চট্টগ্রাম মহানগরীর ক্রমবর্ধমান জনচাপ, আবাসন সংকট, যানজট এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের চাপ কমাতে শহরের বাইরে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট নগর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ পরিকল্পনায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা পটিয়াসহ আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী ও হাটহাজারীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গত (৯ জুলাই) অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সভায় এ বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সিডিএর বোর্ড সদস্য নজরুল ইসলাম।
আরো পড়ুন
মাদকে বিপন্ন ৪৯ ধনীর মেয়ে
এদিকে, এই উদ্যোগকে ঘিরে এরই মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নচাপ ভাগ করে নিতে হলে শুধু নগরসীমার ভেতরে প্রকল্প নিলেই হবে না আশপাশের সম্ভাবনাময় উপজেলাগুলোকে পরিকল্পিত আবাসন, শিল্প, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোসহ আধুনিক উপশহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেই বাস্তবতায় পটিয়ার নাম উঠে আসা নিঃসন্দেহে বড় তাৎপর্যপূর্ণ।
সিডিএ বোর্ড সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম শহরের ওপর ক্রমাগত বাড়তে থাকা চাপ কমাতে স্যাটেলাইট শহর গঠনের বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। ওয়ান সিটি টু টাউন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ পাঁচটি উপজেলাকে সিডিএ’র আওতায় আনা হবে। বৃহস্পতিবারের বোর্ড সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে এবং চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পটিয়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী ও হাটহাজারীকে পরিকল্পনার আওতায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরো পড়ুন
শাড়ি নিয়ে প্রতারণার মামলায় মুখ খুললেন তানজিন তিশা
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম নগরের সম্প্রসারণ এখন আর শুধু নগরকেন্দ্রিক ভাবনায় আটকিয়ে রাখলে চলবে না। নগরের সঙ্গে যোগাযোগ, আবাসন, শিল্প ও নাগরিকসেবাকে সমন্বয় করে আশপাশের উপজেলাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নগরের জনচাপ যেমন কমবে, তেমনি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্রও গড়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০) শীর্ষক ২৫ বছরমেয়াদি এই পরিকল্পনায় এ ৫ উপজেলায় বিশেষায়িত শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এর মাধ্যমে বন্দর নগরীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৈরি করা হয়েছে এই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত রূপরেখা।
আরো পড়ুন
দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও থামছে না যমুনার ভাঙন
অপর দিকে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত পটিয়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাগত ও যোগাযোগগত গুরুত্ব বহন করে আসছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত এই উপজেলা একদিকে নগরের খুব কাছাকাছি, অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত জনপদের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পটিয়া ভৌগোলিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
পটিয়ায় এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, ব্যাংকিং, বাজারব্যবস্থা ও আঞ্চলিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই উপজেলাকে আবাসননির্ভর উপশহর হিসেবে সমন্বিত পরিকল্পিত নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
আরো পড়ুন
ভেঙে গেল অভিনেত্রী ঊর্মিলার ১৫ বছরের সংসার
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম শহর এখন জনসংখ্যা, যানবাহন, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত চাপ বহন করছে। নগরের কেন্দ্রভাগে বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে; অথচ সড়ক, ড্রেনেজ, পার্কিং, আবাসন ও গণপরিবহন অবকাঠামো সেই তুলনায় প্রসারিত হয়নি। ফলে শহরের চাপ কমাতে বিকল্প পরিকল্পিত নগরায়ণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় চট্টগ্রামের চারপাশে স্যাটেলাইট নগর গড়ে তোলা গেলে নগরের আবাসনচাপ কমবে, নতুন শিল্প ও সেবা খাত গড়ে উঠবে, পাশাপাশি নাগরিক সুবিধাও ছড়িয়ে পড়বে শহরের বাইরে। এর ফলে কেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়নের পরিবর্তে বহুকেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
আরো পড়ুন
জাককানইবি নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করছেন শ্রমিকরা, বিভিন্ন সময় নিহত ৩
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, পরিকল্পিতভাবে নতুন উপশহর গড়ে তোলা গেলে মূল নগরের ওপর জনসংখ্যা, আবাসন ও যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আরো পড়ুন
আমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই, কখনো সংস্কারের কথা বলিনি
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পটিয়াকে স্যাটেলাইট নগরের আওতায় আনা হলে কয়েকটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, আধুনিক সড়ক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক জোন, আইটি বা সার্ভিস হাব, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পাঞ্চল, বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো এবং আধুনিক নাগরিক সেবা। একই সঙ্গে পটিয়াকে ঘিরে নতুন আবাসিক এলাকা, বহুতল বাণিজ্যিক স্থাপনা, পরিবহন টার্মিনাল, গুদামজাতকরণ সুবিধা, স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও পরিবেশবান্ধব নগর অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হতে পারে। ফলে এটি শুধু আবাসনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিককেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, পটিয়াকে স্যাটেলাইট নগরের অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, তবে এটি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশা পূরণ হবে না। প্রয়োজন হবে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিবেশগত প্রভাব যাচাই, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, গণপরিবহন নেটওয়ার্ক, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, বর্জ্যব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা অবকাঠামো এবং শিল্প-বাণিজ্যিক জোনিং সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।
আরো পড়ুন
ডেমরা পুলিশ লাইনে গলায় ফাঁস দিয়ে কনস্টেবলের আত্মহনন
অন্যদিকে, পটিয়াবাসীর প্রত্যাশা, সিডিএর এই উদ্যোগ যেন কেবল সভার আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। খুব দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রাথমিক নকশা, জমি ব্যবহারের কাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের ধাপভিত্তিক রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, ভূমি বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
আরো পড়ুন
বীরগঞ্জে ভাড়াবাসা থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার
পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে পটিয়া শুধু চট্টগ্রাম শহরের চাপ কমানোর অংশীদারই হবে তা নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ আধুনিক নগর বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।