বাস্তবে উত্তেজনাকর বা অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা বলি সিনেমার মতো। কিন্তু বাস্তব যে কখনো কখনো সিনেমাকেও হার মানাতে পারে করণ কক্কড়ের হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ।
ব্যবসায়ী করণ কক্কড় দিল্লী থেকে মায়ানগরী মুম্বাই এসেছিলেন প্রযোজক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ঘাতকরা শেষ সময়ে তার সামনে দুটি বিকল্প রাখে—জ্যান্ত অবস্থায় ব্লেড দিয়ে তার গলা কেটে ফেলবে, নাকি করণ নিজে ঘুমের বড়ি খাবেন। করণ দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছিলেন। ঘুমের বড়িতেই শেষ হয় তার স্বপ্ন।
ঘটনাটি ২০১২ সালের। ১৪ বছর পরও পরিবার বিচারের আশায় দিন গুনছে। দিল্লিতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবসা করতেন ২৮ বছর বয়সী করণ। কিন্তু তার চোখজুড়ে ছিল বলিউডের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২০১২ সালে মুম্বাইয়ে পা রাখেন করণ কক্কড়।
মুম্বাই এসেই চেষ্টা করেন সিনেমা সার্কেলে চলাফেরা করতে। নতুন সার্কেলের লাইফস্টাইলের সঙ্গে তাল মেলাতে আন্ধেরির ওবেরয় স্প্রিংসে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। আর জাতে ওঠার জন্য কিনে নেন সেকেন্ড হ্যান্ড একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি।
পরিবার তার এই স্বপ্নপূরণে তার পাশেই ছিল। বাড়ি ভাড়া ও গাড়ি কেনার জন্য তারা সহায়তাও করেছে। নিজেকে দেখাতে গিয়ে বলিউডের কারো কারো সঙ্গে যোগাযোগ যেমন হয়েছে, তেমনি নজরে পড়েছেন সন্ত্রাসীদেরও।
সিনেমার মতো এ গল্পেও একজন নারী আছেন। তিনি মুম্বাইয়ের তখনকার উঠতি মডেল সিমরান সুদ। নামে মডেল হলেও সিমরান আসলে ছিল সন্ত্রাসী বিজয় পালান্দে গ্রুপের সদস্য। তার দায়িত্ব ছিল পয়সাওয়ালা মক্কেল ধরে আনা। করণের ট্যাকে ভালোই টাকাপয়সা আছে এবং তিনি সিনেমায় বিনিয়োগ করতে চান, এটা জানতে পেরে সিমরান তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতান এবং আস্থা অর্জন করেন। লোভ দেখান বলিউডের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার।
২০১২ সালের ৫ মার্চ সিনেমার প্রজেক্ট মিটিংরে কথা বলে সিমরান তাকে ডেকে নেন মুম্বাইয়ের একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে। সেটি আসলে কোনো মিটিং ছিল না, ছিল একটি মৃত্যুফাঁদ। সেই ফ্ল্যাটে অপেক্ষা করছিল করণের মৃত্যুদূত কুখ্যাত গ্যাংস্টার বিজয় পালান্দে এবং তার সহযোগীরা।
ফ্ল্যাটে ঢোকামাত্রই করণকে আটকে ফেলা হয়। মারধোর করে কেড়ে নেওয়া হয় তার বিভিন্ন ব্যাংকর ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড। সন্ত্রাসীরা তার একাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেয়, আর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেদারসে শপিং করে। টাকা শেষ হতেই তারা করণকে খুনের পরিকল্পনা করে। পরে পুলিশের কাছে বিজয় পালান্দে নিজেই স্বীকার করে সেই রোমহর্ষক মুহূর্তের কথা।
করণকে বেছে নিতে বলা হয়, মৃত্যুর দুটি পথ। যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর আশায় করণ ১৪টি ঘুমের বড়ি খান। ওষুধ কাজ শুরু করতেই বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর গলা কেটে ফেলা হয়। এরপর প্রমাণ লোপাটের জন্য করণের দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে তাঁরই সাধের বিএমডব্লিউ গাড়িতে তোলা হয়।
