• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৬ ‍জুলাই, ২০২৬

গাছ যেভাবে আমাদের উপকার বয়ে আনে

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
গাছ যেভাবে আমাদের উপকার বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের মাধ্যমে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তুলেছেন। সেই নিয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো গাছ। এর মাধ্যমে মানুষের অক্সিজেন, খাদ্য, আসবাব, পশুপাখির আশ্রয়, পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অসংখ্য প্রাণের জীবনধারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ইসলাম গাছকে শুধু একটি উদ্ভিদ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর এক মহা নিয়ামত এবং মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে। নিম্নে গাছ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আসা কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো—

১. রিজিকের অন্যতম উৎস : গাছের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন মাখলুকের রিজিকের ব্যবস্থা করেন। যার মধ্যে মানুষ, পশুপাখি, পোকা-মাকড় সবই অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন এমন বাগানসমূহ, যার কিছু মাচায় তোলা হয় আর কিছু তোলা হয় না এবং খেজুরগাছ ও শস্য, যার স্বাদ বিভিন্ন রকম, জয়তুন ও আনার যার কিছু দেখতে একরকম, আর কিছু ভিন্ন রকম। তোমরা তার ফল থেকে আহার করো, যখন তা ফলদান করে এবং ফল কাটার দিনেই তার হক দিয়ে দাও। আর অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর ও শাক-সবজি,  জয়তুন ও খেজুর বন, ঘনবৃক্ষ শোভিত বাগ-বাগিচা, আর ফল ও তৃণগুল্ম। তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জীবনোপকরণস্বরূপ।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৭-৩২)

এ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, গাছ শুধু মানুষের নয়; পশুপাখির রিজিকেরও অন্যতম উৎস।

২. মানুষের ব্যাবহারিক কল্যাণের মাধ্যম : মহান আল্লাহ গাছের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের ব্যাবহারিক কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। যেমন— নুহ (আ.) নৌকা তৈরি করেছিলেন বলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাকে (নুহকে) কাঠ ও পেরেক নির্মিত নৌযানে আরোহণ করালাম।’ (সুরা : কামার, আয়াত : ১৩)

একইভাবে জ্বালানিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস কাঠ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যিনি সবুজ বৃক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আগুন তৈরি করেছেন। ফলে তা থেকে তোমরা আগুন জ্বালাও।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮০)

এ আয়াতগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গাছের বহুমুখী উপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান যুগে আমাদের ব্যবহৃত বহু জিনিস এমন আছে, যার উৎস মূলত গাছ।

৩. ছায়া দেয় : গাছের শীতল ছায়ায় ক্লান্ত মানুষ স্বস্তি পায়। শরীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রফুল্লতায়ও গাছ বিশেষ ভূমিকা রাখে। মহান আল্লাহ যখন ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে নাজাত দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে ছায়া দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক একটি ছায়াদার গাছ উদ্গত করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর আমি তাকে তৃণলতাহীন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম এবং সে ছিল অসুস্থ।  অতঃপর আমি তার ওপর লাউ-কুমড়া জাতীয় লতাপাতাযুক্ত একটা গাছ বের করে দিলাম।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)

৪. পরিবেশ রক্ষায় উপকারী : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা জমিনে ফাসাদ কোরো না তার সংশোধনের পর এবং তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

কোনো কোনো তাফসিরবিদের মতে, এই আয়াত পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারসহ সব ধরনের ফাসাদ (বিপর্যয়) থেকে বিরত থাকারও একটি মৌলিক নীতি প্রদান করে।

৫. গাছ লাগালে সদকার সওয়াব : গাছ যেহেতু বহুভাবে মানুষের জীবন ও কল্যাণের সঙ্গে জড়িত, তাই সহিহ নিয়তে তা রোপণ করা ও পরিচর্চা করারও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ দিতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা হতে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তবে তা তার পক্ষ হতে সদকা বলে গণ্য হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩২০)

এমনকি অন্য হাদিসে তিনি কিয়ামতের পূর্বক্ষণেও যদি কেউ গাছ লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলেও যেন সে গাছটি রোপণ করে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ)

অতএব আমাদের সবার উচিত পরিবেশের বন্ধু এই সম্পদ বৃদ্ধি, রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে যত্নবান হওয়া।

 

সাহাবি আবু খায়সামা (রা.)-এর নবীপ্রেম

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সাহাবি আবু খায়সামা (রা.)-এর নবীপ্রেম
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু খায়সামা (রা.) নবীজির প্রিয় আনসারী ধনী সাহাবি। একাধিক যুদ্ধে তিনি নবীজির সঙ্গে সশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল নবীপ্রেমের স্ফুলিঙ্গ। যার প্রমাণ তাবুক যুদ্ধের ঘটনা। হাদিসের ভাষায় ঘটনাটির বর্ণনা এরূপ—

নবম হিজরির ঘটনা। রোমের বাদশাহ মদিনা আক্রমণের ষড়যন্ত্র করছিল। নবীজি সংবাদ পেয়ে তার আগমনের অপেক্ষা না করে আগে বেড়ে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরম আর মদিনার প্রধান খাদ্য খেজুর পাকার মৌসুম। 


