তেঁতুলিয়ার তীরে জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন হামিদ খাঁ। নদীর তীব্র ভাঙনে হারিয়ে যেতে দেখেছেন বহু ঘরবাড়ি। এবার বর্ষার শুরতেই নিজ বসতঘরের দিকে ধেয়ে আসছে প্রমত্তা তেঁতুলিয়া। আর মাত্র কয়েক হাত ভাঙলেই নদীতে হারিয়ে যাবে তার বসতঘর।
ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চন্দ্রপ্রসাদ গ্রামের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ হামিদ খাঁর চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। শেষ সম্বলটুকু হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে তার।
শুধু আব্দুল হামিদ খাঁ নন। সদর উপজেলার ভেলুমিয়া এবং ভেদুরিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়াপারের হাজারো পরিবারের দিন কাটছে ভাঙন আতঙ্কে। অবৈধভাবে বালু তোলার ফলে নদীর তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি আর বসতভিটা। হুমকিতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও সরকারি স্থাপনা।
হামিদ খাঁ জানান, তার বসতভিটা আরো প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল। ভাঙনের কারণে বেশ কয়েকবার বসতঘর সরাতে হয়েছে। তিনি জানান, দুই দশক আগে ভাঙনের তেমন তীব্রতা না থাকলেও গত এক দশক ধরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যাওয়ায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে নদী তার বসতঘরের চার-পাঁচ গজের মধ্যে চলে এসেছে।
একই এলাকার ষাটোর্ধ বাসিন্দা আইয়ুব খান জানান, আগে তেঁতুলিয়া নদীর গভীরতা অনেক কম ছিল, তখন ভাঙন ছিল না। কিন্তু গত দুই দশক ধরে অবৈধভাবে বালু তোলার ফলে নদীর গভীরতা বেড়ে গেছে। ফলে দখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ইতোমধ্যে ওই এলাকার তিন শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে।
আইয়ুক খান জানান, নদী তারও ঘরের কাছে চলে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই জোয়ারের পানিতে তাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। তাই দ্রুত বালু তোলা বন্ধ ও ভাঙনরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ইতোমধ্যে কয়েক কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বসতবাড়ি, কৃষিজমি হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়েছে। এখনও হাজারো পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে। হুমকির মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, ১০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অর্ধ শতাধিক মসজিদ মাদরাসা ও সরকারি স্থাপনা। এগুলো রক্ষায় দ্রুত বালু তোলা বন্ধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।
সম্প্রতি ভেদুরিয়া ও ভেলুমিয়া ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার বহু বসতবাড়ি ভাঙনের মুখে। এর মধেই নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও দিন-রাত বালু তুলছে একটি চক্র।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধভাবে বালু তোলা জনজীবনের জন্য হুমকি। সম্প্রতি চরপাতাবুনিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার ও তিনটি বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছে। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনকারীরা ড্রেজার ও বাল্কহেড রেখে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের আটক করা যায়নি। অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
ভোলা পানি উন্নয় বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দিন আরিফ বলেন, ভোলা সদর ও বোরহানউদ্দিন উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতীরের ১৫কিলোমিটার এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভাঙনকবলিত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সমীক্ষা চলছে। সমীক্ষাটি শেষ হলে ওই এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প গ্রহন করা হবে। এর ফলে ভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে।
অবৈধভাবে বালু তোলার বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, যদি কেউ অবৈধভাবে বালু তোলে, তাহলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনকে জানালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





