সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়েছে রেকর্ড গতিতে। বিশ্ববাজারের সাময়িক ওঠানামা বাদ দিলে এই মূল্যবান ধাতুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলছে বছরের পর বছর ধরে। ২০২০ সালেও যেখানে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ ডলার, বর্তমানে তা ৪ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। খবর ডয়েচে ভেলে
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বজুড়ে কাগজের মুদ্রার মান কমছে। অন্যদিকে বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় প্রথাগত বিনিয়োগ এখন আর আগের মতো লাভজনক মনে হচ্ছে না। ফলে নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। আর অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই বিশ্ববাজারে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
জার্মানিভিত্তিক ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সোনা কিনছে। বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার মজুদ ব্যাপক হারে বাড়াচ্ছে। ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ধারা বজায় থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে সোনার দাম বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে প্রতি আউন্স ৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
জার্মানির ল্যান্ডেসব্যাংক বাডেন-ভুর্টেমবার্গের বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক শ্যালেনবার্গার মনে করেন, মার্কিন ডলারের দুর্বল অবস্থান, সুদের হার কমার পূর্বাভাস এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের কেনাকাটার কারণেই সোনার বাজারে এই তেজি ভাব।
তবে এর পাশাপাশি বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো নতুন খাতের অংশগ্রহণকারীদেরও দেখছেন তিনি। শ্যালেনবার্গার জানান, ডিজিটাল মুদ্রার বিনিয়োগকারীরাও এখন ঝুঁকি এড়াতে তাদের সম্পদের একটি অংশ দিয়ে সোনা কিনছেন, যা সোনার দাম বাড়াতে নতুন জ্বালানি জোগাচ্ছে।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের মূল্যবান ধাতু বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল হুয়েহ জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বড় ও স্থায়ী ক্রেতারা এখন বাজার থেকে সাধারণ গহনা ক্রেতাদের একরকম দূরে ঠেলে দিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সোনার দামের রেকর্ড গড়াতে এই প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদাই মূল ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, ডিজেড ব্যাংকের বিশ্লেষক থমাস কুল্পের মতে, বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধাবস্থাই সোনা কেনার প্রধান কারণ। যেকোনো সংকটে সোনা সবসময়ই স্বাধীনতার গ্যারান্টি এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।
সোনা নিজে থেকে কোনো লভ্যাংশ বা সুদ তৈরি করতে পারে না এবং এর দামেও ফটকা বাজারের প্রভাব থাকে। তবুও গদির নিচে নগদ টাকা লুকিয়ে রাখার চেয়ে সম্পদ সুরক্ষায় সোনা রাখা অনেক বেশি নিরাপদ।
তবে শ্যালেনবার্গার কিছুটা সতর্ক করে বলেন, নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার সুনাম মাঝে মাঝে একটু বাড়িয়ে বলা হয়। পুরো সম্পদ সোনায় রূপান্তর না করে, যেকোনো পোর্টফোলিও বা তহবিলের ৫ থেকে ১০ শতাংশ সোনায় রাখা উচিত, যা বাজারের ঝুঁকি বা ওঠানামা কমাতে সাহায্য করে।
অবশ্য ডয়চে ব্যাংকের মাইকেল হুয়েহ ভিন্ন মত পোষণ করে বড় পরিসরেই সোনা জমা রাখার পক্ষে। তিনি মনে করেন, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও মুদ্রাস্ফীতি থেকে বাঁচতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা জমানোর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে সবসময়ই কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকে। ডয়চে ব্যাংকের ২০৩১ সালের মধ্যে আউন্সপ্রতি ৮ হাজার ডলারের পূর্বাভাস নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফ্রাঙ্ক শ্যালেনবার্গার এই পূর্বাভাসের সাথে একমত নন। তার মতে, গোল্ড ইটিএফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার যে জোয়ার ছিল, তা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে দাম দ্বিগুণ হওয়ার মতো বড় কোনো কারণ তিনি দেখছেন না।
তবে ডয়চে ব্যাংকের গবেষক মাইকেল হুয়েহ তার পূর্বাভাসে অনড়। তিনি মনে করেন, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন স্নায়ুযুদ্ধের মতো চরম উত্তেজনা চলছে। ফলে উদীয়মান দেশগুলো মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৪০ শতাংশই সোনায় রূপান্তর করতে পারে। আর তেমনটি হলে সোনার দাম ৮ হাজার ডলারে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়।
ডিজেড ব্যাংকের থমাস কুল্প অবশ্য মধ্যপন্থা অবলম্বন করছেন। ৮ হাজার ডলারের পূর্বাভাসকে তিনি উড়িয়ে না দিলেও কিছুটা সতর্ক। তবে তিনি আশাবাদী হয়ে বলেন, ‘আগামী ১২ মাসের মধ্যে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলারে উঠে যাবে। বাজারে সোনার মৌলিক চাহিদা এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তাই দীর্ঘমেয়াদে সোনার বাজার ইতিবাচক থাকবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’









