধে দেশি-বিদেশি গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সেই বিষয়গুলোর সমন্বিত মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত টিকাদান কর্মসূচি (EPI), মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং ওষুধশিল্পের বিকাশে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করার পাশাপাশি বিশ্বের শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে এসব অগ্রগতির পরও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল, চিকিৎসা গবেষণা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়, স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মান, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) বহন করতে হয়, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও বেশি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। এর ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি একটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ রোগী রাজধানীমুখী হন; আর জটিল রোগের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণকেই তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে।

গত দেড় দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান, দক্ষ মানবসম্পদ, চিকিৎসা গবেষণা, জবাবদিহি এবং আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সমান গতিতে এগোয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়ে গেছে। একইভাবে গত দুই দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা ও চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান সম্পর্কে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এসব প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের একটি অংশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মুনাফাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রবণতা এবং বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তবে এসব সমস্যা সব হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দেশে অনেক দক্ষ, সৎ ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারপরও বিদ্যমান কিছু দুর্বলতা জনগণের একাংশের মধ্যে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

এই আস্থার ঘাটতির অন্যতম প্রতিফলন হলো বিদেশমুখী চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যান। এর মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম ব্যয়, সহজ যোগাযোগ, ভাষাগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের কারণে ভারতের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের যাতায়াত, আবাসন, ওষুধ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সেবা অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের জন্য বিদেশমুখী চিকিৎসা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ও। চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন উৎসে এর পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়, তবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটকে আরঘ গভীর করছে।

তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা কমাতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। এ জন্য স্বাস্থ্যখাতকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সেবার মান, জবাবদিহির ঘাটতি, চিকিৎসা গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সংকট নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকের স্বাভাবিক প্রত্যাশা হলো—তার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিজ দেশের ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারা। সেই আস্থা পুনর্গঠন করাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যখাতকে শুধু জনকল্যাণমূলক খাত হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক হাসপাতাল, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে চিকিৎসা পর্যটনকে লাভজনক অর্থনৈতিক খাতে রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান চিকিৎসা গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসা, গবেষণা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। ফলে দেশটি এখনো চিকিৎসাসেবা রপ্তানিকারকের পরিবর্তে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ হিসেবেই পরিচিত।

এই বাস্তবতা পরিবর্তনে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, মেডিকেল শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশীদারত্ব, হাসপাতালগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু নিজস্ব নাগরিকদের জন্য বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশের বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে স্বাস্থ্যখাতকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।

উপসংহারে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কোনো একক সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে যে জাতীয় বিতর্কের সূচনা করেছে, তা তথ্যভিত্তিক আত্মসমালোচনা ও কার্যকর সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও রয়েছে—জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা হ্রাস এবং বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে তার নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

মন্‌জুরুল ইসলাম
এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

পৃথিবী এখন টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে। মহাপরাক্রমশালী ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষেত্রবিশেষ টেক জায়ান্টদের কাছে ধরাশায়ী। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা এআই মানুষকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এআইয়ের কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে মানব শ্রমশক্তি। প্রশ্ন, এআই কি জনশক্তির বিকল্প হতে যাচ্ছে? মানুষ কীভাবে এআইয়ে দক্ষ হবে? নাকি মানুষই এআইয়ের দাসে পরিণত হবে? এআই কি মনের গোপন কথা প্রকাশ করে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে? পৃথিবী নিয়ে খেলা করতে এআইয়ের পর আর কী প্রযুক্তি আসছে? এআইয়ের অ্যাডভান্সড ভার্সনই বা কী? এসব মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে নাকি ডেকে আনবে সর্বনাশ?

পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষই তার প্রয়োজনে নানান উদ্ভাবনে নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি সভ্যতা মানুষকে বদলে দিয়েছে। কখনো কাজের ধরন বদলে গেছে, কখনো বদলে গেছে চিন্তার ধরন। প্রযুক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে মানবসভ্যতার তিনটি যুগ। প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লোহার যুগ। আর ঐতিহাসিক সময়ের ভিত্তিতে সভ্যতার যুগ হলো চারটি। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক ও সমকালীন যুগ। শিল্পবিপ্লব মানুষের শারীরিক শ্রমের ধরন পাল্টে দিয়েছে। ইন্টারনেট তথ্যপ্রবাহের ধারা বদলে দিয়েছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আই বদলে দিচ্ছে মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব কি না। অনেকের মনে এখনো একটি ভয় কাজ করছে, এআই কি মানুষকে কর্মচ্যুত করবে?

পৃথিবীতে কি মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে? তবে প্রশ্ন যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো এআই মানুষের বিকল্প নয়। বরং যে ব্যক্তি এআই ব্যবহার করতে জানে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনায় পারদর্শী সে ধীরে ধীরে সেই সব ব্যক্তির চেয়ে এগিয়ে যাবে, যারা এআই সম্পর্কে অজ্ঞ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মানুষ। একজন হবেন এআই-দক্ষ, অন্যজন এআই-অদক্ষ। ভবিষ্যতের কর্মবাজারে এ পার্থক্যই সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বিশ্বে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং, মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজাইন, কৃষি ও উৎপাদন শিল্পে এআই দ্রুত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের কপি লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট তৈরি, ছবি ও ভিডিও নির্মাণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা দৈনন্দিন অফিসের কাজসহ সব ক্ষেত্রেই এআই ঢুকে পড়ছে। ফলে যারা এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন, তারা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছেন এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এআই ব্যবহার মানেই শুধু একটি সফটওয়্যার খুলে প্রশ্ন করা নয়। এর জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের দক্ষতা। প্রথমেই জানতে হবে এআই কীভাবে কাজ করে এবং কোন কাজের জন্য কোন টুল উপযুক্ত। যেমন লেখালেখি ও বিশ্লেষণের জন্য এক ধরনের টুল কার্যকর, গবেষণার জন্য আরেকটি। আবার ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বর তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন টুল ব্যবহার করতে হয়। এ মৌলিক ধারণা না থাকলে এআই থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।

এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার একটি হলো প্রম্পট লেখার প্রকৌশল (Prompt Engineering)। এআইকে কী করতে হবে, কোন ভাষায় করতে হবে, কী ধরনের উত্তর দরকার, কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে এসব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই ভালো ফলের দক্ষতা। একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে এআই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের উত্তর দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করা। এরপর আসে কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। ব্লগ, সংবাদ, বিজ্ঞাপনের লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, ইমেইল, প্রতিবেদন কিংবা ব্যবসায়িক বিষয়-সব ক্ষেত্রেই এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ ও সম্পাদনার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে সেই কনটেন্টের মান। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দক্ষ সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। অর্থাৎ এআইয়ের বশ্যতা নয় বরং এআইকে অধীন করতে হবে।

বর্তমান সময়ে ছবি, ভিডিও ও ভয়েস তৈরির প্রযুক্তিও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটি ধারণা থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচারমূলক পোস্টার, সমাজমাধ্যমের ভিডিও, এমনকি মানুষের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যবসা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিনোদনশিল্পে এসব প্রযুক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে এ ক্ষেত্রগুলোতেও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে অটোমেশনে। একই ধরনের কাজ বারবার করার পরিবর্তে এআই সেই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ইমেইল পাঠানো, সমাজমাধ্যমে পোস্ট প্রকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ, রিপোর্ট তৈরি কিংবা গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজ এখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। এতে মানুষের সময় বাঁচছে এবং তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে পারছে।

AI Researcher I Machine Learning Engineer শুধু শেখাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের প্রমাণও জরুরি। তাই যারা এআই নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের ছোট ছোট বাস্তব প্রকল্প তৈরি করতে হবে। নিজস্ব পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে কনটেন্ট, ডিজাইন, ভিডিও, অটোমেশন বা অন্যান্য কাজের নমুনা। বর্তমান চাকরির বাজার ও ফ্রিল্যান্সিং জগতে সনদের চেয়ে বাস্তব দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের জন্য এআই একটি বড় সুযোগও বটে।

দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যদি সময়মতো এআই-দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এআই কখনো মানুষের বিবেক, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প হতে পারে না। তথ্য যাচাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় মানুষকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই এআইকে ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এবং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যক্তি আজ এআই শেখার উদ্যোগ নেবে, আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে সে-ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে থাকবে। আর যারা প্রযুক্তির এ পরিবর্তনকে উপেক্ষা করবে, তাদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। তাই সময়ের দাবি একটাই—এআইকে ভয় নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আপন করে নেওয়া।

এখন দেশে এআই ইন্টিগ্রেটর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের যথেষ্ট অভাব আছে। এআইয়ের যেসব টুল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো কীভাবে ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ করা যায়, তার দক্ষ জনশক্তির খুবই সংকট। বর্তমানে যেখানে একজন সাধারণ ওয়েভ ডেভেলপার এক ঘণ্টা কাজ করলে সর্বোচ্চ ৩০ ডলার আয় করছেন, সেখানে একজন দক্ষ এআই ইন্টিগ্রেটর ঘণ্টায় আয় করছেন সর্বনিম্ন ৭০ ডলার। বর্তমান বাজারে এর একটি বিশাল দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একদিকে আছে অসংখ্য ওয়েভ ডেভেলপার, যারা চমৎকার ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এআই কীভাবে কাজ করে, এআই-এপিআই (Application Programming Interface) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় বা এআইকে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত।

অন্যদিকে আছে AI Researcher I Machine Learning Engineer, যারা মডেল তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যবসার বাস্তব সমস্যা, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বা বাণিজ্যিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে না। ফলে মাঝখানে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ শূন্যস্থান পূরণ করে এমন একজন পেশাজীবী, যে ব্যবসার সমস্যা বোঝে, এআইয়ের সক্ষমতা বোঝে এবং ক্লায়েন্টকে বোঝাতে পারে যে এ কাজটি এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করা সম্ভব। আর সেটি ক্লায়েন্টের বর্তমান সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়াও সম্ভব। এই মানুষটিই হলো একজন এআই ইন্টিগ্রেটর। বর্তমান পৃথিবীতে এমন দক্ষ মানুষের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আর এ কারণেই তাদের পারিশ্রমিকও অনেক বেশি।

প্রযুক্তির আরেক আধুনিক সংযোজন হলো স্মার্টফোন। স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই অনেক কিছু ছাড়তে পারি, কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া একদণ্ডও থাকতে পারি না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, দিনমজুর, রিকশাচালক এমনকি ভিখারির হাতেও ফোন শোভা পাচ্ছে। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানবসভ্যতার বিরাট অর্জন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, সেই প্রিয় সঙ্গী ফোনটিও আমাদের বিশ্বস্ত নয়। আমরা কোথায় যাই, কার সঙ্গে সময় কাটাই, কী বিষয়ে গালগল্প বা ব্যক্তিগত অন্য কিছু করি—সবই জানে এই প্রিয় ডিভাইস। সে কারণে অপরাধ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দারা সবার আগে খোঁজ করেন ওই ফোনটির। এক সময় অপরাধ তদন্তে সবার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো ড্রাইভার, দারোয়ান অথবা কাজের লোককে।  এখন সেই ধরন পাল্টে গেছে। প্রিয় স্মার্টফোনই এখন আমাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এখন যে ভার্সন চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি প্রাথমিক ধাপ। আগামী দিনগুলোতে এটির হয়তো আরও অনেক বেশি অ্যাডভান্সড ভার্সন আসবে। তখন এমনও হতে পারে, এআই হয়তো মানুষের মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে পারবে। তখন হয়তো মুখোশধারী মানুষের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে সেটা হবে ব্যক্তি মানুষের জন্য বিপজ্জনক, কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ। কারণ মুখোশধারী মানুষই ধ্বংস করছে পৃথিবী ও কল্যাণকর মানবসভ্যতা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন