• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

যে আয়াত শুনে মহানবী (সা.) অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন

জুমার দিনে যে ১৫ আমলে মিলবে অফুরন্ত সওয়াব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিনে যে ১৫ আমলে মিলবে অফুরন্ত সওয়াব
সংগৃহীত ছবি

সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার দিন। আল্লাহ তাআলা এই দিনকে অন্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাই জুমার দিনে মুমিনের হৃদয়ে মমতা ও হৃদ্যতার অপার্থিব এক সুখ ফুটে ওঠে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভালোবাসার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। এদিনের বিশেষ কিছু ইবাদত ও আমল আছে, যা মহানবী (সা.)-এর জীবনে পাওয়া যায়। নিম্নে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—

১. জুমাবারের ফজরের তিলাওয়াত করা : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) শুক্রবার ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা এবং সুরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৬৮)

জুমার দিন এই সুরা তিলাওয়াত করতেন : কারণ এই সুরাতে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির কথা, পুনরুত্থানের কথা, কিয়ামতের দিন সবাইকে সমবেত হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর এসব হবে জুমার দিন। সে জন্য এই সুরা পাঠ করে উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

২. বেশি পরিমাণে দরুদ শরিফ পড়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা জুমার দিন আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ কোরো। কেননা তোমাদের পাঠকৃত দরুদ আমার সামনে পেশ করা হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

৩. জুমার নামাজ আদায় করা : ইসলামের যেসব ফরজ বিধান আছে, এর মধ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ জুমার নামাজ। আরাফার দিবসের পর এদিনই সবচেয়ে বেশি মানুষ একসঙ্গে সমবেত হয়। যারা জুমার নামাজকে অলসতা কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ছেড়ে দেয়, তাদের হৃদয়ে আল্লাহ তাআলা মোহর মেরে দেন।

৪. গোসল করা : এই দিনে বিশেষভাবে গোসল করার তাগিদ এসেছে, সালিম (রহ.) থেকে তাঁর পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি জুমার নামাজে আসে সে যেন গোসল করে আসে। (তিরমিজি, হাদিস : ৪৯২)

৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা : অন্য দিনের চেয়ে এদিন বেশি সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮০)

৬. দ্রুত মসজিদে যাওয়া : জুমার দিনের ফজিলত লাভে  এই আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদিকে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া উচিত। 

৭. ইবাদতে মশগুল থাকা : ইমাম জুমার নামাজে আসার পূর্ব পর্যন্ত নামাজ, জিকির ও তিলাওয়াতে রত থাকা।

৮. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকা : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় তার সঙ্গীকে বলল, ‘চুপ থাকো’ সে একটি অনর্থক কাজ করল। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৪০১)

৯. সুরা কাহফ পড়া : আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তীকাল জ্যোতির্ময় হবে।’ (আত-তারগিব, হাদিস : ৭৩৫)

১০. জুমার নামাজের নির্ধারিত সুরা পাঠ করা : নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদের নামাজে ও জুমার নামাজে ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ ও ‘হাল আতা-কা হাদিসুল গা-শিয়াহ’ সুরা দুটি পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) সুরা জুমুআ ও সুরা আলা তিলাওয়াত করতেন।

১১. পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর কাপড় পরিধান করা : আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, তার উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমার সালাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দুজনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস : ১০৯৭)

১২. মসজিদে সুগন্ধি লাগানো : ওমর (রা.) জুমার দিন দ্বিপ্রহরে মসজিদে সুগন্ধি লাগানোর জন্য আদেশ করেছেন।

১৩. ক্ষমা প্রার্থনা করা : এদিন মহান রবের পক্ষে গুনাহ মাফের বারি বর্ষিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি পবিত্র হয়ে জামে মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকে, এরপর ইমাম নামাজ শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে, তাহলে এ নামাজ এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার গুনাহের কাফফারা (মোচনকারী) হয়ে যাবে, যদি ধ্বংসকারী তথা কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৩৭২৯)

১৪. মৃতদের জন্য দোয়া করা : জুমার দিন কবরের আজাব মাফ হয়ে যায়। আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) জুমার দিন ছাড়া (অন্য দিন) ঠিক দুপুরে নামাজ আদায় করা অপছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন, জুমার দিন ছাড়া (অন্যান্য দিনে) জাহান্নামের আগুনকে উত্তপ্ত করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৮৩)

