একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু মানুষের জীবন রক্ষা করে না; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সুদৃঢ় করে। তাই উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যখাতকে কেবল জনকল্যাণমূলক সেবা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিপরীতে, যখন কোনো দেশের নাগরিক জটিল বা বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত বিদেশে যেতে বাধ্য হন, তখন তা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্যখাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কেন সেই চিকিৎসা নিজের দেশে দিতে পারব না? আমরা কেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারব না?’ তার মতে, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা ও মানসম্পন্ন সেবার মাধ্যমে এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এর কয়েক দিন পর ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, ‘একটি বিশেষ দেশকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে খুশি করতে বিগত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছিল।’ তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী নীতির ফলে দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এটিকে প্রতিবেশী ভারতের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এ ব্যাখ্যা জনপরিসরের আলোচনার অংশ হলেও, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্ক হিসেবে সামনে এনেছে।
তবে একটি বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো মতভেদ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতসহ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে ব্যয় হচ্ছে এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটও গভীরতর হচ্ছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা অন্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্নটি কেবল কোন দেশ লাভবান হয়েছে তা নয়; বরং কেন বাংলাদেশ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না।
যদি কোনো দেশের নাগরিক নিয়মিত বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন, তবে তা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এটি নির্দেশ করে যে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব অবস্থা, বিদেশমুখী চিকিৎসার কারণ, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এবং উত্তরণের পথ বিশ্লেষণ করা আজ সময়ের দাবি। এই প্রবন্ধে দেশি-বিদেশি গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সেই বিষয়গুলোর সমন্বিত মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত টিকাদান কর্মসূচি (EPI), মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং ওষুধশিল্পের বিকাশে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করার পাশাপাশি বিশ্বের শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে এসব অগ্রগতির পরও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল, চিকিৎসা গবেষণা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবায় এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়, স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মান, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) বহন করতে হয়, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও বেশি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। এর ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি একটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ রোগী রাজধানীমুখী হন; আর জটিল রোগের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণকেই তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে।
গত দেড় দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান, দক্ষ মানবসম্পদ, চিকিৎসা গবেষণা, জবাবদিহি এবং আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সমান গতিতে এগোয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়ে গেছে। একইভাবে গত দুই দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা ও চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান সম্পর্কে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এসব প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের একটি অংশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মুনাফাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রবণতা এবং বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তবে এসব সমস্যা সব হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দেশে অনেক দক্ষ, সৎ ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারপরও বিদ্যমান কিছু দুর্বলতা জনগণের একাংশের মধ্যে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
এই আস্থার ঘাটতির অন্যতম প্রতিফলন হলো বিদেশমুখী চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যান। এর মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম ব্যয়, সহজ যোগাযোগ, ভাষাগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের কারণে ভারতের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের যাতায়াত, আবাসন, ওষুধ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সেবা অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশমুখী চিকিৎসা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ও। চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন উৎসে এর পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়, তবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকটকে আরঘ গভীর করছে।
তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা কমাতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। এ জন্য স্বাস্থ্যখাতকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সেবার মান, জবাবদিহির ঘাটতি, চিকিৎসা গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সংকট নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকের স্বাভাবিক প্রত্যাশা হলো—তার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিজ দেশের ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারা। সেই আস্থা পুনর্গঠন করাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যখাতকে শুধু জনকল্যাণমূলক খাত হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক হাসপাতাল, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে চিকিৎসা পর্যটনকে লাভজনক অর্থনৈতিক খাতে রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান চিকিৎসা গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসা, গবেষণা, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর হাসপাতাল এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। ফলে দেশটি এখনো চিকিৎসাসেবা রপ্তানিকারকের পরিবর্তে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ হিসেবেই পরিচিত।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, মেডিকেল শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশীদারত্ব, হাসপাতালগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু নিজস্ব নাগরিকদের জন্য বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশের বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে স্বাস্থ্যখাতকে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী দেশ থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
উপসংহারে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কোনো একক সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে যে জাতীয় বিতর্কের সূচনা করেছে, তা তথ্যভিত্তিক আত্মসমালোচনা ও কার্যকর সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও রয়েছে—জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, বিদেশমুখী চিকিৎসার প্রবণতা হ্রাস এবং বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে তার নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট









