• ই-পেপার

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি : স্বপ্ন, সাহস ও বাস্তবতার সমন্বয়

স্বাস্থ্যখাতের অবক্ষয় ও বিদেশমুখী চিকিৎসা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
স্বাস্থ্যখাতের অবক্ষয় ও বিদেশমুখী চিকিৎসা
প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু মানুষের জীবন রক্ষা করে না; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সুদৃঢ় করে। তাই উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যখাতকে কেবল জনকল্যাণমূলক সেবা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপরীতে, যখন কোনো দেশের নাগরিক জটিল বা বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত বিদেশে যেতে বাধ্য হন, তখন তা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্যখাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কেন সেই চিকিৎসা নিজের দেশে দিতে পারব না? আমরা কেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারব না?’ তার মতে, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা ও মানসম্পন্ন সেবার মাধ্যমে এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এর কয়েক দিন পর ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, ‘একটি বিশেষ দেশকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে খুশি করতে বিগত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছিল।’ তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী নীতির ফলে দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এটিকে প্রতিবেশী ভারতের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এ ব্যাখ্যা জনপরিসরের আলোচনার অংশ হলেও, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্ক হিসেবে সামনে এনেছে।

তবে একটি বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো মতভেদ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতসহ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে ব্যয় হচ্ছে এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটও গভীরতর হচ্ছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা অন্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্নটি কেবল কোন দেশ লাভবান হয়েছে তা নয়; বরং কেন বাংলাদেশ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না।

যদি কোনো দেশের নাগরিক নিয়মিত বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন, তবে তা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এটি নির্দেশ করে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব অবস্থা, বিদেশমুখী চিকিৎসার কারণ, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এবং উত্তরণের পথ বিশ্লেষণ করা আজ সময়ের দাবি। এই প্রবন্ধে দেশি-বিদেশি গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সেই বিষয়গুলোর সমন্বিত মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত টিকাদান কর্মসূচি (EPI), মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং ওষুধশিল্পের বিকাশে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করার পাশাপাশি বিশ্বের শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে এসব অগ্রগতির পরও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল, চিকিৎসা গবেষণা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়, স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মান, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) বহন করতে হয়, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও বেশি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। এর ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি একটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ রোগী রাজধানীমুখী হন; আর জটিল রোগের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণকেই তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে।

গত দেড় দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান, দক্ষ মানবসম্পদ, চিকিৎসা গবেষণা, জবাবদিহি এবং আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সমান গতিতে এগোয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়ে গেছে। একইভাবে গত দুই দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা ও চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান সম্পর্কে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এসব প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের একটি অংশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মুনাফাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রবণতা এবং বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তবে এসব সমস্যা সব হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দেশে অনেক দক্ষ, সৎ ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারপরও বিদ্যমান কিছু দুর্বলতা জনগণের একাংশের মধ্যে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

এই আস্থার ঘাটতির অন্যতম প্রতিফলন হলো বিদেশমুখী চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যান। এর মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম ব্যয়, সহজ যোগাযোগ, ভাষাগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের কারণে ভারতের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের যাতায়াত, আবাসন, ওষুধ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সেবা অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের জন্য বিদেশমুখী চিকিৎসা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ও। চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন উৎসে এর পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়, তবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটকে আরঘ গভীর করছে।

তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা কমাতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। এ জন্য স্বাস্থ্যখাতকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সেবার মান, জবাবদিহির ঘাটতি, চিকিৎসা গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সংকট নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকের স্বাভাবিক প্রত্যাশা হলো—তার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিজ দেশের ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারা। সেই আস্থা পুনর্গঠন করাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যখাতকে শুধু জনকল্যাণমূলক খাত হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক হাসপাতাল, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে চিকিৎসা পর্যটনকে লাভজনক অর্থনৈতিক খাতে রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান চিকিৎসা গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসা, গবেষণা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। ফলে দেশটি এখনো চিকিৎসাসেবা রপ্তানিকারকের পরিবর্তে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ হিসেবেই পরিচিত।