মুম্বাইয়ের জাতে উঠতে কেনা বিএমডব্লিউ গাড়িতে করেই করণের মরদেহের টুকরোগুলো মুম্বাই থেকে ২৭৬ কিলোমিটার দূরে কুম্ভার্লি ঘাটের গভীর জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর পালান্দে পুনের পরিচিত এক ব্যবসায়ীর গ্যারেজে করণের বিএমডব্লিউ গাড়িটি রেখে দেয়। পালান্দে সেই ব্যবসায়ীকে বলেন, তিনি বিদেশে যাবেন, তাই গাড়িটি যেন কিছুদিন তার কাছে রাখা হয়। পরে ঘটনা জানতে পেরে সেই ব্যবসায়ীই পুলিশের কাছে গাড়িটি হস্তান্তর করে।
হঠাৎ করে করণের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি তার ভাই হানিশ কক্বড়। মুম্বাই এসে ভাইয়ের খোঁজখবর শুরু করেন। একটি শপিং মলের সিসিটিভি ফুটেজে তিনি দেখতে পান দুই ব্যক্তি করণের এটিএম কার্ড ব্যবহার করছে। হানিশ পুলিশকে সেই তথ্য জানালেও পুলিশ তার কথা আমলে নেয়নি।
২০ দিন মুম্বাই থেকেও কোনো কুলকিনারা করতে না পেরে হানিশ দিল্লি ফিরে যান। পরের মাসে আরেক ব্যবসায়ী অরুণ টিক্কু হত্যাকাণ্ডে বিজয় পালান্দেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন টিভিতে তার মুখ দেখে চমকে ওঠেন হানিশ। তিনি বুঝতে পারেন তার ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার পেছনেও এই গ্যাংস্টার রয়েছে। তিনি দ্রুত মুম্বাই এসে ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে তার সন্দেহের কথা জানান। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পালান্দে করণ হত্যার কথা স্বীকার করে এবং ঘটনার বীভৎস বর্ণনা দেয়।
তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল পুলিশ কুম্ভার্লি ঘাট থেকে করণের কঙ্কালের টুকরো উদ্ধার করে এবং ডিএনএ টেস্টে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়। সেখান থেকে পুলিশ করণের একটি রূপার ব্রেসলেট ও স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব এবং রক্তমাখা একটি ছুরিও উদ্ধার করেন। অপরাধের পুরো ঘটনাটি পুনর্নিমাণ করতে সাহায্য করবে ভেবে তদন্তকারীরা তার ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে করা লেনদেনগুলোও খতিয়ে দেখেছে।
সিনেমার মতো এখানে অপরাধীদের সহায়তাকারী হিসেবে উঠে আসে পুলিশের দুই সদস্যের নামও। কনস্টেবল অমল দেশপান্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ওবেরয় স্প্রিংসে ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে এবং পরিচয় গোপন করতে পালান্দে এবং সিমরানকে সহায়তা করেছেন। আর পালান্দের আত্মীয় ইন্সপেক্টর সঞ্জয় শিন্ডে করণের পরিবারের সন্দেহের পরও পালান্দেকে হয়রানি না করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করেছিলেন। সঞ্জয় শিন্ডের গাড়িও বিভিন্ন সময়ে পালান্দে ব্যবহার করতেন।
ঘটনার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচার পাননি করণের পরিবার। এমনকি দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তারা করণের ডেথ সাটিফিকেট জোগাড় করতে পারেননি। ফলে করণের একাউন্টে থাকা বাকি অর্থও তুলতে পারেননি। বিচারের আশায় হানিশ কক্কড় তার মাকে নিয়ে প্রায়ই দিল্লি থেকে মুম্বাই আসেন। প্রতিটি সফরই তাদের পুরনো বেদনাকে তাজা করে। কিন্তু বিচার বা ডেথ সাটিফিকেট কিছুই মেলেনি এখনো।
করণ কক্কড় ও অরুণ টিক্কু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিজয় পালান্দে এখনো কারাগারেই আছেন। এই মামলায় তার সহযোগী ধনঞ্জয় শিন্ডে ও মনোজ গজকোশও জেল খাটছেন। তবে তিনবছর কারাগারে থাকার পর জ্মিনে ছাড়া পেয়েছেন সিমরান সুদ। করণের এই হত্যাকাণ্ড এখনো মুম্বাইয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।



.jpg)
 (1).jpg)

