ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ৫টি স্থানের কাজ আটকে থাকায় বন্যা আতঙ্কে অরক্ষিত এই বাঁধ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মনু তীরের লোকজন। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছে মনু নদী তীরবর্তী কুলাউড়া উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ৪টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ। কাজ শুরু হওয়ার ৫ বছর অতিবাহিত হলেও বিএসএফের বাধাসহ নানা জটিলতায় এ প্রকল্পে কাজ হয়েছে মাত্র ৭০ শতাংশ। ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন মনু নদের অবস্থান সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় দুই দেশের নদী সুরক্ষাবিষয়ক জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। যথাসময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ার কারণে সম্প্রতি বন্যার কবলে পড়ে কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার মানুষজন ।
এদিকে বিএসএফের বাধায় বন্ধ থাকা পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় মনু নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধে ২০২৪ সালের বন্যার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ অংশ দিয়ে গত ৮ জুলাই গভীর রাতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে শিকড়িয়া, আলীনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে শতাধিক পরিবার ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছে। যাতায়াতের জন্য স্থানীয় লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ওপর একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করে তারা চলাফেরা করছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বিএসএফ কর্তৃক বাধার কারণে সীমান্তবর্তী শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম, নিশ্চিন্তপুর, তেলিবিল, বাগজুর এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ অংশে কাজ না হলেও ভারতের অংশে বছর খানেক আগে কাজ হয় বিএসএফের উপস্থিতিতে। এ নিয়ে স্থানীয় সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে নদী তীরের লোকজন একাধিকবার মানববন্ধন করে স্মারকলিপি দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। এদিকে বিএসএফের বাঁধায় কাজ বন্ধের বিষয় নিয়ে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কথা বলেন মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শওকতুল ইসলাম শকু। তিনি দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের কাছে দাবি করেন।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, মনু নদীর ভয়াবহ বন্যা আর ভাঙন হতে মৌলভীবাজার জেলার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলাকে বন্যা ও নদী ভাঙ্গন থেকে মুক্ত রাখতে ২০২০ সালের ২১ জুন ৯৯৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে দরপত্র আহবান করা হয় কাজের। এ প্রকল্পে কুলাউড়া উপজেলায় মোট ২৮টি প্যাকেজের কাজ রয়েছে। যার মোট চুক্তিমূল্য ৩০৭ কোটি টাকা। ২৮টি প্যাকেজের মধ্যে স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজের ২০টি, চর অপসারণ কাজের ৪টি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ কাজের ৪টি প্যাকেজের কাজ রয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলায় কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। সীমান্তবর্তী কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম, নিশ্চিন্তপুর, তেলিবিল ও বাগজুরসহ মোট ৪টি স্থানে মোট ২ কিলো ২০০ মিটার অংশে স্থায়ী নদী তীর সংরক্ষণ কাজ রয়েছে। কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স বাঁধ মেরামত ও তীর সংরক্ষণের কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ তৈরির কাজ সম্পন্ন করে রাখে। কিন্তু ৪টি স্থানে ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে বিএসএফের বাঁধার কারণে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
.jpg)
সরেজমিনে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া বেঁড়িবাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় ১০০ ফুট ভাঙ্গনের স্থান দিয়ে বন্যার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এসময় স্থানীয় লোকজন বলেন, এই বেড়িবাঁধের কাজ দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে বিএসএফের বাঁধায়। স্থানীয় লোকজন অস্থায়ীভাবে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য তাহির আলী, সংগঠক ফয়জুল হক, ব্যবসায়ী মখলিছ মিয়া, আতিক মিয়া বলেন, ‘২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার পৃথিমপাশা, টিলাগাঁও, হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পৃথিমপাশার রাজাপুর, বেলরতল ও ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর কাজ ঠিকাদারদের গড়িমসি, জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় বারবার বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া শিকড়িয়া, নিশ্চিন্তপুর, তেলিবিল, দত্তগ্রাম ও বাগজুর এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ অংশের কাজ আটকে থাকায় আতঙ্ক কাটছে না। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে প্রতিরক্ষা বাঁধ, নদী আর গ্রাম কোনটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। সেই সঙ্গে এ ইউনিয়নগুলোর বানভাসী লোকজন প্রতিটি মুহুর্তে বন্যা আতঙ্কে তাদের দিন কাটায়। দ্রুত দুই দেশের নদী সুরক্ষা বিষয়ক প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন না করা যায় তাহলে আবারো নদী ভাঙ্গনের আতঙ্কে রয়েছেন মনু পাড়ের লাখো মানুষ।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, ‘পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়ায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনকৃত স্থান পরিদর্শন করেছি। বাঁধের কাজের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে শিকড়িয়াসহ শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশ-ভারতের আন্ত:মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলিদ বলেন, ‘বন্যা ও ভাঙন থেকে কুলাউড়াকে রক্ষা করতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩০৭ কোটি টাকার এ প্রকল্প শুরু হয়। যার সার্বিক অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশেরও বেশি। সীমান্তবর্তী শরীফপুর ইউনিয়নের ৪টি স্থানে মোট ১ হাজার ৪০০ মিটার অংশে বিএসএফের বাঁধার মুখে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছিল। দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সেটি নিয়ে আলোচনা চলমান। অনুমোদন পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের কাজ গত বছর শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিএসএফের বাঁধায় কাজ শুরু করা যায়নি। কাজ শেষ করতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া ও দত্তগ্রামে মনু নদের বেড়িবাঁধের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ অংশে মাটি ভরাট কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারকে বিজিবি সব ধরনের সহযোগিতা করবে।