গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুমিল্লার গোমতী নদীর চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ফসল হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন ফসলি জমিতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী সদর উপজেলা, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবিদ্বার উপজেলার গোমতী চরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, গোমতী নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন আবাদ করা করলা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙ্গাসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজির আবাদ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও চরের নিচু অংশের ফসল তলিয়ে গেছে। পানি আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় চরের উঁচু অংশের অপরিপক্ব ফসল তুলে নিচ্ছেন কৃষকরা।
কুমিল্লার সদর উপজেলার আমতলী এলাকার কৃষক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে দু:চিন্তায় পড়েছিলাম। চরে কয়েক লাখ টাকার ফসল রেখে রাতে ঘুমাতে পারেনি। একটু পর পর চরের এসে দেখি পানির বৃদ্ধির অবস্থা দেখতে আসি। এই কয়েকদিন এভাবেই সময় পার করছি। আমার ৪০ শতাংশ জমিতে করলা ও মিষ্টি কুমড়া আছে। পাইকারদের খবর দিয়েছি, তারা এসে ফসল তুলে নিয়ে যাবে। আর দুইদিন এমন টানা বৃষ্টি হলে এ ফসল আর তোলা যাবে না। কিছু করলা এখনো অপরিপক্ক, আর কিছু করলা পরিপক্ক হয়েছে, এখন কি করব বন্যা হলে তো যা আছে সবই নষ্ট হবে। একই এলাকার আরেকটি ফসলি জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ১৬ জন শ্রমিক মুলা তুলে আঁটি বেঁধে ট্রাকে তুলছেন। শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান করছিলেন নিমসার বাজারের আক্তার হোসেন নামে একজন পাইকারি ব্যবসায়ী। তিনি চরের কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফসল কিনে নিমসার বাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে ফসলের মুলা নষ্ট হয়ে গেছে। দুই লক্ষ টাকার মুলা কিনে ছিলাম এখন লোকসানে পড়তে হবে। বাজারে মুলায় একটু দাগ থাকলে ক্রেতা নিতে চায় না। এখন আবার বন্যা হওয়ার আশঙ্কা, তাই তারাতারি মুলা তুলে নিচ্ছি। বৃষ্টিতে যতটুকু ক্ষতি হইছে বন্যার পানিতে ফসল ডুবলে তো আর ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
চরে মুলার তুলে আঁটি বাঁধছেন দিনাজপুরের শ্রমিক শফিকুর রহমান। তিনি বলেন ‘আমরা ১৬ জন শ্রমিক প্রতিদিন ১২০০ টাকা মজুরিতে চরে কাজ করি। এই কদিন টানা বৃষ্টির কারণে কাজে আসতে পারি নাই। এখন গোমতী নদীর পানি বাড়ছে। বন্যা হলে এখানকার কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এলাকার কৃষকরা ফসল তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাছে আসছেন। অনেক জমির ফসল এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি, তবুও বন্যার আশঙ্কায় মালিকরা আগেভাগেই ফসল তুলে নিচ্ছেন।’
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজানের বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিন গোমতী নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে নদীর গোমতী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ দশমিক ৫৯ মিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর সর্বোচ্চ বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৩ মিটার। ফলে চরাঞ্চলের বাসিন্দা ও কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, ‘গোমতীর পানি এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এখনো ভয়ের কিছু নেই।’
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে গোমতীর চরের প্রায় ৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর ফসলী জমি ডুবে গেছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো পরিদর্শন করেছি। গতকাল বিকাল ৩টায় পানির লেভেল ছিল ৮ দশমিক ৯৪ মিটার। আজকে বিকাল ৩টায় ৮ দশমিক ৪২ মিটার প্রায় অর্থাৎ প্রায় দেড় হাত পানি কমেছে। করলা, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা শাক, দুন্দুল, চিচিঙ্গা এ জাতীয় কিছু ফসল ডুবে গেছে। তারা ডুবাইয়া কিছু ফসল তুলে নিচ্ছে। আর দুই দিনের মধ্যে যদি পানি নেমে যায় তাহলে যে ফসলগুলো ডুবে গেছে তা বেচে যাবে।’
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আকতার বলেন, ‘গত কয়েকদিনের চেয়ে আজকে গোমতীর পানি একটু কমছে। বন্যার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবুও আমাদের ব্যাপক পূর্ব প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি প্রস্তুত আছে। এছাড়াও কৃষকরা যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে তাদেরকে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা করা হবে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারী বর্ষণে বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকায় গোমতীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যায় কবলিত হয় কুমিল্লার ৫টি উপজেলা। এতে শতশত গ্রাম প্লাবিত হয়। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ রাস্তাঘাট, কৃষি ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সে বন্যায় অন্তত ১৪ জন মারা গেছে। সেই ক্ষতের কথা এখনো ভুলেনি নদীর তীরবর্তী গ্রামের মানুষেরা।’