তা ছাড়া যুদ্ধের ময়দান ছিল মদিনা থেকে বেশ দূরত্বের। সব কিছু মিলিয়ে এই যুদ্ধটা ছিল অন্যান্য যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এত কিছুর পরও ঈমানের উজ্জ্বলতায় কোনো কিছুই তাঁদের রুখতে পারেনি। সব বাধা-বিপত্তি, কষ্ট-ক্লেশ উপেক্ষা করে মুনাফিকদের ছাড়া সব মুমিনই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তবে অল্পসংখ্যক মুমিন সাহাবিও বিভিন্ন কারণে মদিনায় রয়ে গিয়েছিলেন। যাঁদের মধ্যে আবু খায়সামা (রা.)ও ছিলেন একজন। তবে তিনি অংশগ্রহণ না করতে পারায় মনের মধ্যে ছিল যথেষ্ট অস্থিরতা। আর এই অস্থিরতা ও পেরেশানি  নিয়ে একদিন তিনি  নিজের বাগানে গেলেন। 

তখন প্রচণ্ড গরম পড়ছিল। গরমের উষ্ণতায় মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। এ অগ্নিপরিবেশে স্বামীকে শীতল পরশ দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল তাঁর দুই স্ত্রী। গাছের ছায়া, ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা, নরম-কোমল বিছানা, দস্তরখানের ওপর বাহারি রঙের খাবারের আয়োজন করে তাঁরা একটি মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু আবু খায়সামা (রা.)-এর মন শীতল ছায়া, ঠাণ্ডা পানি, বাহারি দস্তরখান আকর্ষণ করছিল ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে হৃদয়-সাগরে এক তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ঝড় শুরু হলো। একটি পবিত্র ভাবনার প্রচণ্ড ধাক্কা যেন সামনের বাহারি সব আয়োজন উল্টে দিল। মনের গহিনে জেগে উঠল প্রাণপ্রিয় নবী তো এ প্রচণ্ড গরমে আল্লাহর পথে সফর করে কত কষ্ট করছেন! আর আমি এখানে সুখের মঞ্চে বসে আনন্দ উপভোগ করছি!

এ ভাবনা মনে দোলা দিতেই তিনি উটে চড়ে তাবুকের পথে রওনা হয়ে গেলেন। এরই মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম তাবুক পৌঁছে গিয়েছিলেন। নবীজি দূর থেকে দেখেই আগ্রহভরা কণ্ঠে বলেন, হয়তো আবু খায়সামা হবে। কাছে আসার পর নবীজির ধারণাই সত্য হলো। সালামের উত্তর দেওয়ার পর নবীজি বলেন, আবু খায়সামা, তোমাকে মোবারকবাদ। ধ্বংসের উপকণ্ঠ থেকে তুমি বের হয়ে এসেছ। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৭১৭৫)

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ঈমানের দৃঢ়তাই মুমিনের প্রকৃত শক্তি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ঈমানের দৃঢ়তাই মুমিনের প্রকৃত শক্তি
সংগৃহীত ছবি

মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে জুমার খুতবায় মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহভীতি, ঈমানের দৃঢ়তা এবং কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণের প্রতি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানিয়েছেন মসজিদুল হারামের সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. বন্দর বালিলা। তিনি বলেন, একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা। দুনিয়ার ধন-সম্পদ কিংবা পার্থিব সফলতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন ঈমান, যা মৃত্যুর পর মানুষকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পৌঁছে দেয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ইসলামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে একমাত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ওপর।

ইমাম বালিলা বলেন, সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ নবী করিম (সা.)-এর যুগ থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছে, ততই বাড়ছে নানা ধরনের পরীক্ষা, ফিতনা, সন্দেহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বিভ্রান্তি। এ প্রসঙ্গে তিনি আনাস (রা.) বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের ওপর এমন কোনো সময় আসবে না, যার পরবর্তী সময়টি তার চেয়ে আরও কঠিন হবে, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (সহিহ বুখারি)

তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় বিপদ দারিদ্র্য বা জীবিকার সংকট নয়; বরং ঈমান দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দ্বীনের ওপর অবিচলতা হারিয়ে ফেলা। এ কারণেই মহানবী (সা.) প্রায়ই দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের বিপদ যেন আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে না হয়।’

তাই ঈমান অটুট রাখার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো মহান আল্লাহর কাছে অবিচলতার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা। কারণ, আল্লাহ যাকে দৃঢ়তা দান করেন না, তার পক্ষে নিজ শক্তিতে দ্বীনের ওপর অটল থাকা সম্ভব নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিয়মিত পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, এর অর্থ নিয়ে গভীর চিন্তা, শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা এবং নবী-রাসুল ও সৎকর্মশীল পূর্বসূরিদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ ঈমানকে সুদৃঢ় করে।

খুতবায় তিনি মুসলিমদের কোরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, মুসলিম জামাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, মতভেদ ও বিভক্তি থেকে দূরে থাকা এবং সন্দেহ, ফিতনা ও গুনাহের পরিবেশ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসব বিষয় মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখে এবং ঈমানকে নিরাপদ রাখে।

