বাংলা সাহিত্যের পাতায় হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখকের নাম নয়। তিনি একসময় হয়ে উঠেছিলেন পাঠকের অভ্যাস, টেলিভিশনের সন্ধ্যার আড্ডা আর একটি প্রজন্মের কল্পনার অংশ। কারো কাছে তিনি হলুদ পাঞ্জাবির হিমু, কারো কাছে যুক্তিবাদী মিসির আলি। আবার কারও কাছে তিনি ‘এইসব দিনরাত্রি’র পরিচিত মানুষগুলোর গল্প।
আজ রবিবার ১৯ জুলাই, নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে মারা যান তিনি। তবে মৃত্যুর ১৪ বছর পরও তার লেখা, চরিত্র ও নির্মাণ নিয়ে মানুষের আগ্রহে এতটুকু ভাটা পড়েনি।
সাহিত্যজগতে যে আগমন বদলে দিয়েছিল পাঠকের অভ্যাস
১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজের জায়গা তৈরি করেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
উপন্যাস, ছোটগল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, ভৌতিক গল্প, শিশুসাহিত্য, নাটক, আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই লিখেছেন তিনি। বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, তার রচনার সংখ্যা ৩০০-এর বেশি।
হুমায়ূন আহমেদের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভাষা। কঠিন বিষয়ও তিনি লিখেছেন খুব সহজভাবে। তার গল্পে ছিল আমাদের ঘরের মানুষ, চেনা সম্পর্ক, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, ভালোবাসা, অভিমান আর একাকীত্ব।
তাই তার বই পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার নিজের জীবনের সঙ্গে গল্পের মিল খুঁজে পেয়েছেন।
হিমু, মিসির আলি—চরিত্র নয়, যেন পাঠকের পরিচিত মানুষ
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক কীর্তিগুলোর একটি তার সৃষ্ট চরিত্র।
হিমু—হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাঁটা এক অদ্ভুত মানুষ। প্রচলিত জীবনের নিয়মকে সে নিজের মতো করে দেখে। হিমু হয়ে উঠেছিল তরুণদের কল্পনার এক আলাদা প্রতীক।
অন্যদিকে মিসির আলি ছিলেন যুক্তিবাদী। অদ্ভুত ও রহস্যময় ঘটনাকেও যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন তিনি। মিসির আলির চরিত্রে মনস্তত্ত্ব, রহস্য ও যুক্তির এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।
আর শুভ্র—সরলতা ও নিষ্পাপতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
এই চরিত্রগুলো বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। কয়েক প্রজন্মের পাঠকের মনে তারা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
টেলিভিশনের পর্দায় এক নতুন জগৎ
শুধু বই নয়, টেলিভিশন নাটকেও হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা ভাষা।
‘এইসব দিনরাত্রি’ দিয়ে টেলিভিশন নাটকে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। পরে একের পর এক নাটক ও ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে যান।
তার নাটকে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হতো না। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার, কয়েকজন সাধারণ মানুষ আর তাদের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা দিয়েই তিনি তৈরি করতেন গভীর গল্প।
তার নাটকের চরিত্রগুলো ছিল খুব পরিচিত। তাই পর্দার মানুষগুলোকে দর্শকের মনে হতো পাশের বাড়ির কেউ।
একসময় হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য পরিবারের সবাই একসঙ্গে টেলিভিশনের সামনে বসতেন। সেই সময়ের দর্শকদের স্মৃতিতে তার নাটক এখনো নস্টালজিয়ার বড় অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের গল্পে হুমায়ূনের অন্য পরিচয়
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
‘শ্যামল ছায়া’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘১৯৭১’ ও ‘জোছনা ও জননীর গল্প’—মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের গল্পে শুধু যুদ্ধ বা অস্ত্রের কথা ছিল না। ছিল সাধারণ মানুষের ভয়, অপেক্ষা, ভালোবাসা, স্বজন হারানোর কষ্ট আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’তে অবরুদ্ধ ঢাকার মানুষের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের আবহ ফুটিয়ে তোলেন তিনি। এটি ছিল তার চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম কাজ এবং সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আটটি বিভাগে পুরস্কার পায়।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেক আলোচিত চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’। সিনেমাটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছিল।
চলচ্চিত্রেও নিজের আলাদা ভাষা
সাহিত্য ও নাটকের পর চলচ্চিত্রেও নিজের স্বাক্ষর রাখেন হুমায়ূন আহমেদ।
‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’—তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মোট আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার চলচ্চিত্রের জন্য বিভিন্ন বিভাগে ছয়টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন।
হুমায়ূন আহমেদের সিনেমার বিশেষত্ব ছিল—সাধারণ মানুষের গল্পকে বড় করে দেখা। সম্পর্ক, ভালোবাসা, পরিবার ও মানুষের ভেতরের অনুভূতিই তার সিনেমার মূল শক্তি।
লেখক হয়েও ছিলেন রসায়নের শিক্ষক
হুমায়ূন আহমেদের জীবন শুধু সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি রসায়নে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং রসায়নে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হন। পরে লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
আজও কেন এতটা প্রিয় হুমায়ূন?
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার কারণ খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় তার গল্পের কাছে।
তিনি মানুষের খুব কাছের গল্প লিখেছেন। এমন গল্প, যেখানে বড় কোনো নায়ক নেই। আছে সাধারণ মানুষ। আছে ছোট ছোট সুখ-দুঃখ।
এক প্রজন্ম তার বই পড়ে বড় হয়েছে। কেউ হিমুকে চিনেছে বইয়ের পাতায়। কেউ মিসির আলির রহস্যে ডুবেছে। কেউ তার নাটক দেখে বড় হয়েছে। আবার বর্তমান প্রজন্মও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পুরোনো নাটক ও বইয়ের মাধ্যমে নতুন করে আবিষ্কার করছে তাকে।
আজ ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে ভক্তদের ভিড়। প্রিয় লেখকের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন পাঠকরা। কেউ এসেছেন হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি পরে। কেউ স্মরণ করছেন প্রিয় কোনো বই বা চরিত্রের কথা।
হুমায়ূন আহমেদ শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তার সৃষ্টি এখনো পাঠকের সঙ্গে কথা বলে।
হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি, মিসির আলির যুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, নাটকের পরিচিত মানুষ আর সিনেমার আবেগ—সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক নন। তিনি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের স্মৃতির এক দীর্ঘ অধ্যায়।









