চার জোড়া ছোট্ট হাত! চার জোড়া মুগ্ধ চোখের অগাধ বিস্ময়ে ভরা চোখ! আনন্দ আর স্বপ্নের ঝিলিক! আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী! রাজধানীর চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের ব্যস্ত আয়োজনের মাঝেও কয়েকটি মুহূর্ত যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আকিকের মাথায় স্নেহভরে হাত রাখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খোঁজ নিলেন পড়াশোনার। করমর্দন করলেন আমিরা, তাশজিদ ও সামিন ইয়াসারের সঙ্গে। মফস্বলের একটি সরকারি বিদ্যালয়ের চার শিশুর কাছে মুহূর্তটি ছিল স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার মতো। আকাশ ছোঁয়ার বিস্ময়াভিভূত হওয়ার মতো। সেই স্বপ্নের ঠিকানার নাম—আলমডাঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে দেশের ৬৪ জেলার নির্বাচিত বিদ্যালয়ের মধ্যে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্টল প্রদর্শনের সুযোগ পায় বিদ্যালয়টি। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে জায়গা করে নেওয়া এই বিদ্যালয়ের স্টল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল মফস্বলের একটি বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সাধনা, সাফল্য ও সম্ভাবনার জাতীয় স্বীকৃতি। স্টলে উপস্থিত ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আকিক, তৃতীয় শ্রেণির আমিরা, চতুর্থ শ্রেণির তাশজিদ ও সামিন ইয়াসার। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারেজ উদ্দীন, সহকারী শিক্ষক উম্মে জোবাইদা এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার।
তবে এই বিদ্যালয়ের গল্প আজকের নয়। বহু বছরের শ্রম, পরিকল্পনা এবং আত্মনিবেদনের ফসল আজকের এই অবস্থান। খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি একাধিকবার অর্জন করেছে আলমডাঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগের কারণে বিদ্যালয়টি আজ মফস্বলের সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছেন স্বাপ্নিক প্রধান শিক্ষক হারেজ উদ্দীন। তিনি শুধু বিদ্যালয় পরিচালনা করেন না; তিনি কোমলমতি শিশুদের ভেতরের আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করতে বছরের পর বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক শিশুর কাছে তাই তিনি শুধু ‘স্যার’ নন, ‘বাবা’ বটে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে হারেজ উদ্দীন তুলে ধরেন সেই মানবিক শিক্ষাযাত্রার গল্প। তিনি বলেন, ‘সুযোগ আর স্নেহ পেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরাও সমাজের নেতৃত্ব দিতে পারে। তার কথার প্রমাণও রয়েছে এই বিদ্যালয়ের ইতিহাসে।’
একসময় এই বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করতেন জয় কুমার ব্যাধ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের সেই শিক্ষার্থী আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সম্মানজনক চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়ের অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর মতো জয়ও তার শিক্ষককে ‘স্যার’ নয়, ‘বাবা’ বলেই ডাকে।
ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর আরেক সাবেক শিক্ষার্থী বিদিশা আজ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের কৃতি খেলোয়াড়। মফস্বলের মাঠে ছুটে বেড়ানো সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ জাতীয় জার্সি গায়ে মাঠে নামে। তার এই পথচলার শিকড়ও প্রোথিত রয়েছে আলমডাঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উঠোনে।
এমন সাফল্যের গল্পই প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন হারেজ উদ্দীন। মনোযোগ দিয়ে সব কথা শোনেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় যেকোনো সহযোগিতার বিষয়ে যোগাযোগ করতে বলেন বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
আলমডাঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ শুধু একটি বিদ্যালয়ের নাম নয়। এটি প্রমাণ করেছে, রাজধানী থেকে অনেক দূরের একটি মফস্বল শহরেও নিষ্ঠাবান স্বাপ্নিক শিক্ষক, স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী এবং সচেতন অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠতে পারে জাতীয় মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সেই কয়েক মিনিট হয়তো অনুষ্ঠানসূচির একটি ছোট অংশ। কিন্তু আলমডাঙ্গার মানুষের কাছে তা এক বিশাল প্রাপ্তি। কারণ সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়েছিল শুধু চারজন শিক্ষার্থী নয়; দাঁড়িয়েছিল একটি উপজেলা, একটি বিদ্যালয়, একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রধান শিক্ষক এবং অগণিত স্বপ্নবাজ শিশুর ভবিষ্যৎ।
হয়তো বহু বছর পর আকিক, আমিরা, তাশজিদ কিংবা সামিন ইয়াসার যখন জীবনের নতুন অধ্যায়ে পৌঁছবে, তখন তারা ফিরে তাকিয়ে বলবে—একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাথায় স্নেহের হাত রেখেছিলেন। আর সেই স্পর্শ আমাদের স্বপ্নকে আরো বড় করে দিয়েছিল। আমাদের মাথার ওপরের আকাশও অনেক উঁচু আর উদার হয়েছিল।