জুমার দিনে বা রাতে যে মারা যাবে, তার থেকে কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হবে এটা এই হাদিস থেকে প্রমাণিত। তবে কিয়ামত পর্যন্ত আজাব দেওয়া হবে না এটা নিশ্চিত নয়।

১৫. বেশি বেশি দোয়া করা : বিশেষ সময়ে দোয়া কবুল হয়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, জুমার দিনের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে নিশ্চয়ই তিনি তাকে তা দান করেন। তিনি বলেন, সে মুহূর্তটি অতি স্বল্প। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৫৮)

বেশির ভাগের মতে, সে সময়টি আসরের পর থেকে নিয়ে মাগরিবের আগ মুহূর্ত। (জাদুল মাআদ থেকে সংক্ষেপিত)

যে দুই গুণ মুমিনের অন্যতম অবলম্বন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যে দুই গুণ মুমিনের অন্যতম অবলম্বন
সংগৃহীত ছবি

দুটি গুণ ঈমানকে মজবুত করে; এক. আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস। দুই. আল্লাহ ও মানুষের সামনে বিনয়। ক্ষেত্র বিশেষে আত্মবিশ্বাস ছাড়া মানুষ ভালো কাজের সাহস পায় না, আবার ভালো কাজের মাহাত্ম বজায় রাখার জন্য বিনয়ের বিকল্প নেই। ফলে আল্লাহর হুকম পালনের উদ্দেশ্যে অর্জিত এই দুটি গুণকে একে অপরের পরিপূরক বলা যেতে পারে।
আল্লাহর ওপর রাখা অগাধ আস্থা-ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস মুমিনকে দৃঢ় করে তোলে। পবিত্র কোরআনেও মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এই দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৯)

এই আয়াতে প্রতিটি মুমিনের জন্য শক্তিশালী অনুপ্রেরণা রয়েছে। এই আয়াত মুমিনকে আশাবাদী, সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে এই আত্মবিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে নিজের শক্তিই চূড়ান্ত; বরং এটি আল্লাহর সাহায্য, রহমত ও প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল।

মানুষ যদি প্রকৃত মুমিন হতে পারে, তাহলে তার হারানোর কিছুই নেই। সে দুনিয়াতে যে অবস্থায়ই থাকুক, তার জীবনে যা-ই ঘটুক, মহান আল্লাহ তাকে কোনো অবস্থায় ঠকতে দেবেন না। তার বিজয় সুনিশ্চিত। এই আত্মবিশ্বাস যদি কোনো মুমিন অর্জন করতে পারে, তাহলে পৃথিবীর কোনো বাধা, দুঃখ, হতাশা মুমিনকে দুর্বল করতে পারবে না।

তবে সতর্ক থাকতে হবে, আত্মবিশ্বাস যেন অহংকারে রূপ না নেয়। কারণ আল্লাহ অহংকারীকে নয়, বরং বিনয়ী বান্দাদের ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে বিনয়ী বান্দাদের সুনাম করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সংবোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’।” (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)


বিনয়ের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, বিনয় মানুষকে দুনিয়াতে সম্মানিত করে, আখিরাতে সফলতা অর্জনে সহায়তা করে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৮৬)

এর বিপরীতে অহংকারের ব্যাপারে অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬৮)

আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ ছিলেন রাসুল (সা.)। তিনি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসতেন, তাদের খোঁজখবর নিতেন, নিজের কাজ নিজেই করতেন এবং কখনো অহংকার করতেন না। আবার আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে অবিচল থেকেছেন।

আল্লাহর ওপর রাখা ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে এগিয়ে নেয়, আর বিনয় সেই অগ্রযাত্রাকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই দুটি মহৎ গুণের সমন্বয় মানুষের ঈমানকে আরো সুন্দর করে তোলে। মহান আল্লাহ সবাইকে আত্মবিশ্বাসী ও বিনয়ী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যেসব দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যেসব দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশ কিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়।  আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০)

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আছরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আছরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আছর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবনযাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১,  তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯)

৩. মা-বাবাসহ সব মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে সেই দিন ক্ষমা করে দেবেন; যেই দিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লিখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সমাজে ইমামের মর্যাদা ও সামাজিক আচরণবিধি

শায়খ আতাউর রহমান নদভী
সমাজে ইমামের মর্যাদা ও সামাজিক আচরণবিধি
সংগৃহীত ছবি

সমাজে মসজিদের ইমামদের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের মানসিক সংকটের একটি বাস্তবচিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পথে একজন ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথোপকথনে ফুটে উঠেছে। তিনি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আমাকে সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলেন এবং একপর্যায়ে আক্ষেপ করে বললেন, ‘আজকাল সমাজের মসজিদের ইমামরা মুকতাদিদের গোলামি ছাড়া আর কী করছেন? তারা (মুকতাদিরা) যা চান, ইমামরা তা-ই করছেন; খতিবও তার আলোচনায় তাদের সন্তুষ্টির কথা মাথায় রেখে আলোচনা করছেন।

কোরআন-সুন্নাহ যা চায়, তা করছে না। কারণ সত্য কথা বললে চাকরি থাকবে না। তাই অনেক সময় ভাবি, সামান্য একটু রুটি-রুজির জন্য কোরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে মুসল্লিদের সন্তুষ্টি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি! আখিরাতে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব—এটি নিয়ে সব সময় ভাবনায় থাকি।’
একজন ইমামের মুখে এমন বাস্তব ও বেদনাদায়ক কথা শোনার পর বাসায় ফিরে অবসর সময়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এই আত্মিক ও সামাজিক রোগ দূর করার জন্য যে সমাধানগুলো সামনে আসে, তা নিচে বিন্যস্ত করা হলো—

১. আত্মমর্যাদা রক্ষা এবং মুকতাদিদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা

* ইমামের নিজস্ব মর্যাদা ও দূরত্ব : ইমামকে সব সময় মুসল্লিদের থেকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে নিজের দ্বিনি মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে হবে। অতিরিক্ত সস্তা বা সহজলভ্য হয়ে গেলে হকের দাওয়াত ও ইমামতির প্রভাব ক্ষুণ্ন হয়। মুসল্লিদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গালগপ্প প্রথমেই ছাড়তে হবে। তাদের সঙ্গে চায়ের দোকানে আর পানের দোকানে বসা পরিহার করতে হবে। নিজের প্রয়োজনে বাজারে গেলে দ্রুত ফিরে আসতে হবে।

কেউ কোনো প্রশ্ন করে কিছু জানতে চাইলে তাকে নামাজের পর মসজিদে দেখা করতে অথবা নিজের রুমে এসে জানতে বলতে হবে।
* অতিরিক্ত ফ্রি না হওয়া : মুকতাদিদের সঙ্গে অনাবশ্যক ফ্রিনেস বা বেতাকল্লুফ (লৌকিকতাহীন ঘনিষ্ঠতা) রাখা যাবে না। এই ধরনের খোলামেলা ঘনিষ্ঠতা শুদু নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গেই মানায়।

২. মুকতাদিদের বাড়িতে অতিরিক্ত খাওয়াদাওয়া পরিহার করা

* মুকতাদিদের বাড়িতে ঘন ঘন দাওয়াত বা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। একটা সময় ছিল যখন মানুষ অত্যন্ত ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা নিয়ে ইমামদের আপ্যায়ন করত। কিন্তু বর্তমানের বস্তুবাদী মানসিকতা বা যে কারণেই হোক না কেন—পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। ইমামদের খাওয়াদাওয়ার ওপর অনেক সময় তাদের হকের বয়ান নির্ভর করে ফেলে। তাই চেষ্টা করুন, যেখানে উপযুক্ত দ্বিনি পরিবেশ নেই, সেখানে মুকতাদিদের ঘরে গিয়ে খাওয়াদাওয়া না করতে।

৩. বিভিন্ন মতাদর্শের মুকতাদিদের প্রতি আচরণ

* সমালোচনা বর্জন : নিজের বক্তৃতা ও বয়ানে প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার সঙ্গে সত্য তুলে ধরুন, কিন্তু অন্য কোনো ঘরানার মানুষকে উপহাস বা ঠাট্টা করবেন না। এতে মানুষের মধ্যে দূরত্ব ও ক্ষোভ তৈরি হবে। পরিশেষে আপনার ব্যাপারেও বিরূপ মন্তব্য শুরু হবে।

* মসজিদের উদার পরিবেশ : চেষ্টা করুন আপনার মাসজিদের পরিবেশ এমন রাখতে, যেন প্রতিটি মতাদর্শ ও ঘরানার মানুষ সেখানে দ্বিন শেখার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারে।

