মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী সাম্রাজ্য এসেছে, যারা সম্পদ, ক্ষমতা ও অস্ত্রের জোরে পৃথিবী শাসন করেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। ন্যায়বিচারই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি, সমাজের শান্তির মূল চাবিকাঠি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থার প্রধান স্তম্ভ। তাই প্রতি বছর ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস পালিত হয়। ইসলামও চৌদ্দশ বছর আগে ন্যায়বিচারকে এমন উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং ন্যায়ের সাক্ষ্য দেবে। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)
ইসলামে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের বিচারকের দায়িত্ব নয়; বরং পরিবার, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। একজন মুসলিমের কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু কিংবা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ঈমানের দাবি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ন্যায়বিচারের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বংশ-মর্যাদা বা ক্ষমতার কারণে বিচারে পক্ষপাত করেননি। একবার এক সম্ভ্রান্ত বংশের নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে কিছু সাহাবি তার শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৭৫)
এ হাদিস প্রমাণ করে যে, ইসলামে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কোনো ব্যক্তির পরিচয়, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা তাকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ডান পাশে নুরের মিম্বরের ওপর অবস্থান করবেন। তারা হলো সেই সব ব্যক্তি, যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত, পরিবার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল বিষয়ে ন্যায়বিচার করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৭)
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, নিপীড়ন, দুর্নীতি, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ হলো ন্যায়বিচারের অভাব। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শান্তি ও উন্নয়নের জন্য শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা। ইসলামও ঠিক এই শিক্ষাই দেয়—ক্ষমতার নয়, সত্যের বিজয়ই প্রকৃত বিজয়।