এই বাস্তবতা পরিবর্তনে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, মেডিকেল শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশীদারত্ব, হাসপাতালগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু নিজস্ব নাগরিকদের জন্য বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশের বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে স্বাস্থ্যখাতকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।

উপসংহারে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কোনো একক সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে যে জাতীয় বিতর্কের সূচনা করেছে, তা তথ্যভিত্তিক আত্মসমালোচনা ও কার্যকর সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও রয়েছে—জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা হ্রাস এবং বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে তার নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

মন্‌জুরুল ইসলাম
এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

পৃথিবী এখন টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে। মহাপরাক্রমশালী ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষেত্রবিশেষ টেক জায়ান্টদের কাছে ধরাশায়ী। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা এআই মানুষকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এআইয়ের কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে মানব শ্রমশক্তি। প্রশ্ন, এআই কি জনশক্তির বিকল্প হতে যাচ্ছে? মানুষ কীভাবে এআইয়ে দক্ষ হবে? নাকি মানুষই এআইয়ের দাসে পরিণত হবে? এআই কি মনের গোপন কথা প্রকাশ করে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে? পৃথিবী নিয়ে খেলা করতে এআইয়ের পর আর কী প্রযুক্তি আসছে? এআইয়ের অ্যাডভান্সড ভার্সনই বা কী? এসব মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে নাকি ডেকে আনবে সর্বনাশ?

পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষই তার প্রয়োজনে নানান উদ্ভাবনে নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি সভ্যতা মানুষকে বদলে দিয়েছে। কখনো কাজের ধরন বদলে গেছে, কখনো বদলে গেছে চিন্তার ধরন। প্রযুক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে মানবসভ্যতার তিনটি যুগ। প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লোহার যুগ। আর ঐতিহাসিক সময়ের ভিত্তিতে সভ্যতার যুগ হলো চারটি। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক ও সমকালীন যুগ। শিল্পবিপ্লব মানুষের শারীরিক শ্রমের ধরন পাল্টে দিয়েছে। ইন্টারনেট তথ্যপ্রবাহের ধারা বদলে দিয়েছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আই বদলে দিচ্ছে মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব কি না। অনেকের মনে এখনো একটি ভয় কাজ করছে, এআই কি মানুষকে কর্মচ্যুত করবে?

পৃথিবীতে কি মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে? তবে প্রশ্ন যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো এআই মানুষের বিকল্প নয়। বরং যে ব্যক্তি এআই ব্যবহার করতে জানে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনায় পারদর্শী সে ধীরে ধীরে সেই সব ব্যক্তির চেয়ে এগিয়ে যাবে, যারা এআই সম্পর্কে অজ্ঞ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মানুষ। একজন হবেন এআই-দক্ষ, অন্যজন এআই-অদক্ষ। ভবিষ্যতের কর্মবাজারে এ পার্থক্যই সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বিশ্বে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং, মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজাইন, কৃষি ও উৎপাদন শিল্পে এআই দ্রুত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের কপি লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট তৈরি, ছবি ও ভিডিও নির্মাণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা দৈনন্দিন অফিসের কাজসহ সব ক্ষেত্রেই এআই ঢুকে পড়ছে। ফলে যারা এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন, তারা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছেন এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এআই ব্যবহার মানেই শুধু একটি সফটওয়্যার খুলে প্রশ্ন করা নয়। এর জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের দক্ষতা। প্রথমেই জানতে হবে এআই কীভাবে কাজ করে এবং কোন কাজের জন্য কোন টুল উপযুক্ত। যেমন লেখালেখি ও বিশ্লেষণের জন্য এক ধরনের টুল কার্যকর, গবেষণার জন্য আরেকটি। আবার ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বর তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন টুল ব্যবহার করতে হয়। এ মৌলিক ধারণা না থাকলে এআই থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।

এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার একটি হলো প্রম্পট লেখার প্রকৌশল (Prompt Engineering)। এআইকে কী করতে হবে, কোন ভাষায় করতে হবে, কী ধরনের উত্তর দরকার, কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে এসব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই ভালো ফলের দক্ষতা। একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে এআই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের উত্তর দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করা। এরপর আসে কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। ব্লগ, সংবাদ, বিজ্ঞাপনের লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, ইমেইল, প্রতিবেদন কিংবা ব্যবসায়িক বিষয়-সব ক্ষেত্রেই এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ ও সম্পাদনার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে সেই কনটেন্টের মান। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দক্ষ সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। অর্থাৎ এআইয়ের বশ্যতা নয় বরং এআইকে অধীন করতে হবে।

বর্তমান সময়ে ছবি, ভিডিও ও ভয়েস তৈরির প্রযুক্তিও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটি ধারণা থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচারমূলক পোস্টার, সমাজমাধ্যমের ভিডিও, এমনকি মানুষের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যবসা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিনোদনশিল্পে এসব প্রযুক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে এ ক্ষেত্রগুলোতেও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে অটোমেশনে। একই ধরনের কাজ বারবার করার পরিবর্তে এআই সেই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ইমেইল পাঠানো, সমাজমাধ্যমে পোস্ট প্রকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ, রিপোর্ট তৈরি কিংবা গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজ এখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। এতে মানুষের সময় বাঁচছে এবং তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে পারছে।

AI Researcher I Machine Learning Engineer শুধু শেখাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের প্রমাণও জরুরি। তাই যারা এআই নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের ছোট ছোট বাস্তব প্রকল্প তৈরি করতে হবে। নিজস্ব পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে কনটেন্ট, ডিজাইন, ভিডিও, অটোমেশন বা অন্যান্য কাজের নমুনা। বর্তমান চাকরির বাজার ও ফ্রিল্যান্সিং জগতে সনদের চেয়ে বাস্তব দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের জন্য এআই একটি বড় সুযোগও বটে।

দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যদি সময়মতো এআই-দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এআই কখনো মানুষের বিবেক, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প হতে পারে না। তথ্য যাচাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় মানুষকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই এআইকে ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এবং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যক্তি আজ এআই শেখার উদ্যোগ নেবে, আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে সে-ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে থাকবে। আর যারা প্রযুক্তির এ পরিবর্তনকে উপেক্ষা করবে, তাদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। তাই সময়ের দাবি একটাই—এআইকে ভয় নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আপন করে নেওয়া।

এখন দেশে এআই ইন্টিগ্রেটর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের যথেষ্ট অভাব আছে। এআইয়ের যেসব টুল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো কীভাবে ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ করা যায়, তার দক্ষ জনশক্তির খুবই সংকট। বর্তমানে যেখানে একজন সাধারণ ওয়েভ ডেভেলপার এক ঘণ্টা কাজ করলে সর্বোচ্চ ৩০ ডলার আয় করছেন, সেখানে একজন দক্ষ এআই ইন্টিগ্রেটর ঘণ্টায় আয় করছেন সর্বনিম্ন ৭০ ডলার। বর্তমান বাজারে এর একটি বিশাল দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একদিকে আছে অসংখ্য ওয়েভ ডেভেলপার, যারা চমৎকার ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এআই কীভাবে কাজ করে, এআই-এপিআই (Application Programming Interface) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় বা এআইকে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত।

অন্যদিকে আছে AI Researcher I Machine Learning Engineer, যারা মডেল তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যবসার বাস্তব সমস্যা, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বা বাণিজ্যিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে না। ফলে মাঝখানে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ শূন্যস্থান পূরণ করে এমন একজন পেশাজীবী, যে ব্যবসার সমস্যা বোঝে, এআইয়ের সক্ষমতা বোঝে এবং ক্লায়েন্টকে বোঝাতে পারে যে এ কাজটি এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করা সম্ভব। আর সেটি ক্লায়েন্টের বর্তমান সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়াও সম্ভব। এই মানুষটিই হলো একজন এআই ইন্টিগ্রেটর। বর্তমান পৃথিবীতে এমন দক্ষ মানুষের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আর এ কারণেই তাদের পারিশ্রমিকও অনেক বেশি।

