• ই-পেপার

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ঈমানের দৃঢ়তাই মুমিনের প্রকৃত শক্তি

মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

নেক সন্তানই মাতা-পিতার চিরস্থায়ী সম্পদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নেক সন্তানই মাতা-পিতার চিরস্থায়ী সম্পদ
সংগৃহীত ছবি

মসজিদে নববীর জুমার খুতবায় সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও মাতা-পিতার জন্য এক মহামূল্যবান আমানত হিসেবে তুলে ধরেছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আব্দুল মোহসেন আল-কাসিম। তিনি বলেন, সন্তান শুধু পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য নয়; বরং সঠিক ঈমান, আদর্শ ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তুলতে পারলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে পিতা-মাতার জন্য স্থায়ী কল্যাণের উৎস হয়ে ওঠে।

খুতবায় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর বহু নবীকে সন্তান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-কে ‘এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ’ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ এ থেকে বোঝা যায়, সন্তান আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ, যার যথাযথ হক আদায় করা প্রত্যেক পিতা-মাতার দায়িত্ব।

তিনি বলেন, সন্তানের প্রকৃত সফলতা নিশ্চিত হয় শুধু তাদের ঈমান, তাকওয়া ও ইসলামী আদর্শে লালন-পালনের মাধ্যমে। সন্তানদের হৃদয়ে তাওহিদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা, কোরআনের শিক্ষা দেওয়া, সালাতে অভ্যস্ত করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ও নির্ভরতার শিক্ষা দেওয়াই একজন অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব।

তিনি উল্লেখ করেন, নবীগণ সন্তান জন্মের আগেই তাদের নেককার হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। ইবরাহিম (আ.) প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমাকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’ আর জাকারিয়া (আ.) মিনতি করেছিলেন, ‘হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে এক পবিত্র সন্তান দান করুন।’ এসব দোয়া প্রমাণ করে, নেক সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা নবীদের সুন্নত।

খুতবায় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন, ‘প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ তিনি বলেন, শিশুর এই সহজাত পবিত্র স্বভাবকে রক্ষা করা এবং ইসলামের আলোয় বিকশিত করা পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাদের সালাম দিতেন, ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং ছোটবেলা থেকেই আদব-কায়দা শিক্ষা দিতেন। উমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.)-কে উদ্দেশ করে তাঁর শিক্ষা ছিল, ‘হে বালক! 'বিসমিল্লাহ' বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।’ এই শিক্ষা শিশুর চরিত্র গঠনে নববী পদ্ধতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইমাম আরো বলেন, শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, তাদের সম্মান করা, দৃঢ়চেতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে গড়ে তোলাও ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি কোরআনের ইয়াহইয়া (আ.)-সম্পর্কিত আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, ‘হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সঙ্গে কিতাব ধারণ করো।’ এ থেকেই বোঝা যায়, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধে গড়ে তুলতে হবে।

খুতবায় বিশেষভাবে সন্তানদের জন্য দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, নেক সন্তানের জন্য দোয়া করা মাতা-পিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছোটবেলায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে কিতাবের জ্ঞান দান করুন।’ এই দোয়ার বরকতেই তিনি পরবর্তী সময়ে উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরে পরিণত হন।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও নেক সন্তানের দোয়া তাদের আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ তিনি বলেন, নেক সন্তানের কারণে আল্লাহ জান্নাতে পিতা-মাতার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তাদের পুনরায় একত্রিত করেন।

খুতবার শেষাংশে শায়খ আল-কাসিম জোর দিয়ে বলেন, সন্তান প্রতিপালন শুধু একজনের নয়; বরং মা-বাবা উভয়ের যৌথ দায়িত্ব। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন, ‘নারী তার স্বামীর ঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’

সবশেষে তিনি পিতা-মাতাকে সন্তান লালন-পালনে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সন্তানের কোনো ভুল বা অবাধ্যতায় হতাশ হওয়া যাবে না এবং কখনোই তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা উচিত নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে কিংবা সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না। এমন সময় তা কবুল হয়ে যেতে পারে, যখন আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।’

