রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হলে দেশ ও জাতি উভয়ের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য, কূটনৈতিক কৌশল বা জননিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত তথ্য প্রকাশ পেলে তা রাষ্ট্র ও জনগণের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ইসলামী শরিয়ত রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার জোর তাগিদ দিয়েছে।
গোপনীয়তা আমানত
ইসলামী শরিয়ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা পর্যন্ত সব গোপনীয় বিষয়কে আমানত বলে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৈঠকগুলো আমানতস্বরূপ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৬৯)
আর আমানত রক্ষা করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া মুমিনের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
তাফসিরবিদদের মতে, এখানে ‘আমানত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে মানুষের সম্পদ যেমন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও গোপন তথ্যও অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করেন, তবে তিনি এই আমানতের খিয়ানত করেন।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা প্রকাশযোগ্য নয়
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো মুমিনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের গোপনীয়তা প্রকাশ করা বৈধ নয়। এমনকি কোনো সাধারণ মানুষও যদি কোনো গোপন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে, তবে তারা তা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছাড়া কারো কাছে প্রকাশ করার অধিকার রাখে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন শান্তি অথবা শঙ্কার কোনো সংবাদ তাদের কাছে আসে, তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসুল কিংবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)
উল্লিখিত আয়াতের আলোকে ফকিহরা বলেন, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রসংক্রান্ত তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা শরিয়তসম্মত নয়।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসে নবীজির বিচার
মক্কা বিজয়ের আগে সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.) এক নারীর মাধ্যমে কুরাইশদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যাতে মুসলিম বাহিনীর অভিযানের ইঙ্গিত ছিল। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিষয়টি জানিয়ে দেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ধরতে আলী (রা.), মিকদাদ (রা.) ও জুবায়ের (রা.)-কে প্রেরণ করেন। তারা চিঠির বাহক নারীকে আটক করেন। তদন্তে যখন হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-এর নাম প্রকাশ পায় তখন ওমর (রা.) তাঁর প্রাণদণ্ড দেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) হাতিব (রা.)-এর কাছে কারণ জানতে চান। তিনি উত্তরে বলেন, আমি এর মাধ্যমে মক্কায় থেকে যাওয়া আর পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং বলেন, তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আাাল্লাহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা যা ইচ্ছা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০০৭)
হাদিসের শিক্ষা
উল্লিখিত ঘটনার আলোকে প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন,
১. রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। কেননা তা রক্ষার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।
২. রাষ্ট্রীয় বা সামরিক গোপনীয়তা ফাঁস করা গুরুতর অপরাধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি নাকচ করেননি, অযৌক্তিক বলেননি, বরং তিনি বদরি সাহাবি হিসেবে ক্ষমা লাভ করেছেন।
৩. শাস্তি নির্ধারণে অপরাধীর উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রের ক্ষতির মাত্রাও বিবেচনা করা আবশ্যক।
গোপনীয়তা ফাঁস করা হারাম
গোপনীয় বিষয় চাই তা অন্যের ব্যক্তিগত হোক বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোক তা প্রকাশ করা হারাম। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেওয়া খিয়ানত। যখন তাতে অন্যের ক্ষতি থাকবে তা করা হারাম আর তাতে ক্ষতি না থাকলে তা নিন্দনীয় বিষয়।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ৯/২৩৬)
শরিয়তে গোপনীয়তা ফাঁসের শাস্তি
ইসলামী শরিয়তে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় ফাঁসকারীর জন্য কোনো হদ (বিধিবদ্ধ শাস্তি) ঘোষণা করেনি। তবে কাজটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে এবং তাজিরের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাজির হলো এমন অপরাধ, যার শাস্তি শরিয়ত রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করেছে। রাষ্ট্র অপরাধের ধরন, উদ্দেশ্য ও ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনা করে তার শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করবে। যার মধ্যে থাকতে পারে সতর্কীকরণ, ভর্ত্সনা, পদচ্যুতি, জরিমানা, কারাদণ্ড, নির্বাসন ইত্যাদি। ‘নাতায়িজুল বুহুস’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে, ‘ইসলামী শরিয়ত রাষ্ট্রের গোপনীয়তায় অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে এবং তা ফাঁস করাকে গুরুতর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেননা এর ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। ইসলামী শরিয়ত গোপনীয়তা ফাঁসকারীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে।’ (নাতায়িজুল বুহুস ওয়া খাওয়াতিমুল কুতুব : ৪/৩৯৪)
গোপনীয়তা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ধর্মীয় আমানত। তা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনগণের জীবন ও সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবেদনশীল তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের বাইরে প্রকাশ করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। কোরআন আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, যাচাই ছাড়া নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রচার করতে নিষেধ করেছে। তাই একজন মুসলিমের উচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং এ আমানত ভঙ্গ থেকে বিরত থাকা। পবিত্র কোরআনে যেভাবে বলা হয়েছে, ‘মুমিনরা তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ কোরো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ কোরো না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।