প্রযুক্তির আরেক আধুনিক সংযোজন হলো স্মার্টফোন। স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই অনেক কিছু ছাড়তে পারি, কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া একদণ্ডও থাকতে পারি না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, দিনমজুর, রিকশাচালক এমনকি ভিখারির হাতেও ফোন শোভা পাচ্ছে। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানবসভ্যতার বিরাট অর্জন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, সেই প্রিয় সঙ্গী ফোনটিও আমাদের বিশ্বস্ত নয়। আমরা কোথায় যাই, কার সঙ্গে সময় কাটাই, কী বিষয়ে গালগল্প বা ব্যক্তিগত অন্য কিছু করি—সবই জানে এই প্রিয় ডিভাইস। সে কারণে অপরাধ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দারা সবার আগে খোঁজ করেন ওই ফোনটির। এক সময় অপরাধ তদন্তে সবার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো ড্রাইভার, দারোয়ান অথবা কাজের লোককে।  এখন সেই ধরন পাল্টে গেছে। প্রিয় স্মার্টফোনই এখন আমাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এখন যে ভার্সন চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি প্রাথমিক ধাপ। আগামী দিনগুলোতে এটির হয়তো আরও অনেক বেশি অ্যাডভান্সড ভার্সন আসবে। তখন এমনও হতে পারে, এআই হয়তো মানুষের মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে পারবে। তখন হয়তো মুখোশধারী মানুষের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে সেটা হবে ব্যক্তি মানুষের জন্য বিপজ্জনক, কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ। কারণ মুখোশধারী মানুষই ধ্বংস করছে পৃথিবী ও কল্যাণকর মানবসভ্যতা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

আহসান হাবিব বরুন
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র—এ দুটি ধারণা পরস্পরের পরিপূরক। একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি-নির্ধারণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তৃণমূল পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি স্বাধীন, কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে এক ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেন্দ্রীয় রাজনীতির, বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যের যাঁতাকলে পিষ্ট। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে—স্থানীয় সরকারকে পঙ্গু করে এবং এমপিদের সর্বব্যাপী প্রভাব বজায় রেখে আদৌ কি টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা। একটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের চাহিদা সবচেয়ে ভালো বোঝেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো—জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ—স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে বন্টিত হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের।

বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে আইনপ্রণেতা তথা সংসদ সদস্যদের প্রশাসনিক কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। আইনপ্রণেতাদের মূল দায়িত্ব জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশে এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, ইজারা, প্রশাসনিক বদলি থেকে শুরু করে একদম ছোটখাটো সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করেন।

আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদে এমপিদের ‘উপদেষ্টা’ ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এই আস্কারা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসনে এক ধরনের অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছে—এমপির ইশারা ছাড়া কিছুই হবে না। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিছক ঠুঁটো জগন্নাথ বা রাজনৈতিক অনুঘটে পরিণত হয়েছেন। প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় ক্ষমতার দাপটের সামনে দেখেও না দেখার ভান করে, যা স্থানীয় সুশাসনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

এমপিদের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল কিংবা পরিবহনের ইজারা প্রক্রিয়ায় কোনো উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা হতে দেওয়া হয় না। এমপির পছন্দের লোক বা তাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের হাতে নামমাত্র মূল্যে এসব রাজস্ব আয়ের উৎস তুলে দেওয়া হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার একটি গরুর হাটের কথা। ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে যে হাটটি প্রায় পৌনে চার কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদে রাজনৈতিক প্রভাব ও ইশারায় সেই একই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকার কিছু বেশিতে। অর্থাৎ, মাত্র একটি হাটের ইজারাতেই সরকার প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

