ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সম্পর্কের ফাটল দেখা দেয়। এরপর থেকেই দুই দল দুই মেরুতে অবস্থান নেয়। নির্বাচনে তাদের নেতৃত্বে হয় আলাদা জোটও। ধীরে ধীরে দুই জোটেই প্রকাশ পাচ্ছে নানা সংকট। দুই জোটেই প্রধান শরিকের বিরুদ্ধে অন্য দলগুলোর নানা ধরনের অভিযোগ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে উভয় জোটে জটিলতা আরো বেড়েছে
সমকাল এক প্রতিবেদনে জানায়, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে আসতে কওমি ধারার দলগুলোর ওপর রয়েছে হেফাজতে ইসলামের চাপ। হেফাজতের এ অবস্থানকে জোট ভাঙতে বিএনপির ‘চাল’ হিসেবে দেখছে জামায়াত। যদিও আসছে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে একলা চলো নীতিতে জামায়াতের ওপর বেজার শরিক নেতারা।
তাদের ভাষ্য, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে শরিকদের সামনে রাখা হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা করছে না জামায়াত। ত্রয়োদশ সংসদে আসন না পাওয়া খেলাফত আন্দোলন এরই মধ্যে জোট ছেড়েছে। শনিবার বরিশালে জোটের বিভাগীয় সমাবেশে যায়নি খেলাফত মজলিস।
আরো পড়ুন
সাতক্ষীরায় বসুন্ধরা শুভসংঘের আয়োজনে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা
মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও ১১ দলের অতিসক্রিয়তায় নাখোশ। জামায়াতের সঙ্গে জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এনসিপির বাদানুবাদ রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ক্যাম্পাসগুলোতে এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির বিরোধ রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে। সংসদে ভূমিকা, সরকারের সমালোচনায় কঠোর না হওয়া এবং স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের নীতিতে ক্ষুব্ধ দলটি। একই দৃষ্টিভঙ্গি এবি পার্টিরও।
তবে বাকি পাঁচ শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং লেবার পার্টির আপত্তি নেই জামায়াতের অবস্থান নিয়ে। এ দলগুলোর সংসদে প্রতিনিধিত্বও নেই।
১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে এনসিপিকে ৩০, বাংলাদেশ খেলাফতকে ২৪, খেলাফত মজলিসকে ১৪, এলডিপিকে ৭, এবি পার্টি ও নেজামে ইসলামকে ৩টি করে এবং বিডিপিকে দুটি আসন ছেড়েছিল জামায়াত। আসন পায়নি খেলাফত আন্দোলন, লেবার পার্টি ও জাপগা।
তবে কিছু আসনে জোটের একাধিক দলের প্রার্থী ছিল। আবার ছেড়ে দেওয়া কিছু আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা থেকে যান। যেমন এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী থেকে যান। নেজামে ইসলাম, এলডিপি ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটে। জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬, বাংলাদেশ খেলাফত ২ এবং খেলাফত ১টি আসনে জয়ী হয়।
খেলাফত আন্দোলনকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সংসদের উচ্চকক্ষে আসন দেওয়া হবে। উচ্চকক্ষ হবে কিনা– এ নিশ্চয়তা না থাকায় দলটি জোট ছেড়ে চলে গেছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে। খেলাফত মজলিসও ১১ দলের কর্মসূচিতে থাকছে না। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের বলেন, সংসদে একসঙ্গে থাকলেও আপাতত জোটের কর্মসূচিতে থাকছি না।
কেন থাকছেন না প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনও বলার সময় আসেনি। সময় হলে সব খোলাসা করা হবে। খেলাফত মজলিস গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষেই আছে। তবে জোটের কর্মসূচিতে থাকছে না।
আরো পড়ুন
নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধী, গ্রেপ্তার করতে চান মামদানি
জোট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত ও এনসিপি বাদে অন্য দলগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জোটের কর্মসূচিতে এই দুই দলের নেতাদের সভাপতি, প্রধান অতিথি হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু খেলাফত মজলিসসহ বাকি দলগুলোকে একই রকম গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শীর্ষ নেতা ছাড়া অন্য কাউকে সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয় না।
