সরকারি সব নিয়ম-কানুন মেনে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি ৭০ জন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীর। রিক্রুটিং এজেন্সি ও কফিলের (মালিক) প্রতারণায় কাজ না পেয়ে অবৈধ হয়ে পড়ার পর সে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটে অবশেষে নিঃস্ব অবস্থায় আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারা।
রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল ৮টা ১০ মিনিটে সালাম এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইটে (ওভি ৪০১) প্রবাসীরা চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।
ফেরত আসা প্রবাসীরা জানান, তারা সবাই দালাল ও নিবন্ধিত এজেন্সির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ করে ৩ মাসের ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যান। দালাল ও এজেন্সির প্রতিশ্রুতি ছিল সৌদিতে পৌঁছানোর পর তিন মাসের মধ্যে কফিল বা কাজের নিয়োগকর্তা তাদের আকামা নবায়ন করে দেবেন। তবে সৌদিতে পা রাখার পর কোনো মালিকের দেখা মেলেনি, কিংবা চুক্তি অনুযায়ী কাজও পাননি তারা। ফলে তিন মাসের মেয়াদ শেষ হতেই সে দেশের আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হিসেবে গণ্য হন এই প্রবাসীরা।
ময়মনসিংহের আসাদ জানান, দেড় বছর আগে স্থানীয় দালালের কথায় বিশ্বাস করে খাবার হোটেলের কাজে তিনি সৌদি গিয়েছিলেন। কথা ছিল মালিক বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাবেন, কিন্তু বিমানবন্দর থেকে কেউ তাকে নিতে আসেনি। প্রথম দিন থেকেই তিনি সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েন। লুকিয়ে কিছুদিন ভবন নির্মাণের কাজ করলেও মজুরি পাননি ঠিকমতো। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আজ শূন্য হাতে দেশে ফিরে দিশাহারা তিনি।
একইভাবে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে তিন মাসের কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মো. রাকিব। বিএমইটির কার্ড ও বহির্গমন ছাড়পত্র থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কাজ পাননি তিনি। তিন মাস কর্মহীন থাকার পর আকামা নবায়ন করতে না পেরে ২০ দিন কারাবন্দি থাকতে হয় তাকে। দালাল ও এজেন্সির প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের খেসারত দিয়ে আজ সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।
নরসিংদীর রাজিব মিয়ার গল্পটাও একই রকম। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের কথা বলে তাকে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে মালিক বা কাজ কোনোটারই দেখা পাননি। দেশ থেকে টাকা আনিয়ে কয়েক মাস চলার পর ১৫ দিন জেল খেটে অবশেষে ৫ মাসের মাথায় খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাকে। ভুক্তভোগীরা জানান, সৌদি কারাগারগুলোতে এমন হাজার হাজার নথিহীন বাঙালি কর্মী মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) মো. মনিরুজ্জামান প্রবাসীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বিমানবন্দর হয়ে অবৈধ অভিবাসন বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সর্বদাই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে নিয়মনীতি মেনে গিয়েও প্রতারিত হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তিনি প্রবাস গমনেচ্ছুদের যেকোনো এজেন্সির প্রতিশ্রুতি বা দালালের কথা বিশ্বাস করার আগে সরকারের স্বীকৃত উৎস ও শর্তাবলি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেন।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের আওতায় নিঃস্ব হয়ে ফেরা এই কর্মীদের তাৎক্ষণিক জরুরি খাবার এবং নিজ নিজ এলাকায় নিরাপদে পৌঁছানোর উদ্দেশে নগদ যাতায়াত খরচ হস্তান্তর করা হয়।
বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে কাজের উদ্দেশ্যে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই গেছেন ৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ জন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও অবৈধ অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির কারণে বিশাল এই শ্রমবাজার এখন হুমকির মুখে পড়ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৫ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত অভিবাসীকে জরুরি সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, যার মধ্যে কেবল চট্টগ্রামেই এই সহায়তা পেয়েছেন ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী কর্মী।