দেশজুড়ে হাজার হাজার হাটবাজার, বালুমহাল ও জলমহালে প্রতিদিন এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। উন্মুক্ত দরপত্রের তোয়াক্কা না করে দলীয় প্রভাব ও এমপির আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার এই অলিখিত সংস্কৃতির কারণে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব লোপাট হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।

যুগ যুগ ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি এক মারাত্মক ব্যাধি বা সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল যখন যেই থাকুক, এমপিদের ছত্রছায়ায় এলাকায় কিছু কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও ক্যাডার বাহিনী গড়ে ওঠে। তারা যা বলে, সেটাই যেন স্থানীয় আইনে পরিণত হয়। আইনি শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে টেন্ডারবাজি, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং সরকারি সম্পত্তি দখলের মহোৎসব চলে।

এই গভীর সংকট সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য। বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিতে বিচার করলে, এককভাবে কোনো সরকারের পক্ষে বা সরকারপ্রধানের পক্ষে রাতারাতি এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ চাঁদাবাজি কেবল কোনো নির্দিষ্ট একক দলের বলয়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবনতির কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজির ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

এই চরম সংকট থেকে উত্তরণ পেতে এবং স্থানীয় সরকারকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি :

১. রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রকাশ্যে, রশিদের মাধ্যমে ও আইনগত কাঠামো মেনে চাঁদা বা ফান্ড সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও গোপনে চাঁদা বা তোলাবাজির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আইন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো যাতে গোপনে বা বলপ্রয়োগ করে টাকা না তুলে, বৈধভাবে রশিদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে সাহায্য বা চাঁদা গ্রহণ করতে পারে—তা আইনগতভাবে মঞ্জুর করা দরকার।

২. চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন স্বয়ং সরকারপ্রধান। সরকারপ্রধান (যেমন বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনাব তারেক রহমান)-কে স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিতে হবে। সরকার যদি একটি কঠোর ঐতিহাসিক ঘোষণা জারি করে যে—'কোনো এমপি বা তার সংসদীয় এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দখলবাজির সত্যতা গণমাধ্যমে কিংবা তদন্তে প্রমাণিত হলে, তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং আইনগত তদন্তের মাধ্যমে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হবে।'

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন একটি কঠোর নীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পরিমাণ বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

পরিশেষে বলতে চাই, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন, স্থানীয় শাসনের ওপর ছড়ি ঘোরানো নয়। জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আত্মনির্ভরশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

সরকারের যদি প্রকৃত সদিচ্ছা থাকে, তবে অবিলম্বে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার আনা সম্ভব। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই কেবল বাংলাদেশে প্রকৃত সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সুষম টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও দলীয় পর্যায়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে নতুন এই সম্পৃক্ততার গতি ও বিস্তৃতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে যে— ‘নিজস্ব কৌশল’ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কিভাবে এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পারে?

এবারের সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক। সাধারণ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের চুক্তি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে। বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রসারের অংশ হিসেবে সিপিসি তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়েই দীর্ঘকাল ধরে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। প্রবাসীদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দেশটির ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট'-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন গবেষকরা।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় এমন আরো কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি ও শিক্ষাবিনিময়ের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রতিষ্ঠান গভীর পর্যবেক্ষণের মুখেও পড়েছে।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ' (সিএমজি) কনটেন্ট শেয়ারিং, সাংবাদিকদের পারস্পরিক সফর এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া কূটনীতিতে এমন অংশীদারি সাধারণ বিষয় হলেও এর মাধ্যমে বেইজিং বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচারের বড় সুযোগ পাচ্ছে। 

চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সমানভাবে দৃশ্যমান অবকাঠামো খাতে। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, এর কাছাকাছি প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা জাগিয়েছে। দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে এসব প্রকল্প বাংলাদেশের দারুণ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।  

অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টিও সমান মনোযোগ দাবি করে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ সামান্য। তাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

এসব পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করা যাবে না। বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারি প্রয়োজন, যেখানে চীন বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সফল অংশীদারি গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সমান স্পষ্টতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কি না।