১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের অবশ্য দাবি জোটে ক্ষোভ নেই। তিনি বলেন, সামান্য মান-অভিমান আছে। এগুলো সব জোটেই থাকে। যা কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে, তা একসঙ্গে বসলে ঠিক হয়ে যাবে।
এখনও জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের দুই অংশ এবং নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা একাধারে হেফাজতেরও নেতা। হেফাজত এবং দলগুলোর নেতারা বলেছেন, জমিয়ত বিএনপির সঙ্গে থাকায় এবং কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে থাকায় আলেম-ওলামাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বাহাস হচ্ছে।
দেওবন্দের অনুসারী কওমি মাদরাসাভিত্তিক হেফাজতের জামায়াতের অনুসরণ করা মওদুদীবাদের ঘোরবিরোধী। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজত-সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান। ওই বৈঠকে বলা হয়, জামায়াতের আকিদা ঢুকে যাচ্ছে মাদরাসায়। এরপর নিয়ন্ত্রণও চলে যাবে। তাই আকিদা ও কওমি মাদরাসা রক্ষায় দেওবন্দের অনুসারী দলগুলোকে জামায়াত ছাড়তে হবে।
খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম নেতারা এই বৈঠকে হেফাজত আমিরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কওমি ধারার দলগুলোর ঐক্যে তারাও থাকবে। দেওবন্দের উসুলের বাইরে তারা যাবেন না।
আরো পড়ুন
কাকরাইলে সড়কে গেল বৃদ্ধের প্রাণ
হেফাজতের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব এবং কওমি মাদরাসার মুরব্বি হিসেবে পরিচিত আলেমরা দশকের পর দশক মওদুদীবাদের সমালোচনা করেছেন। সেই ঘরানার দলগুলোর জামায়াতের জোটে থাকা তাদের আদর্শিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির ও মহাসচিব জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হেফাজত আমির জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া দেন। যদিও সংগঠনটির নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেছেন, হেফাজত তার অরাজনৈতিক চরিত্র থেকে কওমি ধারার দলগুলোকে একসঙ্গে থাকার নসিহত দিয়েছে।
দেশের সব সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে দল সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করেছে জামায়াত। প্রার্থীরা মাঠে কাজ শুরু করেছেন আগে থেকেই। আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদের তপশিল ঘোষণা হতে পারে। অক্টোবর থেকে নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছর ধরে ধাপে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে ভোট হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।
সব জায়গায় জামায়াত এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করায় নাখোশ শরিকরা। তারা স্থানীয় নির্বাচনেও জোট চান। বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য জুলাই সনদের পক্ষে সক্রিয় রয়েছে।
এনসিপি ছয়টি সিটি করপোরেশনের জন্য সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। ১০০ উপজেলা এবং পৌরসভাতে সম্ভাব্য প্রার্থীর নামও তালিকা করে রেখেছে। এ দলটি এককভাবে নির্বাচনের কথা বলছে, তবে তারাও চায় স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকুক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন করবেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সাবেক উপদেষ্টাকে সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী করা হয়নি।
জামায়াত দক্ষিণ সিটিতে গণঅভ্যুত্থানের আরেক ছাত্রনেতা আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা না দিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম সম্প্রতি ছাত্রজীবনের ইতি টেনে শিবির থেকে বিদায় নিয়েছেন। ভিপি পদের মেয়াদ শেষে যোগ দেবেন জামায়াতে। তাই দক্ষিণ সিটি অন্য কাউকে দিতে রাজি নয় জামায়াত।
দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘জামায়াত যখন বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল তখনও স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করেছে। জাতীয় নির্বাচনে জোট কাজ করলেও স্থানীয় নির্বাচনে তা হয় না।’