kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

পতিতা কন্যার জীবন থেকে লেখা হয় ‘গেঁন্দাফুল’

মাহতাব হোসেন   

২৯ মার্চ, ২০২০ ১৭:২১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পতিতা কন্যার জীবন থেকে লেখা হয় ‘গেঁন্দাফুল’

সামাজিক যোগাযোগ ও সামাজিক বিনোদন মাধ্যমে ‘গেঁন্দাফুল’ গানটি এখন বেশ ট্রেন্ডিং। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা রীতিমতো গানের সাথে জ্যাকলিন ফার্নান্দেজের নাচে মজেছেন। শুধু এতোটুকুই নয়। কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে যখন হাপিয়ে উঠছিলেন তরুণ-তরুণীরা  তখন এই ট্রেন্ড এসে দোলা দিয়ে গেল। বিশেষ করে গানের সাথে তরুণীরা নেচে ফেসবুকে পোস্ট করছেন ভিডিও। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে বন্ধ ঘরের দরজার ভেতরে।

তবে নতুনভাবে এই গান ভাইরাল হওয়ার নেপথ্যে একদিকে যেমন বাঙালি লাজবন্তী বেশে বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকলিন ফার্নান্দেজ রয়েছেন, তেমনই কিন্তু রয়েছেন খ্যাতনামা ব়্যাপার বাদশাও।পায়েল যাদবের কণ্ঠে ঠোঁট মিলিয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকলিন। তবে এই গান প্রকাশকারী ভারতের সনি মিউজিক এড়িয়ে গেছেন  গীতিকারের নাম। 'বড়োলোকের বিটি লো' গানের গীতিকার রতন কাহার। এ কারণে ভারতের কণ্ঠশিল্পী রুপঙ্করসহ অনেকেই সনি মিউজিক্র ওপর ক্ষিপ্ত। গানটি এর আগে পশ্চিমবঙ্গের এসভিএফের প্রযোজনায় ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাজা রানী রাজি’ শিরোনামে একটি চলচ্চিত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে; তবে রতন কাহারের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

রতন কাহার পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের বাসিন্দা। নিভৃতচারী এই লোকের গান বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ালেও তিনি রয়ে যান অন্তরালে। 

‘গেঁন্দাফুল’গানটি ১৯৭৬ সালে গেয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান স্বপ্না স্বপ্না চক্রবর্ত্তী। গানটির জন্য স্বপ্না ডিস্ক রেকর্ড পুরস্কারও পান। সাম্প্রতিক সময়ে উপমহাদেশে তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া  'বড়োলোকের বিটি লো' গানটি কীভাবে লেখা হলো? নেপথ্যের কথা জানা গেল রতন কাহারের মুখে।  বললেন, 'আমি নিজেই যে স্বপ্নাকে গানটা দিয়েছিলাম তা কিন্তু নয়। আমার গানটা একটা দল কোরাস গাইতো। সেই গান অনেকে পছন্দ করতো। সাহা বলে একজন লোক ছিলেন তিনি আমার কাছ থেকে গানটা নেন। ওটা আমি ৭২ সালে লিখেছিলাম। সত্যি কথা বলতে গেলে গানটা আমি আরো বহু লিখেছিলাম। তবে ৭২ সালে সম্পূর্ণ হয়।  ৭৬ সালে রেকর্ডিং করা হয়। সেখানে আমার নামও লেখা ছিল না, আমাকে কোনো টাকা পয়সা দেওয়া হয়নি।'

রতন কাহার বলেন, ঘটনার ক'দিনপর আমি কলকাতা গিয়েছিলাম রেডিওতে গান করতে। সেখানে আকাশবাণীর কর্মকর্তারা আমার চারটা গান নেন। সেখানে বড়লোকের বিটি লো'সহ আরো তিনটি গান ছিল। গানগুলোর লেখা হওয়ার পরে আমার সাইন নেওয়া হয়। 

গান লেখার নেপথ্যে রয়েছে আরো গভীর কথা। একজন পতিতা ও তার কন্যাকে দেখে রতনের মনে গানের কথা উঁকি দেয়। রতন কাহার বলেন, 'একজন পতিতা ছিলেন। সমাজে অবহেলিত সেই পতিতার একটি মেয়ে হলো। যখন ৭-৮ বছর বয়স হলো, তখন একদিন দেখছিলাম পতিতা মেয়েটি তার ছোটমেয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছিলেন। তখন তার মেয়ের দিক থেকে গানের কথাগুলো আমার মনে উদ্রেক হয়। আমি ঘরে থাকতে পারতাম না। মা চিন্তা করতো বাবা চিন্তা করতো কিন্তু আমি ঘরে থাকতে পারতাম না। আমি গান লিখতাম, গাইতাম।' 

রতন কাহারের চার ছেলেমেয়ের কেউই পয়সার অভাবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। রতন কাহারের এক ছেলে বলেন, 'বাবার গানে গেয়ে অনেকেই কোটিপতি হয়ে গেছেন। কিন্তু আমার বাবার কিচ্ছু হয়নি।'  আসলেই কিছুই হয়নি। বীরভূমের শিউরির ৪ নং ওয়ার্ডের এক ভাঙাচোরা বাড়িতে পরিবারসহ বসবাস করেন রতন কাহার। 

ছেলের এমন কথায় রতন কাহার কর্ণপাত করতে রাজি নন। তিনি বলেন, আমার কখনো দুঃখ হয় না। একটু আফসোস হয় যে ছেলেদের জন্য। তাদের জন্য তো কিছু করতে পারিনি। অনেকেই আমাকে সংবর্ধনা দেয়। কিন্তু সংবর্ধনা নিয়ে ফিরলে বাসায় কেউই খুশি হয়না, টাকা নিয়ে এলে খুশি হয়।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা