ফিতরাত অর্থ হলো প্রথমবার সৃষ্টি করা, উদ্ভাবন করা এবং মৌলিক সৃষ্টির অবস্থা। ফিতরাত মানে মানুষের সৃষ্টিগত সহজাত প্রবৃত্তি।ফিতরাত বলতে মানুষের সেই সহজাত স্বভাবকে বোঝায়, যার ওপর সে জন্মগ্রহণ করে। এতে মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত। এগুলো এমন বৈশিষ্ট্য, যা মানবতার মৌলিক দাবি। এগুলোর বিরোধিতা করা বা এগুলো থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে মানবিক স্বভাব থেকে বিচ্যুত হওয়া—কখনো সম্পূর্ণভাবে, আবার কখনো আংশিকভাবে।
ইসলাম ও মানবীয় ফিতরাত
আসমানি সব ধর্মই মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সব নবী-রাসুলের শিক্ষা মানবীয় ফিতরাতকে সমর্থন করেছে, তাকে শক্তিশালী করেছে এবং সেই স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণেই ইসলামকে ‘ফিতরাতের ধর্ম’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে এ দ্বিনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটি আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বিন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)
আল্লাহর অস্তিত্বের একটি সহজাত প্রমাণ
ফিতরাত আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম বড় প্রমাণ। মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বিস্ময়কর সামঞ্জস্য যেমন একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি মানুষের অন্তরের গভীরে নিহিত একটি সহজাত অনুভূতিও আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে।
এই অনুভূতি আল্লাহ মানুষের অন্তরে জন্মগতভাবে স্থাপন করেছেন। এটিই মানুষের ধর্মীয় প্রবৃত্তি, যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে। তবে কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে এই সহজাত অনুভূতি নিস্তেজ হয়ে যায়। কিন্তু যখন মানুষ বিপদে পড়ে, দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হয় কিংবা চারদিক থেকে অসহায় হয়ে যায়, তখন তার অন্তর্নিহিত ফিতরাত আবার জেগে ওঠে এবং সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। এ বিষয়েই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন মানুষ কোনো কষ্টে পতিত হয়, তখন সে শোয়া, বসা কিংবা দাঁড়ানো—সব অবস্থায় আমাকে ডাকে। অতঃপর যখন আমি তার কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলে যায় যেন সে কখনো তার কষ্ট দূর করার জন্য আমাকে ডাকেইনি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১২)
বাস্তবতা হলো মানুষ যতই আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন, তার অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাত কখনো সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয় না।
অনেক নাস্তিক বা আল্লাহকে অস্বীকারকারী মানুষকেও দেখা যায়, যখন জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে অজান্তেই আকাশের দিকে তাকায়, দুই হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সর্বশক্তিমান এক সত্তার আশ্রয় কামনা করে। এটাই মানবীয় ফিতরাতের জাগরণ এবং আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম শক্তিশালী সাক্ষ্য।
কোরআনে ফিতরাত সম্পর্কিত আয়াতসমূহ ও তাদের তাৎপর্য
কোরআনে এমন কিছু আয়াত আছে, যেগুলো সরাসরি মানবীয় ফিতরাতের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা রুমের ৩০ নম্বর আয়াত। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইসলাম মানুষের প্রকৃত স্বভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষকে এমন একটি স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে, যা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ইবাদত এবং সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। যদিও ‘ফিতরাত’ শব্দ কোরআনে মাত্র একবার এসেছে, তবু বহু আয়াতে তার অর্থ ও তাৎপর্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১. আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে তাঁর রব হওয়ার সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘আর স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে এনে তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৭২)
অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে এমন এক অন্তর্নিহিত স্বীকৃতি নিয়ে যে তার একজন স্রষ্টা আছেন।
২. আল্লাহর অঙ্গীকার (মিসাক) : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো এবং সেই অঙ্গীকারও স্মরণ করো, যা তিনি তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, যখন তোমরা বলেছিলে—‘আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম।’ আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের সব কথা জানেন।” (সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষকে মূলত আল্লাহর আনুগত্য করার স্বাভাবিক প্রবণতা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে।
৩. সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত অঙ্গীকার : আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৬০)
এখানে ‘অঙ্গীকার’ বলতে সেই প্রাচীন অঙ্গীকারকেই বোঝানো হয়েছে, যা আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে থাকা মানবজাতির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল।
৪. যারা আল্লাহর অঙ্গীকার রক্ষা করে : আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২০)
কাফফাল (রহ.) বলেন, ‘এ অঙ্গীকার বলতে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির মধ্যে স্থাপিত তাওহিদ ও নবুয়তের প্রমাণকে বোঝানো হয়েছে।’
৫. আল্লাহ এরই মধ্যে অঙ্গীকার নিয়েছেন : আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছ না, অথচ রাসুল তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনার আহবান জানাচ্ছেন? আর যদি তোমরা সত্যিই মুমিন হও, তবে আল্লাহ তো এরই মধ্যে তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন।’ (সুরা : আল-হাদিস, আয়াত : ৮)
কোরআনুল কারিমে মানবীয় ফিতরাতকে একটি শক্তিশালী দলিল ও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ব এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যের স্বাভাবিক অনুভূতি সৃষ্টি করে।