৪. বিদআত ও কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা

* যাবতীয় বিদআত, অনৈসলামিক রীতিনীতি ও সামাজিক কুসংস্কার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখুন।

* শুধু দাওয়াত খাওয়া এবং কিছু অর্থ কামানোর ধান্ধায় কোরআন-সুন্নাহর বাইরে বা সমাজের লোকদের কথায় নতুন কোনো ইবাদতের সিস্টেম চালু করবেন না।

* মানুষকে যা বলবেন তা আগে নিজে করে দেখাবেন।

* রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো কিছু খাবেন না।

* সমাজের ছোট-বড় সবাইকে সালাম দেবেন, এখানে তিক্ত একটি কথা না বলে পারছি না। এই যুগের মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্ররা এবং আলেমদের বড় একটি সংখ্যা মনে করেন তাঁরা শুধু সালাম পাওয়ার জন্য দুনিয়াতে এসেছেন। তাই তাঁরা অন্যকে সালাম দেন না। এ প্রসঙ্গে আমার একজন শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে। আমরা তাকে সালাম দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকি যে তিনি আরেকটু কাছে এলে সালাম দেব; কিন্তু না, তার আগেই তিনি সালাম দিয়ে দিতেন। তাকে কেউ আগে সালাম দিতে পারেনি।

৫. মাজহাব ও অন্যান্য ওলামাদের প্রতি সহনশীলতা

* মতান্তরের প্রতি উদারতা : ভিন্ন ভিন্ন মাজহাব ও মতামতের প্রতি উদারতা এবং সহনশীলতা বজায় রাখুন। যে বিষয়ের পেছনে কোরআন ও সুন্নাহর কোনো না কোনো দলিল বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষকে জোরজবরদস্তি বা পাকড়াও করবেন না।

* মাশায়েখদের সম্মান : আপনার সমসাময়িক বা অন্যান্য দ্বিনি নেতা, আলেম এবং মাশায়েখদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে চলুন। চাই তিনি যে মাজহাবেরই হোন না কেন? যে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকুন না কেন? এসব কথা মানতে পারলে সমাজে আপনার মর্যাদা বাড়বে।

* অবসর সময়ে জিকির-আজকার করতে থাকুন। বিশেষ করে ইস্তিগফার করতে থাকুন, আল্লাহ আপনার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন।

৬. রাজনীতি ও বিতর্কিত বিষয় পরিহার

* রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিষয়ের জটিল চোরাবালি এবং অনাবশ্যক বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। মসজিদের মিম্বারকে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে রাখুন।

৭. নামাজের পর মুসাল্লায় (জায়নামাজে) অবস্থান ও সুন্নত আদায়

* প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাড়াহুড়া না করে কিছুক্ষণ জায়নামাজে জিকির ও দোয়ায় অবস্থান করুন। তবে এটি আপনার নিজস্ব ইবাদত। তাই এটি কোনোভাবেই জোরে করা যাবে না। কারণ আপনার জোরে জোরে দোয়া কত মানুষ সুরাতুল ফাতেহা ভুলে তা কি আপনি জানেন? তাই আপনার দোয়া জান্নাতে না নিয়ে জাহান্নামেও নিতে পারে—এটি ভুলে যাবেন না। মেহরাবের পেছনের দরজাগুলো মূলত (মানুষের মুখোমুখি হওয়া থেকে) পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা। মসজিদে এমন দরজা রাখবেন না।

* সব সময় মেহরাবের ভেতর থেকেই সরাসরি জায়নামাজে আসা এবং সালাম ফিরিয়েই সেখান দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার স্থায়ী অভ্যাস করবেন না। কোনো বিশেষ বাধ্যবাধকতা বা জরুরি প্রয়োজন থাকলে তা ভিন্ন কথা।

* ফরজের আগের ও পরের সুন্নাত নামাজগুলো মসজিদেই আদায় করুন। যদিও সাধারণ মানুষের জন্য সুন্নত ও নফল নামাজ ঘরে পড়া উত্তম, কিন্তু একজন ইমাম হওয়ার খাতিরে আপনি তা করবেন না; বরং মুসল্লিদের শিক্ষা দেওয়া এবং ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে মসজিদেই তা আদায় করুন।