খুতবার মাধ্যমে মসজিদে নববীর ইমাম স্পষ্ট বলেন—সন্তান আল্লাহর দেওয়া একটি মহামূল্যবান আমানত। তাই তাদের শুধু পার্থিব সাফল্যের জন্য নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র ও ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলাই একজন মুসলিম পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নেক সন্তানই দুনিয়ায় প্রশান্তির কারণ এবং আখিরাতে পিতা-মাতার জন্য অব্যাহত সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

হাদিসের বাণী

যে ভালোবাসা ত্যাগ শেখায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে ভালোবাসা ত্যাগ শেখায়
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক লোক মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, ওয়াল্লাহি! আমি আপনাকে ভালোবাসি। মহানবী (সা.) বললেন, তুমি যা বলছ, তা একটু ভেবে-চিন্তে বলো। সে বলল, ওয়াল্লাহি! আমি আপনাকে ভালোবাসি। এমনটা সে তিনবার বলল। তিনি বললেন, যদি তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে দারিদ্র্যের জন্য বর্ম তৈরি করে রেখো। কেননা, যে আমাকে ভালোবাসবে, পানির স্রোত তার শেষ প্রান্তের দিকে যাওয়ার চেয়েও অতি দ্রুত দরিদ্রতা তার কাছে চলে আসবে।' (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৫০)

শিক্ষা ও বিধান
১. মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর পর সর্বাধিক ভালোবাসার অধিকারী হলেন মহানবী (সা.)। তবে এই ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়; তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হয়।

২. ভালোবাসার দাবির সঙ্গে ত্যাগের প্রস্তুতিও থাকতে হবে। মহানবী (সা.) লোকটিকে বললেন, ‘ভেবে-চিন্তে বলো।’ অর্থাৎ প্রকৃত ভালোবাসা মানে তাঁর পথের কষ্ট, ত্যাগ ও পরীক্ষাকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখা।

৩. আল্লাহর পথে চললে পরীক্ষা আসবেই। নবী-রাসুল, সাহাবায়ে কেরাম এবং নেককারদের জীবন ছিল দুঃখ-কষ্ট, অভাব ও নির্যাতনে পরিপূর্ণ। তাই মুমিনের জীবনও পরীক্ষা থেকে মুক্ত নয়।

৪. দারিদ্র্য এখানে একটি পরীক্ষার স্বরূপ। হাদিসে দারিদ্র্যের কথা বলা হলেও এর উদ্দেশ্য হলো—দ্বিনের পথে চললে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ কমে যেতে পারে, মানুষ বিভিন্ন ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হতে পারে। তাই ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

৫. সুন্নাহ অনুসরণে দুনিয়ার স্বার্থের চেয়ে আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর আদর্শ আঁকড়ে ধরে, সে অনেক সময় দুনিয়াবি লাভ-লোকসানকে উপেক্ষা করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়।

৬. পরীক্ষার সময় ধৈর্যই মুমিনের অলংকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরই তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১০)

৭. নবীদের জীবন ছিল কষ্টময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ; তারপর যারা তাদের অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৮)

উত্তম চরিত্র লাভে পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
উত্তম চরিত্র লাভে পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষ স্বভাবতই সুন্দর চেহারা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা কামনা করে। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়—প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু মুখমণ্ডলের নয়; বরং উত্তম চরিত্র, নম্র আচরণ ও সুন্দর আখলাকই একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে। আল্লাহ তাআলা যেমন আমাদের অবয়বকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে হবে যেন তিনি আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এ দোয়াটি পাঠ করতেন।

اللَّهُمَّ أَحْسَنْتَ خَلْقِي فَأَحْسِنْ خُلُقِي

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা আহসানতা খালকি ফা আহসিন খুলুকি।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার চেহারা সুন্দর করেছেন। অতএব, আমার চরিত্রও সুন্দর করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪৩৯২, বাইহাকি, হাদিস : ৪৮৮)

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ দোয়ার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, বাহ্যিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর আখলাক অর্জনের জন্যও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা উচিত। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চেহারায় নয়, বরং তার চরিত্র, ব্যবহার এবং তাকওয়ায়। কেননা যে সৌন্দর্য মানুষের চোখে ধরা পড়ে, তার চেয়েও মূল্যবান হলো সেই সৌন্দর্য, যা মানুষের হৃদয় জয় করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়।

