কৃষকদের অধিকার আদায়ে কাজ করতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গসংগঠন হিসেবে জাতীয় কৃষক শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। একই সঙ্গে এটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিও (আংশিক) ঘোষণা করা হয়েছে।
আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সাঈদ উজ্জ্বল ও সদস্যসচিব হয়েছেন কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম। মুখ্য সংগঠক হিসেবে নফিউল ইসলামকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন আহমেদ জাকি ও মো. আব্দুল আজিজ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মজিবুর রহমান খোকন ও মো. রাকিবুল হাসান রানা দায়িত্ব পেয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার টগরাই হাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদের সভাপতিত্বে ও গোলাম মর্তুজা সেলিমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। কৃষক সমাবেশে জুলাই শহীদ রাজীবের মা জান্নাতুল ফেরদৌস এবং জুলাইযোদ্ধা আরিফুল ইসলামও বক্তব্য দেন।
জাতীয় কৃষক শক্তির ঘোষণাপত্র পাঠকালে নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল বলেন, “‘কৃষকের শক্তি, জাতীয় মুক্তি’ স্লোগানকে সামনে রেখে এগিয়ে যাবে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নয়, একই সঙ্গে এই ভূখণ্ডের অর্থনীতির ভিত্তি এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান শক্তি। নীলচাষ-বিরোধী আন্দোলন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, টঙ্ক আন্দোলন, কৃষকপ্রজা পার্টি, তেভাগার সংগ্রাম এবং মাওলানা ভাসানীর কৃষক রাজনীতি আমাদের সেই ঐতিহাসিক ধারার অংশ। এসব আন্দোলন জমির মালিকানা, উৎপাদনের অধিকার এবং রাষ্ট্রে কৃষকের মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন লড়াই করে গেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর কৃষককে ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে কেবল উৎপাদনের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।”
সাঈদ উজ্জ্বল আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা কৃষকের কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে, অথচ কৃষিনীতি, বাজারনীতি, মূল্যনীতি কিংবা ভূমিনীতি নির্ধারণের টেবিলে কৃষকের কোনো কার্যকর উপস্থিতি তৈরি হয়নি। উৎপাদন করে কৃষক, কিন্তু লাভ পায় অন্যেরা। কৃষক ঝুঁকি নেয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় অন্যেরা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে কৃষকের মুক্তি সম্ভব নয়; আর কৃষকের মুক্তি ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তিও অসম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটি মহান শ্রমশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে— কৃষকের মাঠের শ্রম, কৃষকের সন্তানের প্রবাসের শ্রম এবং কৃষককন্যার গার্মেন্টসশিল্পের শ্রম। এই তিনটি শক্তিই বৈদেশিক মুদ্রা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। অথচ এই শ্রমশক্তির মূল উৎস, গ্রামীণ কৃষক সমাজ, আজও রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় সবচেয়ে অবহেলিত।’
সমাবেশে জাতীয় কৃষক শক্তির ১৪ দফা অধিকার সনদ পাঠ করেন সদস্যসচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম। দফাগুলো হলো—
১. কৃষকের রাজনৈতিক স্বীকৃতি : কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী ও জাতীয় শক্তি হিসেবে সাংবিধানিক ও নীতিগত স্বীকৃতি দিতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
২. ন্যায্যমূল্যের অধিকার : প্রতিটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়, শ্রম ও ন্যায্য মুনাফা বিবেচনায় মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকে কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ন্যায্য মূল্যে সরাসরি ক্রয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কৃষক তার উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য লাভ নিশ্চিত করতে পারেন।
৩. কৃষি বীমার অধিকার : জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক ফলন সূচকের ভিত্তিতে সর্বজনীন কৃষি বীমা চালু করতে হবে।
৪. কৃষি অঞ্চলের পুনর্বিন্যাস : বাংলাদেশকে হাওর, উপকূল, চর, পাহাড়, বরেন্দ্র, প্লাবনভূমি ও অন্যান্য জলবায়ুভিত্তিক কৃষি অঞ্চলে ভাগ করে অঞ্চলভিত্তিক কৃষিনীতি, গবেষণা, ভর্তুকি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৫. খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা : দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়া বীজনির্ভরতা কমিয়ে কৃষকের বীজের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৬. কৃষি উপকরণের নিশ্চয়তা : মানসম্মত বীজ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ, ডিজেল ও কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য এবং সহনীয় মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা : প্রতিটি কৃষি অঞ্চলে আধুনিক হিমাগার, গুদাম, সংগ্রহকেন্দ্র, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষক সরাসরি বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
৮. প্রযুক্তি ও তথ্যের অধিকার : প্রতিটি কৃষকের হাতে আবহাওয়া, বাজারদর, রোগবালাই, সরকারি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ পৌঁছে দিতে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে।
৯. কৃষিশ্রমিকের মর্যাদা : কৃষিশ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ : তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষিবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মকে কৃষিতে আকৃষ্ট করতে বিশেষ ঋণ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বিনিয়োগ সহায়তা দিতে হবে।
১১. নারী কৃষকের অধিকার : নারী কৃষকের শ্রমের স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার, ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও বাজারে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
১২. কৃষকের সামাজিক নিরাপত্তা : বয়স্ক কৃষকের পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা, দুর্ঘটনা সহায়তা এবং কৃষক পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে হবে।
১৩. কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি : কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন এবং রপ্তানিমুখী কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি করতে হবে।
১৪. কৃষক নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রনীতি : কৃষি, খাদ্য, ভূমি, পানি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পর্কিত সব নীতি প্রণয়নে কৃষক সংগঠন, কৃষিবিদ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষককে নীতির বিষয় নয়, নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য।