খুতবার সমাপনী বক্তব্যে শায়খ ড. বন্দর বালিলা মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, আল্লাহকে ভয় করতে হবে, কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে অবিচল থাকতে হবে এবং সালাফে সালেহিনের পথ অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে পথভ্রষ্টতা, বিদআত ও বিভ্রান্তিকর চিন্তা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি। সর্বশেষ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফিতনা ও পরীক্ষার যুগে দ্বীনের ওপর ধৈর্য ধারণ করা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে ধরে রাখার মতো কঠিন হলেও, এ ধৈর্যই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।

মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

নেক সন্তানই মাতা-পিতার চিরস্থায়ী সম্পদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নেক সন্তানই মাতা-পিতার চিরস্থায়ী সম্পদ
সংগৃহীত ছবি

মসজিদে নববীর জুমার খুতবায় সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও মাতা-পিতার জন্য এক মহামূল্যবান আমানত হিসেবে তুলে ধরেছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আব্দুল মোহসেন আল-কাসিম। তিনি বলেন, সন্তান শুধু পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য নয়; বরং সঠিক ঈমান, আদর্শ ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তুলতে পারলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে পিতা-মাতার জন্য স্থায়ী কল্যাণের উৎস হয়ে ওঠে।

খুতবায় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর বহু নবীকে সন্তান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-কে ‘এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ’ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ এ থেকে বোঝা যায়, সন্তান আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ, যার যথাযথ হক আদায় করা প্রত্যেক পিতা-মাতার দায়িত্ব।

তিনি বলেন, সন্তানের প্রকৃত সফলতা নিশ্চিত হয় শুধু তাদের ঈমান, তাকওয়া ও ইসলামী আদর্শে লালন-পালনের মাধ্যমে। সন্তানদের হৃদয়ে তাওহিদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা, কোরআনের শিক্ষা দেওয়া, সালাতে অভ্যস্ত করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ও নির্ভরতার শিক্ষা দেওয়াই একজন অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব।

তিনি উল্লেখ করেন, নবীগণ সন্তান জন্মের আগেই তাদের নেককার হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। ইবরাহিম (আ.) প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমাকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’ আর জাকারিয়া (আ.) মিনতি করেছিলেন, ‘হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে এক পবিত্র সন্তান দান করুন।’ এসব দোয়া প্রমাণ করে, নেক সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা নবীদের সুন্নত।

খুতবায় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন, ‘প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ তিনি বলেন, শিশুর এই সহজাত পবিত্র স্বভাবকে রক্ষা করা এবং ইসলামের আলোয় বিকশিত করা পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের সালাম দিতেন, ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং ছোটবেলা থেকেই আদব-কায়দা শিক্ষা দিতেন। উমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.)-কে উদ্দেশ করে তাঁর শিক্ষা ছিল, ‘হে বালক! 'বিসমিল্লাহ' বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।’ এই শিক্ষা শিশুর চরিত্র গঠনে নববী পদ্ধতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইমাম আরো বলেন, শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, তাদের সম্মান করা, দৃঢ়চেতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে গড়ে তোলাও ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি কোরআনের ইয়াহইয়া (আ.)-সম্পর্কিত আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, ‘হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সঙ্গে কিতাব ধারণ করো।’ এ থেকেই বোঝা যায়, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধে গড়ে তুলতে হবে।

খুতবায় বিশেষভাবে সন্তানদের জন্য দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, নেক সন্তানের জন্য দোয়া করা মাতা-পিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছোটবেলায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে কিতাবের জ্ঞান দান করুন।’ এই দোয়ার বরকতেই তিনি পরবর্তী সময়ে উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরে পরিণত হন।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও নেক সন্তানের দোয়া তাদের আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ তিনি বলেন, নেক সন্তানের কারণে আল্লাহ জান্নাতে পিতা-মাতার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তাদের পুনরায় একত্রিত করেন।

খুতবার শেষাংশে শায়খ আল-কাসিম জোর দিয়ে বলেন, সন্তান প্রতিপালন শুধু একজনের নয়; বরং মা-বাবা উভয়ের যৌথ দায়িত্ব। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন, ‘নারী তার স্বামীর ঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’

সবশেষে তিনি পিতা-মাতাকে সন্তান লালন-পালনে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সন্তানের কোনো ভুল বা অবাধ্যতায় হতাশ হওয়া যাবে না এবং কখনোই তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা উচিত নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে কিংবা সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না। এমন সময় তা কবুল হয়ে যেতে পারে, যখন আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।’

খুতবার মাধ্যমে মসজিদে নববীর ইমাম স্পষ্ট বলেন—সন্তান আল্লাহর দেওয়া একটি মহামূল্যবান আমানত। তাই তাদের শুধু পার্থিব সাফল্যের জন্য নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র ও ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলাই একজন মুসলিম পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নেক সন্তানই দুনিয়ায় প্রশান্তির কারণ এবং আখিরাতে পিতা-মাতার জন্য অব্যাহত সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।