হত্যায় ব্যবহার হয় এমন সব সরঞ্জাম নিষিদ্ধ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হত্যায় ব্যবহার হয় এমন সব সরঞ্জাম নিষিদ্ধ
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার দিকে নিয়ে যায়—এমন সব পথ ও উপায় বন্ধ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বহু হাদিস আছে। নিচে সেগুলোর উপস্থাপন করা হলো—
মুসলিমকে ভয় দেখানোও হারাম : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা বৈধ নয়।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৭৬৫৮)

অস্ত্র তাক করা বা ইশারা করাও নিষিদ্ধ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র নিয়ে না চলে এবং অস্ত্র দ্বারা ইশারা না করে। কারণ সে জানে না, হয়তো শয়তান তার হাতকে ফসকে দেবে। ফলে সে জাহান্নামের গর্তে পতিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৭২)

লোহার অস্ত্র দিয়ে ইশারা করলেও ফেরেশতাদের অভিশাপ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দিকে লোহার অস্ত্র দিয়ে ইশারা করে, ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে, যদিও সে তার আপন সহোদর ভাই হয়।’ (মুসলিম, হা : ২৬১৬)

মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৭১)

দুই মুসলিম অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি হলে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন দুই মুসলিম একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, তখন তারা উভয়েই জাহান্নামের কিনারায় থাকে। আর যদি একজন অন্যজনকে হত্যা করে, তবে উভয়েই জাহান্নামে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৮৮)

বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন দুই মুসলিম তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হয় তখন হত্যাকারী ও নিহত উভয়েই জাহান্নামি।’ সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! হত্যাকারীর ব্যাপারটি তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন?’ তিনি বললেন, ‘কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১)


বাজার বা মসজিদে অস্ত্র বহনের আদব : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে বা বাজারে তীর-ধনুক নিয়ে যাবে, তখন যেন তীরের ফলাগুলো ধরে রাখে, যাতে কোনো মুসলিম আহত না হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৭৫, মুসলিম : ২৬১৫)।

জাবির (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি মসজিদে খোলা তীর নিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো ‘তীরের ফলা ধরে রাখো, যাতে কোনো মুসলিমের গায়ে আঁচড় না লাগে।’(বুখারি : ৭০৭৪, মুসলিম : ২৬১৪)

ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মারা যায় অথবা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার ব্যাপার ভিন্ন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৪৫২৪)

মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান পবিত্র : রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান—এগুলো একে অপরের জন্য ততটাই পবিত্র, যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই নগর পবিত্র। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে এ কথা পৌঁছে দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭)

হত্যার জন্য বাধ্য করা হলেও হত্যা বৈধ নয়
যদি কাউকে বলা হয়, ‘অমুককে হত্যা করো, না হলে তোমার সম্পদ কেড়ে নেওয়া হবে’ অথবা তাকে মারধরের ভয় দেখানো হয়, তবু নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করা ইসলামে বৈধ নয়। অনেক আলেমের মতে, হত্যার নির্দেশদাতা ও হত্যাকারী—উভয়েই অপরাধে অংশীদার এবং উভয়ের ওপর কিসাস প্রযোজ্য হতে পারে। ইমাম আবু ইসহাক আশ-শিরাজি (রহ.) বলেন, ‘উম্মতের ঐকমত্য হলো, যাকে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে, তারও হত্যা করা বৈধ নয়। সে যদি হত্যা করে, তবে সে গুনাহগার হবে।’ ফাতহুল বারি : ১২/৩১২)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘যাকে অন্যকে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে, তার জন্য সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা, প্রহার করা বা তার সম্মান লঙ্ঘন করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। বরং সে নিজে কষ্ট সহ্য করবে; নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যের জীবন নেওয়া বৈধ নয়।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ১০/১৮৩)

অতএব জবরদস্তি করে হত্যার আদেশ দেওয়া হলেও তা পালন করা ইসলামে বৈধ নয়। আর ‘আমি শুধু আদেশ পালন করেছি’—এ অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। ‘আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করেছি’, এমন কথা মানুষ হত্যার বৈধ দলিল হতে পারে না। এই অজুহাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দুনিয়ার আদালতেও গ্রহণযোগ্য নয়।